নৈতিক শিক্ষা: প্রকৃতি, প্রকরণ ও বাস্তবায়ন

0
446

অধ্যাপক ড. গালিব আহসান খান

নৈতিক শিক্ষার বাস্তবায়ন
এখন প্রশ্ন হলো, কল্যাণমুখী কর্তব্যবাদকে নৈতিক বাস্তবায়ন করার উপায় কি হবে? এটি একটি জটিল বিষয়। সমাজে বসবাসকারী মানুষের নানা বৈচিত্র্য, যেমন, দেহ-মনের বৈচিত্র্য, শিক্ষা-সংস্কৃতির বৈচিত্র্য, কামনা-বাসনার বৈচিত্র্য, ইত্যাদি বিবিধ দিক মানব প্রকৃতিকে এবং মানবিক পরিপ্রেক্ষিতকে অতি জোরালো অর্থে বিচিত্র এবং আপেক্ষিক করে তোলে। বৈচিত্র্যের এই ভিত্তি থেকে সমাজও গড়ে ওঠে নানা বৈচিত্র্য নিয়ে। কিন্তু সকল বৈচিত্র্যের মধ্যে অত্যাবশ্যকভাবে বিরাজ করে, এমন সার্বিক ও মৌলিক তিনটি দিকের ওপর আমি আলোকপাত করব। এই তিনটি দিকের মধ্য দিয়েই নৈতিক শিক্ষার বাস্তবায়ন হবে। প্রথম দিকটি হবে মানব-প্রকৃতি, দ্বিতীয় দিকটি হবে বাস্তবায়নের শুরু ও শেষ সংক্রান্ত এবং তৃতীয় দিকটি হবে ব্যক্তি ও সমষ্টির সম্পর্কের দিক।

নৈতিক শিক্ষার বাস্তবায়ন : প্রসঙ্গ মানব-প্রকৃতি
মানুষ কীভাবে কাজ করে, কাজটির ভালো-মন্দ দিকের মূল্যায়ন কী হবে- এসব বহুলাংশে নির্ভর করে একজন মানুষের মানবিক প্রকৃতির ওপর। একজন মানুষ কথা বেশি বলে এবং বেশি বলতে যেয়ে ভুল কথা বলে ফেলে। এটি ব্যক্তিটির মানব প্রকৃতির সাথে যুক্ত; ব্যক্তিটি প্রকৃতিগতভাবে এক্সট্রোভার্ট ধরনের এবং তার বৃদ্ধির মাত্রা উচ্চস্তরের নয় অথবা ব্যক্তিটি ভুলকে ভালোবাসে। বাস্তবে এমন আছে যে, অনেক মানুষ ভুল পথে চলতে আনন্দ পায়, অন্যকে দুঃখ দিয়ে আনন্দ পায়। আবার এমনও আছে যে, সত্য বলে দুঃখকে মেনে নেবে, কিন্তু মিথ্যা বলবে না। ভারতীয় চার্বাক দর্শনের আলোচনা ও চর্চা থেকে মনে হয় যে, এমন মানুষ আছে যারা ঋণ করে ঘি খাবার পক্ষে; কিন্তু বাস্তবে এমন মানুষও আছেন যারা অনাহারে, অর্ধাহারে দিন কাটালেও খাবার জন্য ঋণ করবে না। এসব বিবিধ বিষয় ব্যক্তি বিশেষের মানব-প্রকৃতির সাথে যুক্ত থাকে। সব মানুষ এক রকম নয়। এই পরিপ্রেক্ষিত থেকে বলা যেতে পারে যে, মানুষ তার নিজস্ব মানব প্রকৃতি দিয়ে কাজ করে। এখানে মানব প্রকৃতি বলতে আমি মানুষের জীবতাত্ত্বিক দিকটির ওপর গুরুত্ব দিয়েছি, যা জৈব-দৈহিক প্রবৃত্তি দ্বারা চালিত হয়। কিন্তু এই প্রকৃতিকে শিক্ষার মধ্য দিয়ে পরিবর্তন করা সম্ভব। এমন পরিবর্তনের দ্বারা মানুষের ব্যক্তিত্বকে নৈতিকভাবে গড়ে তোলার মধ্য দিয়েই নৈতিক শিক্ষার বাস্তবায়ন হবে। মানুষের ব্যক্তিত্বের গঠনের ক্ষেত্রে জীবতাত্ত্বিক এই দিকটির ওপর মনোবিদ্যক দিক থেকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। Personality : Theory and Research গ্রন্থে পারভিন এবং জন বলেন যে, ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে নানা প্রতিক্রিয়াশীল বিষয় দিয়ে, যেগুলোর মধ্যে রয়েছে জেনেটিক ও সাংস্কৃতিক দিক এবং সমাজের শ্রেণীস্তর ও পারিবারিক দিক; ব্যক্তি বৈশিষ্ট্যের বিকাশের পরিধির পরিসীমা বংশ পরস্পরা দিয়েও নির্ধারিত হয়, যে পরিসীমার মধ্যে বৈশিষ্ট্যকে নির্ধারণ করে পরিবেশগত শক্তি। এখানে ব্যক্তিত্ব গঠনের ক্ষেত্রে জেনেটিক যে দিকটির কথা বলা হয়েছে, সেটাই জীবতাত্ত্বিক দিক। এই দিকটির এবং সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং পরিবেশগত যেসব দিকের কথা বলা হয়েছে তার সব ক্ষেত্রেই ভালো পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ভালো ব্যক্তিত্ব গঠন করলে সেটাই হবে নৈতিক শিক্ষার বাস্তবায়ন।


নৈতিকতা বিকাশের জীবতাত্ত্বিক এই দিকটির সাথে দর্শনের একটি মতাদর্শের যোগসূত্র রয়েছে। মানুষ কি কাজ করে, কেমন কাজ করে, তার সাথে ব্যক্তির দেহ-মনের পারস্পরিক সম্পর্কের দিকটিও যুক্ত। দৈহিক শক্তি কিছু মানুষকে খ্যাতি অর্জনে মূল সহায়তা দেয়; অন্যদিকে মানসিক দিকটিও কখনো এমন মূল সহায়তা দিয়ে থাকে। একজন ফুটবল খেলোয়াড়ের খ্যাতি অর্জনে দৈহিক দিকটির ভূমিকা যেমন প্রধান, একজন সাহিত্যিকের খ্যাতি অর্জনে মনের দিকটির ভূমিকাও তেমনি প্রধান। এই উভয় দৃষ্টান্তেই প্রধান দিকটির অপর দিকটি প্রধান না হলেও তা পরিপূরক ভূমিকা পালন করে। দর্শনে এভাবে একটি মতাদর্শ গড়ে উঠেছে, যা হলো দেহ-মনের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়াবাদ। এ মতবাদ অনুসারে যে কোনো দৈহিক পরিবর্তন মনেও পরিবর্তন আনবে এবং অনুরূপভাবে যে কোনো মানসিক পরিবর্তন দৈহিক পরিবর্তনও আনবে। যেমন, দৈহিক অসুস্থতা মানুষের মনকে দুর্বল করে দেয়; একইভাবে মানসিক বেদনা দৈহিক প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশ পায়। নৈতিক শিক্ষার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দেহ-মনের এই সম্পর্কের একটা ভূমিকা থাকবে। ব্যক্তির আচরণের দৈহিক প্রকাশ এবং গঠনের জন্য মানসিক দিককে নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হওয়া যেতে পারে। মানসিক দিকের নিয়ন্ত্রণ এবং গঠন মূলত শিক্ষার মধ্য দিয়েই হবে। এ বিষয়ে আমার মত হলো যে, নৈতিক শিক্ষার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মনের ভূমিকাটা থাকবে মুখ্য, কিন্তু নৈতিক শিক্ষার ব্যর্থতার ক্ষেত্রে দেহ-মন উভয়েরই জোরালো ভূমিকা থাকবে এবং এটা হবে দেহ-মনের নিম্ন পর্যায়ের গুণগত মান দিয়ে। যে ব্যক্তি জৈবদৈহিক প্রবৃত্তি দিয়ে চলবে, বা যে ব্যক্তির মন সংকীর্ণ হবে তাদের ক্ষেত্রে নৈতিক শিক্ষা ভালো কাজ করবে না। অন্যদিকে শিক্ষাকে গ্রহণ এবং ধারণ করা হয় মন এবং মননশীলতার মাধ্যমে। এই পরিপ্রেক্ষিত থেকে নৈতিক শিক্ষার বাস্তবায়নে আমি মনের ওপর বেশি গুরুত্ব দেবো, যেন মন দ্বারা প্রভাবিত হয়ে দেহ সঠিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতে পারে এবং মানুষের আচরণ সুন্দর এবং ভালো হয়।


নৈতিক শিক্ষা প্রসঙ্গে উপর্যুক্ত আলোচনায় মানব-প্রকৃতির জীবতাত্ত্বিক দিক ও মননশীলতার দিকের ওপর আমি গুরুত্ব দিয়েছি; প্লেটোর দর্শনেও এ দুটো দিকের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আদর্শ রাষ্ট্রের আলোচনায় প্লেটো সমাজের যে শ্রেণী বিভক্তের কথা বলেছেন, সেখানে ব্যক্তির আত্মার তিনটি দিকের কথা রয়েছে, যেগুলো হলো- প্রবৃত্তি, বিক্রম এবং প্রজ্ঞা। প্রবৃত্তি বলতে প্লেটো বুঝিয়েছেন ক্ষুধা, তৃষ্ণা, কামনা-বাসনা, ভোগ এবং তৃপ্তির দিক। প্রবৃত্তির দিকটি মানব-প্রকৃতির জীবতাত্ত্বিক দিকেরই প্রতিফলন। অন্যদিকে প্রজ্ঞা বলতে প্লেটো বুঝিয়েছেন চিন্তার দিক। চিন্তার এ দিক মন এবং মননশীলতারই প্রতিফলন। আত্মার অপর দিকটি হলো বিক্রম, যা আত্মার দ্বন্দ্বে বিবেকের পক্ষ অবলম্বন করে। আদর্শ রাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং ন্যায়পরতার আলোচনায় মানব-প্রকৃতির এই কাঠামোকেই প্লেটো ধারণ করেছিলেন। নৈতিক শিক্ষায় মানব-প্রকৃতির গুরুত্বের এটি একটি ক্লাসিক দৃষ্টান্ত।

নৈতিক শিক্ষার বাস্তবায়ন: শুরু ও শেষ
নৈতিক শিক্ষা প্রসঙ্গে মানব-প্রকৃতির যে দিকটিকে উপরোক্ত আলোচনায় তুলে ধরা হয়েছে, সেই পরিপ্রেক্ষিতে থেকেই নৈতিক শিক্ষার শুরু হবে। মানব-প্রকৃতি অনুযায়ী একজন ব্যক্তি শিশুকালে জৈব-দৈহিক প্রকৃতি দিয়ে জীবন শুরু করে। এ সময়ে মানব জীবনের ভিত্তিমূলক মৌলিক শিক্ষার সূচনা হয়, যা শিশুকালে সূচিত না হলে জীবনে আর কখনোই হয় না। নৈতিক শিক্ষাও জীবনের ভিত্তিমূলক একটি মৌলিক শিক্ষা; এটা মৌলিক এ কারণে যে, এই শিক্ষার শূন্যতা মানুষকে অমানুষে পরিণত করতে পারে। এসব মৌলিক শিক্ষার সূচনা শিশুকালে না হলে, পরবর্তীতে সেটা যে আর কখনোই হয় না, তার একটি দৃষ্টান্ত হলো, কথা বলতে শেখা। শিশুকালে যে, কথা বলতে শিখতে পারে না, জীবনে কখনোই সে কথা বলতে পারে না, সে হয় বাক প্রতিবন্ধী। আরো একটি দৃষ্টান্ত, যেমন হাঁটতে শেখা। শিশুকালে যে হাঁটতে শিখতে পারে না, সেও হয় এক ধরনের দৈহিক প্রতিবন্ধী। স্বাভাবিক হাঁটা-চলা তার আর কখনোই হয় না এবং শিশুকালে যার স্কুলের প্রাথমিক শিক্ষা হয় না, প্রাপ্ত বয়স্ক অবস্থায় তার সেই শিক্ষা আর হয় না। একইভাবে, আদব-কায়দা, রুচি-সংস্কৃতি-এগুলোও এক ধরনের মৌলিক শিক্ষা এবং শিশুকালেই এসবের সূচনা হয়। শিশুকালে যাকে চেষ্টা করেও আদব-কায়দা শেখানো যায় না, প্রকৃতিগতভাবেই সে হয় আদব-কায়দা বর্জিত। এই পরিপ্রেক্ষিত থেকে বলবো যে, শিশুকালে নৈতিক শিক্ষার শুরু হবে একজন শিশুর আচরণ এবং ব্যক্তিত্বের গঠনের মধ্য দিয়ে। আচরণ এবং ব্যক্তিত্বের গঠন যেমন শিশুকাল থেকেই শুরু হয়, একইভাবে আচরণের ও ব্যক্তিত্বের মূল্যবোধের দিকটির গঠনও শিশুকাল থেকেই শরু হয়।

এরই একটি ক্লাসিক ও ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন বিংশ শতাব্দীর আমেরিকান দার্শনিক জন ডিউই। যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার করার লক্ষ্যে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে নানা পরিবর্তন আনেন। তাঁর এই কার্যক্রম এতোটাই বিশ্বখ্যাতি লাভ করেছিল যে, তিনি তুরস্ক, রাশিয়া, চীন এবং জাপানে শিক্ষার সংস্কারমূলক কাজে উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠনের মূল ভিত্তি হিসেবে শিশুশিক্ষার ওপরই গুরুত্ব দিয়েছিলেন ডিউই। এই উদ্দেশ্যে থেকেই তিনি সর্বপ্রথম প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন নতুন ধারার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বর্তমানে আমরা যাকে ল্যাবরেটরি স্কুল বলে থাকি। ল্যাবরেটরি স্কুলে শিশুদের কেবল বইয়ের পাতা থেকে শেখানো নয়, বরং হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে শিশুদের আচরণ ও ব্যক্তিত্ব গঠনের প্রক্রিয়া জন ডিউই প্রথম প্রচলন করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে। তাঁর ল্যাবরেটরি স্কুলে শিশুদেরকে তুলা দেওয়া হতো, সুতা বননের জন্যে; এসব কাজের জন্যে যে অধ্যবসায় এবং যে পারস্পরিক সহযোগিতার প্রয়োজন হয়, তার মধ্য দিয়েই ব্যক্তি হিসেবে শিশুর আচরণ ও ব্যক্তিত্ব গঠন হতো। ভালো সমাজ গঠনের জন্যে মানুষের মাঝে যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতার প্রয়োজন হয়, এমন প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়েই শিশুদের মধ্যে তা গড়ে ওঠে।
শিশুদেরকে শিশুকালে এভাবে গড়ে তোলার জন্যে আমার এমন চিন্তার পক্ষে আমি আরো একটি বাস্তব দৃষ্টান্ত দেবো।

আমরা লক্ষ্য করি যে, বাংলাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষায় শিশুকালে শিশুদেরকে যেভাবে গড়ে তোলা হয়, সেই শিশুগণ পরবর্তীতে সেভাবেই জীবনযাপন করে। একইভাবে শিশুকালে যদি আমরাও শিশুদের নৈতিকভাবে গড়ে তুলতে পারি তাহলে পরবর্তীতে তারাও তাদের জীবন থেকে এ শিক্ষার প্রভাব অগ্রাহ্য করতে পারবে না, কারণ তাদের জীবনটা গড়েই উঠবে নৈতিক শিক্ষা দিয়ে। শিশুকালে দেহ ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। মনোবিজ্ঞানের চিরায়ত সাপেক্ষীকরণ তত্ত্ব বা ক্লাসিক্যাল কন্ডিশনিং তত্ত্ব অনুযায়ী যদি নৈতিকভাবে শিশুদেরকে কন্ডিশন্ড করে দেওয়া যায়, তাহলে সেটাই হবে তাদের দেহ-মনের গঠন এবং সেভাবেই তারা জীবনযাপন করবে। নৈতিক সাপেক্ষিকরণ তখন চলবে চিরায়তভাবে। রিপাবলিক গ্রন্থে প্লেটো যে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার কথা বলেছেন, সেখানেও এই আদর্শই প্রতিফলিত হচ্ছে।


শিশুকালে নৈতিক শিক্ষা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণের মধ্যে যে পার্থক্য সেটাও বিবেচনায় আনতে হবে। এ দুয়ের মধ্যে প্রশিক্ষণের গুরুত্ব প্রাথমিক পর্যায়ে বেশি, কারণ শিশুকালে শিক্ষার শুরু হয় প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও অনেক বিষয়েই প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়েই শিক্ষার বাস্তবায়ন হয়। গণিতের মতো বিশুদ্ধ বিজ্ঞানে শিশুদের সংখ্যাজ্ঞান এবং গণনা শিক্ষা হয় হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে। শিশুদের খেলাধুলা শেখা, সংগীত শেখা, চিত্রকলা শেখা, সবই হয় প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে। কিন্তু পরবর্তীতে চিকিৎসা বিজ্ঞান, ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা এবং এমন অনেক বিষয়েই শিক্ষার পূর্ণতা আসে ইন্টার্নশিপের মধ্য দিয়ে, যা হলো প্রশিক্ষণ। নৈতিক শিক্ষার বাস্তবায়ন যেহেতু আচরণ এবং ব্যক্তিত্ব গঠনের মধ্য দিয়ে হবে, তাই শিশুকালে এটা শুরু হবে প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে এবং বয়ঃসন্ধিকাল থেকে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি থাকবে নৈতিক শিক্ষা। নৈতিক প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে নৈতিক অভ্যাস গঠন হবে; শিক্ষা একধরনের অভ্যাস গঠন। পরবর্তীতে নৈতিক শিক্ষার মধ্য দিয়ে এ বিষয়ে মন ও মননশীলতার চর্চা হবে। প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে দৈহিক আচরণের গঠন ও পরিবর্তন প্রাধান্য পাবে; পরবর্তীতে শিক্ষার মধ্য দিয়ে মনের দিকটি অর্থাৎ মানসিক দিকের বিকাশ প্রাধান্য পাবে। মানব-প্রকৃতির জীবতাত্ত্বিক দিক ও মানবিক (যা মননশীলতার ও মনুষ্যত্ববোধের প্রকাশ) দিক নৈতিকভাবে গড়ে উঠবে।


নৈতিক প্রশিক্ষণ ও নৈতিক শিক্ষা বিষয়ে আমার মত হলো যে, শিশুকালে প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ছাত্র-ছাত্রীদের নৈতিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে এবং পরবর্তীতে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত নৈতিক শিক্ষা দেওয়া হবে এবং নবম ও দশম শ্রেণির সময়ে পুনরায় নৈতিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, সেখানে শৃঙ্খলা, সংযম, শিষ্টাচার, অধ্যবসায় ও সততা শেখানো হবে। এর মধ্য দিয়ে শিশুকাল থেকেই সুন্দর ব্যক্তিত্ব গঠনের সূচনা সম্ভব হবে। আমার এ প্রস্তাবটি নতুন কোনো কথা নয়, কিন্তু বাস্তবে এর চর্চা কতটুকু হচ্ছে তা যথেষ্ট প্রশ্নসাপেক্ষ বিষয়। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত যে নৈতিক শিক্ষা দেওয়া হবে, তার মাধ্যম হবে নীতিশিক্ষা সহায়ক সাহিত্য। যেমন, টলস্টয়ের বিশ্বখ্যাত গল্প, “একজন মানুষের কতটুকু জমি প্রয়োজন” এবং গাই দ্য মোপাশার বিশ্বখ্যাত গল্প, “নেকলেস” এবং অনুরূপ রচনা থেকে পাঠের মধ্য দিয়ে যথার্থ অর্থেই তরুণ সমাজের মধ্যে নৈতিক চেতনাকে উদ্বুদ্ধ করা যেতে পারে। এসব গল্প থেকে একজন স্কুল শিক্ষার্থী যে আবেগ-অনুভূতি লাভ করবে, সেটাই হবে আত্মসংযম শেখার মূল ভিত্তি। উপরের আলোচনায় বলেছি যে, নবম ও দশম শ্রেণিতে নৈতিক প্রশিক্ষণ হবে। এ পর্যায়ের প্রশিক্ষণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বলতে পারি যে, একটি শিক্ষাঙ্গনকে পরিচ্ছন্ন রাখার কাজটি ছাত্রছাত্রীগণ করতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়েও এই প্রক্রিয়াটির প্রচলন করা যেতে পারে। দৃষ্টান্ত হিসেবে বলতে পারি যে, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ক্যাম্পাস সাভারে স্থাপন করা হয়েছে, যা আবসিক ক্যাম্পাস। সব ছাত্র-ছাত্রীদেরকেই পর্যায়ক্রমে এক সেমিস্টারের জন্যে সাভারের এই ক্যাম্পাসে থেকে কোর্স করতে হয়। এ সময়ে শিক্ষার্থীদেরকেই ক্যাম্পাসের রক্ষণাবেক্ষণের কিছু কাজ করতে হয়। এমন প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়েই তরুণ প্রজন্মের মনে দায়িত্ববোধ, সমাজ সেবার চিন্তা, পারস্পরিক সহযোগিতার বোধ, ইত্যাদি গড়ে ওঠে, যা একটি ভালো সমাজের জন্যে একান্তভাবেই আবশ্যক।
শিক্ষাজীবনের প্রাথমিক স্তরের প্রশিক্ষণ প্রসঙ্গে একটি সমস্যার কথাও বলবো। কখনো এমনও হতে পারে যে, প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে পারিবারিক ভূমিকা অনিচ্ছাকৃতভাবেও বাধা হতে পারে। একটি দৃষ্টান্ত দেবো। একজন ছাত্র স্কুলে পরীক্ষায় ভালো করেনি। ছাত্রটির ওপর তার বাবা খুব ক্ষুব্ধ হয়েছেন। এক পর্যায়ে বাবা রেগে ছেলেকে বললেন, ‘আমি কোনো কথা শুনতে চাইনা, যেভাবেই হোক তোমাকে পরীক্ষায় ভালো করতেই হবে’। ছেলেটি ভাবতে শুরু করলো, যেভাবেই হোক তাকে পরীক্ষায় ভালো করতেই হবে। ছেলেটি ভাবতে থাকে, যেভাবেই হোক, তাহলে কিভাবে? ছেলেটি বন্ধুদের সহায়তা নিতে শুরু করলো। বই পড়তে যেয়ে কিছু বুঝতে না পারলে বন্ধুদের সহায়তা নিলো। প্রশ্নের উত্তর কীভাবে লিখবে, সেখানে বন্ধুদের পরামর্শ নিলো। এমন সহায়তা নিতে নিতে এক পর্যায়ে ছেলেটি পরীক্ষার হলে বন্ধুর সহায়তা নিলো; বন্ধুর উত্তরপত্রের দিকে তাকিয়ে দেখে তার উত্তর লিখলো। একজন ব্যক্তি তাঁর সন্তানের ভালো চাইলেন, কিন্তু বিষয়টি অনৈতিক দিকে চলে গেল। সমস্যাটি এখানে যে, সন্তানের নিকট ভালো কিছু চাইলেও কীভাবে তা চাইতে হবে সেটাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এই দৃষ্টান্ত দিয়ে আমি বুঝাতে চাইছি যে, পারিবারিক প্রশিক্ষণের ত্রুটি শিক্ষার্থীদের ভুলের কারণ হতে পারে। ‘যেভাবেই হোক’ কথাটার অর্থের মধ্যে সমস্যা আছে। আক্ষরিক অর্থে, ‘যেভাবেই হোক’ কথার মধ্যে কোনো বাধা নেই, যেভাবে ইচ্ছে কাজ করা যাবে। কিন্তু এমন কথার মধ্যে যে অর্থের বৈচিত্র্য থাকতে পারে, তা একজন স্কুল ছাত্রের পক্ষে বোঝার কথা নয়, স্কুল ছাত্র কোনো ভাষাবিদ নয়। বাবা তাঁর ছেলেকে কথাটা বলেছেন ক্রোধ এবং আবেগ থেকে, যুক্তি বা বিবেক থেকে নয়। সমস্যা এখানেই। আমার উপরেরর আলোচনায় নৈতিক শিক্ষার ক্ষেত্রে মানব-প্রকৃতির যে ভূমিকার কথা বলেছি, তার বাস্তবতা এই দৃষ্টান্তের মধ্যে রয়েছে।
এই পরিপ্রেক্ষিত থেকে আমার প্রস্তাব হলো যে, নৈতিক শিক্ষার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রাথমিক শিক্ষাপর্বে শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের জন্য স্কুলের পক্ষ থেকে শিক্ষাবর্ষের শুরুতে একটি অরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠান করা প্রয়োজন, যার মধ্য দিয়ে অভিভাবকগণ তাঁদের সন্তানদের সঠিক দিকনির্দেশনা দেবার ধারণাগুলো পাবেন। শিক্ষাবর্ষের শুরুতে শিক্ষকদের জন্যও অনুরূপ একটি অনুষ্ঠান করা একটি ভালো কাজ হবে। কিন্তু সমস্যাটা এখানে যে, আমাদের প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষা কারিকুলাম ভিত্তিক পঠন-পাঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। এ কারণে নৈতিক শিক্ষার কোনো ব্যবহারিক প্রয়োগ বা প্রশিক্ষণ হয় না এবং নৈতিক শিক্ষার বাস্তবায়ন হয় না।

নৈতিক শিক্ষার বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই অভিভাবকদের এবং শিক্ষকদের অরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠান আবশ্যক। নৈতিক শিক্ষার বাস্তবায়নের শুরু কীভাবে হবে উপরের আলোচনায় তা তুলে ধরা হয়েছে। নৈতিক শিক্ষার বাস্তবায়নের শেষ হওয়া প্রসঙ্গে বলবো, এটা হবে কর্মজীবনে; বিভিন্ন ব্যক্তির পেশাগত দিক থেকে নানাভাবে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। এখানে মুখ্য ভূমিকা পালন করবে বিবিধ নৈতিক উন্নয়ন কেন্দ্র। কিন্তু নৈতিক শিক্ষা এবং এর বাস্তবায়ন বিরোধী সম্ভাব্য একটি সমস্যা সম্পর্কে কিছু বলবো।


আলোচনার শুরুতে আমি বলেছি যে, নৈতিক হবার জন্যে নৈতিক শিক্ষার প্রয়োজন। কিন্তু কেউ বলতে পারেন যে, নৈতিক শিক্ষা দিলেই যে একজন মানুষ নৈতিক হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। বাস্তবে এমন দেখা যায় যে, জ্ঞানী ব্যক্তি এমন কাজ করেন যা করা উচিত নয়। একইভাবে নৈতিক শিক্ষা, নৈতিক জ্ঞানের অধিকারী হয়েও কেউ এমন কাজ হয় করেন যা করা উচিত নয়। এভাবে কেউ নৈতিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাকে প্রশ্নসাপেক্ষ করতে পারেন। কিন্তু আমি মনে করি, এ প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করার কোনো অবকাশ নেই। সাদৃশ্যমূলক একটি যুক্তি দিয়ে বিষয়টিকে আমি ব্যাখ্যা করবো।
এটা বাস্তবে সত্য যে, অনেক সময় চিকিৎসা নিয়ে আমরা সুস্থ হতে পারি না, ঔষধ দিয়ে রোগ নিরাময় হয় না। কিন্তু তাই বলে চিকিৎসা বা ঔষধের প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করা যায় না। একইভাবে নৈতিক শিক্ষা, কোনো বিরূপ পরিস্থিতির কারণে, একজন ব্যক্তিকে নীতিবান করার ক্ষেত্রে বিফল হলেও এর গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করা যাবে না।


পরিশেষে বলবো যে, নৈতিক শিক্ষার বাস্তবায়নের শেষ হবে বিভিন্ন পেশার মধ্য দিয়ে কর্মজীবনের পরিসরে। নৈতিকতার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজনীতিরও একটা ভূমিকা থাকবে; কারণ, রাজনীতি সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং সমাজ কেমন তার ওপরই নির্ভর করবে নৈতিকতা কেমন হবে এবং কতটুকু বাস্তবায়িত হবে। আদর্শ রাষ্ট্রের রাজনীতি হবে গণতান্ত্রিক এবং গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে নৈতিকতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here