নৈতিক শিক্ষা: প্রকৃতি, প্রকরণ ও বাস্তবায়ন

0
22

অধ্যাপক ড. গালিব আহসান খান

এ জগতে মানব অস্তিত্বের বিকাশের ধারায় মানবজাতির এবং মানব সভ্যতার যত সংকট তৈরি হয়েছিল, তার মূলে ছিল নৈতিক সংকট। সভ্যতার বিকাশের বিবিধ পর্যায়ে, যেমন প্রাচীন যুগের দাস প্রথার সময়ে, আইয়ামে জাহেলিয়াতের সময়ে, হিটলারের হত্যাযজ্ঞের সময়ে এবং এ ধরনের সকল ক্ষেত্রেই সভ্যতার সঙ্কটের মূল কারণ ছিল নৈতিক সংকট। এসব বৃহত্তর দিকগুলোর পাশাপাশি যদি ক্ষুদ্র দিকের কথা বলি তাহলেও দেখব যে, মানুষের দুঃখের একটা বড়ো কারণ হলো নৈতিক সংকট। ইভ টিজিং কেন হয়? ছিনতাই, খুন কেন হয়? মিথ্যাচার কেন হয়? একজন ব্যক্তি আদর্শের কথা বলেন কিন্তু আদর্শ-বিচ্যুত কাজ কেন করেন? এ সবকিছুর মূলেই রয়েছে নৈতিক সংকট। যুগে যুগে যত ধর্ম এসেছে, যত মহামানব এসেছেন- এ সবই হয়েছে মানুষকে নৈতিক সংকট থেকে মুক্ত করার জন্যে এবং সৎ ও ভালো জীবন ধারায় ফিরিয়ে আনার জন্যে। নৈতিক শুদ্ধতা অর্জনের মধ্য দিয়ে মানুষ স্রষ্টার সাথে একাত্মতা বোধ করতে পারে, দুঃখী মানুষও শুদ্ধতার আলো নিয়ে এ জগত ছেড়ে যেতে পারে। অনেক হতাশার মধ্যে এই আশার আলোর জন্যে আমাদেরকে নৈতিক হতে হবে। কিন্তু নৈতিক হবার জন্যে নৈতিক শিক্ষা প্রয়োজন। নৈতিকতা কি, এটা না শিখে নৈতিক হওয়া সহজ হবে না। আর এই শিক্ষার জন্যে এর প্রকৃতি ও প্রকরণ জানতে হবে এবং এর বাস্তবায়ন করতে হবে। কিন্তু সমস্যা এখানে যে, নৈতিক শিক্ষার প্রকৃতি থেকে এর প্রকরণ তৈরি হয়েছে এবং এ প্রকরণ পর্যায়ক্রমে নৈতিক শিক্ষার বাস্তবায়নে বাধা তৈরি করেছে। বিষয়টি আমি এখানে ব্যাখ্যা করবো এবং এর সমাধানের একটা উপায় উদ্ভাবনের চেষ্টা করবো। এর মধ্য দিয়ে যদি আমরা ভালো মানুষ ও ভালো সমাজ গঠনের দিকে এগিয়ে যেতে পারি, তাহলে সেটা হবে আদর্শ রাষ্ট্র গঠনের জন্যে সহায়ক।

নৈতিক শিক্ষা: প্রকৃতি ও প্রকরণ
নৈতিক শিক্ষার প্রকৃতি হলো মানুষকে নৈতিক সচেতনতা ও কাজে উদ্বুদ্ধ করা যেন মানুষ তার কার্যক্রমের মধ্যে ন্যায়-অন্যায়, উচিত-অনুচিত, ভালো-মন্দ ইত্যাদি বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে এবং তার জীবনধারায় সঠিক পথে চলতে পারে। দর্শনের আদি যুগ থেকে এ বিষয়ে আলোচনা হয়ে এসেছে। সক্রেটিস এটা করেছিলেন- ন্যায় বিচার কাকে বলে, এই চিন্তা থেকে। এই চিন্তা থেকে প্লেটো তৈরি করেছিলেন আদর্শ রাষ্ট্রের ধারণা। একইভাবে এরিস্টটল বলেছিলেন বন্ধুত্বের কথা। বদ্ধুত্ব হলো ভালো। কিন্তু আসলে ভালো কাকে বলে? নৈতিক শিক্ষার ইতিহাসে আছে এই প্রশ্নের দীর্ঘ আলোচনা। একই সাথে আলোচিত হয়েছে ভালো জীবন কি এবং জীবনে সর্বোচ্চ ভালো কি, এসব প্রশ্ন। কেউ বলেছেন, সুখ ভালো; আবার কেউ এমন বলেছেন যে, সুখী চতুস্পদ প্রাণী হওয়ার চেয়ে অসুখী মানুষ হওয়া ভালো। এমন মতকে অনুসরণ করে আমি বলতে চাই যে, সুখী খারাপ মানুষ হওয়ার চেয়ে অসুখী ভালো মানুষ হওয়া ভালো। কিন্তু আবার কেউ এটাও বলেছেন যে, কর্তব্যের জন্যে কর্তব্য করে যাওয়া ভালো।


কিন্তু এগুলো যদি নৈতিক শিক্ষা হয়, তাহলে এটাও প্রশ্ন করা যায় যে, এই নানা শিক্ষার মধ্যে কোনটি আসল শিক্ষা? যাঁরা সুখকে জীবনের সর্বোচ্চ ভালো বলেছেন, তাঁরা কর্তব্যের জন্যে কর্তব্য করার মতাদর্শকে গ্রহণ করেননি। অন্যদিকে যাঁরা কর্তব্যের জন্যে কর্তব্য করার মতাদর্শে বিশ্বাসী, তাঁরা সুখবাদকে গ্রহণ করেননি। এভাবে নৈতিক শিক্ষার প্রকৃতিগত আলোচনা নানা মতাদর্শীদের মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করেছে। এই দ্বন্দ্ব ও বিতর্ক নৈতিক শিক্ষার প্রকৃতিকে জটিল করে তুলেছিল। নৈতিক শিক্ষার কথা যারা বলতেন তাঁদের কাজটা দাঁড়িয়ে ছিল নিজ নিজ মতকে সমর্থন করে অপরের মতকে সমালোচনা করে। কিন্তু এটাতো নৈতিক শিক্ষা হতে পারে না। আসলে নৈতিক শিক্ষার প্রকৃতিগত এই দিকগুলো নৈতিক শিক্ষার নানা প্রকরণে রূপ নেয় এবং প্রকরণগুলোর দ্বন্দ্ব নৈতিক শিক্ষার বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।


কিন্তু এ বিষয়ে কি আমরা একটা নিরপেক্ষ অবস্থান নিতে পারিনা? এখানে মনে পড়ে বার্ট্রান্ড রাসেলের একটি মতাদর্শের কথা; ভাববাদ এবং বাস্তববাদের দ্বন্দ্বে তিনি নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছিলেন এবং নিরপেক্ষ একত্ববাদ নামে একটি মতবাদ প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন আধিবিদ্যক পরিপ্রেক্ষিত থেকে। নৈতিক শিক্ষার প্রকৃতির ক্ষেত্রে মতাদর্শের দ্বন্দ্বে আমিও নিরপেক্ষ অবস্থান নেব। কিন্তু রাসেলের মতো নিরপেক্ষ একত্ববাদী আমি হতে পারবো না। নৈতিক মতাদর্শের এই দ্বন্দ্বের ক্ষেত্রে আমি নিরপেক্ষ থাকবো; দ্বন্দ্ব থাকবে বলেই নিরপেক্ষতারও প্রয়োজনীয়তা থাকবে। কিন্তু নিরপেক্ষ থাকবো বলেই কোনো মতকেই আমি বাদ দিতে পারবো না এবং একটা সমাধানে আসতে হলে এ দ্বন্দ্বের মধ্যে একটা সমন্বয় করতে হবে। দ্বন্দ্ব থাকবে এবং সমন্বয়ের লক্ষ্যে নিরপেক্ষতাও থাকবে; আমার এই অবস্থানকে আমি বলবো দ্বান্দ্বিক নিরপেক্ষবাদ। এটা সম্ভব। বুদ্ধিবাদ ও অভিজ্ঞতাবাদের পারস্পরিক সমালোচনা এবং দ্বন্দ্বের মধ্যে প্রবেশ না করে ইমানুয়েল কান্ট উভয়ের প্রতি নিরপেক্ষ থেকে উভয়ের মধ্যে একটা সমন্বয় করেছিলেন। নৈতিক শিক্ষার বাস্তবায়নে এমন দ্বান্দ্বিক নিরপেক্ষবাদই হবে সমন্বয়ধর্মী এবং সহায়ক। এ বিষয়ে দ্বন্দ্ব কিভাবে তৈরি হয়েছিল এটা এখন ব্যাখ্যা করবো।


উপরোক্ত দুটো মতবাদের মধ্যে সময়ানুক্রমিকভাবে প্রথম যে মতটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তা হলো সুখবাদ; সুখই জীবনের সর্বোচ্চ ভালো। এ মতের পরিণত রূপে এটা বলা হয় যে, সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের সর্বোচ্চ সুখ হবে নৈতিকতার উদ্দেশ্য। পরিণামে এই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করাই হলো নৈতিকতা। নীতিবিদ্যায় এই মতবাদকে বলা হয় পরিণতিমূলক বা consequential মতবাদ। অপরদিকে, কর্তব্যের জন্যে কর্তব্য করার মতবাদ অনুযায়ী কর্তব্য করা হবে কর্তব্যবোধ থেকে, কোন প্রাপ্য ফলাফলের জন্যে নয়। এ মতবাদকে বলা হয় deontological মতবাদ; এ মতবাদ পরিণতমূলক নয়। এ মতবাদ অনুযায়ী কর্তব্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থেকে কোনো দায়িত্ব পালন করলে, ফলাফল ভালো বা মন্দ যাই হোক না কেন, কাজটিকে নৈতিক বলা হবে; এখানে পরিণামে কি হবে সেটা বড়ো কথা নয়, কর্তব্যের জন্যে কর্তব্য করাটাই বড়ো কথা। পরিণামে কি হবে, এটাকে গুরুত্ব না দেবার কারণে এখানে কাজের লক্ষ্য বা ফলাফল বিবেচ্য হবে না। যেমন, একজন ধনী ব্যক্তি যদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ কবলিত অসহায় এবং বিধ্বস্ত অনেক পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেন এই লক্ষ্য বা পরিণামের কথা চিন্তা করে যে, এ কাজের মধ্য দিয়ে তার সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে, তাহলে এমন কাজকে কর্তব্যের কাজ বলা যাবে না, বলা যাবে স্বার্থ প্রণোদিত কাজ। এই ব্যক্তি যদি এমনও মনে করেন যে, অসহায় মানুষ সুখী হলে তিনি নিজেও সুখী হবেন, তাহলেও এটা কর্তব্যের জন্যে কর্তব্য করা হবে না। সঠিক অর্থে কর্তব্য হলো এমন কাজ যা কেবলমাত্র কর্তব্যের বোধ থেকে করা হয়, যাকে বলা যায়, কোন উদ্দেশ্যের জন্যে নয় বরং কর্তব্যের জন্যে কর্তব্য করা। ইংরেজীতে এটাকে বলা হয় duty for duty’s sake। উপরোক্ত পরিণতমূলক মতবাদের বিপরীত মতবাদ হিসেবে এটাকে আমি বলবো কর্তব্যবাদ। এভাবে উপরোক্ত এ দুটো মতবাদ এমন যে, একটি হলো পরিণতমূলক বা ফলাফলধর্মী এবং অপরটি হলো পরিণতিমুক্ত বা ফলাফলমুক্ত। বৈপরীত্বের দ্বন্দ্ব এখানেই। একটিকে গ্রহণ করলে অপরটিকে গ্রহণ করা যাবে না। নৈতিকতার বাস্তবায়নের পথে এটা হলো একটা বাধা। নৈতিকতা শিক্ষার একাধিক প্রকরণের কারণে এখানে আমরা পাই নঞ্চর্থক পরিণতি।


নৈতিক শিক্ষার বাস্তবায়নে এমন আরো একটি বাধা এসেছে প্রকরণগত অনুরূপ অন্য একটি দ্বন্দ্ব থেকে। উপরে আলোচিত একটি মতাদর্শ অনুযায়ী সুখ হলো জীবনের সর্বোচ্চ ভালো। কান্টের অপর মতাদর্শটি অনুযায়ী সদিচ্ছা হলো একমাত্র নিঃশর্তভাবে ভালো। কোনো কাজ যদি সৎ ইচ্ছা থেকে করা হয় তাহলে কাজের ফলাফল ভালো-মন্দ যাই হোক না কেন, কাজটিকে খারাপ বলা যাবে না বা কাজটি যে করেছে তাকে খারাপ বলা যাবে না। কর্তব্যের জন্যে কর্তব্য করার ইচ্ছা সদিচ্ছা দ্বারাই চালিত হতে হবে। কিন্তু সদিচ্ছার ভালোত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্বাভাকিভাবেই কেউ প্রশ্ন করতে পারেন যে, সুখ এবং সদিচ্ছা- কোনটি বেশি ভালো? সবকিছু মিলিয়ে এমন প্রশ্ন উঠেছে যে, ‘ভালো’ কাকে বলে? ‘ভালো’ শব্দের কোনো সংজ্ঞা সম্ভব নয়; আর সংজ্ঞা সম্ভব না হলে এর কোনো সর্বজনীন অর্থও দাঁড় করানো যাবে না।

‘ভালো’ শব্দটিকে দু’ভাবে দেখার এই প্রকরণগত দ্বৈততা ও বৈপরীত্যের মধ্যে মতাদর্শের যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়, সেটাও নৈতিকতার চর্চা ও বাস্তবায়নে একটা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। কোনো বিষয়ে মতবিরোধ থাকলে তার বাস্তবায়ন বাধা পাবে এটাই স্বাভাবিক। এই পরিপ্রেক্ষিত থেকে আরো একটি সমস্যা তৈরি হয়। শব্দের এবং শব্দ দিয়ে গঠিত বচনের অর্থের বিতর্ক থেকে দর্শনের শাখা ভাষা দর্শন বা Philosophy of Language গড়ে ওঠে। এই বিতর্ক দর্শনের ক্ষতি করেছে এবং দর্শনের শাখা হিসেবে নীতিদর্শনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং নৈতিকতার বাস্তবায়নে তা বাধা হয়েছে। শব্দের এবং ভাষার অর্থকে স্পষ্ট করার এই দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধিতা করে ১৯৪৫ সনে লন্ডনে অনুষ্ঠিত দর্শনের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে সভাপতির উদ্বোধনী ভাষণে এস. এস. প্রাইস এ বিষয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন, “স্পষ্টতাই যথেষ্ট নয়” শিরোনামে। এ প্রবন্ধে তিনি বলেছেন যে, দর্শন যদি এভাবে চলতে থাকে তাহলে দর্শন পটল তুলবে; কিংবা অন্তত দর্শন চলে যাবে জ্ঞানের জগতের এক দূরবর্তী কোণে এবং সেখানে বাগানে চাষাবাদ করবে এবং তার কাজ হবে প্রথমে আগাছা লাগানো এবং পরে আগাছা তুলে ফেলা। নৈতিক শিক্ষার প্রকৃতির সূত্র ধরে মতাদর্শের এবং অর্থের নানা প্রকরণ এভাবে নৈতিকতার বাস্তবায়নের পথে বাধা হয়। নীতিবিদগণ কেবল একে অপরের মতাদর্শের সমালোচনা করেন।


এখানে আশাবাদী দিকটি হলো যে, ১৯৭০-এর দশক থেকে দর্শনের এই সমস্যাটি ধীরে ধীরে দূর হতে থাকে। তাত্ত্বিক বিতর্কের পরিবেশ থেকে দার্শনিকগণ বের হয়ে আসতে শুরু করেন এবং এবং তাত্ত্বিক দিককে বাদ দিয়ে দর্শনের ব্যবহারিক এবং প্রায়োগিক দিকের ওপর মনোযোগ দেন। এভাবে ব্যবহারিক ও প্রায়োগিক দিক থেকে নীতি দর্শনের বাস্তবায়ন বর্তমানে সমগ্র বিশ্বে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। নৈতিক শিক্ষার বাস্তবায়নের এ উদ্দেশ্য থেকে আমি দুটো দিকের ওপর আলোচনা করব। প্রথমত, নৈতিক শিক্ষায় বর্তমানেও আমাদের দেশে এবং বিদেশে মতাদর্শের যে দুটো প্রকরণের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়, আমার উপরের আলোচনায় পরিণতমূলক এবং পরিণতিমুক্ত মতাদর্শের যে দ্বন্দ্বের কথা আমি তুলে ধরেছি, সেখানে দ্বন্দ্ব নিরসনের একটা উপায় আমি তুলে ধরবো। এ দ্বন্দ্বের নিরসন হলে নৈতিক শিক্ষার ক্ষেত্রে আমরা সহজতরভাবে অগ্রসর হতে পারব। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে আমাদের সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে নৈতিক শিক্ষার বাস্তবায়নে আমরা কি করতে পারি সে বিষয়েও কিছু বক্তব্য রাখব।


সুখবাদের পরিণত প্রকরণের, অর্থাৎ উপযোগবাদের মূল নীতিটি হলো, সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের সর্বোচ্চ পরিমাণ সুখের জন্যে কাজ করা। এখন মনে করুন, একজন ধনী ব্যক্তি তাঁর গ্রামে এক লক্ষ টাকা দান করতে চাইছেন। সেই গ্রামের একশত পরিবারের প্রতিটি পরিবারকে এক হাজার টাকা দিয়ে এক লক্ষ টাকা দান করলেন। একশত পরিবারের সুখ বৃদ্ধি পেল। কিন্তু লক্ষণীয় যে, সেই গ্রামে একজন দরিদ্র দূরারোগ্য রোগী রয়েছেন, যার চিকিৎসার জন্যে এক লক্ষ টাকা প্রয়োজন; চিকিৎসা না হলে রোগীর মৃত্যু হবে। এখানে একশত পরিবারের সুখ কিছু পরিমাণে বৃদ্ধি করা অথবা একজন ব্যক্তির জীবন রক্ষা করা- কোনটি সঠিক কাজ হবে? আমি মনে করি, এক লক্ষ টাকা দান করে একশত পরিবারের সুখ কিছু বৃদ্ধি করার চেয়ে সেই এক লক্ষ টাকা দিয়ে চিকিৎসা করে একজন ব্যক্তির জীবন রক্ষা করা সঠিক কাজ হবে। সমস্যাটা এখানে যে, এমন ক্ষেত্রে প্রচলিত সুখবাদকে অনুরসরণ করলে আমরা একটা ভুল কাজ করবো; এখানে এটা একটা অমানবিক কাজ হবে। এটা হবে সুখবাদের জন্যে একটা সমস্যা। এমন ক্ষেত্রে আমাদের বিবেচ্য বিষয় হবে, অনেক মানুষের সুখ বৃদ্ধি করা অথবা একজন মানুষের জীবন রক্ষা করা- কোনটা উচিত হবে এবং এই অর্থে কোনটা আমাদের কর্তব্য হবে। এখানে সুখের পরিবর্তে কর্তব্যবোধ প্রাধান্য পাবে। তাহলে বিষয়টি এমন দাঁড়ালো যে, সুখবাদ যেখানে সমস্যার মুখোমুখি হবে সেখানে কর্তব্যবাদ দেবে আমাদেরকে সঠিক দিকনির্দেশনা। এটাই হবে সুখবাদ ও কর্তব্যবাদের একটা সমন্বয়।


এমন সমন্বয় বিপরীত দিক থেকে, অর্থাৎ কর্তব্যবাদের সীমাবদ্ধতার দিক থেকেও হতে পারে। ধরা যাক, একটি পোষা বিড়াল পানির পাত্রের মধ্যে পড়ে যেয়ে সম্পূর্ণ ভিজে গেল। গৃহকর্মী একজন ব্যক্তি বিড়ালটির দেহকে শুষ্ক করার জন্যে বিড়ালটিকে একটি মাইক্রোওয়েব ওভেনে ঢুকিয়ে ওভেনটি চালু করে দিল। বিড়ালটির মৃত্যু হবে এটা তিনি জানতেন না। এ ক্ষেত্রে কর্তব্যের জন্যে কর্তব্য করার নীতি যথেষ্ট নয়; এখানে পরিণতির কথা, কল্যাণ-অকল্যাণের কথাও বিবেচনা করতে হবে। নৈতিকতা অকল্যাণমূলক হবে এটা বাঞ্ছনীয় নয়। এ কারণে কর্তব্যের জন্যে কর্তব্য করার ক্ষেত্রে পরিণতির কথা ভাবতে হবে, কল্যাণের দিক বিবেচনা করতে হবে। কর্তব্যবাদ অনুশীলনের সমস্যার ক্ষেত্রে সুখবাদের পরিণতিধর্মী চিন্তা কর্তব্যবাদের সহায়ক ও সম্পূরক ভূমিকা পালন করতে পারবে। সুখবাদের এবং কর্তব্যবাদের সমন্বয় এভাবেও হতে পারে।


নৈতিক শিক্ষার প্রকরণগত মতদ্বৈততার এ সমন্বয়কে আমি এক কথায় বলবো কল্যাণমুখী কর্তব্যবাদ। সুখের চেয়ে কল্যাণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সুখের মধ্য দিয়ে কল্যাণ হতে পারে; অন্যদিকে সুখ না থাকলেও কেবল দুঃখ মোচনের মধ্য দিয়েও কল্যাণ হতে পারে। আমরা আমাদের কাজের ভালো-মন্দ এবং উচিত-অনুচিত বিচার করব কল্যাণমুখী দৃষ্টিকোণ থেকে। কল্যাণ চিন্তাকে সম্মুখে রেখে আমরা কর্তব্য করে যাব। নৈতিক শিক্ষার বাস্তবায়নের ভিত্তি হবে কল্যাণমুখী কর্তব্যবাদ।
(চলবে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here