পবিত্র আশুরার গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য

1
326

ইমাম ড. আরসাম কুদরত এ খোদা :

সৃষ্টির সূচনা লগ্ন থেকেই মাসের সংখ্যা ১২টি। এর মধ্যে আল্লাহর কাছে ৪টি মাস পবিত্র ও সম্মানিত। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেন, “নিশ্চয় মাসসমূহের সংখ্যা আল্লাহর কাছে বারো মাস। সুনির্দিষ্ট রয়েছে আল্লাহর কিতাবে সেদিন থেকে যেদিন তিনি সৃষ্টি করেছেন আসমান ও জমিন, এর মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত। এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত ধর্মপথ। সুতরাং এই মাসগুলোর ব্যাপারে তোমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করো না।” [সূরা তওবা ৯: আয়াত ৩৬] আর এই ৪টি মাসের মধ্যে মহরম বছরের প্রথম মাস। এই মাস নিঃসন্দেহে অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।
আরবি আশারা শব্দ থেকে আশুরা শব্দের উৎপত্তি। এর অর্থ দশম। মহররম মাসের দশ তারিখকে আশুরা বলা হয়। ইতিহাসের অনেক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী এই ১০ মহররম। তার মধ্যে কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো:
এই দিনেই হযরত আদম (আ.)-কে আল্লাহ্ তার প্রতিনিধি হিসেবে সৃষ্টি করেন।
এই দিনেই হযরত আদম (আ.)-এর অপরাধ ক্ষমা করা হয়।
এই পবিত্র দিনেই হযরত নূহ (আ.) এর নৌকা মহাপ্লাবন শেষে জুদী পাহাড়ের পাদদেশে এসে থেমেছিল।
এই দিনেই হযরত ইব্রাহীম (আ.) নমরুদের জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড থেকে মুক্তি পান।
এই দিনেই হযরত আইয়ুব (আ.) রোগমুক্ত হন।
এই দিনেই হযরত সোলাইমান (আ.) তাঁর হারানো রাজত্ব ফিরে পান।
এই দিনেই হযরত ইউনুস (আ.) মাছের পেট থেকে মুক্তি পান।
এই দিনেই হযরত ইয়াকুব (আ.) তাঁর হারানো পুত্র ইউসুফ (আ.)-কে চল্লিশ বছর পর ফিরে পান।
এই দিনেই মুসা (আ.) তাঁর অনুসারীদের নিয়ে লোহিত সাগর অতিক্রম করেন আর পক্ষান্তরে ফেরাউন তার দলবল-সহ সাগরে ডুবে মৃত্যুবরণ করে।
এই দিন হলো প্রায় দুই হাজার নবি-রাসুলের শুভ জন্মদিন।
এই দিনে এত বরকতময় ঘটনা ঘটার কারণ হলো এই দিন মহান রাব্বুল আলামিনের অভিষেক অনুষ্ঠানের দিন। অর্থাৎ সৃষ্টিজগত সৃষ্টি করে এই পবিত্র দিনেই মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আরশে সমাসীন হয়ে তাঁর সৃষ্টির সামনে নিজেকে প্রভু হিসেবে প্রথম আত্মপ্রকাশ করেছিলেন।
হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তায়ালা ফরমান, “আমি ছিলাম গুপ্ত ধনাগার, নিজেকে প্রকাশ করতে ভালোবাসলাম, তাই সৃষ্টিজগত সৃজন করলাম।”
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, “নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ, যিনি সৃষ্টি করেছেন আসমান ও জমিন ছয় দিনে। অতঃপর তিনি আরশে সমাসীন হন এবং প্রতিটি বিষয় পরিচালনা (করতে শুরু) করেন।” [সূরা ইউনুস ১০ : আয়াত ৩]
সেদিন আরশে সমাসীন হওয়ার মধ্য দিয়ে যে অভিষেক অনুষ্ঠান হয়েছিলো সেই অনুষ্ঠানে সকল আদম সন্তানের রূহুসমূহ মহান আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে আল্লাহকে প্রভু হিসেবে স্বীকার করে নেয়।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ এরশাদ করেন, “হে রাসুল! আপনি স্মরণ করুন সেই সময়ের কথা, যখন আপনার প্রতিপালক আদম সন্তানদের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের বংশধরদের বের করে আনলেন এবং তাদের কাছ থেকে স্বীকারোক্তি নিলেন তাদেরই সম্বন্ধে এবং বললেন, “আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই?” তারা বলল, হ্যাঁ, আমরা সাক্ষী রইলাম।“ [সূরা আরাফ ৭ : আয়াত ১৭২]
উল্লেখ্য যে মহান রাব্বুল আলামিনের আরশে সমাসীন হওয়ার এই দিনটি ছিল ১০ই মহরম, শুক্রবার।
বর্ণিত হাদিসটি তাফসীরে দূররে মানছুরের ৮ম খণ্ডে হযরত ইকরামা (রা.) হতে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা আসমান জমিন এই দুইয়ের মাঝে যা কিছু আছে তা সৃষ্টির সূচনা করেছেন রবিবার দিন। অতঃপর তিনি (সৃষ্টিকার্য সমাপ্ত করে) শুক্রবার দিন (আশুরার দিন) আরশে সমাসীন হয়েছেন।”
হযরত আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, “আল্লাহ তায়ালা হযরত আদম (আ.)-কে শুক্রবার আছরের পর সৃষ্টি করেন। অতঃপর তিনি আরশে সমাসীন হন।” [মেশকাত শরীফ ও মুসলিম শরীফ]
মূলত এই দিনটি ছিল মহররম মাসের ১০ তারিখ, শুক্রবার।
গুনিয়াতুত তালিবীন কিতাবে কাদেরিয়া তরিকার ইমাম হযরত বড়পির আব্দুল কাদের জিলানি (রহ.) লিখেছেন, “মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আশুরার দিন আরশে সমাসীন হয়েছেন। আর এই বিশ্বজাহান ধ্বংসও হবে এ দিনে। সর্বপ্রথম বৃষ্টি ও আল্লাহর রহমত দুনিয়াতে বর্ষিত হয় এ আশুরার দিনেই।”
পবিত্র আশুরা বা ১০ই মহররম মহান রাব্বুল আলামিনের অভিষেক অনুষ্ঠানের দিন হওয়ার কারণেই এই দিনের সম্মান ও মাহাত্ম্যকে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। যেমন- কোনো রাজ্যের রাজার অভিষেক অনুষ্ঠানের দিনটি সেই রাজ্যের রাজা ও প্রজাদের কাছে বিশেষ স্মরণীয় দিন। সেই দিনটি ঐ রাজ্যের প্রজাদের চাওয়া-পাওয়ার দিন। তেমনিভাবে আশুরা হলো বান্দাদের জন্য মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নিকট চাওয়া-পাওয়ার দিন। এজন্যই মহান রাব্বুল আলামিন তার অভিষেকের দিনকে স্মরণীয় করে রাখার জন্যই তার এই সৃষ্টিজগতে অসংখ্য ঘটনার অবতারণা করেছেন।
পবিত্র আশুরার ইতিহাস সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা না থাকার জন্যই মুসলিম জাতি এ দিনটিকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারছে না। কারবালায় ইমাম হোসাইন (রা.) তাঁর ৭২ জন সঙ্গী-সাথী নিয়ে যে শাহাদত বরণ করেছিলেন তা এই পবিত্র আশুরার দিবসেই। আমাদের অনেকের ধারণা যে কারবালায় ইমাম হোসাইন (রা.)-এর বিয়োগান্তক ঘটনার কারণেই এই দিনটি মুসলিম বিশ্বে স্মরণীয় হয়ে আছে। আবার শিয়া সম্প্রদায় যেহেতু এই দিনটি শোকের সাথে পালন করে তাই অজ্ঞতার কারণে অনেকে ধারণা করে থাকেন যে এই আশুরা আসলে শিয়াদের অনুষ্ঠান। কিন্তু যুগের ইমাম মহান সংস্কারক মোহাম্মদী ইসলামের পুনর্জীবনদানকারী সূফী সম্রাট হযরত সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদা দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজান সর্বপ্রথম মানবজাতির কাছে তুলে ধরেছেন আশুরা আল্লাহর অভিষেকের দিন। এদিন শিয়াদের অনুষ্ঠান নয়। এদিনেই মহান আল্লাহ সৃষ্টিজগত সৃষ্টি করে আরশে সমাসীন হয়েছিলেন।
১০ মহররম বা আশুরা-সৃষ্টির সূচনা থেকে উদযাপিত হওয়া এক ঐতিহাসিক দিন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, “আল্লাহর রাসুল (সা.) পবিত্র মদীনায় আগমন করে দেখলেন যে ইহুদি সম্প্রদায় আশুরার দিন রোজা রাখে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা এই দিনে কেন রোজা পালন করো?” তারা বলল, এটি এক মহান দিন। এ দিনে আল্লাহ মুসা (আ.)-কে রক্ষা করেছিলেন আর ফেরাউনের দলকে লোহিত সাগরে ডুবিয়ে মেরেছিলেন।” সেজন্য মুসা (আ.) আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা স্বরূপ এই দিনে রোজা রাখতেন। আল্লাহর রাসুল (সা.) শুনে বললেন, হযরত মুসা (আ.)-এর প্রতি সম্মান প্রদর্শনে তোমাদের থেকে আমরাই বেশি অগ্রগামী। সুতরাং, তিনি আশুরার রোজা রাখেন এবং মুসলমানদেরও রোজা পালনের নির্দেশ দেন।” [বোখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ, বায়হাকী শরীফ, তাফসীরে দূররে মানছুর-৩০নং খণ্ড]
বর্ণিত হাদিসটি তাফসীরের কিতাব তাফসীরে দূররে মানছুরের ৩০নং খণ্ডে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) কর্তৃক বর্ণনা করা হয়েছে। হযরত রাসুল (সা.) এরশাদ করেন, “আশুরার দিনটি এমন একটি দিন যে, সমস্ত নবি-রাসুল এই দিনে রোজা রাখতেন। সুতরাং, তোমরাও এই দিনে রোজা রাখো।”
বর্ণিত হাদিসটি হাদিসের কিতাব বোখারী শরীফের ২য় খণ্ডে হযরত আয়েশা (রা.) কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, “পবিত্র রমজানের পূর্বে আশুরার রোজা রাখা হতো। যখন রমজানের রোজা ফরজ হলো, আল্লাহর রাসুল (সা.) ঘোষণা করেন, যে ব্যক্তি আশুরার রোজা রাখতে চায় সে রাখতে পারে আর যে ঐদিন রোজা না রাখে তাতেও কোনো অসুবিধা নেই।”
বর্ণিত হাদিসটি তাফসীরের কিতাব তাফসীরে দূররে মানছুরের ৩০নং খণ্ডে হযরত জাবের (রা.) হতে বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহর রাসুল (সা.) এরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি আশুরার দিন নিজ পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত ভালো খাবারের ব্যবস্থা করবে, আল্লাহ তায়ালা তার জন্য সারা বছর পর্যাপ্ত রিজিকের ব্যবস্থা করবেন।”
আমরা এই মানবজাতি, সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে দয়াময় রাব্বুল আলামিনের প্রভু হিসেবে আত্মপ্রকাশের এই পবিত্র আশুরার দিনটি যদি যথাযথ মর্যাদার সাথে পালন করতে সক্ষম হই তাহলে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে অবারিত রহমত ও বরকত লাভের অসিলা হিসেবে কাজ করবে।
[লেখক: পরিচালক, সমন্বয়ক ও সমস্যার ফয়সালাকারী, দেওয়ানবাগ শরীফ; সহকারী অধ্যাপক, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি]

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here