পবিত্র আশুরা ও কারবালার শহিদগণ

1
501

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান মিয়া
হিজরি সনের প্রথম মাস মহররম। এ মাসের ফজিলত অনেক। আশুরা আরবি শব্দ, এর অর্থ দশম। মহররম মাসের দশম দিবসকে আশুরা বলা হয়। ইসলামের ইতিহাসে এ দিবসের গুরুত্ব অপরিসীম। মহান আল্লাহ্ পবিত্র আশুরার দিনেই আরশ, কুরছি, লওহ, কলম, আসমান ও জমিন সৃষ্টি করে প্রভু হিসেবে নিজে আরশে সমাসীন হয়েছেন। এ দিবসে মানব জাতির আদি পিতা হযরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং তাঁকে বেহেশতে স্থান দেয়া হয়েছে। পরবর্তীতে এ দিনেই দুনিয়াতে পাঠিয়ে মহান আল্লাহ তাঁকে প্রতিনিধির মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছেন। পবিত্র আশুরার এ দিনে হযরত ইব্রাহীম (আ.) জন্মগ্রহণ করেন, পরবর্তীতে তিনি নমরুদের অগ্নিকুণ্ড থেকে উদ্ধার লাভ করেন এবং প্রাণপ্রিয় পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ.)-কে আল্লাহর নামে উৎসর্গ করে ‘খলিলুল্লাহ’ উপাধি লাভ করেন। পবিত্র আশুরার এ দিনে হযরত ইউনুছ (আ.) মাছের পেট হতে মুক্তি লাভ করেন, হযরত ইয়াকুব (আ.) তাঁর হারানো পুত্র হযরত ইউসুফ (আ.)-কে দীর্ঘ ৪০ বছর পর ফিরে পান এবং হযরত সোলায়মান (আ.) তাঁর হারানো রাজত্ব পুনরুদ্ধারে সক্ষম হন। পবিত্র আশুরার দিবসেই মহাপ্লাবনে পতিত হযরত নূহ (আ.)-এর নৌকা তাঁর অনুসারীদের নিয়ে জুদী পাহাড়ের পাদদেশে এসে ভিড়ে। হযরত ঈসা (আ.) আশুরার দিনে জন্মলাভ করেন আবার এ দিবসেই চতুর্থ আসমানে উত্থিত হন।
আশুরার এ দিনটি শুধু মুসলিম জাতির জন্যই নয়, বরং সমগ্র মানব জাতির নিকট অতীব পবিত্র ও সম্মানিত। এ দিনের তাৎপর্য সম্পর্কে বহু হাদিস বর্ণিত হয়েছে। হযরত রাসূল (সা.) ফরমান- মহররম মাসে যদি কেহ রোজা পালন করে তবে প্রতিটি রোজার বিনিময়ে তাকে ৩০টি রোজার পূণ্য দান করা হয়। তিনি আরো ফরমান- কোনো ব্যক্তি যদি মহররম মাসে ১০টি রোজা রাখে, তবে তাকে ১০ হাজার ইবাদতের পরিমাণ পূণ্য দান করা হয়। তাছাড়া ১০ হাজার হজ ও উমরাহ পালনকারীর ন্যায় পূণ্যও দান করা হয়।
পবিত্র আশুরা বিশ্ব মুসলিমের কাছে যে কারণে স্মরণীয়, এ সম্পর্কে বর্ণনা দিতে গিয়ে মহান সংস্কারক, যুগের ইমাম, মোহাম্মদী ইসলামের পুনর্জীবনদানকারী, আম্বিয়ায়ে কেরামের ধর্মের দায়িত্ব ও বেলায়েত লাভকারী, পুর্ণিমার চাঁদে বাবা দেওয়ানবাগীর জীবন্ত প্রতিচ্ছবি, সূফী সম্রাট হযরত সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদা দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজান বলেন- “আশুরা হচ্ছে- আল্লাহর অভিষেকের দিন। মহান আল্লাহ সৃষ্টিজগত সৃজন করে এ দিবসে আরশে সমাসীন হয়েছিলেন। অপর দিকে এ দিনেই দুরাচারী এজিদ বাহিনী হযরত রাসূল (সা.)-এর প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসাইন (রা.)-কে সপরিবারে কারবালার মরুপ্রান্তরে নির্মমভাবে শহিদ করে।”
বিশ্বমানবতার মুক্তির দূত, সাইয়্যেদুল মুরছালিন, রাহমাতুল্লিল আলামিন হযরত রাসুলে করিম (সা.) যাঁদেরকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন, যাঁদের মনে সামান্যতম কষ্ট হলেই হযরত রাসুল (সা.) হৃদয়ে আঘাত পেতেন; শিশুকালে যাঁদের বিন্দুমাত্র কান্নাও তিনি সহ্য করতে পারতেন না; সেই প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র হযরত ইমাম হাসান (রা.) ও হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) এ দুজনই সত্য ও ন্যায়ের জন্য আত্ম উৎসর্গ করে বিশ্ববাসীর কাছে অমর হয়ে আছেন।
ইমাম হাসান (রা.) শহিদ হয়েছেন কুখ্যাত এজিদ কর্তৃক বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে এবং ইমাম হোসাইন (রা.) শহিদ হয়েছেন হযরত রাসুল (সা.)-এর আদর্শ মোহাম্মদী ইসলামের সত্য ও ন্যায়ের ঝাণ্ডাকে জগতের বুকে সমুন্নত রাখার জন্য কুখ্যাত এজিদ বাহিনীর সাথে কারবালা প্রান্তরে সংগ্রাম করতে গিয়ে। তাই সেই কারবালার হৃদয়বিদারক ঘটনা আজও মুসলিম জাতিকে সত্যের পথে সংগ্রাম করার অনুপ্রেরণা যোগায় এবং স্মরণ করিয়ে দেয় ইমাম হোসাইন (রা.) ও তাঁর পরিবারবর্গের মহান আত্মত্যাগের কথা। আজ থেকে ১৩৮১ বছর পূর্বে পবিত্র আশুরার দিনে কারবালা প্রান্তরে সংঘটিত হয় সেই নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড, যা আমাদেরকে প্রতি বছর মহান ত্যাগের শিক্ষা দিয়ে থাকে।
প্রতি বছর মহররম মাসের আশুরার দিনে (১০ই মহররম) বিশ্বের মুসলমানগণ কারবালার শহিদানদের কথা স্মরণ করে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। কারবালার কাহিনী যে কত মর্মান্তিক এবং হৃদয় বিদারক, তা ব্যক্ত করার ভাষা নেই।
কারবালার শহিদগণের নামের তালিকা:
হযরত ইমাম হোসাইন (রা.)-এর সঙ্গে আহলে বাইতের সদস্যসহ ৮২ জন কারবালায় গমন করেছিলেন। তন্মধ্যে আহলে বাইতের ৯ জন মহিলাও ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ৭২ জন শহিদ হন। কারবালায় যাওয়ার পর আরো কতিপয় লোক ইমামের পক্ষে যোগদান করেছিলেন। এদিকে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর বিরুদ্ধে ২২ হাজার এজিদ বাহিনী প্রেরণ করা হয়েছিল। বিশাল বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করে ইমাম হোসাইন (রা.)-সহ মোট ৯২ জন শহিদ হয়েছিলেন। আহলে বাইতের ৯ জন মহিলা এবং হযরত জয়নাল আবেদীন (রা.)-সহ ১০ জন জীবিত ছিলেন। কারবালা প্রান্তরে ৯২ জন শহিদের নামের তালিকা নিম্নে প্রদত্ত হলো :
(১) হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) (২) হযরত আলী আকবার ইবনে হোসাইন (রা.) (৩) হযরত আলী আসগর ইবনে হোসাইন (রা.) (৪) হযরত আবু বকর ইবনে হাসান (রা.) (৫) হযরত আমর ইবনে হাসান (রা.) (৬) হযরত কাসেম ইবনে হাসান (রা.) (৭) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে হাসান (রা.) (৮) হযরত মুহাম্মদ ইবনে আলী (রা.) (৯) হযরত ওসমান ইবনে আলী (রা.) (১০) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আলী (রা.) (১১) হযরত জাফর ইবনে আলী (রা.) (১২) হযরত আব্বাস ইবনে আলী (রা.) (১৩) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আকীল (রা.) (১৪) হযরত আবদুর রহমান ইবনে আকীল (রা.) (১৫) হযরত জাফর ইবনে আকীল (রা.) (১৬) হযরত মুহাম্মদ ইবনে মুসলিম (রা.) (১৭) হযরত আওন ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) (১৮) হযরত সাদ (রা.) হযরত আলী (রা.)-এর গোলাম হযরত মুহাম্মদ ইবনে সাদ (রা.) (২০) হযরত ফিরোজ (রা.) [হযরত ইমাম হোসাইন (রা.)-এর গোলাম]।
হযরত ইমাম হোসাইন (রা.)-এর ভক্ত ও সঙ্গীগণ :
(২১) হযরত বোরাইর ইবনে হামদানী (রা.) (২২) হযরত সাআদ ইবনে হানযাল (রা.) (২৩) হযরত যোহায়ের ইবনে হাসান (রা.) (২৪) হযরত ওয়াহাব ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) (২৫) হযরত হামাম ইবনে আনাস (রা.) (২৬) হযরত আমর ইবনে খালেদ (রা.) (২৭) হযরত আমর ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) (২৮) হযরত খালেদ ইবনে ওমর (রা.) (২৯) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) (৩০) হযরত হেলাল ইবনে নাফি (রা.) (৩১) হযরত শারীহ ইবনে ওবায়েদ (রা.) (৩২) হযরত ওয়াক্কাস ইবনে মালেক (রা.) (৩৩) হযরত মুসলিম ইবনে আওয়াহ (রা.) (৩৪) হযরত বশির ইবনে আমর (রা.) (৩৫) হযরত মাররাহ ইবনে আবী মাররাহ (রা.) (৩৬) হযরত কায়েস ইবনে মাসবাহ (রা.) (৩৭) হযরত হাশেম ইবনে উতবাহ (রা.) (৩৮) হযরত হাবীব ইবনে মুজাহির (রা.) (৩৯) হযরত আনান ইবনে সা’আদ (রা.) (৪০) হযরত যুহায়ের ইবনে কায়েস (রা.) (৪১) হযরত নায়ীম ইবনে আজলান (রা.) (৪২) হযরত কাসেদ ইবনে যুহায়ির (রা.) (৪৩) হযরত হারেছ ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) (৪৪) হযরত কায়েস ইবনে রাবী (রা.) (৪৫) হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আরওয়াহ (রা.) (৪৬) হযরত মুহাম্মদ ইবনে মুসলিম (রা.) (৪৭) হযরত হেরার বাছরীর (রা.) (৪৮) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে শায়েছ (রা.) (৪৯) হযরত জুয়াইর ইবনে মালেক (রা.) (৫০) হযরত জরআমা ইবনে মালেন (রা.) (৫১) হযরত কারদাদা ইবনে জুয়াইর (রা.) (৫২) হযরত আকাবা ইবনে আকীক (রা.) (৫৩) হযরত আমর ইবনে চীনাহ (রা.) (৫৪) হযরত ইয়াজীদ ইবনে শায়েছ (রা.) (৫৫) হযরত বদর ইবনে মাশআশ (রা.) (৫৬) হযরত আমেরা ইবনে মুসলিম (রা.) (৫৭) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে শায়েছ (রা.) (৫৮) হযরত আম্মার ইবনে হাসান (রা.) (৫৯) হযরত নজর ইবনে আমর (রা.) (৬০) হযরত ছালেম (রা.) (৬১) হযরত আবদুল্লাহ (রা.) (৬২) হযরত ছাইফ ইবনে মালেক (রা.) (৬৩) হযরত তাহের (রা.) (৬৪) হযরত জাবালাহ ইবনে আলী (রা.) (৬৫) হযরত হাজ্জাজ ইবনে মদরাক (রা.) (৬৬) হযরত যোবায়ের ইবনে বশীর (রা.) (৬৭) হযরত মসউদ ইবনে হাজ্জাজ (রা.) (৬৮) হযরত মাজমা ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) (৬৯) হযরত হাসান ইবনে হারেছ (রা.) (৭০) হযরত সালমান (রা.) (৭১) হযরত আলী ইবনে হোর (রা.) (৭২) হযরত কাব (রা.) (৭৩) হযরত আবু তামামা (রা.) (৭৪) হযরত আসলাম ইবনে কাছীর (রা.) (৭৫) হযরত ইয়াজিদ ইবনে যিয়াদ (রা.) (৭৬) হযরত জুহায়ের ইবনে ছালীম (রা.) (৭৭) হযরত ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) (৭৮) হযরত হানজালা ইবনে আসআদ (রা.) (৭৯) হযরত মালেক ইবনে ছারীহ (রা.) (৮০) হযরত মাছআব (রা.) (৮১) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহ্ (রা.) (৮২) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আনছারী (রা.) (৮৩) হযরত আম্মার ইবনে আবী সালমাহ (রা.) (৮৪) হযরত আয়েশ ইবনে হাবীব (রা.) (৮৫) হযরত সাআদ ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) (৮৬) হযরত গুজাব (রা.) (৮৭) হযরত শাইব ইবনে হারেছ (রা.) (৮৮) হযরত মুহাম্মদ ইবনে আনাস (রা.) (৮৯) হযরত কাসেম ইবনে হাবীব (রা.) (৯০) হযরত আমার ইবনে জুনদার (রা.) (৯১) হযরত আরওয়াহ (রা.) (৯২) হযরত মেকদাদ আনছারী (রা.)।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here