পবিত্র কুরআনের বাংলা পদ্যানুবাদ ও নজরুল

0
306

মুহাম্মদ জহিরুল আলম
আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। কবির বাইশ বছরের সৃষ্টিশীল জীবনের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ‘মানুষ’। তিনি সুফি কবি, তাঁর সাহিত্যকর্মে এ দর্শনই ফুটে উঠে। নজরুলের সমস্ত সৃষ্টিকর্ম জুড়ে রয়েছে প্রভুকে পাওয়ার আকুতি, তিনি সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে সে সেবাই করেছেন। নজরুলের ‘কাব্য আমপারা’ গ্রন্থটির প্রেক্ষাপটে তাই তিনি বলেছেন, “কোরআন শরীফের মতো মহাগ্রন্থের অনুবাদ করতে আমি কখনো সাহস করতাম না বা তা করার দরকার হতো না- যদি আরবি ও বাংলা ভাষার সমান অভিজ্ঞ কোনো যোগ্য ব্যক্তি এদিকে অবহিত হতেন।” পবিত্র কুরআনকে তিনি হৃদয় দিয়ে ধারণ করেছেন। তাই ভালোবেসে তিনি গেঁয়ে যান-

“জরীণ হরফে লেখা
রূপালি হরফে লেখা
(নীল) আসমানের কোরআন।
সেথা তারায় তারায় খোদার কালাম
(তোরা) পড়, রে মুসলমান
নীল আসমানের কোরআন।
সেথা ঈদের চাঁদে লেখা
মোহাম্মদের ‘মীম’-এর রেখা,
সুরর্যেরই বাতি জ্বেলে’ পড়ে রেজোয়ান।
খোদার আরশ লুকিয়ে আছে ঐ কোরআনের মাঝে,
খোঁজে ফকির-দরবেশ সেই আরশ সকাল-সাঁঝে।
খোদার দিদার চাস রে, যদি
পড় এ কোরআন নিরবধি;
খোদার নুরের রওশনীতে রাঙ রে দেহ-প্রাণ”
নজরুলের ‘কাব্য আমপারা’ গ্রন্থে শব্দ, ছন্দ ও ধ্বনির সুন্দর ব্যবহারে তাঁর কাব্য সৌন্দর্যে পবিত্র কুরআনের বাংলা অনুবাদ ফুটে উঠেছে। আজ কবি নজরুলের অনুবাদকৃত কয়েকটি সুরা ও শানে নজুল পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো।
সূরা কারি‘আ’
(১১টি আয়াত, রুকু, মক্কী)

শুরু করি লয়ে শুভ নাম আল্লার
করুণা-আকর যিনি দয়ার পাথার

১. প্রলয়ান্তক সেই বিপদ
২. কোন সে বিপদ ধ্বংস ভয়?
৩. কিসে সে তোমারে জানাল। সেই
৪. বিপদ ভীষণ প্রলয়ময়?
৫. বিক্ষিপ্ত পতঙ্গপ্রায়
৬. সেদিন উড়িবে লোক সবায়,
৭. বিধূনিত লোমবৎ সেদিন
৮. পর্বতরাজি উড়িবে বায়।
৯. যেদিন সে পাবে সুখী-জীবন
১০. পাল্লা যাহার হবে ভারি,
১১. পাল্লা হবে হালকা যার,
(হবে) ‘হাভিয়া’ দোজখ মাগ তারি।
১২. হাভিয়া কি, তুমি জান কি সে?
১৩. প্রম্বলিত বহ্নি সে।
সূরা ক্বারেয়াত মক্কা শরীফে অবতীর্ণ হয়েছে। এখানে ১১টি আয়াত, ৩৫টি শব্দ ও ১৬০টি অক্ষর আছে। ‘কারি‘আ’ বা ‘ক্বারেয়াত’ শব্দের অর্থ ভীষণ বিপদ অর্থাৎ কিয়ামত বা মহাপ্রলয়। নজরুল কুরআনের প্রায় তিনটি চরণের সম্প্রসারণ করেছেন। তিনি মহাপ্রলয়ের বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করেছেন। শানে নজুলে কবি বলেন, কেয়ামতের ভীতি প্রদর্শন ও ইসলামের বিজয়ের ইঙ্গিত করার জন্য এই সূরা নাজিল হয়। ইমাম কাতাদার মতে ইহুদিরা বলেছিল যে, তারা বিপক্ষ দল অপেক্ষা সংখ্যাগরিষ্ঠ; সেই সময় এ সূরা নাজিল হয়। আবার ইমাম এবনে কাসিরের মতে, মদীনাবাসী দুটি দল-বনি হারেস ও বনি হারেসা সম্পদের অহংকার করলে এই সূরা নাজিল হয়।

সূরা আ‘দিয়াত
(১১টি আয়াত, ১ রুকু, মক্কী)

শুরু করিলাম লয়ে নাম আল্লার,
কৃপা করুণার যিনি অপার পাথার

১. বিদ্যুৎ গতি দীর্ঘশ্বাস
২. (বীর-বাহী উটের শপথ)
৩. যাহার চরণ-আঘাতে উগারে-
৪. তপ্ত বহ্নি ফিন্কিবৎ
৫. প্রত্যুষে করে ধূলি উৎক্ষেপি
(শত্রু শিবির) আক্রমণ,
৬. অনন্তর সে (অরি) দলে পশে
৭. (এই হেন করে বিলুন্ঠন)।
৮. শপথ তাদের – নিঃসংশয়
৯. অকৃতজ্ঞ মানবকুল
১০. তাদের পালন কর্তা প্রভু
পরে, নিশ্চয়, (নহে সে ভুল!)
১১. আর সে নিজেই সাক্ষী ইহার
১২. কঠিন বিষয়াসক্তি তার,
১৩. সে কি তা জানে না, কবর হইতে
১৪. উঠানো হইবে সবে আবার?
১৫. হৃদয়ে তাদের লুকানো যা কিছু
১৬. প্রকাশ করাব সব সেদিন।
১৭. জানিবে তাদের (সকল গোপন)
কথা- “রাব্বুল আলআমিন।”
সূরা আদিয়াত মক্কা শরীফে নাজিল হয়। এতে ১১টি আয়াত, ৪০টি শব্দ ও ১৭০টি অক্ষর আছে। কুরআনের অনুবাদে অশ্বের শপথের কথা উল্লেখ আছে। কবি অশ্ব এবং উট-উভয়ের শপথের কথা এনেছেন। আরবরা বীরত্ববশত রাতের অন্ধকারে আক্রমণকে বীরসুলভ কাজ মনে করে না, নজরুল এ দিক সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। রাসুলের পাঠানো অশ্বারোহী দলের ফিরে আসতে বিলম্ব হওয়ায় কাফেররা উক্ত সৈন্যদল বিনষ্ট হয়েছে বলে মিথ্যা সংবাদ প্রচার করায় মুসলমানগণ দুঃখ পায়, তখন তাঁদেরকে সান্ত্বনা প্রদানের জন্য এ সূরা নাজিল হয়।
সূরা যিলযাল
(৮টি আয়াত, ১ রুকু, মাদানী)

শুরু করি লয়ে “পাক” নাম আল্লার
করুণা-নিধান যিনি কৃপার পাথার।

১. ঘোর কম্পনে ভূমন্ডল প্রকম্পিত সে হবে যে দিন
২. ধরা তার ভার বাহির করিয়া দিবে (সেদিন)
৩. “কি হইল এর” কহিবে লোকেরা।
৪. সে দিন ব্যাক্ত করিবে যে
৫. নিজের যা কিছু খবর, তোমার
৬. প্রভু সে খোদার নির্দেশে।
৭. প্রত্যাগত সে হইবে সে দিন।
৮. দলে দলে যত লোক সকল,
৯. দেখানো হইবে কর্র্ম সকল
১০. তাদের (পাপ ও পূণ্য-ফল)!
১১. এক রেণুবৎ যে পূণ্য-
১২. করিবে, তাহাও দেখিবে সে,
১৩. পাপ যে করেছে এক রেণুবৎ
১৪. দেখা দিবে তারে তাও এসে
এখানে ৮টি আয়াত, ৩৭টি শব্দ ও ১৫৮টি অক্ষর আছে। হাক্কানী, হোসেনী, শাহ্ অলিউল্লাহ, শাহ্ রফিউদ্দিন, শাহ্ আবদুল আজিজ প্রভৃতির মতে এ সূরা মদিনা শরীফে নাজিল হয়েছে। কবীর বলেন, এ সূরা মক্কা শরীফে অবতীর্ণ হয়েছে (এবনে আব্বাস, কাতাদা)। কাশ্শাফ, বায়জাবী ও জালালাইন বলেন- এ সূরার অবতরণের স্থান সম্পর্কে মতভেদ দৃষ্ট হয়। (বোখারী শরীফ) অনুবাদটি প্রায় আক্ষরিক। প্রথম চরণে ‘আপন কম্পনের’ পরিবর্তে করেছেন ‘ঘোর কম্পনে’, যা মানুষের পাপের পরিমাণকে চিহ্নিত করেছে। পঞ্চম চরণে ‘প্রতিপালকের আদেশ’ এর পরিবর্তে বলেছেন ‘প্রভু সে খোদার নির্দেশে’- যার মাঝে শ্রদ্ধামিশ্রিত আবেগ প্রতিফলিত হয়। একদিন রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে আবু বকর (রা.) আহার করছিলেন সে সময় ৭/৮ আয়াত নাজিল হয়। তখন আবু বকর (রা.) আহার গ্রহণ ত্যাগ করে রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, আমি কি একবিন্দু কুকর্মের প্রতিফল প্রাপ্ত হইব? উত্তরে রাসুল (সা.) বললেন, সংসারে তুমি যে কোনও সময়ে বিপদাপন্ন হও, তা তোমার বিন্দু বিন্দু অসৎ কার্যের প্রতিফল। আর তোমার বিন্দু বিন্দু পুণ্যকে আল্লাহ্ তোমার জন্য সম্বলস্বরূপ রক্ষা করেন, পরকালে ঐ সকলের প্রতিদান আল্লাহ্ তোমায় দিবেন। সামান্য সামান্য সৎকার্য আর সামান্য সামান্য পাপ কার্য একত্রিত হয়ে পর্বততুল্য হয়ে যায়। তুচ্ছ কাজও যে কখনো বৃথা যায়না – এ শিক্ষা প্রচারের জন্য আয়াত দুটি নাজিল হয়।

সূরা বায়্যিনাহ
(৮টি আয়াত, ১ রুকু, মাদানী)

শুরু করিলাম নামে পবিত্র আল্লার
সীমা নাই যাঁর দয়া কৃপা করুণার।

১. “আহলে কেতাব” আর অংশীবাদিগণ
২. নিবৃত্ত হয়নি যারা বিশ্বাসী আপন।
৩. ভিন্ন মত হয় নাই তাহার তাবৎ,
৪. না এল তাদের কাছে প্রমাণ যাবৎ
৫. আল্লার রাসুল যিনি পবিত্র কোরআন
৬. উদ্গাতা যাহাতে দৃঢ় সত্য অধিষ্ঠান
৭. (ভিন্ন-মত হইল তাহারা তাঁর ‘পরে);
৮. “আহলে কেতাব” দল এইরূপ করে,
৯. যতদিন আসে নাই পরম প্রমাণ,
১০. করে নাই দলাদলি, করেছে সম্মান
১১. তাদের কেবলমাত্র আজিকার মত
১২. এই সে আদেশ দেওয়া আছিল সতত
১৩. কর্মেতে “হানিফ” হয়ে কেবল আল্লাহর
১৪. করুক তাহারা পূজা, উপাসনা আর।
১৫. নামাজ পড়ুক, দিক্ জাকাত সে সাথে।
১৬. চির-দৃঢ় সত্য ধর্ম, ইহাই ধরাতে।
১৭. “আহলে কেতাব” আর “মুশরিক” যারা
১৮. প্রত্যাখ্যান করিয়াছে সত্যধর্ম তারা
১৯. দোজখ আগুনে হবে হবে চিরস্থায়ী,
২০. সৃষ্টির অধম তারা, সংশয় নাই।
২১. সৃষ্টির বরেণ্য তারা নিশ্চয়ই যারা
২২. ঈমান আনিয়া করে সৎকাজ তারা।
২৩. তাহাদের পুরস্কার দর্গায় আল্লার
২৪. বেহেশ্ত কানন আছে তলদেশে যার
২৫. নহর-লহর বহে; তারা সেই লোকে
২৬. অনন্ত কালের তরে রবে নিরাশোকে।
২৭. প্রসন্ন তাদের প্রতি সদা বিশ্বপতি।
২৮. তাহারাও প্রীত তাই আল্লাহের প্রতি
২৯. জীবনে প্রভুরে হেন ভয় যার মনে
৩০. এই পুরস্কার আছে তাদেরি কারণে।
সূরাটিতে ৮টি আয়াত, ৯৫টি শব্দ, ৪১৩টি অক্ষর আছে। কবীর, হাক্কানী, শাহ্ অলিউল্লাহ ও শাহ্ রফিউদ্দিন বলেন এ সূরা মদিনা শরীফে নাজিল হয়েছে। কাশ্শাফ, বায়জাবী, জালালাইন ও হোসেনী বলেন এ সূরা মক্কা শরীফে অবতীর্ণ হয়েছে। শানে নজুলে কবি বলেন মদীনার ইহুদিগণ ও মক্কার অংশীবাদিগণ তৌরাতের প্রতিশ্রুত শেষ পয়গম্বরের প্রতীক্ষায় ছিল। শেষ পয়গম্বর আবির্ভাব হওয়া সত্বেও তারা পাপ কাজ হতে বিরত হয় নাই- এজন্য এ সূরা নাজিল হয়।

সূরা কাদ্র
(৫টি আয়াত, ১ রুকু, মক্কী)

শুরু করি লয়ে শুভ নাম আল্লার,
আদি অন্তহীন যিনি দয়া করুণার।

১. করিয়াছি অবতীর্ণ কোরআন পুণ্য “শবে কদরে”
২. জানবে কিসে শবে কদর কয় কারে? ধরা ‘পরে
৩. হাজার মাসের চেয়েও বেশি কদর এই যে নিশীথের,
৪. এই সে রাতে ফেরেশতা আর জিব্রাইল আলমের
৫. করতে সরঞ্জাম সকলি নেমে আসে ধরনী,
৬. ঊষার উদয় তক্ থাকে এই শান্তপূত রজনী।
সূরা কদরে ৫টি আয়াত, ৩০টি শব্দ ও ১১৫টি অক্ষর আছে। এ সূরা মক্কা শরীফে অবতীর্ণ হয়েছে। কাশ্শাফ, বায়জাবী, জালালাইন ও হোসেনীর মতে এ সূরা মদীনা শরীফে অবতীর্ণ হওয়ার পক্ষে মত দেন। কদরের এক অর্থ মাহাত্ম্য ও সম্মান এ কারণেই একে ‘লায়লাতুল কদর’, অর্থাৎ মহিমান্বিত রাত বলা হয়। শানে নজুলে কবি বলেন, কোন কথা প্রসঙ্গে হযরত মুহাম্মদ (সা.) একবার উল্লেখ করেন, ইস্রায়েল বংশীয় হযরত সমউন সহস্র মাস কাল দিন রোজা রাখতেন ও জেহাদ (ধর্ম যুদ্ধ) করতেন আর রাত জেগে নামাজ পড়তেন। এ কথা শুনে তাঁর আসহাবগণ বলেন- সাধারণত আমরা ৬০-৭০ বছর বেঁচে থাকি; তার মধ্যে কতকাংশ শৈশবাবস্থায়, কতকাংশ নিদ্রিতাবস্থায়, কতকাংশ পীড়িত ও শৈথিল্যাবস্থায় এবং কতকাংশ জীবিকা সংগ্রহ করতে অতিবাহিত হয়। অবশিষ্টাংশে আমরা কতটুকু সৎকাজ করতে সক্ষম হব? এ কথা শুনে রাসুল (সা.) দুঃখিত হন, তখন এ সূরা নাজিল হয়।

পবিত্র কুরআনের পদ্যানুবাদের মাধ্যমে নজরুলের ঐশী প্রেমই প্রকাশিত হয়। তিনি চেয়েছেন আপামর জনগণ সবাই নিজ ভাষায় কুরআন পাঠের মাধ্যমে কুরআনের মণি মঞ্জুষার সন্ধান লাভ করুক। ইসলাম শান্তির ধর্ম, নজরুলের সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে ইসলামের শান্তি ও সৌন্দর্য প্রকাশিত হয়েছে। সমকালীন যুগে তিনি তা স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরার কারণে এক শ্রেণির নামধারী আলেমদের রোষানলে পড়ে ছিলেন। কিন্তু কালের প্রবাহে কবি ঠিকই বিশ্ববাসীর হৃদয়ে অম্লান হয়ে আছেন এবং থাকবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here