পবিত্র কুরআনের বাংলা পদ্যানুবাদ ও নজরুল

0
364
কবি কাজী নজরুল ইসলাম

মুহাম্মদ জহিরুল আলম
নজরুলের জীবনের বড় সাধ ছিল পবিত্র কুরআনের পদ্যানুবাদ করা। অত্যন্ত সার্থকভাবে তিনি তা করেছেন এবং সেই প্রেরণা থেকেই আরবি ও ফারসিতে পান্ডিত্য অর্জন। বলা হয়ে থাকে, পারস্যের কবি হাফিজ এবং ওমর খৈয়ামের যতজন ‘কবি’ অনুবাদক আছেন, তার মধ্যে নজরুল একমাত্র মূল ফারসি থেকে অনুবাদ করেছেন, বাকী সবাই ইংরেজি থেকে। তাঁর কাব্যানুবাদ তাই সর্বত্র প্রশংসিত হয়েছে। ইসলামের প্রকৃত দর্শন তিনি হৃদয়ে ধারণ করেছেন। ধর্মের নামে যে সব মিথ্যা কুসংস্কার স্তুপকৃত হয়ে আছে নজরুল তার বিরুদ্ধে লিখেন। তিনি মহান আল্লাহ্ ও দয়াল রাসুল (সা.)-কে নিয়ে প্রায় ৪ শতাধিক প্রেম সংঙ্গীত রচনা করেন। তাঁর সংঙ্গীত শ্রবণে খোদা প্রেমিকগণের হৃদয়ে প্রেমের ফল্গুধারা সৃষ্টি হয়। লেখনীর কি অসাধারণ প্রকাশ-

“তৌহিদেরই মুর্শিদ আমার মোহাম্মদের নাম
মুর্শিদ মোহাম্মদের নাম।
ঐ নাম জপলেই বুঝতে পারি, খোদায়ী কালাম
মুর্শিদ মোহাম্মদের নাম।।”

[নজরুলের নিজ হাতে লেখা ‘গজল’; Image Source: Wikimedia Commons]

আজ নজরুলের ‘কাব্য আমপারা’ হতে তাঁর অনুবাদকৃত কয়েকটি সূরা ও শানে নজুল প্রিয় পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।
সূরা আলাক
(১৯টি আয়াত, ১ রুকু, মক্কী)

শুরু করিলাম লয়ে নাম আল্লার,
করুণা সাগর যিনি দয়ার পাথার।

১. পাঠ কর প্রভুর নামে, স্রষ্টা যে জন,
২. করেছেন যিনি ঘন সে শোণিতে মানবে সৃজন।
৩. পাঠ কর, তব বিধাতা মহিমা-মহান সেই
৪. দিয়াছেন সবে লেখনীর দ্বারা শিক্ষা যেই।
৫. -সে জানিত না যাহা,
৬. মানুষেরে তিনি দেছেন শিক্ষা তাহা,
৭. না, না, মানুষ সীমা লঙ্ঘন করিয়া যায়,
৮. ধন-গৌরবে মত্ত যে ভাবে সে আপনায়।
৯. নিশ্চয় তব প্রভুর পানে যে ফিরিতে হবে।
১০. দেখেছ কি তারে-আমার দাসেরে সে জন যবে
১১. নিবারণ করে দাস মোর ঘরে নামাজ পড়ে
১২. দেখেছ, সে জন যাপিত যদি রে সপথ ধরে।
১৩. সে যদি অন্যে সংযমী হতে করিত আদেশ!
১৪. সত্যেরে যদি মিথ্যা বলে সে (শাস্তি অশেষ)
১৫. (সত্য হইতে) মুখ যে ফিরায়! সে জন তবে
১৬. জানে না কি, খোদা দেখিতেছেন যে তার- সে সবে?
১৭. না, না, না, নিবৃত্ত সে না হয়, শেষ
১৮. টানিয়া আনিব ধরিয়া তাহার ললাট-কেশ
১৯. মিথ্যাবাদী সে মহা পাতকীর ললাট (ধরি)
২০. (টানিব)! ডাকুক সভা সে তাহার পারিষদেরি।
২১. আমি ও আমার বীর সেবকেরে দিই খবর;
২২. না, না, না, কখনো মানিও না তাদের ’পর সেজদা কর,
২৩. হও ক্রমে মোর নিকট হইতে নিকটতম?
সূরা আলাক মক্কা শরীফে অবতীর্ণ হয়েছে। এখানে ২৯টি আয়াত, ৭২টি শব্দ, ২৯০টি অক্ষর রয়েছে। এ সূরায় মানব সৃষ্টি ও মানব সৃষ্টির পর তাদের শিক্ষার প্রসঙ্গ উল্লেখিত হয়েছে। শিক্ষার দুটি পদ্ধতি আছে। মৌখিক শিক্ষা এবং লেখার মাধ্যমে শিক্ষা। এ আয়াতে কলমের সাহায্যে শিক্ষার বর্ণনা করা হয়েছে। সূরাটি অনুবাদ করতে গিয়ে নজরুল ধ্বনি সচেতনতা ও ছন্দবোধের পরিচয় দিয়েছেন। প্রথম চরণে ‘প্রতিপালকের’ স্থানে তিনি করেছেন

প্রভু, দ্বিতীয় চরণে ‘আলাক’ স্থানে হয়েছে ‘ঘন শোণিত’। ‘আলাক’ বা ‘শোণিত’ কোনটিই বাংলা শব্দ নয়। ‘ঘন’ শব্দটি ধ্বনি মাধুর্য সৃষ্টি করেছে। তেমনি ‘কলমের’ পরিবর্তে ‘লেখনী’, ‘জাহান্নামের প্রহরী’র স্থলে ‘বীর সেবক’ প্রভৃতি শব্দ অনুবাদের সৌন্দর্য বর্ধন করেছে।
মক্কার অদূরে হেরা গিরিগহবরে হযরত রাসুল (সা.) ইবাদতে মশগুল হতেন। সূরাটির প্রথম পাঁচ আয়াত তখন অবতীর্ণ হয়। এরপর সূরা ফাতেহা ও তারপর সূরা মোদ্দাসসের অবতীর্ণ হয়। দয়াল রাসুল (সা.)-কে সেজদা করতে দেখে আবু জহল রাসূল (সা.)-কে নির্মমভাবে শারীরিক লাঞ্ছিত করার শপথ নেয়; কিন্তু রাসুল (সা.) নামাজ পড়বার সময় কাছে উপস্থিত হয়েও প্রতিজ্ঞা অনুযায়ী কাজ করতে সক্ষম হয়নি। তখন ৬-১৪ আয়াত নাজিল হয়।
সূরা তীন
(৮টি আয়াত, ১ রুকু, মক্কী)

শুরু করি লয়ে শুভ নাম আল্লার,
করুণা ও কৃপা যার অনন্ত অপার।

১. শপথ ‘তীন’ ‘জায়তুন’ ‘সিনাই’ পাহাড়
২. শপথ সে শান্তিপূর্ণ নগর মক্কার-
৩. নিশ্চই মানুষে আমি করেছি সৃজন
৪. দিয়া যত কিছু শ্রেষ্ঠ মূরতি গঠন।
৫. (যে জন সুবিধা এর লইল না তারে)
৬. করিয়াছ নীবাদপি নীচ সে জনারে।
৭. কিন্তু যে ঈমান আনে, সৎকাজ করে,
৮. অনন্ত যে পুরস্কার আছে তার তরে।
৯. ‘সুবিচার পাবে সবে’ বলিলে তোমায়
১০. মিথ্যার আরোপ করে কে সে তবে, হায়?
১১. আল্লাহ্ কি নন
১২. সব বিচারক চেয়ে শ্রেষ্ঠতম জন?
সূরা তীন মক্কা শরীফে নাজিল হয়েছে। এতে ৮টি আয়াত, ৩৪টি শব্দ, ১৬৫টি অক্ষর আছে। সূরাতে চারটি বস্তুর শপথ নেওয়া হয়েছে। শানে নজুলে নজরুল উল্লেখ করেন, ‘তীন’ অর্থাৎ আঞ্জির ও ‘জায়তুন’ তৈল বৃক্ষ বিশেষ উভয় নামে পরিচিত পর্বতে হযরত ঈসা (আ.)-এর জন্ম ও নবুয়ত প্রাপ্তি হয়। ‘সিনাই’ পাহাড়ে হযরত মুসা (আ.) ‘তাওরাত’ প্রাপ্ত হন। ‘বালাদুল আমিন’ অর্থাৎ শান্তিময় নগর বলতে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মভূমি মক্কা নগরীকে বুঝানো হয়েছে। উক্ত তিনটি পাক স্থানের নামে উপরোক্ত নবীগণের স্মরণার্থ আল্লাহ তায়ালা শপথ করে মানবজাতিকে সতর্ক করে জানাচ্ছেন যে, তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ আদেশ প্রদাতা।

সূরা ইনশিরাহ্
(৮টি আয়াত, ১ রুকু, মক্কী)

শুরু করি লয়ে পাক নাম আল্লার,
করুণা কৃপার যিনি অসীম পাথার।

১. তোমার কারণ
২. করিনি কি আমি তব বক্ষ বিদারণ?
৩. নামাযে সে ভার-(মুক্তি) দিইনি তোমার?
৪. ন্যুব্জ-পৃষ্ঠ ছিলে তুমি যে বোঝার ভারে?
৫. নাম কি তোমার
৬. করিনি কি মহীয়ান মহিমা-বিথার?
৭. সঙ্কটের সাথে আছে শুভ নিশ্চয়,
৮. অতএব অবসর পাবে যে সময়-
৯. উপাসনায় রত হবে সংকল্প লয়ে,
১০. প্রভুর করিবে ধ্যান একমন হয়ে;
এই সূরা মক্কা শরীফে নাজিল হয়। এখানে ৮টি আয়াত, ২৭টি শব্দ, ১০৩টি অক্ষর আছে। সূরাটিতে হযরত রাসুল (সা.)-কে প্রদত্ত বিশেষ অনুগ্রহের বর্ণনা আছে। শানে নজুলে নজরুল উল্লেখ করেন, হযরত খাদিজা (রা.)-এর ওফাতের পর হযরত রাসুল (সা.) অত্যন্ত মর্মাহত ও চিন্তাভারগ্রস্থ হন। তাঁর শোকে সান্তনা দেবার জন্য এ সূরা নাজিল হয়।
সূরা দোহা
(১১টি আয়াত, ১ রুকু, মক্কী)

শুরু করি লয়ে শুভ নাম আল্লার,
অনন্তর সাগর যিনি দয়া করুণার।

১. শপথ প্রথম দিবস-বেলার
শপথ রাতের তিমির-ঘন,
২. করেননি প্রভু বর্জন তোমা’,
করেননি দুশমনী কখনো।
৩. পরকাল সে যে উত্তমতর
ইহকাল আর দুনিয়া হতে,
৪. অচিরাৎ তব প্রভু দানিবেন

(সম্পদ) খুশি হইবে যাতে।
৫. পিতৃহীন সে তোমারে তিনি কি
করেননি পরে শরণ দান?
৬. ভ্রান্ত-পথে তোমারে পাইয়া
তিনিই না তোমা’ পথ দেখান?
৭. তিনি কি পাননি অভাবী তোমারে
অভাব সব করেন মোচন?
৮. করিয়া না তাই পিতৃহীনের
৯. উপরে কখনো উৎপীড়ন।
১০. যে জন প্রার্থী -তাহারে দেখিও
১১. করো না তিরস্কার কভু,
১২. ব্যক্ত করহ নিয়ামত যাহা
১৩. দিলেন তোমারে তব প্রভু!
সূরা দোহা মক্কা শরীফে নাজিল হয়। এতে ১১টি আয়াত, ৪০টি শব্দ, ১১৬টি অক্ষর আছে। সূরার অনুবাদে নজরুলের কাব্য প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়। ছন্দবদ্ধ অনুবাদের মাধমে কবি সুন্দরভাবে অর্থ ফুটিয়ে তুলেছেন। কবি উল্লেখ করেন, হযরত রাসুল (সা.)-এর নিকট কোনো কারণে কয়েকদিন (কারো মতে ১০ দিন, কারো মতে ১৫ দিন, কারো মতে ৪০ দিন) ওহি নাজিল না হওয়ার কারণে কাফেররা বিদ্রুপ করে বলেছিল যে, মুহাম্মদ (সা.)-কে আল্লাহ্ পরিত্যাগ করেছেন। এ কথা শুনে রাসুল (সা.) দু:খে মর্মাহত হন, তখন এ সূরা নাজিল হয়।
সূরা লাইল
(২১টি আয়াত, ১ রুকু, মক্কী)

শুরু করি শুভ নাম লয়ে আল্লার,
দয়া করুণার যিনি মহা-পারাবার।

১. শপথ রাতের আবৃত যখন করে সে অন্ধকারে
২. দিনের শপথ প্রোজ্জ্বল যাহা করে দেয় জ্যোতিঃধারে,
৩. নর ও নারীর শপথ – যাদের তিনি সে স্রষ্টা প্রভু,
৪. তোমাদের যত কর্মফল একমত নহে কভু।
৫. যারা দাতা সংযমী, সত্যধর্মে সত্য বলিয়া লয়,
৬. সহজ করিয়া দিব কল্যাণে তাহাদের নিশ্চয়।
৭. কিন্তু যাহারা কৃপণ, নিজেরে ভাবে অতি বড় যারা,
৮. বলে সত্যধর্মে মিথ্যা, শীঘ্র দেখিতে পাইবে তারা
৯. সহজ করিয়া দিয়াছি তাদের দোজখের পথ, আর
১০. রক্ষা করিতে পারিবে না তারে তার ধন-সম্ভার।
১১. তখন ধ্বংস হইবে সে। জেনো সুপথ প্রদর্শন

১২. কর্তব্য সে আমার। একাল পরকাল সবখন
১৩. কেবল আমারি এখ্তিয়ারে সে। করি তাই সাবধান,
১৪. প্রজ্বলিত সে অনল হইতে জ্বল জ্বল লেলিহান।
১৫. হতভাগা সেই জন সত্য হতে যে মুখ ফিরায়,
১৬. সে ছাড়া সেই যে অগ্নিকুন্ডে পশিবে না কেহ হায়!
১৭. সে অনল হতে রক্ষা পাইবে সেই সংযমী জন
১৮. শুদ্ধ হবার মানসে যে জন করে ধন বিতরণ।
১৯. কাহারও দয়ার প্রতিদানরূপে করে না সে ধন দান,
২০. তাহার মহিময় সে প্রভুরে তুষিতে যত্নবান।
সূরা লাইল মক্কা শরীফে নাজিল হয়। এখানে ২১টি আয়াত, ৭১টি শব্দ ও ৩১৪টি অক্ষর আছে। অনুবাদটিতে এখানে নজরুলের কবি প্রতিভার সাক্ষর রয়েছে। কবি চমৎকার ছন্দে অনুবাদ তুলে ধরেন,
সহজ করিয়া দিয়াছি তাদের দোজখের পথ, আর
রক্ষা করিতে পারিবে না তারে তার ধন-সম্ভার।

শানে নজুলে কবি বলেন, হযরত আবু বকর (রা.) ও ২য় খালাফের পুত্র উমাইয়া মক্কার ধনাঢ্য ও সম্ভ্রান্ত সমাজনেতা ছিলেন। পরকালের জন্য উমাইয়া দান করত না, কারণ বর্তমানে বিপুল ধন-সম্পদ থাকায় সে কল্পিত কোন বেহেশতের প্রত্যাশী নয়। সে হযরত বেলাল (রা.)-এর মনিব ছিল। উমাইয়ার ঘরে রাত্রে কান্নার শব্দ শুনে হযরত আবু বকর (রা.) ৪০টি স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে বেলাল (রা.)-কে ক্রয় করে রাসুল (সা.)-এর সামনে এনে তাঁকে মুক্তি দেন। এরপর আবু বকর (রা.) ও উমাইয়া সম্পর্কে এ সূরা নাজিল হয়।

কবি নজরুল অনুবাদ সাহিত্যের এক অনন্য কারিগর। তিনি পবিত্র কুরআনের পদ্যানুবাদের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। অনুবাদের সাহিত্য রসের পাশাপাশি তার সাহিত্যকর্মে ইসলামের প্রকৃত দর্শনকে তিনি ঠিকই প্রাধান্য দিয়েছেন, এজন্যই তিনি অনন্য নজরুল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here