পবিত্র কুরআনের বাংলা পদ্যানুবাদ ও নজরুল

0
458
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ।

মুহাম্মদ জহিরুল আলম
নজরুলের সাহিত্য কর্মে নান্দনিক সৌন্দর্য যেমন আছে, তেমনি রয়েছে দার্শনিক গভীরতা। তাঁর সাহিত্য কর্মের মাঝে স্রষ্টাকে পাবার বাসনা ফুটে উঠে। তাই প্রভু প্রেমে বিভোর হয়ে সমকালীন প্রচলিত ধর্মচিন্তার ঊর্ধ্বে তিনি ধর্মজ্ঞান ধারণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তারই বহিঃপ্রকাশ তাঁর লেখনীতে-

যেদিন রোজ হাশরে করতে বিচার তুমি হবে কাজী
সেদিন তোমার দিদার আমি পাব কি আল্লাজী।
সেদিন নাকি তোমার ভীষণ কাহ্হার রূপ দেখে
পীর পয়গম্বর কাঁদবে ভয়ে ‘ইয়া নফসী’ ডেকে;
সেই সুদিনের আশায় আমি নাচি এখন থেকে।
আমি তোমায় দেখে হাজারো বার দোজখ যেতে রাজী।
যেরূপে হোক বারেক যদি দেখে তোমায় কেহ
দোজখ্ কি আর ছুঁতে পারে পবিত্র তাঁর দেহ।
সে হোক না কেন হাজার পাপী হোক না বে-নামাজী।
ইয়া আল্লাহ, তোমার দয়া কত তাই দেখাবে ব’লে
রোজ-হাশরে দেখা দেবে বিচার করার ছলে, –
প্রেমিক বিনে কে বুঝিবে তোমার এ কারসাজি।

নজরুলের প্রভু প্রেমের একটি নিদর্শন এখানে নজরুল প্রেমিক ও নজরুল গবেষকদের উদ্দেশ্যে নিবেদন করছি, …১৯৪০ সালের… ডিসেম্বর মাসের তৃতীয় সপ্তাহে তিনি ঢাকায় ছিলেন। ঢাকায় থাকাকালে একদিন কবি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি হলে যান প্রথমে সলিমুল্লাহ হলে, তারপর ফজলুল হক হলে। এর কোনো একটা জায়গায় পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। জসীমউদ্দীন এই ঘটনার স্মৃতিচারণা করে বলেছেন, ‘‘এক জায়গায় কবি বলিয়া ফেলিলেন, আমি আল্লাহ্কে দেখিয়াছি। কিন্তু সে কথা বলবার সময় এখনও আসে নাই। সেসব বলবার অনুমতি যেদিন পাব, সেদিন আবার আপনাদের সামনে আসব।’’ (গোলাম মুরশিদ, নজরুলের ধর্মচিন্তায় মোড় ফেরা; প্রথম আলো, ২৫ আগষ্ট, ২০১৭ )। এ বিষয়টি বিশিষ্ট নজরুল গবেষক হাবিব মোস্তফার গবেষণায়ও পাওয়া যায়। নজরুলকে নিয়ে অনেক গবেষণা হলেও তাঁর এই আধ্যাত্মিক দিকটি যথাযথভাবে জগতবাসীর নিকট তুলে ধরা হয়নি। আমরা লক্ষ্য করলে দেখতে পাব তিনি প্রভুকে নিজ হৃদয়ে ধারণ করেছেন এবং প্রভুর প্রেম ও তাঁর বাণী নিজ ভাষায় গণমানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চেয়েছেন। তারই এক সুন্দর প্রচেষ্টা ‘কাব্য আমপারা’। সেখান থেকে কয়েকটি সূরা ও শানে নজুল প্রিয় পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

সূরা শামস্
(১৫টি আয়াত, ১ রুকু, মক্কী)

শুরু করি লয়ে নাম মহান আল্লার,
যিনি সব দয়া কৃপা-করুণার-আধার।

১. শপথ রবি ও রবি-কিরণের
২. যখন চন্দ্র চলে সে পিছনে তার
৩. দিবস যখন করে সপ্রকাশ
৪. রবিরে, রজনী অন্ধকার,
৫. যখন ছাইয়া ফেলে সে রবিরে;
৬. নভঃ-নির্মাণকারী তাহার;
৭. এই সে পৃথিবী স-বিস্তার;
৮. আত্মা, সুচারু গঠন তার।
৯. সেই আত্মার সৎ ও অসতের
১০. দিয়াছি দিব্য জ্ঞান,
১১. এই সকলের শপথ ইহারা
১২. সকলে করিছে সাক্ষ্য দান-
১৩. আত্মশুদ্ধি হইল যার,
১৪. নিশ্চয় সার্থক জীবন,
১৫. আত্মায় কলুষিত করিল যে
১৬. চির-বঞ্চিত হল সে জন।
১৭. সত্যেরে বলিল মিথ্যা
১৮. ‘সামুদ’ জাতি সে গর্বভরে
১৯. অগ্রসর হলো হতভাগারা
২০. (রসুলেরে নাহি গ্রহণ করে)।
২১. কহিলেন রসুল খোদার প্রেরিত
২২. -সলিল করিতে পান
২৩. ওই আল্লার উটেরে
২৪. দিও না কো বাধা বধো না প্রাণ।
২৫. বলিল নবীরে মিথ্যাবাদী
২৬. তথাপি তাহারা বধিল উটেরে,
২৭. তাহাদের তাই পাপের ফলে
২৮. বিধ্বস্ত করিল আল্লা তাদেরে।
২৯. ধূলিসাৎ করে ফেলিলেন খোদা
৩০. তাদেরে; এই সে ধ্বংস-লীলার
৩১. পরিণাম ফলে বে-পরোয়া তিনি
৩২. (কোন ভয় কভু নাই তাঁর)।

সূরা শামস্ থেকে শুরু করে পরবর্তী সূরাগুলি মক্কা শরীফে অবতীর্ণ হয়। এতে ১৫টি আয়াত, ৫৬টি শব্দ ও ২৫৪টি অক্ষর আছে। এখানে সাতটি শপথের কথা বলা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে ‘শপথ’ শব্দটি বারবার উচ্চারিত, কবি নজরুল সাতটি বস্তুর ক্ষেত্রে একবারই ‘শপথ’ শব্দটি ব্যবহার করেন। তিনি সূরা অবতীর্ণ হওয়ার কারণ যথার্থভাবে তুলে ধরেছেন। এ সূরায় সূর্য, চন্দ্র ও দিবারাত্রি প্রভৃতির উল্লেখ করে তাদের তারতম্য বুঝানো হয়েছে, কোন কাজ মানুষের আত্মাকে কলুষিত করবে অথবা তার জীবনকে ব্যর্থ করবে তারও দৃষ্টান্ত এখানে দেওয়া হয়েছে। ‘সামুদ’ জাতির ঘটনার উল্লেখ করে, খোদাতায়ালা যাকে ইচ্ছা হেদায়েত করে, যাকে ইচ্ছা গোমরাহ্ করে – এ উক্তি উক্ত সূরার মাধ্যমে খন্ডন করা হয়েছে।

সূরা বালাদ
(২০টি আয়াত, ১ রুকু, মক্কী)

শুরু করি লয়ে শুভ নাম আল্লার,
যিনি দয়াশীল আর কৃপার আধার।

১. শপথ করি এই নগরের
২. যেহেতু বিরাজ করিছ হেথায়
৩. শপথ পিতার আর তাহাদের সন্তানের
৪. (অধিবাসী এই নগর মক্কায়)।
৫. মানুষে করেছি সৃষ্টি যে আমি
৬. নিশ্চয় দুঃখ ক্লেশের মাঝ,
৭. সে কি ভাবে, তার পরে প্রভুত্ব
৮. করিতে কেহই নাহি সে আজ?
৯. “উড়ায়ে দিয়াছি রাশি রাশি টাকা
১০. আমি” – সে বলে বিনাশিতে তোমারে,
১১. সে কি (এই শুধু) মনে করে
১২. কেহ দেখিতেছে না তাহারে?
১৩. আমি কি তাহার মঙ্গল লাগি’
১৪. দিইনি তাহারে যুগল নয়ন?
১৫. জিহ্বা ওষ্ঠ দিইনি? দেখায়ে
১৬. দিইনি উভয় পথ সে কারণ?
১৭. কিন্তু প্রবেশ করিল না ত সে
১৮. দুর্গম পথে উপত্যকার,
১৯. উপত্যকার দুর্গম সেই
২০. পথ-জান তুমি সন্ধান তার?
২১. সে পথ-দাসের মুক্তি দান
২২. ও অন্নদান সে ক্ষুধার্তরে
২৩. আশ্রয় দান ধূলি-লুন্ঠিত
২৪. কাঙাল, “এতিম্” আত্মীয়েরে।
২৫. এমনি করে সে হয় একজন
২৬. তাদের মতই, ঈমান যারা
২৭. আনে আর দেয় উপদেশ
২৮. সব বিপদে (মহৎ তারা)
২৯. উপদেশ দেয় পরস্পরে সে
৩০. দয়াশীল হতে তারাই হবে
৩১. দক্ষিণ কর অধিকারী। আর
৩২. এ আয়াতে অবিশ্বাস করে গো যারা-হবে
৩৩. বাম হস্তের অধিকারী তারা, তাদের তরে
৩৪. আছে নিবদ্ধ হুতাশনের বরাদ্ধ রে।

সূরা বালাদ্ মক্কা শরীফে অবতীর্ণ হয়। এখানে ২০টি আয়াত, ৮২টি শব্দ ও ৩৪৭টি অক্ষর আছে। শানে নজুলে কবি উল্লেখ করেন, যখন রাহ্মাতুল্লিল আলামিন হযরত রাসুল (সা.) কালদা নামক এক কাফেরকে ইসলাম গ্রহণের কথা বলায় সে অবজ্ঞাভরে বলেছিল যে, দোজখের ১৯ জন ফেরেশতাকে সে একা বাম হাতে অবরোধ করতে পারবে; বেহেশতের বাগিচা, নাহার ও মনিকাঞ্চনের মূল্য তার বিবাহে ব্যয়িত অর্থের সমপরিমাণ নয়। তখন এ সূরা নাজিল হয়।

সূরা ফজর
(৩০টি আয়াত, ১ রুকু, মক্কী)

শুরু করি লয়ে পাক নাম আল্লার,
করুণা-নিধান যিনি কৃপা-পারাবার।

১. ঊষার শপথ। দশ সে রাতের শপথ করি,
২. যোড়-বিজোড় সে দিনের শপথ। সে বিভাবরী,
৩. যবে অবসান হতে থাকে করি তার শপথ
৪. জ্ঞানীদের তরে যথেষ্ট শপথ-এই ত।
৫. ভীমবাহু ঐ ইরামীয় “আদ”দের ‘পরে
৬. করেছেন কিবা প্রভু তব, দেখনি কি ওরে?
৭. হয়নি সৃজিত নগরসমূহে তাদের প্রায়
৮. আর সে “সামুদ” জাতি যে পাথর কাটিয়া
৯. সে উপত্যকায় –
১০. বসাইয়াছিল নগর বসতি, আর বহু কীলকধারী;
১১. ফেরাউন সাথে বিনাশ সাধিলাম কেন
১২. আমি তাহারি?
১৩. নগরে নগরে করেছিল ঔদ্ধত্য-আর
১৪. বহু অনাচার এনেছিল তথায় আবার।
১৫. শাস্তি দন্ড তোমাদের প্রভু
১৬. তাদের উপরে দিলেন তাই,
১৭. নিশ্চয় তব প্রভু দেখে সব,
১৮. থাকেন সময় প্রতীক্ষায়।
১৯. মানবে যখন দিয়ে সম্পদ্
২০. সম্মান, করে পরীক্ষা প্রভু,
২১. “আমার প্রভুই দিলেন এ সব
২২. সম্মান”- বলে অবোধ তবু।
২৩. আবার তাহারে পরীক্ষা যবে
২৪. করেন জীবিকা হ্রাস করে,
২৫. সে বলে, “আমার প্রভুই এ হেন
২৬. অপমানিত গো করিল মোরে!”
২৭. নহে, নহে, তাহা কখনোই নহে,
২৮. এ সবের তরে তোমরা দায়ী,
২৯. এতিমে তোমরা গ্রাহ্য কর না
৩০. কাঙালে খাদ্য দিতে উৎসাহ নাহি।
৩১. অন্নমুষ্টি তারে নাহি দাও,
৩২. অত বেশি কর অর্থের মায়া,
৩৩. পিতৃ-সম্পদ্ বিনা বিচারে সে
৩৪. যাও যে তোমরা ভোগ করিয়া।
৩৫. জান না কি, যবে ভীষণ রবে
৩৬. এ – ধরিত্রী বিচূর্ণিত হবে,
৩৭. দলে দলে ফেরেশ্তাগণ
৩৮. তখন হাজির হবে সবে।
৩৯. আর আসিবেন সে-দিন
৪০. তব মহান প্রভু সেথায়,
৪১. দোজখ সেদিন হইবে আনীত,
৪২. সেদিন মানুষ স্মরিবে, হায়!
৪৩. কিন্তু সেদিন স্মরণে কি হবে?
৪৪. “হায় হায়” করি কাঁদিবে সব,
৪৫. “পূর্বে যদি এ জীবনের তরে
৪৬. প্রেরিতাম পুণ্যের বিভব!”
৪৭. অন্য কেহ সে পারিবে না দিতে
৪৮. তেমন শাস্তি সেদিন,
৪৯. অন্য কেহই তখন বাধা দিতে
৫০. পারিবে না সেই যে দিন।
৫১. শাস্তি-প্রাপ্ত মানব-আত্মা!
৫২. ফিরে এস নিজ প্রভু পানে।
৫৩. তুমি তার প্রতি প্রীত যেমন।
৫৪. তিনি তব প্রতি প্রীতি তেমন।
৫৫. অনুগত মোর দাস যারা
৫৬. এস সেই দলে,
৫৭. বেহেশ্তে মোর করিবে প্রবেশ
৫৮. অবহেলা।

সূরাটি মক্কা শরীফে অবতীর্ণ হয়। এখানে ৩০টি আয়াত, ১৩৭টি শব্দ ও ৫৮৫টি অক্ষর আছে। কোনো এক সময়ে কাফেররা বলেছিল যে, মানুষের ভালমন্দ কাজের প্রতিফলন দেওয়া আল্লাহর অভিপ্রেত নয়। যদি তিনি পাপীর প্রতি অসন্তুষ্ট ও পুণ্যবানের প্রতি সন্তুষ্ট হতেন তবে কেয়ামতের প্রতীক্ষা করতেন না। যারা সৎ তারা ইহলোকেই সম্পদশালী হতো, যারা অসৎ তারা হতো বিপর্যস্ত। এরই প্রেক্ষিতে সূরাটি নাজিল হয়।
অনুবাদটিতে নজরুলের ধর্মীয় জ্ঞানের গভীরতার প্রমাণ পাওয়া যায়। ‘ইরাম’ আদ জাতির পূর্বপুরুষদের একজন, তাই তিনি ‘ইরামীয় আদ’ ব্যবহার করেছেন। পবিত্র কুরআনের অনুবাদে ‘ফেরাউন’কে ‘বহু সৈন্য শিবিরের অধিপতি’ বলা হয়েছে। নজরুল তাকে ‘কীলকধারী’ বলেছেন। ফেরাউনকে মূলত ‘কীলকধারী’ বলা হতো। ফেরাইন যার প্রতি অসন্তুষ্ট হতো, তার হাত পা চারটি কিলকে বেঁধে অথবা চার হাত পায়ে কীলকে মেরে রৌদ্রে শুইয়ে দিত এবং সাপ জাতীয় প্রাণী তার উপর ছেড়ে দেওয়া হতো। নজরুল ব্যাপারটি জানতেন বলেই ফেরাউন প্রসঙ্গে ‘কীলক’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন।
সূরা গাশিয়া
(২৬টি আয়াত, ১ রুকু, মক্কী)

শুরু করি শুভ নাম লয়ে আল্লার,
করুণা-নিধান যিনি কৃপা-পারাবার।

১. আসিয়াছে নিকটে তোমার
২. বৃত্তান্ত কি আচ্ছন্নকারী ঘটনার?
৩. বহু সে আনন হবে নত জ্যোতিঃহীন;
৪. শ্রান্ত কর্ম-পরিক্লান্ত তাহারা সে দিন-
৫. প্রজ্জ্বলিত অগ্নিকুন্ডে প্রবেশ করিয়া
৬. ফুটন্ত উৎসের জল যাইবে পিইয়া।
৭. বিষ কন্টক শুধু পাইবে আহার,
৮. করিবে না পুষ্ট দেহ, নিবৃত্তি ক্ষুধার।
৯. খুশিতে হইবে বহু মুখ উজ্জ্বল,
১০. হরষে লইবে তারা নিজ পুণ্য ফল।
১১. মহিমা – সুন্দর পাবে তাহারা বাগান,
১২. শোনে না কেহই সেথা মিথ্যার ব্যাখ্যান।
১৩. সেথা চির বহমান উৎস সমুদয়,
১৪. সমুন্নত সিংহাসন সেই খানে রয়।
১৫. রাখা আছে পান-পাত্র, শত উপাধান,
১৬. বিছানো মখমল শয্যা (আরাম-শয়ান)।
১৭. দেখে নাকি উট সব চেয়ে তারা সবে?
১৮. কিরূপে তাদের সৃষ্টি হইল, না ভাবে?
১৯. দেখে না বিনা স্তম্ভে আকাশ কেমনে
২০. উচ্চে হয়েছে রাখা? পর্বতগণে
২১. দেখে না কেমনে হল তাদের স্থাপন?
২২. বিস্তারিত হল এ-ধরা সে কেমন?
২৩. তুমি উপদেষ্টা শুধু, উপদেশ দাও,
২৪. তুমি ত প্রররী নহ, (পথ সে দেখাও)
২৫. মানিবে না আদেশ যে, ফিরাইবে মুখ,
২৬. দিবেন আল্লাহ্ তারে কঠোর সে দুখ।
২৭. নিশ্চয় ফিরিতে হবে তারে মোর পাশে,
২৮. হিসাব নিকাশ হবে আমারি সকাশে।

সূরা গাশিয়া মক্কা শরীফে অবতীর্ণ হয়। এতে ২৬টি আয়াত রয়েছে। এখানে মেঘের দৃষ্টান্ত দিয়ে বুঝানো হয়েছে যে মহান আল্লাহ্ সবই সম্ভব করতে পারেন। তিনিই মানুষকে পূণর্জীবন দিয়ে এই জীবনের কর্মফল ভোগ করাবেন। আরববাসীর পরকালে অবিশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে সূরাটি নাজিল হয়।

সূরা আ’লা
(১৯টি আয়াত, ১ রুকু, মক্কী)

শুরু করিলাম লয়ে নাম আল্লার,
করুণা-নিধান যিনি দয়ার পাথার।

১. মহত্তম যা নাম প্রভুর,
২. বর্ণনা কর পবিত্রতা তার,
৩. সৃজন করিয়া যিনি পূর্ণতা
৪. দানিয়াছেন তায় আবার।
৫. উচিত ধর্মে নিয়ন্ত্রণ
৬. করিয়া তিনিই দেখান পথ,
৭. সৃজিয়া তৃণাদি তারে আবার
৮. করেন কৃষ্ণ ভষ্মবৎ।
৯. আমি তোমা’ পড়াইব কোরান,
১০. বিস্মৃত তাই হবে না আর,
১১. তবে আল্লাহ্ জানেন সব
১২. প্রকাশ গোপন সব ব্যাপার।
১৩. তোমার তরে সে কল্যাণের
১৪. পথেরে সহজ দিব করে,
১৫. অতএব উপদেশ বিলাও
১৬. যদি সে সুফল হয়, ওরে।
১৭. উপদেশ তব লবে ত্বরায়
১৮. সেই জন আছে যাহার ভয়,
১৯. অতিশয় হত-ভাগ্য যে
২০. তাহা হতে দূর সরিয়া রয়,
২১. দেজখের মহা অনল মাঝ
২২. করিবে প্রবেশ সেই সে জন
২৩. বাঁচিবেও না সে (শান্তিতে)
২৪. হবে না সেথায় তার মরণ।
২৫. সেই জন হয় সফলকাম
২৬. অন্তঃকরণ পবিত্র যার,
২৭. নামাজ পড়ে যে, করি স্মরণ
২৮. নাম সে দয়াল প্রভুর তার।
২৯. পছন্দ সে করিল হায়
৩০. পার্থিব এই জীবনকেই
৩১. উত্তম আর অবিনাশী
৩২. জীবন যা পাবে পরকালেই।
৩৩. নিশ্চয় পূর্বের সকল
৩৪. কেতাবেই আছে তা বিদ্যমান
৩৫. বিশেষ করিয়া ইব্রাহিম,
৩৬. মুসার কেতাব তার প্রমাণ।

সূরা আ’লা মক্কা শরীফে অবতীর্ণ হয়। সূরাটিতে ১৯টি আয়াত রয়েছে। কবি নজরুল সূরার অর্থের দিকে লক্ষ্য রেখে প্রায় আক্ষরিক অনুবাদ করেছেন। শানে নজুলে কবি উল্লেখ করেন, যখন সূরাসমূহ নাজিল হতো এবং হযরত রাসুল (সা.) অসংখ্য তত্ত্বজ্ঞান লাভ করেন, তখন তিনি চিন্তিত হন এই ভেবে যে তিনি লেখাপড়া শেখেননি, সুতরাং এত অধিক সংখ্যক শব্দ ও সূক্ষ্ম মর্ম আয়ত্ত করা ও স্মরণ রাখা সম্ভব হবে না, হয়ত অধিকাংশ বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তখন দয়াল রাসুল (সা.)-কে সান্ত্বনা প্রদানের জন্য এ সূরা অবতীর্ণ হয় – “খোদাই আপনার শিক্ষাদাতা, আপনি উহা ভুলিবার কল্পনাও করিবেন না।”

পবিত্র কুরআনের এ অনন্য অনুবাদ বিশ্ব সাহিত্যে বিরল। কবি নিজেই বলেন, “কোর-আন-পাকের একটি শব্দও এধার ওধার না করে তার ভাব অক্ষুণ্ন রেখে কবিতায় সঠিক অনুবাদ করার মত দুরূহ কাজ আর দ্বিতীয়টি আছে কি না জানিনে।” সত্যিই তাই, ধর্মদর্শন সম্পর্কে সুস্পষ্ট জ্ঞান না থাকলে তা কোনো দিনই সম্ভব নয়। প্রভুকে হৃদয়ে ধারণ করতে না পারলে, তাঁর বাণীর যথার্থ মর্মার্থ স্বার্থকভাবে তুলে ধরা অসম্ভব।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here