পবিত্র কুরআনের বাংলা পদ্যানুবাদ ও নজরুল

1
269

মুহাম্মদ জহিরুল আলম, পিএইচ.ডি গবেষক
সুফি কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি বাংলা সাহিত্যের যুগস্রষ্টা। মাত্র ২২ বছরের সাহিত্য জীবন পেয়েছিলেন, এত অল্প সময়ে পৃথিবীর যে কোনো কবির চেয়ে বেশি গান রচনা করেছেন। তিনি সর্বপ্রথম বাংলা গজল প্রবর্তন করেন। পরম স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসা ও রাহমাতুল্লিল আলামিন হযরত রাসুল (সা.)-এর প্রেম তাঁর সাহিত্যকর্ম জুড়ে বিস্তৃত। সাহিত্য রসের মাধ্যমে এই নান্দনিক প্রেমকে তিনি ফুটিয়ে তুলেছিলেন। কি অসাধারণ তার প্রকাশভঙ্গী-
মোহাম্মদের নাম জপেছিলি বুলবুলি তুই আগে।
তাই কিরে তোর কন্ঠেরি গান, (ওরে) এমন মধুর লাগে।
ওরে গোলাব নিরিবিলি
নবীর কদম ছুঁইয়েছিলি
তাঁর কদমের খোশবু আজো তোর আতরে জাগে।
মোর নবীরে লুকিয়ে দেখে
তাঁর পেশানীর জ্যোতি মেখে
ওরে ও চাঁদ, রাঙ্গলি কি তুই গভীর অনুরাগে।
ওরে ভ্রমর, তুই কি প্রথম
চুমেছিলি নবীর কদম,
গুনগুনিয়ে সেই খুশী কি জানাস্ রে গুল্বাগে।

ইসলামের প্রকৃত দর্শন তিনি জাতির সামনে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। তাই বড়ো সাধ করে নজরুল কুরআন শরীফের বাংলা পদ্যানুবাদ করেন। তাঁর ‘কাব্য আমপারা’ গ্রন্থ হতে কয়েকটি সূরার পদ্যানুবাদ ও শানে নজুল প্রিয় পাঠকদের নিকট তুলে ধরা হলো।
সূরা তারিক
(১৭টি আয়াত, ১ রুকু, মক্কী)

শুরু করি লয়ে শুভ নাম আল্লার,
করুণা-সাগর যিনি দয়ার পাথার।

১. শপথ ‘তারেক’ ও আকাশের
২. সে ‘তারেক’ কি তা জান কিসে?
৩. নক্ষত্র সে জ্যোতিষ্মান
৪. (নিশীথে আগত অতিথি সে)
৫. এমন কোন সে নাহি মানব
৬. রক্ষক নাই উপর যার,
৭. অতএব দেখা উচিত তার
৮. কোন বস্তুতে সৃষ্টি তার।
৯. বেগে বাহিরায় উছল জল-
১০. বিন্দু তাতেই সৃজন তার
১১. পিঠ ও বুকের মধ্য দেশ
১২. সেই যে জল স্থান যাহার
১৩. সক্ষম তিনি নিশ্চয়ই
১৪. করিতে পুনর্জীবন দান
১৫. অভিব্যক্ত হবে সবার
১৬. গুপ্ত বিষয় হবে প্রমাণ,
১৭. রবে না শক্তি সহায় আর
১৮. সে দিন তাহার কোন কিছুই,
১৯. শপথ নীরদ-ঘন নভের
২০. শপথ বিদায়শীল এ-ভুঁই।
২১. ইহাই চরম বাক্য ঠিক,
২২. নিরর্থক এ নহে সে দেখ,
২৩. মতলব করে তাহারা এক
২৪. মতলব করি আমি ও এক
২৫. অবসর তুমি দাও হে তাই
২৬. বিধর্মীদের ক্ষণতরে
২৭. দাও অবকাশ তাহাদের।
সূরা তারিক মক্কা শরীফে অবতীর্ণ হয়। এখানে ১৭টি আয়াত, ৬১টি শব্দ ও ২৫৪টি অক্ষর আছে। ‘তারেক’ শব্দটি পবিত্র কুরআনের অনুবাদে নেই, নজরুল ‘রাত্রিতে যাহা আবির্ভূত’ হয় – এর স্থানে ‘তারেক’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন।

একদিন রাতে হযরত রাসুল (সা.) তাঁর গৃহে পিতৃব্য আবু তালেবের সাথে আহার করছিলেন, সেসময়ে উল্কাপিন্ডের জ্যোতিতে ঐ ঘর উদ্ভাসিত হয় এবং আবু তালেবের চোখের জ্যোতি ক্ষীণ হয়ে যায়। হযরত রাসুল (সা.)-কে বস্তটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি উত্তর দিলেন যে, শয়তান যখন আসমানের গুপ্ত তত্ত্ব অনুসন্ধানের জন্য উড্ডীয়মান হয় তখন ফেরেশতাগণ উল্কাপিন্ড নিক্ষেপ করে তাদের বিতাড়িত করে। আবু তালেব বিস্মিত হয়ে নিস্তব্ধ হলেন। তখন এই সূরা নাজিল হয়।
সূরা বুরূজ
(২২টি আয়াত, ১ রুকু, মক্কী)

শুরু করিলাম লয়ে নাম আল্লার,
করুণা কৃপার যিনি অসীম পাথার।

১. গ্রহ-উপগ্রহভরা শপথ আকাশের,
২. আর শপথ প্রতিশ্রুত রোজ হাশরের
৩. শপথ উপস্থিত, উপস্থাপিত সবার,
৪. ধ্বংস হল সে অধিকারিগণ পরিখার।
৫. কাষ্ঠপূর্ণ অগ্নিকুন্ড-অধিকারিগণ
৬. বসেছিল তদুপরি তাহারা যখন।
৭. আল্লায়-বিশ্বাসিগণে ধরিয়া তথায়
৮. ফেলিয়া দেখিতেছিল নিজেরাই, হায়!
৯. সাজা দিতেছিল শুধু অপরাধে এই
১০. বিশ্বাসিগণের প্রতি; বিশ্বাসীরা যেই
১১. ঈমান আনিয়াছিল আল্লাহর প্রতি,
১২. অনন্ত-প্রতাপ যিনি মহীয়ান অতি।
১৩. স্বর্গ মর্ত্য রাজত্বের অধিপতি যিনি,
১৪. জ্ঞাত এ-সবের তত্ত্ব একমাত্র তিনি।
১৫. ঈমানদার সে নর-নারীরে যাহারা
১৬. দেয় যন্ত্রণা, তৌবা নাহি করে তাহারা
১৭. ইহারই জন্য যাবে দোজখে নিশ্চয়,
১৮. অনল দাহন জ্বালা যেথা শুধু রয়।
১৯. অবশ্য যাহারা সৎ ‘নেক’ কাজ করে,
২০. আনে সে ঈমান; আছে তাহাদের তরে,
২১. এমন বাগান, যার নিম্নদেশ দিয়া
২২. পুণ্য-তোয়া নদী সব চলিছে বহিয়া।
২৩. শ্রেষ্ঠ সফলতা এই নিশ্চয় তোমার
২৪. প্রভু প্রতাপান্বিত বিপুল বিথার।
২৫. প্রথমে সৃজিয়া যিনি গড়েন আবার
২৬. তিনি মহা প্রেমময় ক্ষমাবান,আর
২৭. জগৎ-সাম্রাজ্য-সিংহাসনের পতি,
২৮. ইচ্ছাময় প্রভু তিনি গরীয়ান অতি।
২৯. ফেরাঊন সামুদের সেনা-সম্ভার
৩০. তাদের বৃত্তান্ত শোনা আছে কি তোমার?
৩১. জান কি কেমনে হল তারা ছারখার?
৩২. যে জন অমান্য করে আদেশ আমার
৩৩. সত্যেরে অসত্য বলা কাজ যে তাহার।
৩৪. অথচ আল্লাহ্তালা ঘিরিয়া তাহায়
৩৫. পরিব্যাপ্ত রয়েছেন চারিদিকে, হায়!
৩৬. মহিমান্বিত মহা কোরআন এই
৩৭. লিখিত সুরক্ষিত পাক “লওহে”ই।
সূরা বুরুজ মক্কা শরীফে অবতীর্ণ। এতে ২২টি আয়াত, ১০৯টি শব্দ ও ৪৭৫টি অক্ষর আছে। মক্কার পৌত্তলিকরা মুসলমানগণকে ইসলাম গ্রহণ করার দরুন নানাপ্রকার উৎপীড়ন করত। দয়াল রাসুল (সা.)-এর নিকট মুসলমানগণ অভিযোগ করায় তিনি উত্তরে বলেছিলেন যে, এক সময় তাদের দুর্ব্যবহারের প্রতিশোধ গ্রহণ করতে খোদা তোমাদেরকে সক্ষম করবেন। এ কথা শুনে কাফেররা বলতে লাগল- এরূপ দুর্বল, অপমানিত ও অর্থহীন লোকেরা কিরূপে প্রতিশোধ নিতে সক্ষম হবে? খোদার ইচ্ছাতেই আমরা সম্মানিত আর তারা হেয় ও লাঞ্ছিত। কাফেরদের এরূপ কথার প্রত্যুত্তরে এ সূরা অবতীর্ণ হয়।
সূরা ইনশিকাক
(২৫টি আয়াত, ১ রুকু, মক্কী)

শুরু করিলাম শুভ নামেতে আল্লার,
করুণা কৃপার যাঁর নাই নাই পার।

১. (রোজ কিয়ামতে) যবে ফাটিবে আকাশ,
২. হবে সে প্রভুর নিজ আজ্ঞাবহ দাস,-
৩. এই উপযোগী করে গড়েছি তাহায়;
৪. লাগিবে সে আকর্ষণ যখন ধরায়;
৫. যাহা কিছু আছে তার মধ্যে ‘ফেলি’ তায়
৬. হইয়া যাইবে শূন্য-গর্ভ সে, হায়!
৭. মানিবে পৃথিবী আজ্ঞা তাহার খোদার,
৮. এরি উপযোগী করে সৃজন যে তার।
৯. তোমার খোদার পানে চলিতে, মানব!
১০. তোমারে করিতে হবে চেষ্টা অসম্ভব।
১১. তবে সে করিবে লাভ মিলন তাঁহার!-
১২. মিলিবে “আমলনামা” ডান হাতে যার,
১৩. সহজে দিবে সে তার হিসাব নিকাশ,
১৪. হরষে ফিরিবে নিজ পরিজন পাশ।
১৫. যে পাবে আমলনামা পশ্চাৎ পানে,
১৬. ‘সর্বনাশ’ বলিয়া সে কাঁদিবে সেখানে
১৭. পশিবে সে অগ্নিকুন্ডে-আত্মীয় স্বজনে
১৮. বেষ্টিত ছিল সে যবে হরষিত মনে,
১৯. ধরিয়া লইয়াছিল মনে সে তাহার
২০. ফিরিতে কখনো তারে হইবে না আর।
২১. তারে সর্বদা
২২. দেখিতেছিলেন, নিশ্চয়, তার যে খোদা
২৩. সান্ধ্য – গগনের ঐ গোধূলি-রাগের
২৪. শপথ করি আর যে তিমির রাতের,
২৫. যামিনী সংগ্রহ করে যত কিছু তার,
২৬. আর শপথ করি আমি পূর্ণ-চন্দ্রমার;
২৭. নিশ্চয় তোমরা পৌঁছিবে পরে পরে
২৮. এক স্তর হতে পুনরায় অন্য স্তরে।
২৯. (অতএব) তাহাদের কি হয়েছে? তারা
৩০. বিশ্বাস করে না এ বিশ্বাস হারা!
৩১. কোরান তাদের কাছে যবে পাঠ হয়,
৩২. তাহারা সেজদা নাহি করে সে সময়!
৩৩. অমান্য করে যারা তারাই আবার
৩৪. সত্যে সে আরোপ করে তারাই মিথ্যার।
৩৫. তাহারা পোষণ করে মনে যাহা যত,
৩৬. আল্লাহ্ বিশেষরূপে তাহা অবগত।
৩৭. কঠোর দন্ডের
৩৮. অতএব দিয়ে রাখ সংবাদ তাদের।
৩৯. যাহারা ঈমান আনে, নেক কাজ করে,
৪০. অন্তহীন পুরস্কার তাহাদের তরে।
এই সূরা মক্কা শরীফে অবতীর্ণ হয়। এখানে ২৫টি আয়াত, ১০৮টি শব্দ ও ৪৪৮টি অক্ষর আছে। কেয়ামতের সময় মানুষের যে ভীষণ অবস্থা হবে তার বর্ণনা ও পুনর্জীবন লাভের কথা এ সূরায় উল্লেখ হয়েছে। কেয়ামত ও পুনর্জীবন লাভের কথা ভেবে মানুষ যাতে সৎকর্ম সম্পাদন করে এ উদ্দেশ্যেই এ সূরা অবতীর্ণ হয়েছে।
সূরা মুতাফ্ফিফীন
(৩৬টি আয়াত, ১ রুকু, মক্কী)

শুরু করি লয়ে পূত নাম বিধাতার
করুণা ও দয়া যার অনাদি অপার।

১. সর্বনাশ তাহাদের, হ্রাস-কারী যারা,
২. যখন লোকের কাছে মেপে লয় তারা,
৩. তখন পূর্ণ করে চায় মেপে নিতে,
৪. তাদের ওজন করে হয় যবে দিতে,
৫. তখন কম সে করে মাপে ও ওজনে।
৬. উঠিতে হইবে পুন, করে না তা মনে।
৭. উঠিবে মানব পুন মহান সে দিন,
৮. বিশ্ব-পালকের কাছে দাঁড়াবে যে দিন।
৯. পাপিষ্ঠ লোকের সে কার্য সমুদয়
১০. নিশ্চয় ‘সিজ্জিনে’ থাকে, কভু মিথ্যা নয়।
১১. জান কি, সে ‘সিজ্জিন’ কি? লিখিত কেতাব
১২. (লেখা রবে যাতে তার পাপের হিসাব)।
১৩. সর্বনাশ হবে।
১৪. তাদের- সত্যেরে বলে মিথ্যা যারা সবে।
১৫. কর্মফল প্রাপ্তির এদিন হাশরের
১৬. বলে মিথ্যা- সর্বনাশ হবে তাহাদের।
১৭. আদেশ-লঙ্ঘনকারী পাতকী ব্যতীত।
১৮. আর কেহ বলে না- এ সত্যের অতীত।
১৯. তার কাছে পাঠ হলে আমার এ বাণী
২০. সে বলে এ “পূর্বতন লোকের কাহিনী।”
২১. কখনই নহে, তাহা নহে
২২. অভ্যস্ত তাদের নিজ কাজগুলি রহে,
২৩. জমেছে মরিচা – রূপে তাহাদের মনে।
২৪. সেদিন তাহারা নিজ খোদার সদনে,
২৫. পারিবে না যেতে নিশ্চয়! তারপর
২৬. প্রবেশ করিবে তারা দোজখ ভিতর।
২৭. সেই কর্মের ফল জেনো ইহা সেই,
২৮. তোমরা মিথ্যা সদা বলিতে এরেই।
২৯. কখনই মিথ্যা নহে, রহিবে নিশ্চয়,
৩০. লেখা ‘ইল্লিয়নে’ সব কার্য সমুদয়
৩১. যত সৎলোকের সে। জান ‘ইল্লিয়ন’
৩২. কারে কয়? লিখিত সে কেতাব রতন।
৩৩. প্রত্যক্ষ কেবল তারা করিবে দর্শন
৩৪. আল্লার নিকটে যাবে যে মানবগণ।
৩৫. সুপ্রচুর সুখে রবে পুণ্য- আত্মাগণ,
৩৬. সুউচ্চ তখ্তে রহি, করিবে দর্শন।
৩৭. সে সুখ- পুলকে
৩৮. দেখিতে পাইবে তারা নিজ মুখে চোখে
৩৯. শিলমোহর করা
৪০. তাহারা করিবে পান সুপবিত্র সুরা।
৪১. কস্তুরীর সে মোহর। কামনা কারুর
৪২. থাকে যদি – করুক কামনা এ দারুর।
৪৩. ‘তস্নীম’ সুধা মেশা হয় সে সুরায়,
৪৪. ‘তস্নীম’ সে প্রস্রবণ- উৎস, যাহার
৪৫. আল্লার নিকট যারা, করে তারা পান।
৪৬. অবিশ্বাসী সবার প্রতি বিদ্রুপ – বাণ
৪৭. হানিতে যে অপরাধিগণ নিশ্চয়,
৪৮. আঁখি-ঠারে ইঙ্গিত তারা যে সময়
৪৯. করিতে পরস্পরে বিশ্বাসীরে দেখে
৫০. তাহাদের পাশ দিয়া যাইলে তাহাকে।
৫১. স্বজনের কাছে সব ফিরে গিয়ে পুন
৫২. করিত বিদ্রুপ ব্যঙ্গ ইহারা তখনো।
৫৩. দেখায়ে (বিশ্বাসিগণ) বলিত, “ইহারা
৫৪. নিশ্চয়, নিশ্চয়ই, সবে পথহারা!”
৫৫. বিশ্বসীদের পরে অথচ বেশক
৫৬. প্রেরিত হয়নি এরা হইয়া রক্ষক।
৫৭. ঈমান এনেছ যারা, তারা আজিকে
৫৮. উপহাস করিবে বিধর্মী দেখে।
৫৯. উঁচু সে তখ্তে বসি’ করিবে দর্শন,
৬০. কর্মফল পেল আজ বিধর্মীগণ।
পবিত্র কুরআনে যে সূরার নাম ‘সূরা মুতাফ্ফিফীন’, কবি নজরুল তার নাম লেখেণ ‘সূরা তাৎফীফ’। বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রকাশিত ‘পবিত্র কোরআনুল করীম’ গ্রন্থটিতেও ‘সুরা আত-তাত্ফীফ’ আছে। ‘সূরা তাৎফীফ’ ‘মক্কা’ এবং ‘মদীনা’ দু’জায়গাতেই নাজিল হয়। এখানে ৩৬টি আয়াত, ১৭২টি শব্দ ও ৭৫৮টি অক্ষর আছে। বিশ্বনবি হযরত রাসুল (সা.) মদীনায় পদার্পণ করে দেখলেন যে, উক্ত স্থানের অধিবাসীগণ পরিমাণ ও ওজনে কম-বেশি করে থাকে, তখন এ সূরা নাজিল হয়। মক্কায় এ সূরা প্রথমে নাজিল হয়েছিল। হযরত রাসুল (সা.) মদীনায় যাওয়ার পর সেখানে এ সূরা পাঠ করে শুনিয়ে দিলেন।
সূরা ইন্ফিতার
(১৯টি আয়াত, ১ রুকু, মক্কী)

শুরু করি লয়ে শুভ নাম আল্লার,
করুণা-পাথার যিনি দয়া-পারাবার।

১. আসমান সবে বিদীর্ণ হবে
২. খসিয়া পড়িবে তারকা সব,
৩. সমাধি-পুঞ্জ হবে উন্মুক্ত
৪. উচ্ছ্বসিত হবে অর্ণব,
৫. তখন জানিবে প্রত্যেক লোকে
৬. জীবনে করেছে কি সঞ্চয়,
৭. রাখিয়া এসেছে পশ্চাতে কিবা।
৮. হে মানব! তবে সে কৃপাময়
৯. প্রভু হতে রাখে বঞ্চিত করে
১০. তোমার কিসে? যে প্রভু তোমার
১১. সৃজিয়া তা’পর সাজাল কেমন
১২. কৌশলে যেথা যাহা মানায়।
১৩. যুক্ত তোমায় করেছেন তিনি
১৪. যে আকারে তাঁর ইচ্ছা হয়,
১৫. মিথ্যা বল যে কর্মফলেরে
১৬. নহে নহে তাহা কখনো নয়।
১৭. নিয়োজিত আছে রক্ষীবৃন্দ
১৮. নিশ্চয় তোমাদিগকে ‘পর,
১৯. যাহা কিছু কর, মহান হিসাব
২০. লেখকদের তা হয় গোচর।
২১. রবে নিশ্চয় পরমাহলাদে
২২. পুণ্যবান সৎকর্মীরা,
২৩. নিশ্চয় যাবে দোজখে সে যত
২৪. দুঃশলি কু- ব্যক্তিরা
২৫. করিবে প্রবেশ রোজ কিয়ামতে
২৬. সে দোজখে তারা। পশি’ সেথা
২৭. লুকাতে পলাতে পারিবে না আর’
২৮. তাহা কি জানাল তোমা’ কে- তা?
২৯. জিজ্ঞাসা করি আবার তোমারে
৩০. কিয়ামত কি তা জান কি সে?
৩১. ইহা সেই শেষ- বিচার দিবস,
৩২. যে দিন মানব মানবী সে
৩৩. কেহই কারুর উপকারে কোন
৩৪. আসিবে না, হবে নিঃসহায়,
৩৫. একমাত্র সে আল্লাতা’লার
৩৬. হুকুম সেদিন রবে সেথায়।
সূরা ইন্ফিতার মক্কা শরীফে অবতীর্ণ হয়। এখানে ১৯টি আয়াত, ৮০টি শব্দ ও ৩৩৪টি অক্ষর আছে। অনুবাদটি আক্ষরিক কিন্তু শিল্পসার্থক। ইন্ফিতার মানে বিস্ফোরণ। অনুবাদটিতে কেয়ামতের ভয়াবহ প্রসঙ্গগুলো যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। নজরুলের মাধুর্যপূর্ণ শব্দগুলো ধ্বনি ও ছন্দের সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবহারের মধ্য দিয়ে কেয়ামতের ভয়াবহতায় ব্যঞ্জনার সৃষ্টি হয়েছে। শানে নজুলে কবি বলেন, কেয়ামতের ভীষণ অবস্থার বর্ণনা ও মানুষকে যে তার কর্মফল নিশ্চয়ই ভোগ করতে হবে তা এ সূরার প্রতিপাদ্য বিষয়। পরজীবনের সুফল পাওয়ার জন্য মানুষ যেন সৎকর্ম করে আর কুকর্মের ফল পরজীবনে যন্ত্রণাদায়ক হবে ভেবে যেন (এ-জীবনে) কুকর্ম হতে বিরত থাকে – এ উদ্দেশ্যে এ সূরা নাজিল হয়েছে।

পবিত্র কুরআনের মত মহাগ্রন্থকে কাব্যে রূপ দেওয়া সহজ কাজ নয়- তা অত্যন্ত কঠিন। কুরআনের অনুবাদে নজরুল সার্থকতার পরিচয় দিয়েছেন, যা বাংলা সাহিত্যকেও সমৃদ্ধ করেছে। আজ হতে ১২০ বছর পূর্বে আগমন করে বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি অঙ্গনে তিনি যে সৌন্দর্যের ছটা বিলিয়ে দিয়েছিলেন আজও তা আমদের হৃদয়ে স্পন্দন দিয়ে যায়। প্রিয় কবির জন্মবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here