পবিত্র কুরআনের বাংলা পদ্যানুবাদ ও নজরুল

0
302

মুহাম্মদ জহিরুল আলম, পিএইচ.ডি গবেষক
প্রেমের কবি নজরুল। তাঁর সমস্ত সৃষ্টিকর্ম জুড়ে রয়েছে প্রভুকে পাওয়ার আকুতি। ইসলামের প্রকৃত দর্শন তাঁর সাহিত্যকর্মে ফুটে উঠেছে। সমকালীন সময়ে নজরুল তাঁর লেখনীর মধ্য দিয়ে সমাজের ভীত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি প্রচলিত ধর্ম বিশ্বাসের বিরুদ্ধেও লিখেন। স্রষ্টার সন্ধানে তিনি বলেন, স্রষ্টারে খোঁজ- আপনারে তুমি আপনি ফিরিছ খুঁজে! / ইচ্ছা অন্ধ! আঁখি খোল, দেখ দর্পণে নিজ কায়া / দেখিবে, তোমারি সব অবয়বে পড়েছে তাহার ছায়া। স্রষ্টার রুপের পুজারী তিনি। হয়ত এ রূপের সন্ধান তিনি পেয়েও ছিলেন। তাই নির্বাক হবার আগেই লিখেন-
এ কোন মায়ায় ফেলিলে আমায়
চির জনমের স্বামী-
তোমার কারণে এ তিন ভুবনে
শান্তি না পাই আমি।।
অন্তরে যদি লুকাইতে চাই
এ আগুন আমি কেমনে লুকাই, ওগো অন্তর্যামী।।
মুখ থাকিতেও বলিতে পারে না বোবা স্বপনের কথা;
বলিতেও নারি লুকাতেও নারি; তেমনি আমার ব্যাথা।
যে দেখেছে প্রিয় বারেক তোমায়
বর্ণিতে রূপ- ভাষা নাহি পায়
পাগলিনী-প্রাায় কাঁদিয়া বেড়ায় অসহায়, দিবাযামী।।

কবির বড় সাধ ছিল পবিত্র কুরআনের বাংলা পদ্যানুবাদ করা। কুরআন পাঠের মাধ্যমে মানুষ যাতে মহান আল্লাহর বাণী সহজেই বুঝতে পারে সে প্রচেষ্টা থেকেই তিনি কুরআন শরিফের অর্থ অবিকৃত রেখে বাংলায় পদ্যানুবাদ করেন। নজরুলের ‘কাব্য আমপারা’ হতে কয়েকটি সূরা ও শানে নজুল প্রিয় পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

সূরা তাকভীর
(২৯টি আয়াত, ১ রুকু, মক্কী)

শুরু করিলাম শুভ নামেতে খোদার,
করুণা-আকর যিনি দয়ার আধার।

১. সংঙ্কুচিত হয়ে যবে সূর্য যাবে জড়ায়ে,
২. তারকা সব পড়বে যখন ইতস্তত ছড়ায়ে,
৩. পর্বত সব সঞ্চারিয়া ফিরবে যখন (ধূলির প্রায়)।
৪. পূর্ণ-গর্ভা উটগুলিরে দেখ্বে না কেউ উপেক্ষায়,
৫. বেরিয়ে আসবে বুনো যত জানোয়ারেরা বেঁধে দল,
৬. হবে প্লাবন উদ্বেলিত যখন সকল সাগর-জল।
৭. আত্মা হবে যুক্ত দেহে। জ্যান্ত পোঁতা কন্যাদের
৮. পুছব যখন কোন্ দোষে বধ করছে পিতা তোদের?
৯. যখন খোলা হবে সব আমল-নামা; সেই সেদিন
১০. জ্বলে দোজখ ধু ধু, হবে আকাশ আবরণ-বিহীন,
১১. জান্বে সেদিন প্রতি মানব, সাথে সে কি আনল তার!
১২. শপথ করি ঐ চলমান আর স্থিতিশীল তারকার,
১৩. রাত্রি যখন পোহায় এবং ঊষা যখন ছায় সে দিক
১৪. শপথ তাদের, মহিমাময় রসুলের এ বাণী ঠিক।
১৫. আরশ-অধিপতির কাছে প্রতিষ্ঠা তাঁর, সেই রসুল
১৬. বিশ্বস্ত, সম্মানার্হ, শক্তিধর, ধরায় অতুল।
১৭. পাগল নহে তোমাদের এই সহচারী, সাক্ষ্য দিই,
১৮. মুক্ত দিগন্তরে জিব্রাইল দেখেছেন সে তিনিই।
১৯. অদেখা যা দেখেন ইনি ব্যক্ত করেন তখন তাই,
২০. বিতাড়িত শয়তানের এ উক্তি নহে (কহেন খোদাই)।
২১. তোমরা যবে অতঃপর কোন্ সে দিকে?
২২. বাণীতে- যাহা কই,
২৩. বিশ্ব-নিখিল-শুভ তরে নয় ত এ উপদেশ বই!
২৪. এই উপদেশ তাহার তরে, তোমাদিগের মাঝ হতে
২৫. চলিতে যে চাহে আমার সুদৃঢ় সরল পথে।
২৬. নিখিল-বিশ্ব-অধিরাজের ইচ্ছা না হয় যতক্ষণ,
২৭. তোমরা ইচ্ছা করতে নাহি পারবে জানি ততক্ষণ।
এ সূরা মক্কা শরীফে অবতীর্ণ হয়। এখানে ২৯টি আয়াত, ১০৪টি শব্দ ও ৪৩৬টি অক্ষর আছে। অনুবাদটিতে কাব্য সৌন্দর্য রয়েছে। বিশ্বনবি হযরত রাসুল (সা.) যখন কেয়ামত, পরকাল বা কর্মফলের কথা বলতেন তখন মক্কাবাসীরা তাঁকে উন্মাদ বলত। কেয়ামতের ধ্বংসলীলা ও আল্লাহর শক্তির বর্ণনা করে সৎপথে মানুষকে আল্লাহ্র প্রতি নির্ভরশীল করার উদ্দেশ্যেই সূরাটি নাজিল হয়।

সূরা ‘আবাসা
(৪২টি আয়াত, ১ রুকু, মক্কী)

শুরু করি লয়ে নাম আল্লার,
দয়া করুণার যার নাই নাই পার।

১. (মোহাম্মদ) ভ্রু-ভঙ্গি করি’ ফিরাইল মুখ
২. যেহেতু আসিল এক অন্ধ আগন্তুক
৩. তাঁহার নিকট। তুমি জান (মোহাম্মদ)?
৪. হয়ত বা লভিবে সে শুদ্ধির সম্পদ;
৫. কিম্বা তব উপদেশ মত সে চলিবে,
৬. তাহাতে তাহার তরে সুফল ফলিবে।
৭. মানে না যে তব কথা বে-পরোয়া হয়ে,
৮. বুঝাইতে কত যত্ন তব, তারে লয়ে!
৯. অথচ সে শুদ্ধাচারী না হইলে পর
১০. তোমার দায়িত্ব নাই প্রভুর গোচর।
১১. কিন্তু তব পাশে ছুটে’ আসে যেইজন
১২. আল্লার সে ভয়-ও রাখে, তার থেকে মন
১৩. সরাইয়া লও তুমি! উচিত এ নয়,
১৪. আল্লার এ উপদেশ জানিও নিশ্চয়;
১৫. কাজেই যাহার ইচ্ছা, করুক উহার
১৬. আলোচনা। (সেই উপদেশ-সম্ভার)
১৭. মহিম-মহান পত্রাবলীতে (লিখিত),
১৮. উন্নত পূত লেখক হস্তে (সুরক্ষিত)।
১৯. (আর সে লেখকগণ) সৎ ও মহান।
২০. সর্বনাশ মানুষের! সে কৃতঘ্ন-প্রাণ
২১. অতি ঘোর! (হায়), তারে কোন্ বস্তু হতে
২২. সৃজন করিয়াছেন তিনি? শুক্র হতে!
২৩. -তারে সৃষ্টি করে
২৪. যথাযথভাবে তারে সাজান, তা’ পরে
২৫. সহজ করেন তার জন্য পথ তার,
২৬. পরে মৃত্যু ঘটাইয়া সমাধি মাঝার
২৭. লন তারে। পুনরায় ইচ্ছা সে যখন,
২৮. বাঁচাইয়া তুলিবেন তাহারে তখন।
২৯. না, না তিনি করেছেন যে আদেশ তারে
৩০. সমাধা সে করিল না তাহা (একেবারে)।
৩১. করুক মানুষ এবার দৃষ্টিপাত
৩২. তাহার খাদ্যের পানে, কত বৃষ্টিপাত
৩৩. করিয়াছি (তার তরে); মাটিরে তা’পরে
৩৪. বিদীর্ণ করিয়াছি কত ভাল করে।
৩৫. অনন্তর জন্মায়েছি ফসল প্রচুর,
৩৬. আঙ্গুর শাক-সব্জি, জায়তুন, খেজুর,
৩৭. গহন কানন-রাজি, তৃণাদি ও ফল;
৩৮. তোমাদের, তোমাদের পশুর মঙ্গল
৩৯. সাধিতে। আসিবে যবে সে বিপদ-দিন,
৪০. (ভীষণ নিনাদে) লোক পালাবে সে দিন
৪১. নিজ ভ্রাতা, নিজ পিতা মাতা হতে,
৪২. সঙ্গিনী ও পুত্রগণে (ফেলে রেখে পথে)।
৪৩. সে দিন এমনই হবে অবস্থা লোকের,
৪৪. ভাবিতে সে পারিবে না কথা অন্যের।
৪৫. সে দিন উজ্জ্বল হবে কত সে আনন,
৪৬. হাসিরাশি-ভরা আর পূর্ণ-হরষণ;
৪৭. আবার কত সে মুখ ধূসর ধূলায়।
৪৮. (হইবে হায় রে) আচ্ছাদিত কালিমায়?
৪৯. – ইহারা তাহারা,
৫০. অমান্যকারী আর ভ্রষ্টচারী যারা।
এ সূরা মক্কা শরীফে অবতীর্ণ হয়েছে। সূরাটিতে ৩২টি আয়াত, ১৩৩টি শব্দ ও ৫৫৩টি অক্ষর আছে। শানে নজুলে কবি নজরুল বলেন, একদিন হযরত রাসুল (সা.) কুরাইশ সম্প্রদায়ের ওৎবা, আবু জাহেল, আব্বাস প্রমূখ ব্যাক্তিগণকে ইসলামের দিকে আহবান করছিলেন, সে সময় আবদুল্লা-এবনে-ওম্মে মকতুম নামক জনৈক অন্ধ ব্যক্তি তাঁর নিকট উপস্থিত হয়ে তাকে কুরআন শিক্ষা দেওয়ার জন্য রাসুলকে তার দিকে অগ্রসর হতে বলে। এতে রাসুলের কথোপকথনে ব্যাঘাত সৃষ্টি হলে দয়াল রাসুল (সা.)-এর মুখ বিমর্ষ হয়। তখন এ সূরা নাজিল হয়।

সূরা নাযি‘আত
(৪৬টি আয়াত, ২ রুকু, মক্কী)

শুরু করি লয়ে পূত নাম সে খোদার,
যিনি চির-দয়াময় করুণা-আধার।

১. তাদের শপথ পূর্ণ-বেগে টানে যারা (ধনুর্গুণ)
২. তাদের শপথ ছুটে (যে শর) তীব্র সে গতি-নিপুন।
৩. তাদের শপথ পূর্ণ – বেগে যারা সন্তরণ-কারী,
৪. দ্রুতবেগে অগ্রগামী (অশ্ব যে) প্রমাণ তারি।
৫. করে যারা সব বিষয়ের অবস্থা তাদের প্রমাণ।
৬. কম্পনের সে পরে যেদিন ধরা হবে কম্পমান,
৭. কত সে অন্তরাত্মা সেদিন হবে ঘন-স্পন্দিত,
৮. দৃষ্টিগুলি তাদের সেদিন হবে অবনমিত।
৯. বলছে তারা (ব্যঙ্গসুরে) “আমরা কি গো পুনর্বার
১০. জীর্ণ অস্থি হবার পরেও পূর্বজীবন পথে আর
১১. (বিতাড়িত হব)। ওহো, তবে বড়ই ক্ষতিকর
১২. হবে ত সে জীবন পাওয়া।” একটি মাত্র তাড়নায়
১৩. প্রান্তর-ভূমিতে তারা অমনি হাজির হবে, হায়!
১৪. তোমার কাছে পৌঁছেনি কি মুসার সেই সে বিবরণ?
১৫. তাহার প্রভু যখন তারে করিলেন সেই সম্বোধন
১৬. পূত “তোওয়া প্রান্তরে” ফেরাঊনের বরাবর,
১৭. উশৃঙ্খল হয়েছে সে। বলবে তারে অতঃপর,-
১৮. তুমি পাক হতে কি চাও? দেখাইয়া দিই তোমায়
১৯. তোমার প্রভুর দিকের পন্থা, চলবে হে ভয় করে তায়।”
২০. (পরে) মুসা দেখাল তায় শ্রেষ্ঠতম নিদর্শন,
২১. সে সত্যরে মিথ্যা বলে লইল না তা (ফেরাঊন)।
২২. প্রবৃত্ত সে হইল কুচেষ্টায় যে অতঃপর,
২৩. ঘোষণা সে করিল ফলে জুটিয়ে (বহু লস্কর),
২৪. বলিল তখন, “আমিও ত পরম প্রভু তোদের রে!”
২৫. ইহকাল আর পরকালের শাস্তি দিতে চাই তারে
২৬. ধৃত করিলেন আল্লাহ। ভয় রাখে যে তাঁর তরে
২৭. বিশেষ করে জানার উপদেশ আছে (কোরান ভরে)।
২৮. তোমাদের কি সৃষ্টি অধিক কঠিন? না ঐ আকাশের?
২৯. সৃজিয়া তায় ঊর্ধ্বকে তার করিলেন সুউচ্চ ফের।
৩০. ঠিক-ঠাক তায় দিলেন করে। রজনীকে তিমির-ময়
৩১. করলেন (দূর করে তাহার আলোকরাশি সমুদয়)।
৩২. প্রসারিত করলেন এই ধারায় তিনি অতঃপর
৩৩. তাহার থেকে করলেন বাহির পানি এবং চারণ-চর।
৩৪. (তোমাদের ও তোমাদের পশুর উপকার তরে)
৩৫. প্রতিষ্ঠিত করলেন ঐ শৈলমালা উপরে।
৩৬. সে মহাবিপদ আসবে যে দিন অতঃপর,
৩৭. অর্জন সে করেছে কি বুঝতে পারবে সেদিন নর।
৩৮. দর্শকে দেখানোর তরে দোজখ হবে সুপ্রকাশ,
৩৯. লঙ্ঘন যে করে বিধি পার্থিব জীবনের আশ-
৪০. মুখ্যভাবে যে জন করে তার স্থিতিস্থান দোজখ পরে।
৪১. কিন্তু প্রভুর সম্মুখে তার দাঁড়াবার যে ভয় রাখে,
৪২. নীচ যত প্রবৃত্তি হতে মুক্ত রাখে আত্মাকে,
৪৩. ফলে- (হবে) নিশ্চয় ঐ বেহেশ্ত্ তাহার স্থিতিস্থান!
৪৪. জিজ্ঞাসিছে ওরা হবে কখন তাহার অধিষ্ঠান,
৪৫. সেই মুহূর্ত আসবে কবে? তুমি আলোচনায় সেই
৪৬. (ব্যস্ত) আছ? তার নিরূপণ তোমার প্রভুর নিকটেই।
৪৭. – যে সব লোকে ভয় রাখে সেই মুহূর্তের
৪৮. তুমি কেবল করতে পার সাবধান সে তাহাদের
৪৯. (করবে মনে সে দিন তারা) দেখবে যখন সেই সে খন,
৫০. রয়নি তারা এক সাঁঝ বা এক প্রভাতের অধিক্ষণ।
সূরা নাযি’আত মক্কা শরীফে অবতীর্ণ হয়। এখানে ৪৬টি আয়াত, ১৮১টি শব্দ ও ৮৯১টি অক্ষর আছে। এ সূরায় অনন্ত শক্তিময় আল্লাহর শক্তির কথা আর পরকাল ও পুনর্জীবন প্রভৃতির বর্ণনা দ্বারা মানুষকে সাবধান করে দেওয়া হয়েছে। মানুষ যেন নিজের মনকে নীচ প্রবৃত্তি হতে নিবৃত্ত রাখে এবং ক্ষণস্থায়ী পার্থিব জীবনের সুখ-লালসার নিমিত্ত যেন পরকালের অনন্ত জীবনের অনন্ত সুখের পথ বিনষ্ট না করে। পরকালের প্রতি লক্ষ্য রাখার ইঙ্গিত দেওয়ার জন্যই এ সূরা অবতীর্ণ হয়েছে।

সূরা নাবা’
(৪০টি আয়াত, ২ রুকু, মক্কী)

শুরু করি লয়ে নাম খোদার
করুণাময় ও কৃপা-আধার।

১. পরস্পরে জিজ্ঞাসাবাদ করছে তারা কোন বিষয়?
২. সেই সে মহান খবর লয়ে যাতে সে ভিন্নমত হয়?
৩. না, না, তারা জানবে ত্বরায়, জানবে, কই আবার
৪. করিনি কি শয্যারূপে নির্মাণ আমি এই ধরার?
৫. কীলক স্বরূপ করিনি স্থাপিত ঐসব পাহার?
৬. যোড়ায় যোড়ায় তোমাদের সৃষ্টি করেছি আবার।
৭. বিরাম লাগি’ দিয়াছি ঘুম, রাত তোমাদের আবরণ,
৮. করিয়াছি জীবিকার তরে দিবসের সৃজন।
৯. নির্মিয়াছি দৃঢ় সপ্ত (আকাশ) ঊর্ধ্বে তোমাদের
১০. করিয়াছি প্রস্তুত এক প্রদীপ্ত সে প্রদীপ ফের,
১১. বর্ষণ করেছি সলিল মেঘ হতে মুষলধারায়,
১২. কারণ আমি জন্মাব যে উদ্ভিদ ও শস্য তায়
১৩. এবং গহন কানন-রাজি। আছে আছে সুনিশ্চয়,
১৪. মীমাংসা সে অবধারিত যেদিন সে ভেরী প্রলয়
১৫. উঠবে বেজে; শুনে তাহা তোমরা সবে দলে দল
১৬. সমাগত হবে; এবং খোলা হবে গগন-তল,
১৭. তাহার ফলে হয়ে, যাহে সেদিন তাহা বহুদ্বার,
১৮. সঞ্চালিত করা হবে পাহাড় সবে; ফলে তার
১৯. মরীচি-বৎ হবে তারা। দোজখ আছে অপেক্ষায়,
২০. সুনিশ্চয়; অবাধ্য যারা তাদের বাসস্থান তাহায়।
২১. সেই খানেতে করবে তারা বহু, “হোক্রা” অবস্থান!
২২. পাবে না কো সেখানে তারা স্নিগ্ধ স্বাদ এবং পান
২৩. করতে নাহি পাবে কিছু, যেমন কর্ম তেমনি ফল,
২৪. পাবে সলিল উষ্ণ ভীষণ কিম্বা দারুণ সুশীতল।
২৫. হিসাব নিকাশ আশা তারা করতো না কো সুনিশ্চয়,
২৬. মিথ্যার আরোপ করেছিল নিদর্শন সে সমুদয়।
২৭. দেখতে আমার ওরা সবে হঠকারিতা করেই
২৮. অথচ রেখেছি গুণে গুণে প্রতি বস্তুকেই
২৯. সুতরাং এবার মজা দেখ! এখন কেবল যাতনাই
৩০. বাড়িয়ে দিতে থাকব আমি, তোমাদিগের
৩১. – (রেহাই নাই)!
৩২. সংযমী লোক সবার তরেই সফলতা সুনিশ্চয়,
৩৩. প্রাচীর ঘেরা কাননরাজি এবং আঙ্গুর (সেথায় রয়)।
৩৪. সমান বয়েস তরুণীদল, পানপাত্র পরের পর
৩৫. আসবে সেথা পূর্ণ এবং পবিত্র (অমৃত ভর)।
৩৬. শুনতে নাহি পাবে তারা মিথ্যা প্রলাপ সেই সে স্থান
৩৭. বিনিময়ে তোমার প্রভুর থেকে তাই যথেষ্ট দান।
৩৮. ভূলোক ও দ্যুলোকের যিনি সকল-কিছুর অধীশ্বর,
৩৯. করুণাময় যিনি তাহার কেহই সেদিন তাঁহার পর
৪০. হবে না কো অধিকারী সম্বোধন করিতে তার।
৪১. জিব্রাইল আর ফেরেশ্তারা দাঁড়াবে সব দিয়ে সা’র
৪২. সেদিন তারা কইতে নারবে কোন কথা; কিন্তু যার
৪৩. মিলবে আদেশ কৃপা-নিধান খোদার কাছে বলবে সে
৪৪. সঙ্গত সে কথা। উহাই নিশ্চিত দিন সত্য যে সে।
৪৫. সুতরাং যার ইচ্ছা হয়
৪৬. আপন প্রভুর কাছে এসে গ্রহণ করুক সে আশ্রয়।
৪৭. অনাগত শান্তি সে কি, তার বিষয়
৪৮. সাবধান করেছি আমি তোমাদের সুনিশ্চয়।
৪৯. দেখতে পাবে সেদিন মানুষ পাঠাল দুই হস্ত তার
৫০. কোন্ সম্বল আগের থেকে! বলতে থাকবে কাফের
৫১. – আর (ভাগ্যহত আমি হায়)!
৫২. হতাম যদি মাটি- (ছিল শান্তি তায়)!
সূরা নাবা’ মক্কা শরীফে অবতীর্ণ হয়। এখানে ৪০টি আয়াত, ১৭৪টি শব্দ ও ৮০১টি অক্ষর আছে। শানে নজুলে কবি নজরুল বলেন, হযরত রাসুল (সা.) প্রথম যে সময়ে লোকদের ইসলামের দিকে আহ্বান করে পবিত্র কুরআনের বাণী শুনাতেন ও কেয়ামতের ভীতিপ্রদ সংবাদ বর্ণনা করতেন সে সময় বিধর্মীরা পবিত্র কুরআন ও কেয়ামত সম্বন্ধে তর্ক বিতর্ক করত আর একে অপরের নিকট ঐ সকল বিষয় সম্বন্ধে নানারূপ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করত। তখন এ সূরা নাজিল হয়।

পবিত্র কুরআনের বাংলা পদ্যানুবাদ নজরুলের অনন্য সাহিত্য কর্ম। মুসলমান সমাজের বাস্তব অবস্থা প্রত্যক্ষ করে কবি বলেন- “ইসলাম ধর্মের মূলমন্ত্র – পুঁজি ধণরত্ন- মণি মাণিক্য সবকিছু – কোরআন মজীদের মণি-মঞ্জুসায় ভরা, তাও আবার আরবী ভাষায় চাবি দেওয়া। আমরা- বাঙালী মুসলমানেরা তা নিয়ে অন্ধ ভক্তি ভরে কেবল নাড়াচাড়া করি। ঐ মঞ্জুসায় যে কোন্ মণিরত্নে ভরা, তার শুধু আভাষটুকু জানি।” ১৯৩৩ সালে নজরুলের ‘কাব্যে-আমপারা’ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এখানে তিনি ৩৮টি সূরার পদ্যানুবাদ করেন। পবিত্র কুরআনের একটি শব্দও পরিবর্তন না করে তার মূল ভাব অক্ষুন্ন রেখে কবিতায় সঠিক অনুবাদ করা অত্যন্ত কঠিন। পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি আছে কিনা জানা নেই। মূল অর্থকে বিকৃত না করে কাব্য সৌন্দর্যে পবিত্র কুরআনের অনুবাদ একমাত্র তাঁর দ্বারাই সম্ভব যিনি প্রভু ও তাঁর বাণীকে হৃদয়ে ধারণ করতে পেরেছেন। মহান আল্লাহ্ ও দয়াল রাসুল (সা.)-কে নিয়ে কবি নজরুলের রচিত প্রায় চার শতাধিক প্রেম সঙ্গীতে কবি আল্লাহ্ তায়ালা ও তাঁর প্রিয় হাবিবকে কিভাবে ভালোবাসতে হবে তা আমাদের দেখিয়ে দিয়েছেন। তিনি তাঁর কবিতা ও গানের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করেছেন ধর্মের মূল সুর প্রেম।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here