পবিত্র কুরআনের বাংলা পদ্যানুবাদ ও নজরুল

1
369
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ।

মুহাম্মদ জহিরুল আলম, পিএইচডি গবেষক
মহাগ্রন্থ পবিত্র কুরআন বিশ্বের অমূল্য সম্পদ, যা মানবজাতির জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। দয়াল রাসুল হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মাতৃভাষা আরবি, তিনি এ ভাষাতেই কথা বলতেন, তাই কুরআন শরীফ দয়াময় আল্লাহ্ আরবি ভাষায় নাজিল করেন। যেহেতু পবিত্র কুরআনের ভাষা আরবি, তাই যাদের মাতৃভাষা ভিন্ন তাদের কাছে তা সহজে বোধগম্য হয় না। তাই প্রয়োজন পড়ে মাতৃভাষায় অনুবাদ করার। পবিত্র কুরআন পাঠের মাধ্যমে মানুষ যাতে আল্লাহ্র বাণী সহজেই বুঝতে পারে সে প্রচেষ্টা দীর্ঘদিনের। এ ক্ষেত্রে বাংলা সাহিত্যের অনন্য সংযোজন কাজী নজরুল ইসলামের পবিত্র কুরআন শরীফের বাংলায় পদ্যানুবাদ।

কবি নজরুল বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী একজন সৃষ্টিশীল সাহিত্যিক। সাহিত্য ও সংঙ্গীত-সহ বিভিন্ন অঙ্গনেই তাঁর সৃষ্টিশীলতার নিদর্শন দেখতে পাই। তাঁর অনন্য সাধারণ কাব্যানুবাদ রয়েছে। তিনি ‘রুবাইয়াৎ-ই-হাফিজ’, ‘রুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম’ ফারসি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেন। কবির বড়ো সাধ ছিল কুরআন শরীফের বাংলায় পদ্যানুবাদ করা। তিনি কুরআন শরীফের অর্থ অবিকৃত রেখে বাংলায় অনুবাদ করেন। ১৯৩৩ সালে কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘কাব্যে-আমপারা’ প্রকাশিত হয়। কবি বলেন, “আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সাধ ছিল ‘কোরআন’ শরীফের বাঙলা পদ্যানুবাদ করা। সময় ও জ্ঞানের অভাবে এতদিন তা ক’রে উঠতে পারিনি। বহু বৎসরের সাধনার পর খোদার অনুগ্রহে অন্ততঃ প’ড়ে বুঝবার মতও আরবী-ফার্সি ভাষা আয়ত্ব করতে পেরেছি ব’লে নিজেকে ধন্য মনে করছি। কোরআন শরীফের মত মহাগ্রন্থের অনুবাদ করতে আমি কখনো সাহস করতাম না বা তা র্কবার দরকার হ’ত না- যদি আরবী ও বাঙলা ভাষার সমান অভিজ্ঞ কোন যোগ্য ব্যক্তি এদিকে অবহিত হতেন।” অত্যন্ত সাবলীল ভাষায় কবি পবিত্র কুরআন শরীফের বাংলা অনুবাদের প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করেন। তিনি এ অভাব মোচনের জন্য অগ্রসর হয়ে ‘কাব্যে-আমপারা’ রচনা করেন।
নাম সর্বস্ব মুসলমান হয়ে আমরা শান্তির ধর্ম ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা হতে দূরে সড়ে পড়েছি। কবি নজরুল অনেক আগেই তা উপলব্ধি করেছেন। মুসলমান সমাজের বাস্তব অবস্থা প্রত্যক্ষ করে কবি বলেন, “ইসলাম ধর্মের মূলমন্ত্র – পুঁজি ধনরত্ন- মণি মাণিক্য সবকিছু – কোরআন মজীদের মণি-মঞ্জুসায় ভরা, তাও আবার আরবী ভাষায় চাবি দেওয়া। আমরা- বাঙালী মুসলমানেরা তা নিয়ে অন্ধ ভক্তিভরে কেবল নাড়াচাড়া করি। ঐ মঞ্জুসায় যে কোন্ মণিরত্নে ভরা, তার শুধু আভাষটুকু জানি। আজ যদি আমার চেয়ে যোগ্যতর ব্যক্তিগণ এই কোরআন মজীদ, হাদিস, ফেকা প্রভৃতির বাঙলা ভাষায় অনুবাদ করেন, তাহ’লে বাঙালী মুসলমানের তথা বিশ্ব-মুসলিম সমাজের অশেষ কল্যাণ সাধন করবেন। অজ্ঞান-অন্ধকারের বিবরে পতিত বাঙালী মুসলমানদের তাঁরা বিশ্বের আলোক অভিযানের সহযাত্রী করার সহায়তা করবেন। সে শুভ দিন এলে আমার মত অযোগ্য লোক এ বিপুল দায়িত্ব থেকে সানন্দে অবসর গ্রহণ করবে।” মূলত ইসলামের প্রকৃত জ্ঞান না থাকলে পবিত্র কুরআন শরীফের মর্মবাণী উপলব্ধি করা সত্যই কঠিন। আমরা লক্ষ্য করি নজরুল চেয়েছেন- কুরআন শরীফ যদি সরল বাংলা পদ্যে অনূদিত হয় তাহলে অধিকাংশ মুসলমানই সহজে কন্ঠস্থ করতে পারবেন এবং অনেক ছোটো বালক-বালিকা সহজে মুখস্ত করতে পারবে।

কবি এক দিকে পবিত্র কুরআনের আক্ষরিক অনুবাদ করেছেন, অন্যদিকে শিল্পরূপ বজায় রেখেছেন। বিষয়টি অত্যন্ত কঠিন। এখানে শব্দ, ছন্দ ও ধ্বনির ব্যবহারে তাঁর কাব্য সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে। সত্যিই তিনি অনন্য সাধারণ। সাহিত্যের রসবোধ প্রকাশের পাশাপাশি তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিকট পবিত্র কুরআনের প্রকৃত বাংলা তাফসীরের প্রয়োজনীয়তা প্রকাশ করেছেন। তিনি ‘কাব্যে-আমপারা’ গ্রন্থে ৩৮টি সূরার বাংলা পদ্যানুবাদ করেন। তার মধ্যে এখানে কয়েকটি সূরা পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

সূরা ফাতেহা
(৭ টি আয়াত ও ১টি রুকূ, মক্কী)
(শুরু করিলাম) লয়ে নাম আল্লার,
করুণা ও দয়া যাঁর অশেষ অপার।

১। সকলি বিশ্বের স্বামী আল্লাহ্র মহিমা,
২। করুণা কৃপার যাঁর নাই নাই সীমা।
৩। বিচার-দিনের বিভু! কেবল তোমারি
৪। আরাধনা করি আর শক্তি ভিক্ষা করি
৫। সরল সহজ পথে মোদের চালাও,
৬। যাদের বিলাও দয়া সে পথ দেখাও।
৭। অভিশপ্ত আর পথভ্রষ্ট যারা, প্রভু।
৮। তাহাদের পথে যেন চালায়ো না কভু।

সূরা ফাতেহা মক্কা শরীফে অবতীর্ণ হয়েছে। এতে ৭টি আয়াত, ২৫টি শব্দ, ১২৩টি অক্ষর ও ১টি রুকূ রয়েছে। এর অপর নাম ‘সাবাউল মোসানী’। ‘সাবা’ অর্থ সাত; ‘মোসানী’ অর্থ পুন:পুন। ফাতেহা – উদ্ঘাটিকা । নজরুল উল্লেখ করেন, এ সূরা দিয়েই পবিত্র কুরআন শুরু। এ জন্য এ সূরার নাম ফাতেহা। যার অর্থ শুরু বা প্রারম্ভ। নামাজ, বন্দেগি, প্রার্থনা প্রভৃতি সকল পবিত্র কাজেই সুরা ফাতেহার প্রয়োজন হয় বলে আমপারার সঙ্গে এর অনুবাদ দেওয়া হল। কবি সূরাটি অবতীর্ণ প্রসঙ্গে শানে নজুল উল্লেখ করেন, একদিন হযরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কার প্রান্তর অতিক্রম করার সময় দৈববাণী শুনতে পেলেন যে, ‘‘আমি স্বর্গীয় দূত জিব্রাইল, আপনি পয়গম্বর, আমি শপথ করছি আল্লাহ্ ভিন্ন আর কোনো উপাস্য নাই, মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহ্র রাসুল। আপনি বলুন আলহামদুলিল্লাহ্, সকল প্রশংসাই আল্লাহ্র।” (তাফসীরে আজিজী ও তাফসীরে মাজহারী) অর্থ বিকৃত না করেও অত্যন্ত দক্ষতার সাথে নজরুল শব্দ ব্যবহার করেন। তিনি কুরআন শরীফের প্রথম বাক্যটির ‘প্রশংসার’ জায়গায় ‘মহিমা’, দ্বিতীয় লাইনে ‘দয়াময় ও দয়ালু’র স্থানে অপরিসীম কৃপার, ‘ইবাদতের’ জায়গায় ‘আরাধনার’, ‘ক্রোধ নিপতিত’র স্থানে ‘অভিশপ্ত’ উল্লেখ করেছেন।

সূরা নাস
(৬টি আয়াত ও ১টি রুকূ, মাদানী)

শুরু করিলাম লয়ে নাম আল্লার,
করুণা ও দয়া যাঁর অশেষ অপার।
১। বল, আমি তাঁর কাছে মাগি গো শরণ
২। সকল মানবে যিনি করেন পালন।
৩। কেবল তাঁহারি কাছে,- ত্রিভুবন মাঝ
৪। সবার উপাস্য যিনি রাজ-অধিরাজ।
৫। কুমন্ত্রণাদানকারী “খান্নাস” শয়তান
৬। মানব দানব হতে চাহি পরিত্রাণ।

সুরা নাস মদীনা শরিফে অবতীর্ণ, এতে ৬টি আয়াত, ২০টি শব্দ, ৮১টি অক্ষর ও ১টি রুকু আছে। ‘নাস’ অর্থ ‘মানুষ’, ‘খান্নাস’ মানে ‘কুমন্ত্রণাদাতা’। নজরুল ‘মানুষের অধিপতি’ এবং ‘মানুষের ইলাহের’ স্থানে করেছেন রাজ-অধিরাজ যিনি ত্রিভুবন মাঝে সবার উপাস্য। এতে স্রষ্টার মহিমা বেশি প্রকাশিত হয়েছে। শয়তান যেমন কুমন্ত্রণা দেয়, তেমনি কুমন্ত্রণা জিন এবং মানুষের মধ্য থেকেও হয়। তাই তিসি খান্নাছ বা কুমন্ত্রণাদাতার স্থলে ‘খান্নাছ শয়তান’ এবং জিন বা মানুষের স্থানে মানব-দানব উল্লেখ করেন।

সুরা ফালাক
(৫টি আয়াত ও ১টি রুকূ, মাদানী)

শুরু করিলাম লয়ে নাম আল্লার,
করুণা ও দয়া যাঁর অশেষ অপার।
১। বল, আমি শরণ যাচি ঊষা-পতির,
২। হাত হতে তার – সৃষ্টিতে যা আছে ক্ষতির।
৩। আঁধার ঘন নিশীথ রাতের ভয় অপকার –
৪। এ সব হতে অভয় শরণ যাচি তাঁহার।
৫। যাদুর ফুঁয়ে শিথিল করে (কঠিন সাধন)
৬। সংকল্পের বাঁধন, যাচি তার নিবারণ।
৭। ঈর্ষাতুরের বিদ্বেষ যে ক্ষতি করে।
৮। শরণ যাচি, পানাহ্ মাগি তাহার তরে।

সুরা ফালাক মদীনা শরীফে অবতীর্ণ হয়। এতে ৫টি আয়াত, ২৩টি শব্দ, ৭৩টি অক্ষর ও ১টি রুকু আছে। অনুবাদটি কাব্যিক সৌন্দর্যে ফুটে উঠেছে। ‘ফলক’ শব্দের অর্থ- ঊষা, প্রাত:কাল। ‘ঊষার স্রষ্টার’ স্থলে কবি লিখেছেন ‘ঊষা পতির’। “অনিষ্ট হইতে রাত্রির অন্ধকারের। যখন উহা গভীর হয়” বাক্যটি সংহত করে লিখেছেন “ আঁধার ঘন নিশীথ রাতের ভয় অপকার”। রমণীদের প্রসঙ্গ উহ্য রেখে জাদুর কুফলের প্রসঙ্গটি বিশ্লেষণ করেছেন। ‘হিংসুকের হিংসা’র পরিবর্তে ব্যবহার করেছেন ‘ঈর্ষাতুরের বিদ্বেষ’।

‘সুরা নাস’ ও ‘সুরা ফালাক’ একই সাথে অবতীর্ণ হয়েছে। নজরুল শানে নজুলে এ প্রসঙ্গটি এখানে উল্লেখ করেন – মদীনা শরীফের অধিবাসী লবিদ নামক ইহুদির কয়েকজন কন্যা ছিল। তারা নবি করিম (সা.)-এর মাথার কিছু চুল ও চিরুনীর কয়েকটি দাঁতের উপর যাদুমন্ত্র পাঠ করে এগারটি গ্রন্থি দিয়েছিল এবং প্রতিটি খোর্মা মুকুলের মধ্যে রেখে ‘যোরআন’ নামক কূপের তলদেশে পাথর চাপা দিয়ে রাখে। যাদুর প্রভাবে হযরত রাসুল (সা.)-এর শরীর এরূপ অসুস্থ হয়েছিল যে, তিনি যে কাজ করেননি তাও করেছেন বলে কখনো কখনো মনে হতো। ছয় মাস পর এক রাতে স্বপ্নে তিনি এর কারণ জানতে পারেন। সকালে হযরত আলী (রা.), হযরত আম্মার (রা.), হযরত জোবায়ের (রা.)-কে ‘যোরআন’ কূপের নিকট প্রেরণ করেন। তাঁরা কূপের তলদেশ হতে ঐসকল দ্রব্য তুলে হযরত রাসুল (সা.)-এর নিকট হাজির করেন। তখন ‘সুরা ফালাক’ ও ‘সুরা নাস’ এই দুটি সূরা নাজিল হয়। দুই সূরায় এগারটি আয়াত আছে,। বিশ্বনবি হযরত রাসুল (সা.) এক এক করে ক্রমান্বয়ে এগারটি আয়াত পাঠ করলেন এবং এগারটি গ্রন্থি খুলে গেল। হযরত রাসুল (সা.) সম্পূর্ণরূপে রোগ হতে মুক্তি লাভ করলেন। (এনাম এবনে কছির, জালালায়ন, কবীর)।

যাদুমন্ত্রের প্রভাবে রাসুল (সা.)-এর অসুস্থতার ব্যাপারটি সবার কাছে স্পষ্ট ছিল না, এ সম্পর্কেও কবি সচেতন ছিলেন। কবি বলেন, যাদু মন্ত্রের দ্বারা মানুষের শারীরিক ক্ষতি হওয়া অসমীচীন নয়; কিন্তু সর্বশ্রেষ্ঠ মহাপুরুষ যাদুমন্ত্রের প্রভাবে স্বর্গীয় আদেশ প্রচারের কালে বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়লেন এরূপ ধারণা বাতুলতা মাত্র। তাই তিনি কবির ও হাক্কানীর মতামতটিও তুলে ধরেন।

(চলবে)

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here