পবিত্র রমজানের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

6
560

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান মিয়া
মানবজাতি মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিনের সর্বোত্তম সৃষ্টি, আশরাফুল মাখলুকাত। আঠার হাজার মাখলুকাতের মধ্যে শুধু এ জাতিকেই আল্লাহ্ তায়ালা সৃষ্টির সেরা বা ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। প্রতিটি মাখলুকই আল্লাহর ইবাদতে রত থাকে। আমরা আল্লাহর বান্দা। একমাত্র তাঁর ইবাদত করার জন্য আমাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে- ‘‘আমি জিন ও মানবজাতিকে আমার ইবাদত ব্যতীত অন্য কোনো উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করিনি।’’

আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিনের হুকুম-আহ্কামকে যথাযথভাবে পালন করার নামই ইবাদত। যারা পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর ইবাদত করে, তারাই প্রকৃত মু’মিন। আল্লাহর মনোনীত দ্বীন (ধর্ম) পবিত্র ইসলাম, যা মানব জাতির কল্যাণের জন্য দুনিয়ার বুকে কায়েম হয়েছে। পাঁচটি মুলনীতির উপর এই ইসলাম প্রতিষ্ঠিত। তার মধ্যে রোজা অন্যতম।

রোজা কী?
‘রোজা’ ফারসি শব্দ। আরবিতে ‘সওম’ বলা হয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে বিরত থাকা বা বিরত রাখা। বহুবচনে সিয়াম। আল্লাহর নির্দেশ পালন করার মানসে নিয়তের সাথে সুবহে সাদেক হতে সূর্র্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও কামাচার হতে বিরত থাকার নাম রোজা। রমজ ধাতু হতে রমজান শব্দের উৎপত্তি। ‘রমজ’ শব্দের অর্থ হচ্ছে জ্বালিয়ে দেওয়া। আগুন যেমন স্বর্ণের খাদ জ্বালিয়ে দিয়ে খাঁটি স্বর্ণকে আলাদা করে ফেলে, রোজাও তদ্রুপ রোজাদার ব্যক্তির সমস্ত গুনাহ জ্বালিয়ে দিয়ে শিশুর মতো নিষ্পাপ করে তোলে এবং যাবতীয় পাপের কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখে। হযরত রাসুল (সা.) ফরমান, ‘‘আস সিয়ামু জুন্নাতুন।” অর্থাৎ- ‘‘রোজা ঢালস্বরূপ।’’ যুদ্ধক্ষেত্রে ঢাল যেমন শত্রুর আক্রমণ থেকে সৈনিককে রক্ষা করে, তেমনি রোজা মানুষকে কুরিপুর বেড়াজাল থেকে এবং পাপের কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখে। মোটকথা, কৃপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার যুদ্ধে রোজা মানুষের জন্য ঢালের ন্যায় কাজ করে।

রমজান মাসের রোজা রাখা প্রতিটি মুসলিম নর-নারীর জন্য ফরজ। কেননা, রোজা মানুষের কু-প্রবৃত্তিকে সংযত রাখার ক্ষমতা দান করে মানুষকে শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদায় সমাসীন করে তোলে। এ পৃথিবী সৃষ্টি হওয়ার প্রথম থেকেই সকল জাতির জন্য রোজা ফরজ করা হয়েছিল। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ ঘোষণা করেন: “হে বিশ্বাসীগণ তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী (উম্মত)দের উপর, যাতে তোমরা সংযমী হও। (সূরা বাকারাহ ২ : আয়াত ১৮৩)

রোজার উদ্দেশ্য :
মানুষের মধ্যে সংযম সাধনা, আত্মশুদ্ধি, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি করা, এক কথায় খোদা-ভীতি অর্জন করাই রোজা পালনের উদ্দেশ্য। কেননা রোজার দিবসে মুসলমানগণ আল্লাহ্র আদেশে এবং তাঁরই সন্তুষ্টির জন্য স্বেচ্ছায় পানাহার পরিত্যাগ করে। বিষ পান করলে যেরূপ বাহ্যিক জীবনের অবসান ঘটে, তদ্রূপ পাপ কাজ করলে মানবতার অপমৃত্যু ঘটে, আত্মা কুলষিত হয়ে যায়। তাই পবিত্র রমযান মাসে পানাহার ও কামাচার থেকে বিরত ষড়রিপুকে দমন, ধৈর্য ও সংযম সাধনাই রোজার লক্ষ্য। প্রকৃতপক্ষে, রোজার দ্বারা কামনা-বাসনা পরিত্যাগ করে সংযমী হয়ে মনের যাবতীয় কু-খেয়াল দূরীভূত করে নিষ্কলুস জীবন যাপন করাই রোজার প্রধান উদ্দেশ্য।

রোজার উপকারিতা :
রোজা মানুষের দৈহিক ও আত্মিক উন্নতি সাধন করে থাকে। রোজার দ্বারা মানুষের আত্মার পবিত্রতা ও চিন্তা শক্তির প্রখরতা বৃদ্ধি পায়। এ কারণেই মণীষীগণ উপবাস থাকেন এবং সূফীসাধকগণ রোজা পালন করে থাকেন। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে, রোজা মানব দেহকে সবল ও সতেজ করে তোলে।

ডা. সলোমন তার গার্হস্থ্য ও স্বাস্থ্যবিধি নামক গ্রন্থে মানব দেহকে ইঞ্জিনের সাথে তুলনা করে বলেন : ইঞ্জিনকে‘ মাঝে মাঝে ডকে নিয়ে চুল্লি হতে ছাই ও অঙ্গার সম্পূর্ণ নিষ্কাশিত করা যেমনটা আবশ্যক- উপবাস দ্বারা মাঝে মাঝে পাকস্থলী হতে অজীর্ণ খাদ্য নিষ্কাশিত করাও তেমনটা দরকার।

রোজার ফজিলত :
রোজার ফজিলত অপরিসীম। প্রত্যেক মুসলমানেরই এ ব্যাপারে পূর্ণ জ্ঞান থাকা বাঞ্ছনীয়। এর ফজিলত বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কালামে ফরমান : “তোমাদের মধ্যে যে সেই মাস (রমজান)-কে পায়, সে যেন রোজা রাখে’ (সূরা বাকারাহ ২ : আয়াত ১৮৫)। রোজা আল্লাহর নিকট অতীব প্রিয়। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ্ তায়ালা ফরমান : “রোজা আমারই জন্য এবং আমিই তার প্রতিদান।” যেহেতু, রোজা স্বয়ং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, সেহেতু তিনি তার একটি মূল্যবান পুরস্কার নিশ্চয়ই প্রদান করবেন। তবে শর্ত হলো- রোজা আল্লাহর দরবারে কবুল হতে হবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে, আমরা যে রোজা পালন করি তা আল্লাহ্র দরবারে পৌঁছে কিনা সন্দেহ। কারণ, আমরা রোজাও রাখি এবং রোজা থাকা অবস্থায় নিষিদ্ধ কাজগুলোও করি। তাহলে আমাদের রোজা দ্বারা আর কোনো ফল লাভ হয় না।

রমজানের রোজা পালনকালে অনেক রোজাদার নানাবিধ মিথ্যাচারের আশ্রয় নেয়। তাতে রোজা পূর্ণাঙ্গভাবে পালন করা হয় না। এ প্রসঙ্গে হযরত রাসুল (সা.) ফরমান, ‘‘যে ব্যক্তি রোজা রেখে ও মিথ্যা কথা ও মিথ্যাচার ত্যাগ করে না, তার রোজা রাখতে আল্লাহ্র কোনো প্রকার আগ্রহ নেই।’’

রোজার ফজিলত বর্ণনা করতে গিয়ে রাসুলে খোদা (সা.) ফরমান, হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে- রাসুলুল্লাহ্ (সা.) বলেন, ‘‘মানব সন্তানের নেক আমল বাড়ানো হয়ে থাকে। প্রত্যেক নেক আমল দশগুণ হতে সাতশত গুণ পর্যন্ত (বাড়ানো হয়)। আল্লাহ্ ফরমান, রোজা আমারই জন্য এবং আমিই উহার প্রতিফল দান করবো। সে (রোজাদার) আমারই জন্য আপন প্রবৃত্তি ও খানাপিনা ত্যাগ করে। রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট মেশকের খোশবু অপেক্ষাও অধিক সুগন্ধময়’’ (বোখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফ)
হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) হতে বর্ণিত, ‘রমজানের প্রথম রাতে আসমান এবং বেহেস্তের দরজা খুলে দেওয়া হয় এবং রমজানের শেষ না হওয়া পর্যন্ত বন্ধ করা হয় না। যদি কোনো মোমেন পুরুষ বা মহিলা শুদ্ধ অন্তকরণে এই সব রাতে নামাজ পড়ে তবে প্রত্যেক সেজদার পরিবর্তে এক হাজার সাতশত পূণ্য দান করা হয়। যখন কোনো বান্দা রমজানের প্রথম রোজা রাখে এবং খালেস নিয়তে তওবা করে, আল্লাহ্ রমজানের শেষ পর্যন্ত তার সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দেন। প্রত্যেকটি রোজার পরিবর্তে সত্তর হাজার দরজা বিশিষ্ট এক একটি প্রাসাদ তার জন্য তৈরি করা হয়। সকাল হতে সন্ধ্যা পর্যন্ত সত্তর হাজার ফেরেশতা তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকেন। সে রাতদিনে যত সেজদা করে এর প্রত্যেক সেজদার পরিবর্তে এমন এক একটি গাছ দান করা হবে, যার ছায়ায় কোনো অশ্বারোহী শত বছর অশ্ব পরিচালনা করলেও সেই ছায়ার শেষ সীমার পৌঁছতে পারবে না।’’

হাকিকতে রোজা কাকে বলে?
পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকেই মানুষ রোজা পালন করে আসছে। কিন্তু প্রকৃত রোজা ক’জন লোকের আদায় হচ্ছে? অলী-আল্লাহ্গণ রোজাকে আত্মশুদ্ধি এবং মুক্তির উপায় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

রোজা সাধারণত : দুই শ্রেণীর। যথা- ১। দেহের রোজা বা জাহেরি রোজা, ২। আত্মার রোজা বা বাতেনি রোজা
১। দেহের রোজা বা জাহেরি রোজা দ্বারা দেহের যাবতীয় রোগব্যাধি দুরীভূত হয় এবং মানুষের কাছেও রোজাদার বলে প্রমাণিত হয়। কিন্তু আত্মার রোজা বা বাতেনি রোজা দ্বারা বাতেনি ইন্দ্রিয়গুলো কুরিপূ থেকে মুক্তি লাভ করে। আত্মিক রোজা দ্বারা মানুষের আত্মার পবিত্রতা ও চিন্তা শক্তির প্রখরতা বেড়ে যায়। সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ হয় এবং অজানা ও অব্যক্ত প্রেমে হৃদয়-মন ভরে ওঠে। প্রকৃত মালিক অর্থাৎ আল্লাহ্র সাথে যোগসূত্র সৃষ্টি হয়। তাই হযরত ইমাম সৈয়দ আবুল ফজল সুলতান আহমদ (রহ.) ফরমান : ‘প্রকৃত রোজার মাহাত্ম্য সংযমে, মানুষের মূল মকছুদ পুরা হয় আত্মশুদ্ধি লাভে। যতক্ষণ পর্যন্ত এই আত্মশুদ্ধি না ঘটে, ততক্ষণ পর্যন্ত নিয়ত শুদ্ধ হয় না। আর নিয়ত শুদ্ধ না হলে তার ইবাদত কবুল হয় না।’’

পবিত্র রমজান মাসের সিয়াম সাধনার মাধ্যমে আমাদেরকে আত্মশুদ্ধি লাভ করে প্রকৃত মানুষ হওয়ার চেষ্টা করতে হবে। আর এই আত্মশুদ্ধি একাকী সম্ভব নয়। এ জন্য কোনো অলী-আল্লাহর সান্নিধ্যে যেতেই হবে। তার এ কথাগুলোর মধ্যে আত্মশুদ্ধির গভীর উপদেশ নিহিত রয়েছে। হযরত রাবেয়া বসরী (রহ.) বলেছিলেন, ‘‘ওহে আমার চক্ষু। তুমি এমন অসময়ে ঘুুমিয়ে পড়ো না। কিছুদিন অপেক্ষা কর, একদিন ঘুমিয়ে যেও, যে ঘুম আর কখনও ভাঙ্গবে না, কেউ তোমাকে বিরক্ত করবে না।’

রোজা মানবজাতির জন্য একটি বাস্তব শিক্ষা। তারা যেন দীর্ঘ ১১ মাস আহার-বিহার করার পরে অন্তত: একটি মাস আল্লাহ্র সন্তুষ্টির জন্য ব্যয় করে যাতে জীবনের পাপরাশি মাফ করে নেওয়ার পথ খুঁজে পায়। ধনীরা তার একটা বাস্তব উপলব্ধি এই রোজার মাধ্যমে পেয়ে থাকে। মোটকথা, রোজা ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার বৈষম্য দূরীভুত করে সাম্য ও মৈত্রীর বন্ধন সৃষ্টি করে দেয়।

প্রকৃত অর্থে ষড়রিপু ও পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের প্রভাবমুক্ত হয়ে জীবাত্মা ও পরমাত্মার মিলন ঘটিয়ে উভয় আত্মার দ্বারা আল্লাহ্র সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে রোজা পালন করলেই সারাদিনের উপবাস সার্থক হবে এবং আমাদের রোজা প্রকৃত রোজায় পরিণত হবে। জীবাত্মা পানাহার ও ভোগবিলাস পরিত্যাগ করে আল্লাহর দরবারে আত্মসমর্পণ করবে এবং পরমাত্মা কু-রিপুসমূহ দূরীভূত ও সংযত করে আল্লাহ্র মহব্বতে নিজেকে সপে দিবে, এই রোজার মাধ্যমে। কেননা, আমরা যদি দেহের উন্নতি অপেক্ষা সূক্ষ্ম আত্মার উন্নতি সাধন করতে পারি, তাহলে আমাদের রোজা প্রকৃত রোজা বলে গণ্য হবে। আর এ মাধ্যমেই আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভ করা সম্ভব হবে।

পবিত্র রমজানের গুরুত্ব সম্পর্কে বর্ণনা করতে গিয়ে মহান সংস্কারক সূফী সম্রাট হযরত দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজানের বলেন- “কোনো পশুকে সারাদিন উপবাস রেখে সন্ধ্যায় খেতে দিলে, তাতে পশুর রোজা হবে না। কেননা, রোজা হচ্ছে মানুষের জন্য। তিনি রোজাকে ৩টি শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন। যথা- সাধারণ শ্রেণির রোজা, মধ্যম শ্রেণির রোজা এবং উচ্চ শ্রেণির রেজা বা হাকিকতে রোজা। সাধারণত অলী-আল্লাহ্গণের রোজাকে হাকিকতে রোজা বলে।

সাধারণ শ্রেণির রোজা : সারাদিন পানাহার ও কামাচার থেকে বিরত থাকা হচ্ছে সাধারণ শ্রেণির রোজা।
মধ্যম শ্রেণির রোজা : পানাহার, কামাচার এবং যাবতীয় পাপ কল্পনা থেকে মুক্ত থাকাকে মধ্যম শ্রেণীর রোজা বলে।
উচ্চ শ্রেণির রোজা বা হাকিকতে রোজা : পানাহার, কামাচার এবং যাবতীয় পাপ কল্পনা থেকে দূরে থেকে একমাত্র আল্লাহর ধ্যানে নিমগ্ন থাকাকে উচ্চ শ্রেণির রোজা বলা হয়।

রোজার উপকারিতা :
আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে- রোজার দ্বারা মানব শরীরে কোন প্রকার ক্ষতি হয় না। বরং এর দ্বারা শরীরের অতিরিক্ত মেদ কমে যায় এবং কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। তাছাড়া পাকস্থলীর পরিপাক শক্তি অনেক গুণ বেড়ে যায়।

কয়েক বছর পূর্বে ঢাকা মেডিকেল কলেজে রোজাদারের ওপর এক পরীক্ষা চালানো হয়। এতে ১৭ জন রোজাদারের পেটের রস পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে, যাদের পাকস্থলীতে এসিড খুব বেশি অথবা খুব কম, রোজার ফলে তাদের এই উভয় দোষই সেরে গেছে। এছাড়া আরও ১১ জনের হৃৎপিণ্ড অত্যাধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে (রোজার পূর্বে ও রোজার ২৫ দিন পরে) পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে, রোজা দ্বারা হৃদপিণ্ডের ক্রিয়ার কোনই ব্যতিক্রম ঘটেনি। রোজাদারের মেজাজ কিছুটা খিটখিটে হয়ে যায়, তা সামান্য পরিমাণ রক্তের শর্করা কমে যাওয়ার জন্যই হয়ে থাকে। অবশ্য স্বাস্থ্যের পক্ষে তা কোনো ক্ষতিকর নয়। তাছাড়া রোজা বিদেশ ভ্রমণে ভ্রমণকারীকে এবং যুদ্ধের ময়দানে সেনানীকে কষ্ট সহ্য করতে অভ্যস্ত করে তোলে।

রোজার প্রকারভেদ : রোজা ছয় প্রকার, যথা-
(১) ফরজ : রমজান মাসের রোজা এবং তার কাজা ও কাফফারা হিসেবে পালনীয় রোজা ফরজ।
(২) ওয়াজিব : মানত রোজা। এছাড়া যে কোনো নফল শুরু করলে তা পালন করা ওয়াজিব।
(৩) সুন্নত : মহররম মাসের প্রথম ১০ দিন রোজা রাখা সুন্নত।
(৪) মুস্তাহাব: প্রত্যেক চন্দ্রমাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোজা রাখা মুস্তাহাব। এই রোজাকে ‘আইয়্যামে বীয’ বলা হয়।
(৫) নফল : যে সকল দিন রোজা রাখা নিষেধ (মাকরূহ), সে সকল দিন ব্যতীত যে কোনোদিন রোজা রাখা নফল।
(৬) মাকরূহ : জিলহজ মাসের ১০ (কোরবানির দিন) ১১, ১২ ও ১৩ এবং ঈদুল ফিতরের দিন (মোট ৫ দিন) রোজা রাখা হারাম।
রোজার নিয়ত :
রোজার নিয়ত করা ফরজ। প্রতিটি রোজায় ২টি করে, ৩০টি রোজায় মোট ৬০টি ফরজ রয়েছে। এর একটি নিয়তে আর অন্যটি উপবাসে। তাই রোজা রাখার পূর্বেই নিয়ত করতে হবে। প্রকৃত নিয়ত হলো মানুষের অন্তরে। কোনো ব্যক্তি যদি মনে মনে বলে যে, আমি আগামী দিন রোজা রাখবো, তাহলে নিয়ত করা হয়ে যায়। আর যদি একেবারেই বিনা নিয়তে রোজা রাখে, তাহলে উক্ত রোজার দিন দুপুরের পূর্বে অবশ্যই নিয়ত করতে হবে।
যে সকল কারণে রোজা ভঙ্গ হয় :
নিম্নলিখিত কারণে রোজা ভঙ্গ হয়। যথা-
(১) কোনো জিনিস খেয়ে ফেললে;
(২) কুলি করার সময় পানি পেটে গেলে;
(৩) ঘুমন্ত অবস্থায় কোনোকিছু খেয়ে ফেললে;
(৪) বৃষ্টির পানি মুখে পড়ে পেটের ভিতর গেলে;
(৫) রাত্রি মনে করে পানি মুখে পড়ে পেটের ভিতর গেলে;
(৬) জোরপূর্বক রোজাদার ব্যক্তিকে কেউ পানাহার করালে;
(৭) সন্ধ্যা মনে করে সূর্যাস্তের আগে ইফতার করলে;
(৮) শরীরে ঔষধ প্রবেশ করালে;
(৯) প্রস্রাব-পায়খানার রাস্তায় ঔষধ বা অন্য কিছু প্রবেশ করালে;
(১০) অনিচ্ছাকৃত মুখ ভরে বমি এলে এবং তা পুনরায় পেটে গেলে;
(১১) দাঁত থেকে ছোলা পরিমাণ কোনো জিনিস বের করে খেয়ে ফেললে;
(১২) ভুলক্রমে কোনোকিছু খেতে শুরু করে রোজা নষ্ট হয়েছে ভেবে পুন:আহার করলে (ভূলবশত কিছু খেয়ে ফেললে রোজা নষ্ট হয় না)।
(১৩) ধুমপান করলে রোজা ভঙ্গ হয়ে যায়। উপরে বর্ণিত অবস্থায় রোজা নষ্ট হলেও রোজা রাখতে হবে এবং পরে একটি রোজা কাযা করতে হবে।

যে কারণে রোজা মাকরূহ হয় :
নিম্নলিখিত কারণে রোজা মাকরূহ হয়। যথা-

(১) মিথ্যা কথা বললে, অশ্লীল কথা বললে বা গালিগালাজ করলে;
(২) অপরের গীবত (দোষ) বললে;
(৩) দাঁত থেকে অতি ক্ষুদ্র কোনো জিনিস বের করে চিবিয়ে খেলে;
(৪) ইফতার না করলে;
(৫) মুখে পানি নিয়ে গড়গড়া করলে;
(৬) গরম থেকে বাঁচার জন্য বারবার কুলি করলে বা গায়ে ঠাণ্ডা কাপড় জড়িয়ে রাখলে।

সাহরি ও ইফতার :
রোজা রাখার নিয়তে শেষ রাতে যে খাবার খাওয়া হয়, তাকে সাহরি বলা হয়। বিশ্বনবি হযরত রাসুল (সা.) সাহরিকে বরকতপূর্ণ খাবার বলেছেন। তিনি আরও বলেন- ‘‘আমাদের রোজা ও আহলে কিতাবের (খ্রিষ্টান) রোজার মধ্যে পার্থক্য হলো- সাহরি খাওয়া।’’

মুসলমানরা সাহরি খায় কিন্তু আহলে কিতাবরা সাহরি খায় না।
আল্লাহ্র সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সারাদিন উপবাসের পরে কোনো খাদ্য ও পানীয় দ্বারা রোজা ভেঙ্গে ফেলার নামই ইফতার। রোজাদারের মনে ইফতারির সময় আনন্দের সঞ্চার হয়। তাই হযরত রাসুল (সা.) বলেন, ‘‘রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দ রয়েছে, একটি তার ইফতারের সময় ও অপরটি আপন প্রভুর সাথে সাক্ষাৎ লাভের সময়।’’
কোনো রোজাদার ব্যক্তিকে ইফতার করানো যথেষ্ট পূণ্যের কাজ। অনেকে মনে করে থাকেন যে, সারাদিন কষ্ট করে রোজা রেখে পরের বাড়িতে ইফতার করলে, তাকে সওয়াবের ভাগ দিতে হবে। আসলে এ ধারণা ভুল। যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করায়, তার আমলনামায়ও রোজাদারের সমপরিমাণ সওয়াব লেখা হয়ে থাকে। কিন্তু রোজাদারের সওয়াব থেকে কম করা হয় না। তাই রোজাদার ব্যক্তিকে ইফতার করানোর মতো মহান পুণ্যের কাজে আমাদের এগিয়ে আাসা উচিত।

রোজা ভঙ্গের কাফ্ফারা :
কোনো ব্যক্তি যদি স্বেচ্ছায় অথবা কোনো নিষিদ্ধ কাজ করে রোজা ভেঙ্গে ফেলে, তাহলে তাকে নিম্নলিখিত কাফ্ফারা দিতে হবে, অন্যথায় সে মারাত্মক গুনাহগার হবে।
(১) একাধারে (বিরতিহীনভাবে) দুই মাস (৬০ দিন) রোজা রাখতে হবে। রোজা পালনকালে যাদি কোনো একটি রোজা ভাঙ্গা পড়ে, তাহলে পুনরায় নতুন করে ২ মাস রোজা রাখতে হবে। তবে স্ত্রীলোকের মাসিক বা সন্তান প্রসব এর আওতাভুক্ত নয়।
(২) রোজা পালনে অক্ষম হলে ৬০ জন মিসকিনকে পরিতৃপ্তির সাথে দুবেলা আহার করাতে হবে।
পবিত্র রমজান মাস আমাদেরকে আত্মশুদ্ধি ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে উত্তম চরিত্র গঠনের যে শিক্ষা দিচ্ছে, আমরা যেন সারা জীবন তা অনুসরণ করে প্রকৃত মানবে পরিণত হতে পারি। মহান আল্লাহ্ আমাদেরকে রোজা পালন করে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

6 COMMENTS

    • গুরুত্বপূর্ণ পোস্ট। মহান আল্লাহ্‌ তা’য়ালা তাঁর অলীবন্ধুর শিক্ষানুযায়ী আমাদের হাকিকতে সিয়াম সাধনার তৌফিক দান করুন, আমিন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here