পলি জমে মরছে নদী

0
171

দেওয়ানবাগ ডেস্ক: গত ২০ আগস্ট উপকূলে অতি জোয়ারে সৃষ্ট বন্যার কারণে একটি কথা বারবার উঠে এসেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে জোয়ারের অতি উচ্চতা। তবে বিশেষজ্ঞ মহলে এ নিয়ে বিতর্ক ও ভিন্নমত আছে। তাঁরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি একটি কারণ বটে, তবে আরো কারণ আছে। সেই কারণটি হচ্ছে, দেশের উপকূলভাগে, বিশেষত পশ্চিম উপকূলে পলি অবক্ষেপণের মাত্রা অনেক বেশি। এতে নদীর গভীরতা কমছে, চর তৈরি হচ্ছে, নদী শুকিয়ে যাচ্ছে। তুলনায় প্লাবনভূমি নিচু হচ্ছে। নদীর বেড়িবাঁধের কারণে এত দিন জোয়ারের তীব্রতা চোখে পড়ত না। কিন্তু গত মাসে ভয়াবহতা দেখা গেছে।

এলাকাবাসীর মতে, ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের চেয়েও জোয়ারের তীব্রতা অনেক বেশি ছিল। মুহূর্তেই জোয়ারের পানি বাঁধের ভাঙা অংশ দিয়ে প্রবেশ করে এলাকা তলিয়ে দেয়।

প্রায় চার মাস আগে ২০ মে ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের তাণ্ডবে দেশের পশ্চিম উপকূলের খুলনার কয়রা, সাতক্ষীরার আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলার কমপক্ষে ২০টি স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙে যায়। ভাঙা বাঁধ আটকাতে না পারায় আশাশুনির বিস্তীর্ণ এলাকা এখনো পানির নিচে। ‘বোঝার ওপর শাকের আঁটি’র মতো তিন মাস পরে সাগরে নিম্নচাপ জনিত কারণে অতিবৃষ্টি ও অতি জোয়ার দেখা দেয়। এতে বাঁধের ভাঙা জায়গাগুলো দিয়ে পানি প্রবেশ করে এবং বাঁধের দুর্বল জায়গাগুলো আবারও ভেঙে যায়। মানুষ আবারও পানিতে নিমজ্জিত হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. দিলীপ কুমার দত্ত বলেন, উপকূলে জোয়ারের তীব্রতা তো আগে থেকেই ছিল। অতি জোয়ার ও নোনা ঠেকানের জন্যই তো ইপি-ওয়াপদা (ইস্ট পাকিস্তান-ওয়াটার অ্যান্ড পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট অথরিটি) সিইপির (কোস্টাল এমব্যাংকমেন্ট প্রজেক্ট) আওতায় পোল্ডার ব্যবস্থা গড়ে তোলে। তাতে নদীর দুই তীর বরাবর মাটির বাঁধ দেওয়া হয় আর প্লাবনভূমির পানি নিষ্কাশনের জন্যে স্লুইস গেট নির্মাণ করা হয়। এই বাঁধের কারণেই জোয়ারের চাপ বোঝা যেত না। এখন বাঁধ ভেঙেছে, তাই জোয়ারের তোড় বোঝা গেছে, এটি তো সাধারণ বিষয়।

অধ্যাপক দিলীপ কুমার বলেন, ‘দুঃখজনক হলেও সত্য যে ওই প্রকল্পে আমাদের জোয়ারের নদীগুলোর বিপুল পরিমাণ পলির বিষয়টি বিবেচনায় আনা হয়নি। অবশ্য এখনো বর্তমানের বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি বিবেচনা করছে না।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাঙ্গেয় এই বদ্বীপ ভৌগোলিক দিক দিয়ে একেবারে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যর। এর দক্ষিণভাগে বিস্তীর্ণ বিপুল জলরাশি, যা দুনিয়ার আর কোনো উপকূলভাগে নেই। আবার এই উপকূলে বসতির সংখ্যাও অনেক বেশি। পশ্চিমের শ্যামনগর থেকে পূর্বের কক্সবাজারের টেকনাফ পর্যন্ত উপকূলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যও অনন্য এবং অঞ্চলগতভাবে স্বতন্ত্র। পশ্চিম উপকূলের বয়স বেশ কম। এর ভূমি গঠন প্রক্রিয়া সম্পন্ন (অ্যাকটিভ ডেল্টা) হওয়ার আগেই এখানে মানুষের বসতি গড়ে উঠেছে। মানুষ তার প্রয়োজনে স্বল্পমেয়াদি (ষষ্ঠ বা অষ্টমাসি) বাঁধ দিয়ে জোয়ারের ঢল ঠেকাত। এলাকাবাসীই ওই বাঁধের রক্ষণাবেক্ষণ করত, যা ছিল প্রকৃতির সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ। কিন্তু গত শতকের ষাটের দশকে সিইপি প্রকল্পের আওতায় নদী মেরে, সংকুচিত করে পোল্ডার ব্যবস্থার মাধ্যমে স্থায়ী বাঁধ দেওয়া হয়। নদীকে বশে আনার ওই চেষ্টার বিষময় প্রতিক্রিয়ায় নদী মরতে শুরু করে আর ভেতরের প্লাবনভূমিতে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।

জানা যায়, উপকূলের জোয়ার প্রভাবিত নদীগুলো (টাইডাল রিভার) দিয়ে যে বিপুল পরিমাণ পলি আসত, তা নদী-খাল দিয়ে প্লাবনভূমিতে পতিত হতো। এভাবেই এখানকার ভূমি গড়ে উঠেছে। পোল্ডার ব্যবস্থা এই প্রক্রিয়াটি থামিয়ে দেয়। জোয়ারে এখনো পলি আসে, তবে সেই পলি নদীগর্ভে জমে নদী শুকিয়ে যায়, মরে যায়। এই অঞ্চলের বড় নদীগুলো প্রায় সবই মরেছে অথবা মৃতপ্রায়। অনেক গভীর শিবসা নদীও শুকিয়ে মরতে বসেছে। পশুর নদ নিয়মিত খনন করেও মোংলা বন্দরে ছয় ফুট গভীরতার বেশি জাহাজ আসতে পারে না। খোলপেটুয়া নদী থেকে শ্যামনগরের পদ্মপুকুর ও গাবুরা ইউনিয়ন বিভাজনকারী চৌদ্দরশি নামের নৌসংযোগ পথটি পেরিয়ে কপোতাক্ষ নদে পড়লেই বিশাল চরের মুখোমুখি হতে হয়। ভাটার সময় চর ভেসে ওঠে। জোয়ারের সময় নৌকাগুলো গাবুরার পার ঘেঁষে চলাচল করে। পলি জমেই এ অবস্থা তৈরি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভেন্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয় ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক যৌথ গবেষণায়ও এ তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, সুন্দরবন উপকূলে জোয়ারের নদীগুলোর বয়ে আনা পলিতে নদী মরছে, প্লাবনভূমি নিচু হয়েছে; ফলে এখানকার স্বাভাবিক ভূমি গঠন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

ফ্লাড রিস্ক অব ন্যাচারাল অ্যান্ড এমব্যাংকড ল্যান্ডস্কেপস অন দ্য গাংগেস-ব্রহ্মপুত্র টাইডাল ডেল্টা প্ল্যান’ শীর্ষক প্রবন্ধে ভেন্ডার বিল্ট বিশ্ববিদ্যালয় ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দলের সদস্য এলডাব্লিউ আউর বেখ, এল এল গুডব্রেড ও অন্যরা লিখেছেন, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলসহ গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় বন্যাঝুঁকি বাড়ছে। পলি ব্যবস্থাপনাটি যথাযথভাবে বিবেচনায় না আনায় এই দুর্ভোগ বাড়ছে। অবশ্য জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাও আর একটি কারণ। তবে এই দুটি বিষয়েই যথেষ্ট গবেষণা এখনো হয়নি বলে ওই প্রবন্ধে স্বীকারও করা হয়েছে। নেচার ক্লাইমেট চেঞ্জ পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি সংখ্যায় প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here