পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যে নারী আন্দোলনের ধারা ও গতি-প্রকৃতি: একটি বিশ্লেষণ-জান্নাতুল ফেরদৌস

0
25



পূর্ব প্রকাশিতের পর
পাশ্চাত্য নারী আন্দোলনকারীদের কমসূচীর মধ্যে সমাজ সংস্কার ছিল অন্যতম। সমাজ এবং রাষ্ট্রে নারীর বিভিন্ন সমস্যার মধ্যে স্বামী পরিত্যক্ত হওয়া ও শ্রমের ন্যায্য মজুরী হতে বঞ্চিত হওয়া, পতিতা জীবনযাপন করতে বাধ্য হওয়া, বিবাহ-বিচ্ছেদের অধিকারহীন অবস্থা মেনে নিতে বাধ্য হওয়া ইত্যাদি ছিল অন্যতম। আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, হল্যান্ড, জার্মানী সর্বত্র অভাবের তাড়নায়, জীবিকার সংস্থান করতে না পারায়, স্বামী পরিত্যক্ত হওয়ার কারণে নারীদের পতিতাবৃত্তিও বেছে নিতে হতো। এ আন্দোলনের ফলে ১৭৯৩ সালের জুন মাসে ফ্রান্সে বিশেষ আইন পাস হয় তাতে অনাথ শিশুদের শারীরিক ও নৈতিক শিক্ষার ভার রাষ্ট্রকে গ্রহণ করার দাবী উত্থাপন করা হয়। শিশুর দায়িত্ব রাষ্ট্র নিলেও যত্নের অভাবে শিশু মৃত্যু ঘটে। ১৮০৩ সালে গর্ভপাত আইন নিষিদ্ধ হয় এবং গর্ভপাতের জন্য নারীর মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা দেওয়া হয়। এর ফলশুতিতে গর্ভপাত বিরোধী আইনের বিরুদ্ধে নারীরা আন্দোলন করে।
ফ্লোরেন্স নাইটেঙ্গেল (১৮২০-১৯১০) সমাজে নারীর দুরবস্থা অপসারণ করার জন্য সোচ্চার হন। নার্সিং বৃত্তির প্রবর্তনের জন্য তাকে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছিল। তার সময়ে নারীদের সাধারণ শিক্ষার বাধা দূর হলেও ডাক্তারী ও নাসিং বিষয়ে নারীদের শিক্ষার বাধা রয়ে যায়। ফ্লোরেন্স নাইটেঙ্গেলের প্রতিবাদ জানানোর ফলে এসব বাধা ক্রমান্বয়ে অপসারিত হয়।


পাশ্চাত্যের নারী আন্দোলনের নেত্রীরা ভোটাধিকারের দাবী করেন। নারীর ভোটাধিকারের আন্দোলনকে সংকীর্ণ নারীসুলভ দৃষ্টিভঙ্গির সৃষ্টি বলে নারীর ভোটাধিকার বিরোধীরা এমন অভিমত পোষণ করেন যে, “পুরুষের অধিকার মিলিত বাস্তবায়ন হলেই নারীর অধিকার রক্ষা করা সম্ভব।”
আঠার শতকের শেষে মধ্যবিত্ত সমাজের নারী আন্দোলনের রাজনৈতিক দাবী হিসেবে ‘ভোটাধিকার’ কর্মসূচি যুক্ত হয়। বিবাহিত, অবিবাহিত, সম্পত্তিবান সকল নারীই সেই সময় সমাজিক, আইনগত ও রাজনৈতিক ভোটাধিকারের দাবীতে আন্দোলনে আগ্রহী হয়ে ওঠে। এ আন্দোলনের পথ খুব সহজসাধ্য ছিল না। সম্পত্তিবান নারীরা ভোটাধিকার ও সম-অধিকারের পক্ষে ছিল। ১৮৬৭ সালের পূর্ব পর্যন্ত শুধু বিত্তবান শিক্ষিত পুরুষেরা ভোট দিত। পরে অবশ্য ত্রিশ বছর ও তার চেয়ে বেশি বয়সের বিবাহিত নারীদের ভোটাধিকার বিবেচনা করা হয়। ১৮৬৭ সালে ইউরোপ ও আমেরিকায় সর্বজনীন ভোটাধিকার প্রবর্তন করতে গিয়ে নারীর ভোটাধিকারের দাবী বাতিল হয়ে যায়। ভোটাধিকার আন্দোলনে নেতৃত্ব দানকারী সংগঠন ও ব্যক্তিদের মধ্যে আগে থেকেই এরকম ভাবনা ছিল যে, সীমিতভাবে যদি নারীর ভোটের অধিকার পাওয়া যায় তবুও বাধা থেকে যাবে। পাশ্চাত্য নারীর ভোটাধিকারের বিষটি সম্পর্কে রিটা মে কেলী ও মেরি বুটিলিয়ার তাঁদের রাজনৈতিক নারীর অভ্যুদয় (১৯৯১) গ্রন্থে মত প্রকাশ করে বলেন যে, “সাম্প্রতিককালের অর্থাৎ বিংশ শতাব্দীর শেষ দুই শতকে সমীক্ষাগুলির ফলাফলে দেখা গেছে যে, নারীদের ভোট প্রদানের প্রবণতা যুক্তরাষ্ট্রে লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। নারীদের পরিবর্তনশীল ভূমিকা সমাজের ওপর নারী আন্দোলনের প্রভাবের সত্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য নারী আন্দোলনের প্রবক্তাগণ নারী ও পুরুষের ভোট প্রদানের হারের ব্যবধানের সঙ্কোচনকে রাজনৈতিক আগ্রহের প্রমাণের সহজ পরিমাপ হিসাবে ব্যবহার করে থাকেন।” ব্রিটেনের উপনিবেশবাদী রাষ্ট্রসমূহে বিভিন্ন আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নিউজিল্যান্ডে ১৯২৮ সালে সর্বপ্রথম নারী ভোটাধিকার, ১৯২৮ সালে ইংল্যান্ডে একুশ বছরের নারী ভোটাধিকার ও ব্রিটিশ কলোনিগুলোতেও নারীরা ভোটাধিকার লাভ করে। এখানে লক্ষণীয় যে, নারী ভোটাধিকারের জন্য পাশ্চাত্যেও নারী সমাজকে দীর্ঘ সংগ্রম করতে হয়েছে।


আঠার শতকে পাশ্চাত্যে নারীর অধিকার, সাম্য ও সমতার জন্য আন্দোলনের সময়ে শ্রমজীবী নারীদের মজুরীর সমতার জন্য আন্দোলন শুরু হয়। কারণ সেই সময়ে বিশেষত শিল্প বিপ্লবের পর নারী ও পুরুষের শ্রমের মজুরীর বৈষম্য অধিক মাত্রায় বেড়ে গিয়েছিল। ১৮১৯ সালে ম্যানচেষ্টারে শ্রমজীবী মানুষের যে মিছিল হয় তাতে নারী সমাজ যোগ দেয়। নারী শ্রমিকেরা স্বীয় কর্মস্থলে মজুরী বৈষম্য দূর করার জন্য সংগ্রাম করতে থাকেন। জার্মান অর্থনীতিবিদ ও সমাজতন্ত্রের জনক কার্ল মার্কস (১৮১৮-১৮৮৩) ও ফ্রেডরিক এঙ্গেলস (১৮২০-১৮৯৫) তাদের কমিউনিষ্ট মেনিফেস্টো (১৮৪৮) গ্রন্থে এ তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেন যে, শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির সঙ্গে নারীর মুক্তি জড়িত।


পাশ্চাত্যের নারী আন্দোলনের সময় নারী সমাজ বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছিল। ব্রিটেন ও আমেরিকার নারী আন্দোলনের প্রবাবে প্রখ্যাত সাহিত্যিক ভার্জিনিয়া উলফ (১৮৩২-১৯৪১) গ্রন্থটিতে লিখেন যে, “নারী জাগরণের কাহিনী অপেক্ষা বেশি কৌতুহলকর হচ্ছে নারী জাগরণের পুরুষ কর্তৃক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির ইতিহাস। সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে নারী সমাজ শিক্ষার অধিকার ও সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। সেজন্য উনিশ শতকের পর থেকে নারী আন্দোলনের কর্মসূচীতে শিক্ষা, ভোটাধিকার ও সম্পত্তির অধিকারের দাবী অন্তর্ভুক্ত হয়। এ আন্দোলনের নের্তৃত্ব দানকারীরা নারীর বিভিন্ন কর্ম, বিবাহ, সন্তানের অভিভাবকত্ব, সম্পত্তির অধিকার ইত্যাদির আইনগত সংস্কারের বিষয়ে আন্দোলন করেছেন। নারীর আইনগত অধিকার বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন সংগঠন নারী-পুরুষ আইনের বৈষম্যের বিরুদ্ধাচার করে। বিদ্যমান আইনও নারীর উন্নয়নের পথে বাধা ছিল, তাই সমতার নীতির ভিত্তিতে নারীর জন্য আইনের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। সেই লক্ষ্যে নারীবাদীরা আন্দোলন চালিয়ে যায়। বিবাহ সংক্রান্ত বিষয়েও সংস্কার সাধানের জন্য নারীরা আন্দোলনে লিপ্ত হয়। আন্দোলনকারীদের মধ্যে বেসি রেনন পারকেস (ইবংংরব জধুহড়হ চধৎশবং) মেরি হাউইট (গধৎু ঐড়রিঃঃ) ও এ্যান জেমিসন’র (অহহ ঔধসবংড়হ) নাম উল্লেখযোগ্য। তারা বিবাহ বিষয় নিয়ে প্রথম নারীর অধিকার আদায়ে ব্রতী হন। এ বিষয়ে তারা বৃটিশ পার্লামেন্টে আবেদন করে কিন্তু সফল হননি। ১৮৫৭ সালে স্ত্রীর প্রতি নিষ্ঠুরতা ও ব্যভিচারের কারণে স্বামীকে আইনগতভাবে বিচ্ছেদ ও তালাক প্রদানের অধিকার দেওয়া হয়। যদিও স্বামীর সম্পত্তি ও অর্থের ওপর স্ত্রীর কর্তৃত্বের দিকটা নিয়ে কোনো মীমাংসা তখন হয়নি। ১৮৭৮ সালে বৃটিশ নারী নিজ উপার্জনের ওপর কিছুটা কর্তৃত্ব লাভ করে এবং ১৮৮২ সালে স্ত্রীকে স্বাধীনভাবে সম্পত্তির মালিক হওয়ার অধিকার প্রদান করা হয়।


আঠার শতকে নারী আন্দোলনের নেত্রীগণ শিশু ও মায়েদের অধিকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করেছেন। ১৮৭৮ সালে সুইজারল্যান্ড প্রথম দেশ হিসেবে শ্রমজীবী মায়েদের জন্য আট মাসের প্রসূতিকালীন ছুটির আইন ঘোষণা করে। পরবর্তীতে মা ও শিশুর কল্যাণের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দেশে নারী আন্দোলন ঘটে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় যে, নারী আন্দোলনের ফলে মা ও শিশুর স্বার্থে ইটালীতে ১৯০৫ সালে, জার্মানীতে ১৯১০ সালে, ফ্রান্সে ১৯০৮-১৩ সালে ও ব্রিটেনে ১৯০৯-১৩ সালে প্রসূতি মাতার অধিকার বিল নিয়ে আন্দোলন হয় এবং ইউরোপের আটটি রাষ্ট্রে যথা- ইটালী, ফ্রান্স, নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড, রাশিয়া, রুমানিয়া, ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ায় প্রসূতিদের সাহায্য ভাতা দেওয়া হয়।
চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here