পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যে নারী আন্দোলনের ধারা ও গতি-প্রকৃতি: একটি বিশ্লেষণ

0
49


জান্নাতুল ফেরদৌস
পূর্ব প্রকাশিতের পর
ঐতিহাসিক ফরাসী বিপ্লবে (১৭৮৯) অনেক নারী ও শিশু অংশগ্রহণ করে। ফ্রান্সের জাতীয় পরিষদে ১৭৮৯ সালে নারী সমাজ এক স্মারকলিপিতে জানায় যে, নারী ও পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য, নারীর শ্রমের ও কাজের অধিকারের জন্য এবং তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মে নিয়োগের জন্য সরকারকে সচেষ্ট হতে হবে। ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক কনভেনশনে ‘মানুষের অধিকার’ ঘোষিত হলেও নারীর অধিকার বিষয়ে কোনো বক্তব্য না থাকায় ফরাসী নারী সমাজ এ বিষয়ে প্রতিবাদ ও আলোচনা শুরু করে এবং ফলশ্রুতিতে কনভেনশনের ১৭ নম্বর ধারায় ‘নারীর অধিকার’ সংযোজিত হয়। ফরাসী বিপ্লবে নারীসমাজ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিল এবং প্রতিক্রিয়াশীল ইউরোপীয় আক্রমণের সময় রাষ্ট্র রক্ষার জন্য ফরাসী নারীরা অস্ত্র হাতে সংগ্রাম করেছিল। উল্লেখ্য যে, সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত মুসলিম প্রজাতন্ত্রের নারীসমাজ সমগ্র মুসলিম বিশ্বের মধ্যে বৈষয়িক ও মানসিক উভয় দিক থেকে সবচেয়ে স্বচ্ছল ও অগ্রসর নারী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।


শ্রমের অধিকার বাস্তবায়নের জন্য ১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে একটি সুচ কারখানার নারী শ্রমিকেরা দৈনিক ১২ ঘন্টার পরিবর্তে ৮ ঘন্টা কাজের দাবীতে ও ন্যায্য মজুরী এবং কর্মক্ষেত্রে সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবীতে সোচ্চার হয়েছিল। এ কারণে গ্রেফতার হন অনেক নারী। ১৯০৮ সালে ৮ মার্চ আমেরিকার শিকাগো শহরে পোশাক শিল্পে দেড় হাজার শ্রমিক আন্দোলন করেন ৮ ঘন্টা কাজের দাবীতে। আন্দোলন করে কয়েকজন নারী নিহত হয়। ১৯১০ সালে ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে ৮ মার্চকে ক্লারা জেটকিন আন্তজাতিক নারী দিবস ঘোষণা করেন। ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ ৮ মার্চকে নারী দিবস পালন করা শুরু করে। ১৯৭৭ সালে জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের স্বীকৃতি দেয়। আমেরিকার বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনের রূপকার রোজা লুইস ম্যাককুলি সংক্ষেপে রোজাপার্ক কারাবরণ করেছিলেন কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার আদায়ের জন্য। শ্বেতাঙ্গদের অধিকার ছিল সংরক্ষিত। ১৯৫৫ সালের ১ ডিসেম্বর এক তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বর্ণবাদবিরোধী আন্দেলনের সূচনা হয়। রোজা পার্ক কৃষ্ণাঙ্গদের বিশেষ করে কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের নাগরিক অধিকার আদায়ের সংগাম করেন। পরবতীতে মার্টিন লুথার কিং-এর নেতৃত্বে ১৯৬৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গদের নাগরিক অধিকার আইন পাশ হয়। ফলে তিনি আমেরিকার ইতিহাসে ‘মাদার অফ দ্য সিভিল রাইটস মুভমেন্ট’ খেতাবে ভূষিত হন। কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার চর্চার জন্য তিনি কাজ করেন। এর ফল হিসেবে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে কলিন পাওয়েল ও কন্ডোলিৎসা রাইসের মতো প্রভাবশালীদের দেখতে পাওয়া যায়।
নারী জাগরণের যুগে ইংল্যান্ডে, জার্মানি, আমেরিকা ও ইউরোপের নারী সমাজ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের গুরুত্ব উপলব্ধি করে বিভিন্ন সংগঠন গড়ে তোলে। এগুলো হলো: ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অব উইমেন (১৮৮৮), ওয়ার্ল্ড ইউনিয়ন অব ক্যাথলিক উইমেন (১৯০১), ইন্টারন্যাশনাল অ্যালায়ান্স অব উইমেন (১৯০৪), ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব ইউনিভার্সিটি উইমেন (১৯১৯), ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব বিজনেস এন্ড প্রফেশনাল উইমেন (১৯৩০) আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক নারী ফেডারেশন (১৯৪৫) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ সংঘটনগুলো গড়ে উঠেছিল নারীদের নানাবিধ সমস্যার প্রেক্ষিতে।

\
সুতরাং, পাশ্চাত্যের নারী আন্দোলন সম্পর্কে বলা যায়, পাশ্চাত্যের নারীর স্ব্ধাীনতা, অধিকার ও সমতা বাস্তবায়নের জন্য এবং সমাজের বিভিন্ন বৈষম্য থেকে নারীকে রক্ষার জন্য যে নারী আন্দোলনের উদ্ভব ও বিকাশ হয়েছিল তা বর্তমানেও অব্যাহত আছে। এটা স্বীকার্য নারী সমাজের উন্নয়নে এ আন্দোলনের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।
প্রাচ্যের নারী আন্দোলন


ইউরোপে যে সময়ে নারী জাগরণের সূচনা হয় সেই সময়ে প্রাচ্যে নারী জাগরণমূলক কার্যকলাপ তেমন শুরু হয়নি। প্রাচ্যের ভারতবর্ষের নারী সমাজ পরাধীন, শৃঙ্খলিতও বৈষম্য পীড়িত থাকার ফলে নারী অধঃস্তন জীবনকেই স্বাভাবিক গণ্য করেছিল। বিশ্বের অপরাপর রাষ্ট্রের নারীরাও তা মেনে নিয়েছিল। ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে নারীরা সম্রাট ও বাদশাহদের রাণী, বেগম বা দাসী হিসেবে নির্যাতিত, পরাধীন ও ক্ষেত্র বিশেষে অত্যাচারিত জীবনযাপন করত। ফলে এটুকু অনুমেয় যে, প্রাচ্যের নারীদের জীবন খুব একটা সুখের ছিল না এবং অন্যান্য রাষ্ট্রের নারীদের চাইতে কম বেদনাদায়ক ছিল না। প্রাচ্য সমাজে নারীর এ বেদনাদায়ক ও হীন অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সমাজ সংস্কারক ও নারীবাদী চিন্তাবিদেরা নারী আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণ করেন। নারী আন্দোলনের সূচনা হয় সমাজ সংস্কারের মধ্য দিয়ে। ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসনের সূচনা ঘটে ১৯৭৫ সালে এবং সমাপ্তি ঘটে ১৯০ বছর পরে। ইংরেজরা নিজেদের প্রয়োজনেই ভারতে পাশ্চাত্য ধারার শিক্ষার প্রবর্তন করেন। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে নব জাগরণের ফলে সমাজ সংস্কারের সূচনা হয়। এ সমাজ সংস্কারের মধ্যে ছিল সতীদাহ প্রথা রোধ, বহুবিবাহ ও বাল্যবিবাহ রোধ, কৌলিন্য প্রথা দূর করা, নারী শিক্ষার প্রসার ঘটানো ইত্যাদি।
নারী শিক্ষায় ব্রিটিশরা ভারতীয় উপমহাদেশে বিশেষ অবদান রাখেন। শুধুমাত্র ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর সুবিধার্থে বিশেষ করে উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের বিচার ও শাসন বিভাগীয় সমস্যালাঘব করার উদ্দেশ্যে কতগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রাচ্যে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করে। এগুলোর মধ্যে ছিল কলকাতা মাদ্রাসা (১৭৯১) ও কলকাতা ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ (১৮০০) ইত্যাদি। প্রথমদিকে নারীরা কোম্পানীর কর্মচারী হতে পারবে না বলে তাদের শিক্ষার কথা ইংরেজরা ভাবেনি। পরবর্তীতে অবশ্য নারী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা অনুভব করে ইংরেজ সরকার এগিয়ে আসে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর হাতে যতদিন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা আসেনি (১৭৫৭) ততদিন কোম্পানী মিশনারীদের পৃষ্ঠপোষকতায় ধর্ম প্রচার ও শিক্ষা বিস্তারের কাজে সাহায্য করেছে। মিশনারী নারীরাই প্রথমে নারী ও পুরুষ নির্বিশেষে সকলের জন্য আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে শিক্ষার আয়োজন করে।


১৭০০ সালে জ্ঞান প্রচার সমিতির উদ্যোগে অনেকগুলো দাতব্য বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। যেমন- স্কুলভবন নির্মাণের জন্য এককালীন অর্থ প্রদান, স্কুলভবন মেরামতের অর্থ প্রদান, লটারীর সাহায্য অর্থ সংগ্রহ করে স্কুল চালু রাখার অনুমতি দেওয়া ইত্যাদি। ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পরবর্তীতে মিশনারি নারীদের ধর্ম প্রচার ও শিক্ষা বিস্তারে ব্যাপক স্বাধীনতা দেয়। তাঁরা পুস্তক প্রকাশ, নারী শিক্ষার বিস্তার, অনাথ আশ্রম ইত্যাদি প্রতিষ্টার কাজ শুরু করে। এমনকি বাড়ি বাড়ি গিয়েও পর্দানশীল নারীদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তার শুরু কেরে। কোম্পানির এদেশীয় ব্যক্তিবর্গ মনে করলেন যে, আরবি ও সংস্কৃতি ভাষায় মর্যাদা থাকলেও এতে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসারের সুযোগ কম। তাই রাজা রামমোহন রায়সহ প্রগতিবাদীরা (পাশ্চাত্যবাদী) প্রাচ্যে প্রচলিত শিক্ষার পরিবর্তে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রতি তাঁদের সমর্থন প্রকাশ করেন। তাঁরা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, প্রচলিত শিক্ষার পরিবর্তে ইংরেজি শিক্ষা ও বিজ্ঞানের প্রসার দ্বারা ভারতীয় উপমহাদেশে সত্যিকার উপকার সম্ভব হবে।
ইংরেজদের নির্দেশনা অনুসরণ করেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মালোচনার প্রতিষ্ঠান, সংবাদপত্র, মুদ্রণযন্ত্র প্রভৃতি ভারতে স্থাপিত হয় এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি পর্যায়ে শিক্ষার সুযোগ আসে।


প্রাচ্যে নারী আন্দোলনের সূচনা পর্বে নারী সমাজের দুর্গতি দূর করার জন্য আন্দোলন শুরু হয়। নারী আন্দোলনকারীদের মধ্যে রাজা রামমোহন রায় (১৭৭২-১৮৩৩), মহর্ষি দেবেন্দনাাথ ঠাকুর (১৮১৭-১৯০৫), ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের (১৮২০-১৮৯১) নাম উল্লেখযোগ্য। রাজা রামমোহন রায় প্রথম প্রতিবাদ জানান নারীর ওপর সামাজিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে। সতীদাহ প্রথা বন্ধ করার জন্য তিনি ১৮১৫ সালে কলকাতায় বাংলা পত্রিকা প্রকাশ করেন। তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে ব্যাপক জনমত গড়ে ওঠে। ফলশ্রুতিতে ১৮২৯ সালের ৪ ডিসেম্বর আইনসঙ্গতভাবে সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ হয়। নারী সমাজ যেন নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয় সে উদ্দেশ্যে তিনি লেখালেখি করতেন। ধর্ম, সমাজ, শিক্ষা ও রাজনীতি প্রভৃতিতে আধুনিক সংস্কারের লক্ষ্যে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, “সকলের স্ত্রী দাস্য বৃত্তি করে বা একজন নারী একাধারে রাঁধুনী, শয্যাসঙ্গিনী ও বিশ্বস্ত গৃহরক্ষী। পরবর্তীতে তিনি নারী শিক্ষার প্রসারে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ১৮৩০ সালে তিনি ইংল্যান্ড ভ্রমণ করেন এবং নারী জাগরণের রূপ প্রত্যক্ষণ করেন। এ সময় তিনি ভারতীয় নারী সামজের উন্নতির আকাক্সক্ষা প্রকাশ করেন। তাঁর প্রিয় দুই বন্ধু প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর এবং প্রসন্ন কুমার ঠাকুর ১৮২৫ সালের মধ্যেই নারী শিক্ষা বিষয়ে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ১৮২০ সালে ইয়ংবেঙ্গল গোষ্ঠীর নেতা হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও নারীর সমমর্যাদার জন্য প্রচারণা শুরু করেন। এরপর আরো অনেকেই এগিয়ে আসেন যাঁদের মধ্যে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নাম উল্লেখযোগ্য। রাজা রামমোহন রায়ের পর মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলার নারী সমাজের জন্য অবদান রাখেন। তাঁর উদ্যোগেই ঠাকুর পরিবার নারীর জন্য বিভিন্ন ভূমিকা পালন করেন। ঈশ্চরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের উদ্যোগে ১৮৫৬ সালের ২৬ জুলাই বিধবা বিবাহ আইন পাশ হয়। ১৮৫৬ থেকে ১৮৬৭ সাল পর্যন্ত সময়ে ষাটটি বিধবা বিবাহ তাঁর মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। শুধু বিধবা বিবাহ প্রচলন নয়, বহুবিবাহ ও বাল্যবিবাহ বন্ধের জন্যও তিনি আন্দোলন করেন।
উনিশ শতকে ইংরেজ শাসন শুরু হলে শিক্ষা-দীক্ষা, চাকুরী, সামাজিক প্রতিষ্ঠা লাভের ক্ষেত্রে হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়। এ পর্যায়ে ইংরেজ প্রবর্তিত নারী শিক্ষার প্রতি মুসলমানদের অনাগ্রহ লক্ষণীয়। ফলে নারীর সার্বিক উন্নয়নে মুসলমানেরা পিছিয়ে পড়ে। অনেক বছর পর মুসলিম সমাজ ইংরেজি শিক্ষা ও পাশ্চাত্য বিদ্যা গ্রহণের মধ্য দিয়ে আধুনিক জীবনের প্রতি আকৃষ্ট হয়।
চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here