পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যে নারী আন্দোলনের ধারা ও গতি-প্রকৃতি: একটি বিশ্লেষণ

0
27


জান্নাতুল ফেরদৌস
প্রাচীন কাল হতে নারীরা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছ থেকে নিগৃহীত হয়ে আসছে। অত্যাচার ও অবমাননার কারণে নারী সমাজের মনে ক্ষোভ পুঞ্জিভুত হচ্ছিল। ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে নারী আন্দোলনের সূচনা হয়। বিভিন্ন রাষ্ট্রে নারীরা সংগঠিত হয়ে স্বাধীনতা, অধিকার ও সমতার দাবীতে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলনের ডাক দেয় এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছ থেকে তাঁদের প্রাপ্য দাবী আদায়ে তৎপর হয়। পাশ্চাত্যেই প্রথম নারী আন্দোলনের সূচনা হয়। পরবর্তীতে প্রাচ্যের নারীসমাজও নিজেদের অধিকার বাস্তবায়নের দাবীতে আন্দোলন করে। নিজেদের সংগঠিত করার লক্ষ্যে নারী সমাজ বিভিন্ন সংগঠন গড়ে তোলে। এ প্রবন্ধে পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যে নারী আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও ধারাবাহিকতা তুলে ধরে উভয় ক্ষেত্রে নারী আন্দোলনের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে এর মূল্যায়ন করার প্রয়োস নেওয়া হয়েছে।


ভুমিকা
পৃথিবীর বিভিন্ন আন্দোলনের মতো নারী আন্দোলনের ইতিহাসও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। মূলত নারী আন্দোলন হলো সমাজ বিবর্তনের ইতিহাসের সাথে শোষিত ও বঞ্চিত নারীর জীবন-মান পরিবর্তনের ইতিহাস। নারী আন্দোলনের মাধ্যমে নারীর প্রাপ্য অধিকার ভোগ সহজতর হয়েছে। লক্ষ্য করলে দেখা যায়, বিভিন্ন ত্যাগ ও সংগ্রামের মাধ্যমে পুরুষ ও সমাজের শাসন উপেক্ষা করে নারী আন্দোলন এগিয়ে গেছে। বলাবাহুল্য, নারী আন্দোলনের এ পথ সহজ সাধ্য ছিল না। সমাজের সকল স্তরের নারীকে সংগঠিত করতে নারী আন্দোলনকারীদের অনেক দুঃখ-কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। প্রথম দিকে নারী আন্দোলনকারীদের সাথে সমাজের উচ্চবিত্ত নারীরা একাত্মতা ঘোষণা করলেও সমাজের নিম্নস্তরের সাধরণ নারীরা একমত হতে পারেনি। কারণ পূর্বের সমাজ ব্যবস্থায় নারী সমাজ পুরুষের অধীনে থেকে শোষণ ও বঞ্চনা অবস্থাকেই স্বাভাবিক মনে করতো। ব্যক্তি হিসেবে পুরুষ পরিবারের অভিভাবক। সুতরাং পুরুষ সব সুবিধা ভোগ করবে-এ ধারণায় নারী সমাজ অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল এবং সেভাবেই নারী নিজেকে পরিবারে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু নারীর অধঃস্তন হওয়ার বিষয়টি যে স্বতঃসিদ্ধ কোনো নিয়ম নয় তা সাধারণ নারী সমাজকে বুঝতে বিস্তর সময় অতিবাহিত করতে হয়েছে। বিভিন্ন অথ্যাচার, বঞ্চনা ও অধিকারহীনতার ফলে নারী সমাজের মধ্যে অসন্তোষের সৃষ্টি হয়। ফলশ্রুতিতে সূচীত হয় আন্দোলনের প্রেক্ষাপট। নারী আন্দোলনের অব্যাহত গতিধারায় নারী সমাজ তাদের অধিকার সমন্ধে সচেতন হয়ে ওঠে এবং আরো সংগঠিতভাবে আন্দোলনের গতি ত্বরান্বিত করে। এ প্রসঙ্গে মালেকা বেগম বলেন যে “নারীর স্বার্থে সামাজিক, পারিবারিক, আইনগত সংস্কার ও রাজনৈতিক অধিকারের সন্ধানেই সূচীত হযেছিল নারী আন্দোলনের প্রেক্ষাপট।”


পাশ্চাত্যের নারী আন্দোলন
বিশ্ব জুড়ে চলছে নারীর বঞ্চনা, শোষণ ও মর্যাদাহানী। আদিম সমাজে নারীর কর্তৃত্ব বজায় থাকলেও পরবর্তীতে যখন সমাজে সামন্তপ্রথা চলে আসে তখন পরিবারের কর্তৃত্ব পুরুষের হাতে চলে যায় এবং নারী অধঃস্তন হয়ে জীবন কাটাতে থাকে। নিজেদের অস্তিত্ব আর সম্মান অর্জনের জন্য বিভিন্ন দাবী নিয়ে নারী সমাজ সংগঠিত হয় এবং আন্দোলনের পথ বেছে নেয়। পাশ্চাত্যে প্রথম নারী আন্দোলনের সূত্রপাত হয়, বিশেষ করে ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লবের পর যখন নারীসমাজ বেকার হয়ে পড়ে। এ সময় বিভিন্ন অধিকার আদায়ের দাবীতে নারী সমাজ সোচ্চার হয়ে ওঠে। পাশ্চাত্যের অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে বিভিন্ন শোষণ হতে মুক্তি ও অধিকার আদায়ের উদ্দেশ্যে নারী আন্দোলনের সূচনা হয়।


নারী আন্দোলনকারীরা নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মে নিযুক্ত হয়েছেন। ইউরোপীয় রাষ্ট্রসমূহে নারীর ভুমিকা প্রশংসাযোগ্য হলেও এসব রাষ্ট্রের নারীরা বৈষম্যের শিকর ছিল। পাশ্চাত্য সমাজে বিশ শতকেও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলেছে। বিশ শতকে নারী আন্দোলকারীরা এ মত প্রকাশ করেন যে, জ্ঞান চর্চা হবে নারীর দৃষ্টিভঙ্গিতে, কারণ পুরুষ যে দৃষ্টিভঙ্গিতে নারীর জ্ঞান চর্চার কথা বলেন তা নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক। বিশ শতকে পাশ্চাত্যের অনেক চিন্তাবিদ নারীর প্রতি বৈষম্যের জন্য পুরুষ প্রধান সমাজকে দায়ী করেছেন। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা, নারীর পরনির্ভরশীলতা দূর করা, সব বৈষম্য ও শোষণ থেকে নারী সামজকে মুক্তি দেওয়ার লক্ষ্যে নারী ও পুরুষ নির্বিশেষে প্রগতিশীল চিন্তাবিদগণ সমাজে আন্দোলন করেছিল। অবস্থার পরিবর্তনের জন্য নারী সমাজ আইনগত অধিকার আদায়ের প্রয়াস চালায়। প্রথাগত ও ঐতিহ্যগতভাবেই নারীর প্রতি পাশ্চাত্য সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল নেতিবাচক এবং মর্যাদাহানীকর। কয়েকটি ক্ষেত্র ছাড়া সমাজের সব স্তরের পুরুষই নারীর প্রতি অশোভন ও অন্যায় মনোভাব পোষণ করেছে। পুরুষের অশোভন ও অন্যায় আচরণের মধ্য দিয়ে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির নেতিবাচক প্রতিফলন যেমন: যৌতুক প্রথা, এসিড নিক্ষেপ, ধর্ষণ, পর্নোগ্রাফি ইত্যাদি ঘটছে নারীর প্রতি। নারীর প্রতি উদাসীন ও হীনমন্য দৃষ্টিভঙ্গির কারণ হ্যারিয়েট মার্টিনিয়্যু ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিগত পঞ্চাশ বছরে সমাজ পরিবর্তিত হয়েছে যথেষ্ঠ কিন্তু নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলালো না। সে সময়ে এ মতবাদই প্রচারিত হতো যে, বাবা, ভাই, স্বামী ও ছেলের ওপর নারী নির্ভরশীল থাকলে তা সমাজের জন্য মঙ্গলকর হবে। হ্যারিয়েট মার্টিনিয়্যু সমাজে প্রচলিত এ মতবাদ ও এ জাতীয় আইনের বিরুদ্ধে এবং নারীদের শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন। সে সময় ইংল্যান্ডের জন স্টুয়ার্ট মিল (১৮০৬-১৮৭৩) তাঁর (১৮৬৯) গ্রন্থে নারীর শোচনীয় অবস্থার কথা তুলে ধরে বলেন, “আজকের দিনে বিয়েই হলো একমাত্র ক্ষেত্র যেখানে আইনত দাস প্রথা বজায় আছে।” নারীর প্রতি চলমান এ দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের জন্য আন্দোলন করা হয়।


সাম্য ও স্বাধীনতা অর্জনের জন্য নারীদের আন্দোলন করতে হয়েছে। সতের শতকে যখন ইংল্যান্ডে দাস ব্যবসায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন হয় তখন পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় অনুশাসনে বৈষম্য থাকায় নারী সমাজের মধ্যে মুক্তির আকাক্সক্ষা প্রবল হয়ে ওঠে। নারী জাগরণের সূচনালগ্নেও নারীসমাজ পুরুষের সমান ক্ষমতা অর্জনের প্রয়াস চালায়। সেজন্য পুরনো মূল্যবোধের বিরুদ্ধে নারী সমাজ সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়।
সতের শতকের নারী জাগরণ আঠার শতকে পুরো ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। পাশ্চাত্যের নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নারী আন্দোলনে এ পর্যায়ে মধ্যবিত্ত সমাজ অংশ নেয় এবং নারীর স্বার্থে নিম্নোক্ত দাবী সমূহ পেশ করে:
ক) পরিবারে নারীর মর্যাদা ও ভূমিকা নির্দেশিত হতে হবে;
খ) সম্পত্তিতে নারীর অধিকার দিতে হবে;
গ) নারীর নিজস্ব আয়ের ওপর তার অধিকার আইনগতভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
নারীবাদের প্রবর্তক মেরি ওলস্টোনক্র্যাফট নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার যৌক্তিকতা তুলে ধরে তাঁর মত প্রতিষ্ঠা করেন। পাশ্চাত্যের নারী আন্দোলনের বিভিন্ন দাবীর প্রসঙ্গে আসে নারী শিক্ষার কথা। শিক্ষা ছাড়া নারী উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ ব্যাপারে নারীবাদী চিন্তাবিদ মেরি ওলস্টোনক্র্যাফট (১৭৫৯-১৭৯৭) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। নারীর শিক্ষার প্রতি তিনি বিশেষ জোর দিয়ে বলেছেন যে, শিক্ষাসহ সবক্ষেত্রে পুরুষের পাশাপাশি নারীকে সমমর্যাদা দিতে না পারলে কোনো উন্নতিই হবে না বরং উন্নতি ব্যাহত হবে। হ্যারিয়েট মার্টিনিয়্যু (১৮০২-১৮৭৬) তাঁর রচনার মাধ্যমে মেরি ওলস্টোনক্র্যাফটের পরিবর্তী ইংল্যান্ডের নারীসমাজকে সংগ্রামে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন। ভিক্টোরিয়া যুগে যখন নারীবাদী আন্দোলন তীব্র হয় সে সময় এ হ্যারিয়েট ১৮২১ সালে নারী শিক্ষা বিষয়ে লিখেছেন। তিনি নারীর শোচনী অবস্থার বর্ণনা করে বলেন, “শিক্ষা ছাড়া নারীর পরনির্ভরশীলতা ও নির্যাতন বন্ধ করা যাবে না।” পাশ্চাত্যের নারী আন্দোলন কর্মসূচীর উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল নারী শিক্ষার প্রসার ঘটানো এবং উচচ্তর শিক্ষায় নারীর সুযোগ বৃদ্ধি করা।


পাশ্চাত্যে যখনা নারী আন্দোলনের উদ্ভব হয় তখন নারীর নিজস্ব কোনো মর্যাদা ছিল না। সেজন্য নারী আন্দোলনকারীরা নারীর মর্যাদা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করেছেন। নারীর অমর্যাদা লক্ষ করে অনেক চিন্তাবিদ প্রতিবাদ করেছেন। তাঁদের মধ্যে ফরাসী ইউরোপীয় সমাজতন্ত্রী শার্ল ফুরিয়ে (১৭৭২-১৮৩৭) অন্যতম। তিনি নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করেছেন। ফরাসী বিপ্লব (১৭৮৯) দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে জ্যাঁ জ্যাক রুশোও সামাজিক অন্যায় সম্পর্কে মেরি ওলস্টোন ক্র্যাফটকে সাহার্য করেন। তৎকালীন সময়ে পাশ্চাত্যের সমাজে দাস প্রথা প্রচলিত ছিল। নারীদের পণ্যের মতো ক্রয়-বিক্রয় করা হতো। বিশেষ করে কৃষ্ণ সমাজে নারী সমাজ দাসী হিসেবে বিক্রি হয়ে অত্যন্ত অবমাননাকর জীবনযাপন করত। দাস ব্যবসা দূরীকরণের আন্দোলনে ১৮৩২ সালে আমেরিকার নারীসমাজ অংশ গ্রহণ করে। নারীর চারিত্রিক কমনীয়তা ও নারীত্বের ব্যাখ্যার মাধ্যমে নারীকে দাসত্বের শৃঙ্গখলে আবদ্ধ রাখার প্রয়াসকারীদের বিরুদ্ধে মেরি ওলস্টোনক্র্যাফট এবং তাঁর পরবর্তী নারী নেত্রীগণ আন্দোলন করেছেন্ কারণ ন্যায়ের দৃষ্টিতে প্রতিটি মানুষই সমান। লরেঞ্জ ডনস্টোন তাঁর ডড়সবহ ভৎড়স ঝঃধহফঢ়ড়রহঃ ড়ভ চড়ষরঃরপধষ ঊপড়হড়সু গ্রন্থে বলেন, “পুরুষ চায় এমন নারী যে শুধু তাকেই ভালোবাসবে। কেবল তাই নয়, যার স্পর্শ তাঁর ললাট স্নিগ্ধ করবে, সংসারে সুখ-শান্তি আনবে। হাজার রকম খুঁটিনাটি সমস্যার সমাধান করে সংসারকে সুন্দর করবে, সর্বোপরি নারীর অপুরূপ মহিমা তাঁর পারিবারিক জীবনকে মধুর উত্তাপে ভরে রাখবে।” এমন লেখকবৃন্দ নারীকে স্তুতির মাধ্যমে গৃহবন্দি রাখার চেষ্টা করেছেন। মেরি ওলস্টোনক্র্যাফট নারী সমাজকে এ ধরনের অপচেষ্টার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে আহবান জানান। মেরি ওলস্টোনক্র্যাফট তাঁর (১৭৯২) গ্রন্থদ্বয়ে নারীর অধিকার বিষয়ে জোরালো বক্তব্য তুলে ধরেন। তার সময়ে আইনত নারীর অধিকার স্বীকৃতি পেলেও তা বাস্তবায়ন করা ছিল কষ্টকর বিষয়। তথাপি তিনিই প্রথম নারী স্বীকৃতি পেলেও তা বাস্তবায়ন করা ছিল কষ্টকর বিষয়। তথাপি তিনিই প্রথম নারী সমাজকে ভোটাধিকারের জন্য সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করেন ও নারী সমাজের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনাবোধ জাগ্রত করেন।
চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here