পিতার বয়স ৪০ বছর অথচ ছেলের বয়স ১২০ বছর

5
594

বনী ইসরাঈল আল্লাহর নাফরমানি ও জুুলুম-অত্যাচারের সীমা অতিক্রম করলে, মহান আল্লাহ্ তাদের হিদায়েতের জন্য হযরত আরমিয়া (আ.)-কে প্রেরণ করেন। তিনি বনী ইসরাঈলকে আল্লাহর পথে আহ্বান করেন। কিন্তু তারা তাঁর কথায় কর্ণপাত না করে পূর্বাপেক্ষা অধিক নাফরমানি শুরু করে। তারা আল্লাহর এ নবির সাথে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে এবং তাঁকে বন্দি করে রাখে। এমতাবস্থায় হযরত আরমিয়া (আ.) তাদেরকে সতর্ক করে দেন যে, তারাও খুব শীঘ্রই বন্দি হতে যাচ্ছে; আর আল্লাহর সেই আযাব থেকে তারা যে নিজেদেরকে রক্ষা করতে পারবে না, তাও জানিয়ে দেন। এদিকে হযরত আরমিয়া (আ.)-এর এই ভবিষ্যদ্বাণী শীঘ্রই বাস্তবে রূপ নিল, প্রতাপশালী বাদশাহ বুখ্তে নসরের আবির্ভাব হলো। প্রবল শক্তির অধিকারী বাদশাহ বুখ্তে নসর পর পর তিনবার ফিলিস্তিনে হামলা করে বাইতুল মুক্বাদ্দাস ও ফিলিস্তিন অধিকার করে নেয়। বনি ইসরাঈলকে বন্দি করে গরু-ছাগলের ন্যায় তাড়িয়ে বাবেল শহরে নিয়ে যায়। বুখ্তে নসর বনী ইসরাঈলের উপর আক্রমণের সময় হযরত উযায়ের (আ.) পূর্ণ যৌবনে উপনীত। চল্লিশ বছর বয়সে হযরত উযায়ের (আ.)-এর অন্তরে মহান আল্লাহ্ ওহি নাযিল করতে শুরু করেন। নবুয়ত লাভ করার পর মহান আল্লাহ্ তাঁকে বাইতুল মুকাদ্দাসে প্রেরণ করেন। এ সময় মহান আল্লাহ্ তাঁকে বলেন- ‘‘হে উযায়ের! আমি পুনরায় বাইতুল মুকাদ্দাস আবাদ করার ইচ্ছা করছি। অতঃপর সে লক্ষ্যে হযরত উযায়ের (আ.) একটি গাধার পৃষ্ঠে আরোহণ করে রওনা হয়ে যান। সেখানে পৌঁছার পর ধ্বংসস্তূপ ছাড়া ঐ জনপদের আর কোনো চিহ্নই অবশিষ্ট দেখতে পেলেন না। এটা দেখে তিনি আশ্চর্যবোধ করলেন যে, আল্লাহ্ কীভাবে ধ্বংসস্তূপে পরিণত এ জনপদকে আবার আবাদ করবেন? আল্লাহ্ বলেন- ‘‘সে বলল-মৃত্যুর পর কীরূপে আল্লাহ্ একে পুনর্জীবিত করবেন?’’ (সূরা বাকারাহ ২: আয়াত ২৫৯) মহান আল্লাহ্ তাঁর এ প্রিয় বান্দাকে মৃত্যুর পর কিভাবে পুনর্জীবিত করবেন, সে নিদর্শন দেখাতে ইচ্ছা করলেন। আর এ নিদর্শন বাস্তবে রূপ দিতে তিনি হযরত উযায়ের (আ.)-কেই বেছে নিলেন। ফলে মহান আল্লাহ্ মুহূর্তেই হযরত উযায়ের (আ.)-কে মৃত্যু দিলেন। অতঃপর মৃত অবস্থায় ১০০ বছর অতিবাহিত করলেন। এদিকে এ দীর্ঘ সময় মহান আল্লাহ্ ধ্বংসস্তূপ থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস ও ফিলিস্তিনকে বের করে নিয়ে আসেন এবং পুনরায় ঐ জনপদকে আবাদও করে দেন।

অন্যদিকে ১০০ বছর মৃত অবস্থায় রাখার পর মহান আল্লাহ্ হযরত উযায়ের (আ.)-কে জীবিত করেন। আর জীবিত করার পর আল্লাহ্ বললেন- হে উযায়ের! আপনি কতকাল অবস্থান করলেন? জবাবে উযায়ের (আ.) বললেন- হে দয়াময় খোদা! আমি একদিন অথবা একদিনেরও কিছু কম সময় অবস্থান করেছি। আল্লাহ্ বলেন- না, বরং আপনি ১০০ বছর অবস্থান করেছেন। অতঃপর উযায়ের (আ.)-এর চোখের সামনে মহান আল্লাহ্ তাঁর মৃত গাধাটিকেও জীবিত করে দেন। তারপর উযায়ের (আ.) তাঁর গাধায় চড়ে নিজের মহল্লায় আগমন করলেন। কিন্তু মহল্লাহর বাসিন্দাদের এবং তাদের ঘরবাড়িসমূহ তিনি চিনতে পারলেন না। তিনি অনুমানের ভিত্তিতে নিজের বাড়িতে গিয়ে পৌঁছালেন। সেখানে পৌঁছে তিনি বয়সের ভারে অচল এক অন্ধ বৃদ্ধা মহিলার সাক্ষাৎ পেলেন। যার বয়স ছিল ১৪০ বছর। সেই ছিল উযায়ের (আ.)-এর স্ত্রী। উযায়ের (আ.) বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার সময় তার বয়স ছিল চল্লিশ। অর্থাৎ স্বামী ও স্ত্রী সমবয়স্কা ছিলেন। উযায়ের (আ.) অচল অন্ধ এ বৃদ্ধাকে জিজ্ঞেস করলেন- এটি কি উযায়েরের বাড়ি? বৃদ্ধা জবাব দিলেন-হ্যাঁ। কিন্তু আপনি কে? আমি তো এতদিন যাবৎ কাউকে উযায়ের (আ.)-এর নাম নিতে শুনিনি? তখন উযায়ের (আ.) বললেন- আমিই উযায়ের! আল্লাহ্ আমাকে ১০০ বছর মৃত অবস্থায় রাখার পর আবার জীবিত করেছেন। বৃদ্ধা বলল- উযায়ের (আ.) তো ছিলেন আল্লাহর নবি। তিনি অন্ধের দৃষ্টি শক্তি ফিরিয়ে দিতে পারতেন, আপনি যদি উযায়েরই হবেন, তবে আমার দৃষ্টি শক্তি ফিরিয়ে দিন। উযায়ের (আ.) অন্ধ বৃদ্ধা স্ত্রীর দৃষ্টিহীন চোখের উপর হাত বুলালেন। মহান রাব্বুল আলামিনের অপার দয়ায় মুহূর্তে সে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেল। সে চিনতে পারল যে, হ্যাঁ, সত্যিই এ আমার স্বামী, আল্লাহর নবি উযায়ের (আ.)। এ পর্যায়ে উযায়ের (আ.) বৃদ্ধ স্ত্রীর হাত ধরে বললেন- তুমি আল্লাহর নামে দাঁড়িয়ে যাও। মুহূর্তেই তিনি পূর্ণ সুস্থ হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন। এরপর উযায়ের (আ.)-এর স্ত্রী তার একমাত্র সাহেবজাদার সন্ধানে বের হলেন। তিনি ইহুদিদের এক মজলিসে গিয়ে নিজের বৃদ্ধ সন্তানকে খুঁজে পেলেন। অতঃপর সকলের সামনেই তিনি উযায়ের (আ.)-এর আগমনের সংবাদ দিলেন। উযায়ের (আ.)-এর বৃদ্ধ সন্তান সংবাদে দ্রুত বাড়ি ফিরে আসেন। ঘটনার আদ্যেপান্ত অবগত হয়ে সন্তান বলল-তবে কি আপনিই আমার পিতা? আমার পিতার দুকাঁধের মধ্যখানে তো চন্দ্রাকৃতির একটি কালো তিলক ছিল। অতঃপর সে পিতার কাঁধের মধ্যখানের ঐ চন্দ্রাকৃতির কালো তিলকটিও আবিস্কার করে নেয়। এ পর্যায়ে পিতা ও পুত্রের পরিচয় পর্ব সম্পন্ন হয়।

উল্লেখ্য, হযরত উযায়ের (আ.) ৪০ বছর বয়সে মৃত্যু মুখে পতিত হন। অতঃপর ১০০ বছর মৃত অবস্থায় থেকে পুনর্জীবন লাভ করেন। ফলে জীবিতকালের ঐ হিসাব অনুযায়ী তিনি যখন ৪০ বছর বয়সেই বাড়ি ফিরে আসেন, তখন তাঁর সন্তানের বয়স ১২০ বছরে পৌঁছে গেছে। মহাবিস্ময়কর এ ঘটনা ঘটিয়ে মহান আল্লাহ পুনরুত্থানের অনন্য নজির স্থাপন করেন। আল্লাহ্ বলেন- ‘‘এ ঘটনা এজন্য যে, (হে উযায়ের) আমি আপনাকে মানবজতির জন্য নিদর্শন বানাব।’’ (সূরা বাকারাহ ২: আয়াত ২৫৯)

বিশ্ববিখ্যাত অভিধানে মহান রাব্বুল আলামিনের আল-বা’ইছ নামের অর্থ করা হয়েছে- পুনরুত্থানকারী, পুনর্জীবনদানকারী, প্রেরণকারী, জাগ্রতকারী ইত্যাদি। এজন্য আমরা মহান রাব্বুল আলমিনের আল-বা’ইছ নামের অর্থ নিয়েছি- আল্লাহ্ পুনরুত্থান বা পুনর্জীবনদানকারী।

মূলে একজন মুসলমানকে মনে-প্রাণে ইমানের ৭টি মৌলিক বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের ঘোষণা দিতে হয়। আর তাহলো- ‘‘আমি বিশ্বাস স্থাপন করছি আল্লাহর প্রতি, তাঁর সকল ফেরেশতার প্রতি, তাঁর সকল নবি ও রাসুলের প্রতি, পরকালের প্রতি, ভাগ্যের ভালো ও মন্দ আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত তার প্রতি এবং মৃত্যুর পরে পুনর্জীবনলাভের প্রতি।’’ সুতরাং পুনরুত্থান প্রসঙ্গটি ইমানের সাথে অঙ্গাঅঙ্গীভাবে জড়িত। এজন্য এ বিষয়টির স্বরূপ জানা, অতঃপর সঠিক বিশ্বাস পোষণ করা এবং সে লক্ষ্যে নিজেকে প্রস্তু করা, প্রতিটি আশেকে রাসুল মু’মিনের জন্য অপরিহার্য কর্তব্য।


[তাফসীরে সূফী সম্রাট দেওয়ানবাগী ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬০৯ থেকে সংকলিত]

5 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here