পিরকে বাবা বলা এবং পিতামাতার জীবদ্দশায় পির ধরা কী জায়েজ?

0
593

পির ফার্সি শব্দ। এটির অর্থ জ্ঞানী, মুরুব্বি ও শিক্ষাগুরু। যেমন ফার্সি ভাষায় বলা হয় পির পয়গম্বর অর্থাৎ বার্তাবাহক নবি ও রাসুল, এবং পির-মোর্শেদ, শিক্ষাগুরু। প্রকৃতপক্ষে পির বলতে মোর্শেদকে বুঝায়। মহান আল্লাহ বলেন “আল্লাহ যাকে গোমরাহ করেন, আপনি কখনো তার জন্য কোনো (মোর্শেদ বা) পথপ্রদর্শনকারী অভিভাবক পাবেন না।” (সূরা আল কাহ্ফ ১৮ : আয়াত ১৭)


আসলে পির বা মোর্শেদ বলতে আমরা মারেফাতের শিক্ষাগুরু কামেল অলী-আল্লাহকে বুঝি। প্রত্যেক মানুষের ক্বালবের সপ্তম স্তরে আল্লাহর এক টুকরো নুর সুপ্ত অবস্থায় বিরাজ করে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন “আমি (আল্লাহ) তোমাদের ক্বালবের (সপ্তম স্তরে) নাফসির মোকামে বিরাজ করি, তোমরা কি দেখো না? (সূরা আয যারিয়াত ৫১: আয়াত ২১)


হিদায়েতের নুরের ধারক ও বাহক কামেল মোর্শেদ মুরিদকে সবক দেওয়ার সময় আপন সিনায় বিরাজমান জাগ্রত আল্লাহর নুরের বীজ মুরিদের ক্বালবে স্থাপন করেন। অতঃপর সাধনার মাধ্যমে মুরিদ নিজের ক্বালবে সুপ্ত আল্লাহর নুর জাগ্রত করে, প্রকৃত মু’মিনে পরিণত হয়। এ প্রসঙ্গে আমিরুল মু‘মিনীন, শেরে খোদা হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু বলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) এরশাদ করেন “আলেমগণ (আল্লাহতত্ত্বের জ্ঞানে জ্ঞানী) পৃথিবীর প্রদীপ এবং আম্বিয়ায়ে কেরামের প্রতিনিধি, কিংবা আলেমগণ আমার উত্তরাধিকারী এবং আম্বিয়ায়ে কেরামেরও উত্তরাধিকারী।” (তাফসীরে মাজহারী ১০ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৭)


শুক্রকীট থেকে দেহের জন্ম লাভ হয়। অনুরূপভাবে কামেল মোর্শেদের রূহানি ফায়েজ থেকে মুরিদের সুপ্ত নুর জাগ্রত এবং ক্রমান্বয়ে বিকশিত হয়ে পরিপূর্ণতা লাভ করে বলে পির বা মোর্শেদকে ‘আত্মিক পিতা’ বলা হয়। ফলে কুল-কায়েনাতের রহমত, বিশ্বনবি হযরত মুহাম্মদ (সা.) হলেন মু’মিনদের আত্মিক পিতা, যে কারণে ওহির বাণী আল কুরআনে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সম্মানিত স্ত্রীগণকে মু’মিনগণের মাতা বলা হয়েছে।
আল্লাহ বলেন “নবি (সা.) মু’মিনদের নিকট তাদের নিজেদের অপেক্ষা ঘনিষ্ঠতর এবং নবির স্ত্রীগণ মু‘মিনদের মাতা।” (সূরা আল আহযাব ৩৩: আয়াত ৬)
মায়ের স্বামী কি হয়? অবশ্যই পিতা। এ প্রসঙ্গে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন “হযরত মুহাম্মদ (সা.) হলেন তাদের পিতা, আর তাঁর স্ত্রীগণ হলেন তাদের মা।” (তাফসীরে রুহুল বয়ান ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৩৯)


সেই সাথে হযরত আবু হুরায়রাহ (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) এরশাদ করেন “নিশ্চয় আমি তোমাদের জন্য পিতার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। পিতার মতোই তোমাদেরকে শিক্ষা দেই। অতএব তোমাদের মধ্যে যখন কেউ শৌচাগারে যাবে, তখন সে যেন কেবলার দিকে মুখ না করে বসে, আর না কেবলার দিকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে বসে। আর কেউ যেন শৌচকার্যে ডান হাত ব্যবহার না করে।” (আবু দাউদ শরীফের সূত্রে তাফসীরে ইবনে কাছীর ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৭৪)


হাদিস শরীফে আরো বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহর রাসুল (সা.) শেরে খোদা হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহুকে উদ্দেশে বলেন “আমি ও তুমি এই উম্মতের পিতা।” (তাফসীরে রুহুল বয়ান ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৪০)
যতদিন দেহের অস্তিত্ব বিরাজ করে, দেহের পিতার সঙ্গে সম্পর্কের মেয়াদকালও ততদিন বিদ্যমান থাকে। পক্ষান্তরে আত্মা অমর। ফলে মৃত্যুর পরেও আত্মিক পিতা কামেল মোর্শেদের সাথে মুরিদের সম্পর্ক অব্যাহত থাকে। দৈহিক পিতা তথা দেহের জন্মদাতা পিতার সাথে সম্পর্ক ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আত্মিক পিতার সাথে সম্পর্ক চিরস্থায়ী। এজন্য মুসলিম জাতির আদি পিতা হযরত ইব্রাহীম খলিলুল্লাহ (আ.)-কে ওহির বাণী আল কুরআনে মুসলমানদের পিতা বলা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন “মিল্লাতা আবীকুম ইবরাহীমা, হুওয়া সাম্মাকুমুল মুসলিমীন।” অর্থাৎ- এটি তোমাদের পিতা ইব্রাহীম (আ.)-এর ধর্মাদর্শ। তিনি তোমাদের নাম রেখেছেন মুসলমান।” (সূরা আল হাজ্জ ২২: আয়াত ৭৮)


প্রকৃতপক্ষে আত্মার মুক্তিই মানুষের প্রকৃত মুক্তি। এজন্য আত্মার পিতাই প্রকৃত পিতা। নবুয়তের যুগে নবি ও রাসুলগণ মু’মিনদের আত্মিক পিতারূপে তাদের ক্বালবে ইমানের বীজ বপন করত, তাদেরকে আদর্শ চরিত্র শিক্ষা দিয়ে মু’মিনরূপে যেমন গড়ে তুলেছেন, তেমনি নবুয়ত পরবর্তী বেলায়েতের যুগে যুগের ইমাম, মোজাদ্দেদ ও আওলিয়ায়ে কেরামও মু’মিনদের আত্মিক পিতারূপে অনুরূপ ইমানের বীজ ক্বালবে প্রদান করে মু’মিনরূপে গড়ে তোলেন। এজন্য আল্লাহর রাসুল (সা:) এরশাদ করেন- “উলামাউ উম্মাতী কাআনবিইয়াই বানী ইসরাঈল।” অর্থাৎ- আমার উম্মতের আলেমগণ (আল্লাহ্তত্ত্বের জ্ঞানে জ্ঞানী) বনি ইসরাঈলের নবিদের মতো। (তাফসীরে রুহুল বয়ান ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৪৮)


মানুষের জন্য দু’টি হক বা কর্তব্য রয়েছে। একটি হাক্কুল্লাহ তথা আল্লাহর হক। আর অপরটি হলো হাক্কুল ইবাদ বা বান্দার হক। অর্থাৎ আল্লাহর হক আদায়ের পর পিতামাতার হক আদায়ের প্রশ্ন আসে। যেহেতু আল্লাহর হক আদায় তথা আল্লাহর পরিচয় লাভ করার জন্য কামেল মোর্শেদের বাইয়াত গ্রহণ করা অবশ্য কর্তব্য। যেহেতু পিতামাতা এ বিষয়ে সন্তানের জন্য মোর্শেদের প্রয়োজন পূরণ করতে সক্ষম নন, সেহেতু তাদের জীবদ্দশায় হলেও আত্মিক মুক্তির জন্য পির বা মোর্শেদের নিকট বাইয়াত গ্রহণ করতে হবে।


এ প্রসঙ্গে আল্লাহর রাসুল (সা.) এরশাদ করেন “যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলো যে, তার ঘাড়ে বাইয়াতের কোনো শিকল নেই অর্থাৎ সে জীবনে কোনো বাইয়াত গ্রহণ করেনি, তবে তার মৃত্যু হয়েছে জাহিলিয়্যাতের মৃত্যু।” (মুসলিম শরীফ ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২৮ এবং ই.ফা.বা কর্তৃক অনূদিত মুসলিম শরীফ ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৯৭ ও ৩৯৮)


প্রকৃতপক্ষে মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী। সন্তান যে পিতার পূর্বে মৃত্যুবরণ করবে না, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। ইমান নিয়ে মৃত্যুবরণ করা প্রত্যেক মানুষের একান্ত কাম্য। আর এজন্য যত শীঘ্র সম্ভব কামেল মোর্শেদের নিকট বাইয়াত গ্রহণ করা কর্তব্য। প্রকৃতপক্ষে প্রতিটি মানুষের দু’বার জন্ম হয়। যথা১। পিতার শুক্রকীট মায়ের ডিম্বকোষে মিলিত দেহের জন্ম হয়। (২) দ্বিতীয় জন্ম হয় কামেল মোর্শেদের সহবতে এসে মোর্শেদের ক্বালবের জাগ্রত আল্লাহর নুর থেকে নুর নিজের হৃদয়ে ধারণ করলে, এ নুর থেকে মানব অন্তরে নুরের শিশুর জন্ম হয়। আর এটি হায়াতে ওয়াহদানিয়্যাত বা তিফলুল মা‘আনী প্রকৃতপক্ষে এটিই ইমানের নুর। আর এজন্যই মোর্শেদকে ইমানের পিতা বলা হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here