প্রচলিত ধর্মীয় শিক্ষা ও বাস্তবতা

0
234

আশেকে রাসুল ফজলে রাব্বী মো. ফরহাদ
ধর্ম শব্দটি বিশ্লেষণ করলে জানা যায় যে, ধর্ম আসলে শুধুমাত্র কোনো আচার-অনুষ্ঠান বা রুসম-রেওয়াজের নাম নয়। ধর্ম অর্থ মর্ম ধারণ। আর মর্ম হলো মন ও মননে অনুধাবন করা। ধর্ম মানেই ধ্যানের মাধ্যমে উৎপন্ন জ্ঞান। এ জ্ঞান দুধরনের হতে পারে। যথা- কল্যাণকর ও অকল্যাণকর। কল্যাণকর জ্ঞান হলো- মহান আল্লাহ্ কর্তৃক উৎসারিত আর অকল্যাণকর জ্ঞান হলো শয়তান কর্তৃক উৎসারিত জ্ঞান। কবি বলেন ‘‘পৃথিবী পাপস্থান, অর্ধেক এর ভগবান আর অর্ধেক শয়তান।’’

অজানাকে জানাই হলো জ্ঞান, আল্লাহ তায়ালা বলেন- আল্লাহ মানুষকে সেই জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন, যা তাদের ছিল না। হযরত আদম (আ.) হতে শুরু করে হযরত মোহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত সকল নবি-রাসুলের শিক্ষা পদ্ধতি ছিল এক ও অভিন্ন। যা পরবর্তীতে তাঁদের উত্তরসূরী অলী-আল্লাহগণের মাধ্যমে অনন্তকাল বিদ্যমান থাকবে।
বর্তমানে আল্লাহ প্রদত্ত নবি-রাসুলগণের সেই চিরন্তন শিক্ষা ব্যবস্থার ধরন ও প্রকৃতি বিলুপ্ত প্রায়। প্রচলিত ধর্মীয় শিক্ষা ও সাধারণ শিক্ষা মূলত একই ধারায় চললেও দেখা যাচ্ছে, সাধারণ তথা জাগতিক শিক্ষা বাস্তবিক পক্ষে এক বিস্ময়কর ও অভাবনীয় উন্নতি সাধন করেছে। যার সুফল বিশ^ মানব ভোগ করছে। আজকের বিজ্ঞান মানুষের জাগতিক আকাক্সক্ষা বহুলাংশে পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে। পক্ষান্তরে ধর্মীয় শিক্ষা-পদ্ধতিগত ভুলের কারণে মূল লক্ষ্য তো দূরে থাক, জাগতিক সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যারিস্টার, দার্শনিক ও বিজ্ঞানী হয়ে বিপুল যশ ও সম্মানের অধিকারী হতে পারলেও ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গ মুহাদ্দিস, মুফাসসির, মুফতি, ইমাম ও মুয়াযযিন নামে অভিহিত হন। কিন্তু এর বাস্তব কোনো সুফল পরিলক্ষিত হয় না।

বর্তমান ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গের কল্যাণধর্মী পদচারণা সুনির্দিষ্ট একটা গণ্ডীর মধ্যেই আবর্তিত। ধর্মীয় শিক্ষার ধ্যান-জ্ঞান ও বিশ^াস কাল্পনিক জগতের এক স্বপ্নবিলাস। এরূপ ধর্মীয় শিক্ষায় জ্ঞানী-গুণী ও চিন্তাশীল ব্যক্তিবর্গ সামনে এগুচ্ছে না। কারণ একটাই আর তা হলো এ শিক্ষার গুণগত কোনো প্রকার প্রতিদান নেই। ধর্মীয় শিক্ষায় যুক্ত হচ্ছে সমাজের অনগ্রসর, অস্বচ্ছল, কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও সোনালী ভবিষ্যতের আশা বিবর্জিত শ্রেণী গোষ্ঠি।

আপনারা লক্ষ্য করলেই দেখবেন- এতিমখানা নামধারী রোজগারখানা কোনো স্কুল, কলেজ বা বিশ^বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে নেই। সবগুলো এতিমখানা ধর্মীয় শিক্ষাঙ্গন সংলগ্ন। অধিকাংশ ধর্মীয় শিক্ষাঙ্গন করবস্থান সংলগ্ন অর্থাৎ ধর্ম শিক্ষার চর্চা শুধুমাত্র কবর ও মউত ঘিরে। জগৎজীবন এর মধ্যে প্রাধান্য না পাওয়ায় এহেন দূরাবস্থায় পতিত হয়েছে।

কথিত আছে, বিদেশী এক গোয়েন্দা সংস্থার ভাষ্যমতে মুসলিমদের নিয়ে অগ্রসর হওয়া যাবে না। কারণ এদের ভাবনা শুধু কবর নিয়ে। এটি তো বেশিদিন আগের কথা নয়, মুসলিম সমাজে নারী শিক্ষা, ইংরেজি শিক্ষা ও আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা নিষিদ্ধ ছিল। বেগম রোকেয়া মুসরিম নারীদেরকে ও নবাবগণ ইংরেজি শিক্ষায় মুসলমানগণকে উদ্ধুদ্ধ করেছিলেন। অপরিকল্পিত ও অপরিণামদর্শী শিক্ষার ফলে ধর্মীয় শিক্ষালয় হতে কোনো বিজ্ঞানী বা দার্শনিক সৃষ্টি হচ্ছে না।

কবি বলেন- বিশ^ যখন এগিয়ে চলেছে, আমরা তখন বসে
বিবি তালাকের ফতোয়া খুঁজিছি, কুরআন হাদীস চষে।
মহান আল্লাহর নিকট আমাদের কৃতজ্ঞতা এজন্য যে, তিনি তাঁর প্রিয় বন্ধু একবিংশ শতাব্দীর সোজাদ্দেদ মোহাম্মদী ইসলামের পুনর্জীবনদানকারী, সূফী সম্রাট হযরত দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজানের মাধ্যমে বিলুপ্তপ্রায় ধর্মীয় জ্ঞান ও প্রগতিকে সংস্কার সাধন করে একটি নির্মল, প্রকৃত জ্ঞানধর্মী প্রগতিশীল ধর্মীয় ভাবধারা প্রচলন করাচ্ছেন, যার নাম ‘মোহাম্মদী ইসলাম’। সূফী সম্রাট হযরত সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদা দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজান তাঁর নিরলস প্রচেষ্টা ও নিরন্তন সাধনার মাধ্যমে বিশ^ মুসলিমের চেতনা দানকল্পে অজস্র লিখনী লিখে চলেছেন। তার অন্যতম হলো- ‘এজিদের চক্রান্তে মোহাম্মদী ইসলাম’ নামক গ্রন্থখানি। উক্ত গ্রন্থখানি মনোযোগ-সহ অধ্যয়ন করলেই ‘চক্রান্তের বেড়াজালে আবদ্ধ মাদ্রাসা শিক্ষা’ বিষয়টি যথার্থরূপে বোধগম্য হবে বলে আশা রাখি।

ধর্মীয় শিক্ষার সুফল না আসার মূলে হযরত রাসুল (সা.) বলেন- শরিয়ত আমার কথা, তরিকত আমার কাজ, হাকিকত আমার অবস্থা ও মারেফত আমার নিগূঢ় রহস্য। হযরত রাসুল (সা.)-এর মহাজ্ঞান চারটি স্তরে বিন্যস্ত। যথা- শরিয়ত, তরিকত, হাকিকত ও মারেফত। আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় উক্ত চারটি স্তর বিলম্বে হলেও প্রবর্তন হয়েছে। যথা- জ্ঞানমূলক, অনুধাবনমূলক, প্রয়োগমূলক ও উচ্চতর দক্ষতামূলক।
জ্ঞানমূলক : কী জান? এটি শরিয়ত।
অনুধাবনমূলক : কী ভাব? এটি হাকিকত।
প্রয়োগমূলক : কী করো? এটি তরিকত।
উচ্চতর দক্ষতামূলক: কী পেলে? এটি মারেফত।

সাধারণত আমরা মনে করি শিক্ষা মানে পুঁথিগত কিছু বক্তব্য মুখস্ত করে তা লিখে পেশ করা। প্রকৃতপক্ষে শিক্ষার সংজ্ঞায় বলা হয়েছে-যা শিক্ষা করলে মানুষের আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে তাই শিক্ষা। সম্প্রতি দেখা যায়, শিক্ষায় উক্ত গুণগত আচরণ খুব একটা পরিলক্ষিত হয় না। এর কারণ হচ্ছে মহান আল্লাহ প্রদত্ত ও হযরত রাসুল (সা.) প্রদর্শিত পদ্ধতির অনুশীলন না থাকা। নবি করিম (সা.)-এর সাহাবিগণ প্রচলিত শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন না। তদুপরিও তাঁরা বিশ^ মানবের আদর্শের নমুনা হয়ে রয়েছেন। হযরত রাসুল (সা.)-এর প্রতিনিধিত্বকারী অলী-আল্লাহগণও একই ধারায় তাঁদের শিক্ষা পদ্ধতি প্রয়োগ করে, যুগ যুগ ধরে পথহারা মানুষকে পথের সন্ধান দিয়ে, ইহলৌকিক কল্যাণ ও পারলৌকিক মুক্তির পথে উন্নতি করে চলেছেন।
প্রচলিত ধর্মীয় বিশ^াস পরিপূর্ণ নয়। যার বাস্তবতা কোনোক্রমেই জ্ঞান ও প্রজ্ঞাপ্রসূত নয়। যেমন কবর ও কবরের আযাব সম্পর্কিত বর্ণনাসমূহ সম্পূর্ণরূপে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে গৌণ ব্যাপার। পৃথিবীর দুই তৃতীয়াংশ মানুষের কবর হয় না। এক তৃতীয়াংশে মুসলিম এর মাঝেও দৈব ঘটনায় মৃত্যু বরণকারীগণের কবর হয় না। একই কবরে একাধিক ব্যক্তি শায়িত হওয়া, কবরে যাওয়ার পূর্বেই এর সকল প্রশ্ন জানিয়ে দেওয়া, কবরস্ত ব্যক্তিবর্গের দাফনের পরক্ষণেই লাশ স্থানান্তর হওয়া। এছাড়া বিভিন্ন পরীক্ষাগার ও ডাক্তারখানায় মানুষের পূর্ণাঙ্গ দেহ বা ভগ্নাংশ রক্ষিত থাকায় সওয়াল জওয়াব কীভাবে সংগঠিত হয় বা হবে, এ জাতীয় শতসহস্র প্রশ্নাবলির প্রাসঙ্গিক কোনো সদুত্তর আজ পর্যন্ত কোনো ধর্মীয় শিক্ষক বা পণ্ডিতবর্গ প্রদান করেননি। বরং যে সব জওয়াব পাওয়া যায়, তা রীতিমত অসংলগ্ন।

কবরে বড়ো বড়ো সাপ বিচ্ছু কামড়াবে কিন্তু যাকে বাঘ-ভাল্লুক বা কুমিরে খেল, তাকে সাপ-বিচ্ছু কোথায় কামড়াবে তা আজও জানা হয়নি। অথচ কুরআনে আল্লাহ বলেন- ‘‘আমার কুরআনে কোনো বিষয়েরই সদুত্তর বাদ পড়েনি।’’

পবিত্র কুরআনে বর্ণিত ঐ সকল রহস্যময় বিষয়গুলোর যথার্থ বর্ণনা থাকলেও ঐশীজ্ঞান বা ইলমুল ক্বালবের অর্থাৎ ইলমে তাসাউফের চর্চা বিলুপ্ত হওয়ায় তা আর নির্ণয় সম্ভব হয়নি। মহান আল্লাহ্র অপার দয়ায় উক্ত রহস্যময় বিষয়াবলির যথার্থ ব্যাখ্যা দানকল্পে সূফী সম্রাট হযরত দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজানকে মহান আল্লাহ আমাদের মাঝে প্রেরণ করেছেন। তাঁর প্রদত্ত ইলমে তাসাউফ যথার্থরূপে অনুশীলন করলে প্রকৃত ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব।

তাঁর অনবদ্য রচনা ‘আল্লাহ কোন পথে?’ পুস্তকখানা বিশ^ মানবের জন্য এক বিশেষ উপহার। ‘আল্লাহ কোন পথে?’ পুস্তকখানা প্রকাশ হওয়ার পর ঐশীজ্ঞান বা ‘ইলমুল ক্বালব’ বিবর্জিত তথা কথিত ধর্মীয় আলেম উলামাগণ তা অনুধাবন করতে পারেনি। কিন্তু জ্ঞানী-সুধীমহল তা উপলব্ধি করতে পারায়, সূফী সম্রাটের অগ্রযাত্রা অবিরাম ধারায় অব্যাহত রয়েছে এবং সুধীমহল ভূয়শী প্রশংসা করছেন। প্রচলিত ধর্মীয় শিক্ষা প্রান্তিক মানুষের সহযোগিতা পেলেও সমাজের রূপকার জ্ঞানী সুধী ও চিন্তাশীলদের কাছে ঘেষতে পারেনি। আপনারা লক্ষ্য করবেন ধর্মীয় শিক্ষালয়গুলো অধিকাংশই ছিন্নমূল সমাজেরই। সূফী সম্রাট হুজুর কেবলাজান আফসোস করে বলেন, মুসলিম জাতির সামগ্রী বিশ্বাস ভুলে ভরা। তিনি বলেন, আল্লাহ সম্পর্কে তাদের ধারণাটি সম্পূর্ণরূপে ভুল। যে আল্লাহ স্বরূপে চির বিরাজমান, সেই আল্লাহ নাকি নিরাকার। এই বিষয়টি তাদের ধর্মহীনতার উজ্জল ও উৎকৃষ্ট প্রমাণ। কবি বলেন-
‘‘আল্লাহতে যার পূর্ণ ইমান
কোথা সে মুসলমান?’’

আল্লাহতে বিশ^াস স্থাপনের পরই নামাজ, রোজা ও অন্যান্য উপাসনা ফলদায়ক হয়। যেমন ‘১’ সংখ্যাটি স্থাপিত হওয়ার পর যত ‘০’ শূণ্য ডানে বসবে প্রতিবারই ‘১০’ গুণ আকারে বর্ধিত হবে যথা-১০০০০০। আর ‘১’ বিহনে ডানের যত শূণ্যই বসানো হউক না কেন সর্বাবস্থায় ‘০’ ই থেকে যাবে।
সুতরাং আল্লাহতে বিশ^াসই মূলত ইমান। প্রচলিত ধর্মীয় শিক্ষায় আল্লাহ পাককে ভীতিকর, ভয়াবহ, যন্ত্রণাদায়ক, জ¦ালাময় ও নিষ্ঠুররূপে উপস্থাপন করা হয়েছে। অথচ প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ হলেন দয়াময়, করুণাময় ও মায়াময়। প্রচলিত ধর্মীয় শিক্ষা ভারতীয় ব্রাহ্মণ সংস্কৃতিরই আরবি রূপ। শাব্দিক পরিবর্তন সাধিত হলেও ভাবগত দিক প্রায়ই এক ও অভিন্ন। নীচে এর একটি তুলনামূলক ছক দেওয়া হলো-
হুজুর – পুরোহিত
মসজিদ – মন্দির
কুরআন – পুরাণ
দাঁড়ি-টুপি – পৈতা-টিকি

অনুরূপ অসংখ্য সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যায়। অনেকে মনে করেন ধর্মীয় সভ্যতা-সংস্কৃতির গৌরবময় ঐতিহ্য যা সুদূর অতীত। এ ধারণাটি সঠিক নয়। এখনো তেঁতুলে টক আছে, আখে মিষ্টি রয়েছে। সবই বিদ্যমান। কবি বলেন- চন্দ্র-সুর্য, গ্রহ-নক্ষত্রের কোনো বিবর্তন হয়নি, শুধুমাত্র মুসলিমদের ধ্যান-জ্ঞানে পরিবর্তন এসেছে। সূফী সম্রাট হযরত দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজান মূল ধারায়, হযরত রাসুল (সা.) প্রবর্তিত ধর্মীয় শিক্ষা-দীক্ষা, ধ্যান-জ্ঞান, চিন্তা-চেতনা ও সভ্যতা- সংস্কৃতি ফিরিয়ে এনেছেন। যার নাম মোহাম্মদী ইসলাম।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here