প্রথম জিন মডিফাইড মানব শিশু ও নৈতিকতা

0
255

দেওয়ানবাগ ডেস্ক: কিছুদিন আগেও চীনের শেনজেনের সাউদার্ন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক হি জিয়ানকুইকে খুব বেশি মানুষ চিনতো না। ইউটিউবে মাত্র একটি ভিডিও আপ্লোড করে রাতারাতি বিজ্ঞান মহলের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছেন এই বিজ্ঞানী।
মাত্র ৪ মিনিট ৪৪ সেকেন্ডের এই ভিডিওতে বিজ্ঞানী হি জিয়ানকুই দাবী করছেন প্রথমবারের মতো কৃত্রিমভাবে জিনেটিক পরিবর্তন আনা ডিএনএ নিয়ে পৃথিবীর বুকে জন্ম নিয়েছে দুই মানব সন্তান-লুলু আর নানা। ক্রিসপার প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই বিজ্ঞানী ও তাঁর দল পালটে দিয়েছে দুই জমজ কন্যার ডিএনএ সিকুয়েন্স। বিজ্ঞান মহলে জন্ম দিয়েছে আতঙ্ক ও বিতর্ক!
কেনো এত ভয় বা উদ্বেগ এই প্রযুক্তি নিয়ে? সহজ ভাষায় ক্রিসপার (বিজ্ঞান যাত্রার প্রবন্ধ) হচ্ছে এমন এক প্রযুক্তি যার মাধ্যমে ডিএনএ সিকুয়েন্সের যেকোনো অংশ বিজ্ঞানীরা নিজেরদের মনের মতো জিন দিয়ে পাল্টে দিতে পারবেন। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীতে পড়া নকশাকৃত মানবশিশু তৈরির হাতিয়ার হলো এই ক্রিসপার।


অবশ্য চীনের এই বিজ্ঞানী ও তাঁর দল এমনভাবে ডিএনএ সিকুয়েন্স পালটে দিয়েছে, যেন এই দুই মানব সন্তান মরণঘাতি এইডসের ভাইরাস, এইচআইভি দ্বারা আক্রান্ত না হয়। মানুষের প্রায় ২০ হাজার জিনের মধ্যে ঈঈজ৫ জিন এক ধরণের প্রোটিন তৈরি করে যা এইচআইভি মানুষের কোষে সংক্রমণের জন্য ব্যবহার করে। এই দুই জমজের পিতা একজন এইচআইভি আক্রান্ত রোগী। বিজ্ঞানী হি জিয়ানকুই ও তাঁর দল, ক্রিসপার প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভ্রুণ অবস্থায় ঈঈজ৫ জিন পরিবর্তন করে দিয়েছেন। যার দরুণ, দুই মানবশিশু এইচআইভি বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়েই জন্মেছে।
আপাতদৃষ্টিতে তাদের উদ্দেশ্য হিতকারী মনে হলেও বিশ্বজুড়ে কেন তবে উঠেছে নিন্দার ঝড়?
প্রথমত, ক্রিসপার প্রযুক্তি ব্যবহারে সবচেয়ে বড় বাধা হল “অফ-টারগেট মিউটেশন”। ডিএনএর জিনগুলো একে অপরের উপর বিভিন্নভাবেনির্ভরশীল। কোন জিনের সাথে কোন জিনের কতটা সম্পর্ক রয়েছে তার সম্পূর্ণ তথ্য এখনো আমাদের হাতে নেই। তাই, বিজ্ঞানীরা যদি কোন একটি জিন পালটে দিতে চায়, সেই জিনের উপর নির্ভরশীল অন্য জিনগুলো কী কী আর সেগুলো কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে, সে ব্যাপারে বিস্তারিত ধারণা থাকার লাগে। বিজ্ঞানী হি জিয়ানকুই যে জিনটির পরিবর্তন এনেছেন, সেই জিনের ব্যাপারে শুধুমাত্র একটি তথ্যই এখন অব্দি আমাদের জানা আছে। কিন্তু এই জিনের উপর নির্ভরশীল অন্য জিনগুলোর তালিকা যেমন আমাদের কাছে নেই, তেমনি এই জিনের অনুপস্থিতিতে কী ধরণের সমস্যা হতে পারে তাও আজও অজ্ঞাত। স্বাভাবিকভাবেই তাই উদ্বেগ ওঠে, দুই জমজ কন্যাকে এইডসপ্রতিরোধী করে জন্ম দিতে গিয়ে অন্য কোনো অজ্ঞাত মিউটেশন ঘটিয়ে ফেলা হল না তো?


দ্বিতীয়ত, সম্পূর্ণ পরীক্ষাটি নীতি বর্জিত। যেহেতু মানুষের জিনে পরিবর্তন আনলে তার ফলাফল কী হতে পারে সে ব্যাপারে আমরা অজ্ঞাত এবং সে পরিবর্তন মোকাবেলার মত প্রস্তুতি আজও আমাদের নেই, তাই যৌক্তিক কারণেই মানব-জিন নিয়ে খেলা করা পৃথিবীর অনেক দেশেই নিষিদ্ধ। চীনে মানুষের ভ্রুণেরস্টেম কোষে ১৪ দিন পর্যন্ত গবেষণার অনুমোদন আছে। এক্ষেত্রে নিশ্চিত করতে হয়, ব্যবহৃত ভ্রুণগুলোরগাঠনিকত্রুটিজনিত কারণে কোনোভাবেই পরিণত মানব হওয়া সম্ভব না এবং পরীক্ষার পর সেগুলোও ধ্বংস করে ফেলা বাধ্যতামূলক। বিজ্ঞানী হি ও তার দল সেই চরম মাত্রাকেই অতিক্রম করেছেন। হংকং এ হওয়া এক কনফারেন্সে তিনি জানিয়েছেন, এই পরীক্ষার ব্যাপারে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত অবগত ছিলো না।
তৃতীয়ত, বৈজ্ঞানিক যৌক্তিকতা। এরকম একটি বড় রকমের বৈজ্ঞানিক সফলতা ইউটিউবেরভিডিওর মাধ্যমে প্রচারকে কোনোভাবেবিজ্ঞানসম্মত বলে মানা যাচ্ছে না। এছাড়াও, হংকং এর কনফারেন্সে প্রদর্শিত তথ্যে রয়ে গেছে বেশ কিছু ফাঁক। যেখানে ডিম্বাণু নিষিক্ত করার আগে পিতার শুক্রাণুওয়াশ করেই ভ্রুণেএইচআইভির সংক্রমণ এড়ানো সম্ভব সেখানে স্বাস্থ্যকর স্বাভাবিক ভ্রুণেরডিএনএ তে পরিবর্তন আনার মতো ঝুঁকি নেয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। এই উত্তরে তিনি বলেছেন, তিনি মূলতঃ পিতা থেকে সন্তানের মাঝে এইচআইভি সংক্রমণ রুখার জন্য এই পরীক্ষা চালাননি, বরং এই দুই শিশু যেন ভবিষ্যতে কোনোভাবেএইচআইভিসংক্রমিত না হয়, সেই ব্যবস্থা করেছেন। অথচ একই কনফারেন্সে অন্য প্রশ্নের উত্তরে রোগহীন দুই মানবসন্তানের জন্মে অবদান রাখতে পারায় তিনি গর্বিত বলে অনুভূতি প্রকাশ করেছেন।


উল্লেখ্য মানুষের বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায়ক্রিসপার ব্যবহার নিয়ে গবেষণা এটিই প্রথম নয়, কিন্তু অন্য সকল গবেষণা যখন নীতিগত কারণে “সোমাটিককোষ”এই সীমাবদ্ধ, বিজ্ঞানী হি চেয়েছেনজন্মসূত্রেই রোগ প্রতিরোধকারী মানুষ তৈরির যাদের বংশধরেরাও এই নকশাকৃত জিনের বাহক হবে।
একেবারে সবাই যে সমালোচনায় মুখর তা কিন্তু না। মার্কিন জিনবিজ্ঞানী জর্জ চার্চ স্বাগত জানাচ্ছেন এই পরীক্ষাকে। তাঁর মতে, যেহেতু এইচআইভি প্রতিরোধ করার মতোভ্যাক্সিন বা সম্পূর্ণ নিরাময় এখনো আবিষ্কার হয়েনি, ক্রিসপারের এই ব্যবহার সময়ের দাবী। বিজ্ঞানী হি’র স্বচ্ছতা নিয়ে অবশ্য জর্জ চার্চ নিজেও নাখোশ।
এই পরীক্ষার জন্য শুরুতে সর্বমোট আট দম্পতি (পুরুষ এইচআইভি বাহক) স্বেচ্ছায় অংশ নিলেও পরে এক দম্পতি পিছুহটে। আরো একজন মা গর্ভধারণের প্রাথমিক ধাপে রয়েছেন। লুলু আর নানা প্রথম সফল ক্রিসপারবেবি। বিজ্ঞানী হি অবশ্য সফল “ক্রিসপারবেবি” পেতে মোট কতগুলো মানবভ্রুণ ব্যবহৃত হয়েছে আর কতগুলোই বা নষ্ট হয়েছে তা সম্পর্কে সঠিক কোন ধারণা দেননি। এমনকি তাদের ল্যাবের ওয়েবসাইটেও শুধুমাত্র সফল গর্ভায়ন এবং সন্তান জন্মদানের কথাই উল্লেখ করা হয়েছে।
এখন অব্দি, সম্পূর্ণ পরীক্ষাটি এখনো প্রশ্নবিদ্ধ অন্য কোন স্বাধীন মাধ্যম দ্বারা যাচাই হয়নি। যদিও বিজ্ঞানী হি জিয়ানকুই তাঁর নিজস্ব অর্থায়নে করা এই পরীক্ষা “একটি” বৈজ্ঞানিক পত্রিকায় প্রকাশের জন্য জমা দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন।

ফিরে যাই আলোচনার শুরুর দিকে উল্লেখিত বিতর্কে। যদি জন্মের আগেই একজন মানুষকে এইডসেরমতো জটিল রোগের প্রতিরোধ ব্যবস্থা দিয়ে দেয়া যায়। তাহলে কি তা আদতেই নীতি বহির্ভূত? একই সাথে যেহেতু রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়েই তারা জন্মেছে, তারা কি কিছু ক্ষেত্রে (স্বাস্থ্য বীমা কিংবা চাকুরি ক্ষেত্রে) অন্যান্যদের তুলনায় বেশি সুযোগ পেতে চলেছে না? আলোচনা ও সমালোচনা দুই-ই চলুক। একই সাথে চলতে থাকুক বিজ্ঞানের জয়যাত্রা!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here