বঙ্কিমচন্দ্রের দৃষ্টিতে চিত্তশুদ্ধি

4
496
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

মুহাম্মদ জহিরুল আলম
মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। মানবের যে অংশটুকু তার দেহের অস্তিত্ব ও সত্তার বিকাশ ঘটায়, তা আত্মা বা চিত্ত। খোদ আল্লাহ্র জাত-পাক থেকে আত্মার উৎপত্তি। আত্মা দেহকে সচল ও কর্মক্ষম রাখে। দেহের সাথে চিত্ত তথা আত্মার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলেই আমরা মৃত। অর্থাৎ জীবাত্মা ও পরমাত্মার সমন্বয়েই মানুষ। সুফি সাধকগণের মতে, জীবাত্মা দেহের কর্তা। তার শক্তি দ্বারাই দেহ নানা কাজ করে। জীবাত্মা যতক্ষণ কু-রিপুর তাড়নামুক্ত থাকে, ততক্ষণ সে পরমাত্মার অনুশাসন মেনে চলে। ততক্ষণ তার দ্বারা সৃষ্টিকর্তার নাফরমানিমূলক কোনো কাজ সংগঠিত হয় না। কিন্তু কু-রিপুর তাড়নায় জীবাত্মা যখন পরমাত্মার অনুশাসন অমান্য করে স্বেচ্ছাচারী হয়, তখন তার দ্বারা আল্লাহ্র নাফরমানীমূলক কাজ সংগঠিত হয়। তখনই মানুষ নিকৃষ্ট প্রাণিতে পরিনত হয়। আর অন্তরের পাপ, পঙ্কিলতা ও কুভাব দূর করে মনকে নির্মল করাই ‘চিত্তশুদ্ধি’।

সকল মহামানব ‘চিত্তশুদ্ধি’ বা ‘আত্মশুদ্ধি’ অর্জনের মাধ্যমে স্রষ্টাকে পাওয়ার পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছেন। অসীম দয়ালু আল্লাহ্ পবিত্র কুরআনে বলেন- “নিশ্চই সাফল্য লাভ করবে সে, যে আত্মশুদ্ধি লাভ করে।” (সূরা আল আ‘লা: আয়াত ১৪) দয়াময় আল্লাহ্ আরো বলেন- “যেদিন ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততি কোনো কাজে আসবে না, সেদিন উপকৃত হবে কেবল সে, যে আল্লাহ্র নিকট আসবে বিশুদ্ধ অন্তর নিয়ে।” (সূরা আশ শু‘আরা: আয়াত ৮৮ ও ৮৯) পরমাত্মার উপস্থিতিই মানুষকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। মানুষ যখন তার শ্রেষ্ঠত্ব হারিয়ে নিকৃষ্ট জীবের ন্যায় আচরণ করে, তখনই তার জন্য তথা সমাজের জন্য দুঃখ ও অশান্তি নেমে আসে। তাই প্রয়োজন চিত্তশুদ্ধি।

সাহিত্যে জীবন বিকাশের নৈপুণ্য সুন্দরভাবে ফুটে উঠে। উনিশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৮৯৪)। পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনায় জন্মগ্রহনকারী এ সাহিত্যিক প্রথম স্বার্থক বাংলা ঔপন্যাসিক। বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদান অসামান্য। তাঁর সম্পাদিত ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার মাধ্যমে তিনি পৃথক সাহিত্যের ধারা সৃষ্টি করেন। ঔপন্যাসিক হিসেবে অসামান্য অবদানের পাশাপাশি তিনি বেশ কিছু প্রবন্ধ রচনা করেন। তাঁর রচিত ‘চিত্তশুদ্ধি’ প্রবন্ধের মাধ্যমে তিনি মানব মনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে চেয়েছেন। সমকালীন সময়ে গীতার ব্যাখ্যাদাতা হিসেবে তিনি বিশেষ খ্যাতিমান ছিলেন। আমরা বঙ্কিমচন্দ্রের দৃষ্টিতে ‘চিত্তশুদ্ধি’ অর্থাৎ ‘আত্মশুদ্ধি’কে যদি বিশ্লেষণ করি তবে দেখতে পাই, তিনি ‘চিত্তশুদ্ধি’কেই ধর্মের মূল হিসেবে গণ্য করেছেন। তাঁর মতে ‘চিত্তশুদ্ধি’র তিনটি লক্ষণ রয়েছে, তা হলো ইন্দ্রিয় সংযম, পরার্থপরতা এবং ঈশ্বরে ভক্তি।

তাঁর বিশ্লেষণে ‘চিত্তশুদ্ধি’ অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। তিনি মনে করেন, “চিত্তশুদ্ধি থাকিলে সকল মতই শুদ্ধ, চিত্তশুদ্ধির অভাবে সকল মতই অশুদ্ধ। যাহার চিত্তশুদ্ধি নাই, তাহার কোনো ধর্মই নাই।… চিত্তশুদ্ধি কেবল হিন্দুধর্ম্মেরই সার, এমত নহে, ইহা সকল ধর্ম্মের সার। ইহা হিন্দুধর্ম্মের সার, খ্রীষ্টধর্ম্মের সার, বৌদ্ধধর্ম্মের সার, ইসলামধর্ম্মের সার, নিরীশ্বর কোমৎধর্ম্মেরও সার। যাঁহার চিত্তশুদ্ধি আছে, তিনি শ্রেষ্ঠ হিন্দু, শ্রেষ্ঠ খ্রীষ্টীয়ান, শ্রেষ্ঠ বৌদ্ধ, শ্রেষ্ঠ মুসলমান, শ্রেষ্ঠ পজিটিভিষ্ট্। যাঁহার চিত্তশুদ্ধি নাই, তিনি কোনো ধর্ম্মাবলম্বীদিগের মধ্যে ধার্ম্মিক বলিয়া গণ্য হইতে পারেন না। চিত্তশুদ্ধিই ধর্ম্ম।

সত্যিই, যার চিত্তশুদ্ধি নাই তার ধর্ম পালনের মূল্য কি? বঙ্কিমচন্দ্র চিত্তশুদ্ধি অর্জনের উপায়ও তুলে ধরেছেন। প্রথমেই তিনি ইন্দ্রিয় সংযম এর উপর গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, “চিত্তশুদ্ধির প্রথম লক্ষণ ইন্দ্রিয় সংযম। ‘ইন্দ্রিয় সংযম’ ইতি বাক্যের দ্বারা এমন বুঝিতে হইবে না যে, ইন্দ্রিয় সকলের একেবারে উচ্ছেদ বা ধ্বংস করিতে হইবে। ইন্দ্রিয়গণকে সংযত করিতে হইবে, কেবল ইহাই বুঝিতে হইবে।… ইন্দ্রিয়ের সংযমবিধিতে এমন বুঝিতে হইবে না যে, পেটে কখন খাইবেনা বা কেবল বায়ু ভক্ষণ করিবে বা কদর্য আহার করিয়া থাকিবে। শরীররক্ষার জন্য এবং স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য যে পরিমাণ এবং যে প্রকার আহারের প্রয়োজন, তাহা অবশ্য করিতে হইবে, তাহাতে ইন্দ্রিয় সংযমের কোন বিঘ্ন হয় না।” সকল ধর্মে সংযমের ক্ষেত্রে একই কথা বলে। ব্যক্তি জীবনে এর গুরুত্ব অপরিসীম, এ জন্য সংসার বিবাগী হওয়ার প্রযোজন নেই, সংসারে থেকেই তা অর্জন করতে হবে। প্রাবন্ধিক মনে করেন, “সংসারধর্ম্মেই ইন্দ্রিয় সংযম লাভ করা যায়। প্রত্যহ অরণ্যে বাস করিয়া ইন্দিয়তৃপ্তির উপাদান সকল হইতে দূরে থাকিয়া সকল বিষয়ে নির্লিপ্ত হইয়া, মনে করা যায় বটে যে, আমি ইন্দ্রিয়জয়ী হইয়াছি, কিন্তু যে মৃৎপাত্রে অগ্নিসংস্কৃত হয় নাই, সে যেমন স্পর্শমাত্র টিকেনা, এই ইন্দ্রিয়সংযমও তেমনি লোভের স্পর্শমাত্র টিকে না। যে প্রত্যহ ইন্দ্রিয়চরিতার্থের উপযোগী উপাদানসমূহের সংসর্গে আসিয়াছে, তাহাদিগের সঙ্গে যুদ্ধ করিয়া কখন জয়ী, কখন বিজিত হইয়াছে, সেই পরিশেষে ইন্দ্রিয় জয় করিতে পারিয়াছে।”

দ্বিতীয়ত, বঙ্কিমচন্দ্র পরার্থপরতাকে আরো বেশি গুরুত্ব প্রদান করেছেন। পরার্থপরতা ছাড়া চিত্তশুদ্ধি হয় না। শুধু ইন্দ্রিয় সংযম নয়, অপরের প্রতি ভালোবাসাও আবশ্যক। বর্তমান যুগে যার বড়ই অভাব। নিজের পাশাপাশি অপরের সুখ, স্বার্থকেও বিবেচনায় আনতে হবে। তাঁর মতে, “পরার্থপরতা ভিন্ন চিত্তশুদ্ধি নাই। যখন আপনি যেমন, পর তেমন, এই কথা বুঝিব, যখন আপনার সুখ যেমন খুঁজিব, পরের সুখ তেমনি খুঁজিব, যখন আপনা হইতে পরকে ভিন্ন ভাবিব না, যখন আপনার অপেক্ষাও পরকে আপনার ভাবিব, যখন ক্রমশঃ আপনাকে ভুলিয়া গিয়া, পরকে, সর্ব্বস্ব জ্ঞান করিতে পারিব, যখন পরেতে আপনাকে নিমজ্জিত রাখিতে পারিব, যখন আমার আত্মা এই বিশ্বব্যাপী বিশ্বময় হইবে, তখনই চিত্তশুদ্ধি হইবে।”

চিত্তশুদ্ধি অর্জনে বঙ্কিমচন্দ্র সবশেষে যে বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করেছেন তা হলো ঈশ্বরে ভক্তি। যিনি শুদ্ধির স্রষ্টা, যার দয়া ব্যতীত চিত্তশুদ্ধি লাভ করা সম্ভব নয়, সে পরম স্রষ্টার প্রতি ভক্তি থাকতে হবে। তিনি বলেন, “চিত্তশুদ্ধির গুরুতর লক্ষণ আছে। যিনি সকল শুদ্ধির স্রষ্টা, যিনি শুদ্ধিময়, যাঁহার কৃপায় শুদ্ধি, যাঁহার চিন্তায় শুদ্ধি, যাঁহার অনুকম্পা ব্যতীত শুদ্ধি নাই, তাঁহাতে গাঢ় ভক্তি চিত্তশুদ্ধির প্রধান লক্ষণ। ইন্দ্রিয়সংযমই বল, আর পরার্থপরতাই বল, তাঁহার সম্পূর্ণ স্বভাবের চিন্তা এবং তৎপ্রতি প্রগাঢ় অনুরাগ ব্যতীত কখনই লব্ধ হইতে পারে না। এই ভক্তি চিত্তশুদ্ধির মূল এবং ধর্মের মূল।”

আজ হতে প্রায় পৌনে দু’শ বছর পূর্বে এ মনীষী মানব, মানবিকতা ও মনুষ্যত্ব বিকাশে চিত্তশুদ্ধির কথা বলেছেন। যা সকল ধর্মেরও সার। তাঁর প্রবন্ধ শতবছর পর আজও প্রাসঙ্গিক। অন্তরকে পবিত্র করে সর্বপ্রকার অনৈতিক কাজ থেকে অন্তরকে মুক্ত ও নির্মল রাখাই চিত্তশুদ্ধি। বিশ্বাসীবান্দার পরিশুদ্ধ আত্মার মাঝে প্রভুর অস্তিত্ব বিরাজমান। তাই মানবজীবনে চিত্তশুদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠ এবং চমৎকার প্রবন্ধটি আজও মুক্তিকামী মানুষকে শুদ্ধতার ও প্রভু প্রেমের প্রেরণা দেয়।

4 COMMENTS

  1. আলহামদুলিল্লাহ! খুবই শিক্ষণীয় একটি পোস্ট।
    ইন্দ্রিয় সংযম, পরার্থপরতা ও ঈশ্বর ভক্তির সমন্বয়ে গঠিত চিত্তশুদ্ধির মাধ্যমে নিজের মানবিকতা ও মনুষ্যত্বের বিকাশ সাধন করা আমাদের প্রত্যেকেরই প্রয়োজন, যা আমাদের সৃষ্টিকর্তার প্রতি প্রেমময়ী হতে সহায়তা করে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here