বন্ধ পাটকল পাটচাষি এবং আমাদের কৃষির ভবিষ্যৎ

0
136

মোহাম্মদ সায়েদুল হক: সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বিজেএমসি ১ জুলাই ২০২০ তারিখ হতে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন সর্বশেষ ২৫টি পাটকল বন্ধ ঘোষণা করেছে। সরকারের হিসাব অনুযায়ী স্বাধীনতার পর বিগত পঞ্চাশ বছরে পাটকলগুলো লোকসান করেছে ১০ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে অনেকে সাধুবাদ জানিয়েছেন আবার কেউ কেউ বিরোধীতা করেছেন এবং প্রতিবাদ করেছেন। তবে কোনো পক্ষের যুক্তিই আমার কাছে পরিপূর্ণ মনে হয়নি। কারণ যে পণ্যের সাপ্লাই চেইন যত বিস্তৃত, সে পণ্যের ক্ষেত্রে যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রভাবও ততখানি বিস্তৃত। যেমন চা শিল্পের সাপ্লাই চেইনের চেয়ে আমার কাছে পাট শিল্পের সাপ্লাই চেইন অনেক বেশি বিস্তৃত এবং জাতীয় অর্থনীতির জন্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়।

এক পক্ষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু চাকরি হারানো প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিক। যেখানে দেশে প্রতি বছর ২৫ লাখ লোক শ্রম বাজারে প্রবেশ করছে সেখানে এই ২৫ হাজার সংখ্যাটা খুব বেশি নয়। আমার কাছে এর চাইতে গুরুত্বপূর্ণ হলো যে খাতটি এক সময় দেশের প্রধান রপ্তানি খাত ছিল সেই খাতটিকে তিলে তিলে ধ্বংস হতে দেওয়া। আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ৪০ লাখ কৃষকের নগদ আয়ের পথটি প্রায় বন্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছতে দেওয়া। সরকার পাটকল বন্ধ করে দেওয়ায় এখন পাট শিল্প পুরোপুরি চলে গেল গুটিকয়েক ব্যক্তির হাতে। সমগ্র পৃথিবীতে যাই ঘটুক আমাদের দেশে ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এক চোখে যতখানি রাষ্ট্র বান্ধব মনে হয় আরেক চোখে দেখলে মনে হয় ওরা রাষ্ট্রটাকেই জিম্মি করে রেখেছে। দেশের চার দশকের গামের্ন্টস খাত আর চামড়া শিল্প দেখলে ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের দেশপ্রীতি বা মানবসেবা নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন নেই। বিশেষ করে করোনাকালীন সময়ে আমরা যদি গামের্ন্টস কারখানা, বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকগুলোর দায়িত্বশীলতা দেখি তাহলে কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনের জন্য ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে এখনই আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। সরকার পাটকল বন্ধ করে দেওয়ায় আমার মনে হচ্ছে কৃষি শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় এখন মুছে যাবে। কৃষি বিশেষজ্ঞগণ দেশে উৎপাদিত ফসলকে নানা কায়দায় নানা দলে বিভক্ত করেন। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফসল দল হলো অর্থকরী ফসল। বাংলাদেশের ৪০ লাখ কৃষকের কাছে এখন পর্যন্ত একমাত্র অর্থকরী ফসল হচ্ছে পাট। এই ৪০ লাখ কৃষক পরিবার পাট বিক্রির পয়সা দিয়ে পরবর্তী ফসল চাষ করে;, ছেলে মেয়ের লেখা পড়ার খরচ দেয়; ঈদ এবং পূজা পার্বণ উদ্যাপন করে, চিকিৎসার খরচ মেটায়। পাট এমন একটি ফসল যা সময়মতো বিক্রি করতে না পারলে কৃষক ষোল আনাই ক্ষতিগ্রস্থ হয়। রপ্তানি ছাড়া পাটের বাজার মূল্য ধরে রাখার কোনো উপায় নেই। আমাদের প্রতিবছরের অভিজ্ঞতা হলো প্রয়োজনের তুলনায় দেশে কম পরিমাণে উৎপাদিত ফসল যেমন পেঁয়াজ, রসুন, আদা, ভূট্টা প্রভৃতির ক্ষেত্রে উৎপাদন মৌসুমে কৃষক যখন ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না তখন কি করে বিশ^াস করবো রপ্তানির জন্য উৎপাদিত একটি ফসল ব্যক্তি নিয়ন্ত্রণে থাকার পরও কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবে? শুধু অর্থনৈতিক দিক বিবেচনা করে নয় বরং পাট শিল্প বিষয়ক যে কোনো সিদ্ধান্ত নেবার আগে আমাদের বিবেচনা করতে হবে আমাদের কৃষির সার্বিক চাষ পদ্ধতি এবং উপযুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশ। কৃষক যখন পাট চাষ বন্ধ করে দিবে তখন মাটির উপর নেমে আসবে ভয়ংকর নির্যাতন। এখন পর্যন্ত পাটের জমিতে যে শস্যক্রমগুলো অনুসরণ করা হয় তা হলো আগাম তোষা পাট – রোপা আমন- গম শস্যক্রম; দেশী পাট – রোপা আমন – গম শস্যক্রম; পাট – মুলা – লাল শাক – আলু মিষ্টি কুমড়া শস্যক্রম;  পাট – রোপা আমন- আলু – ডাটা শস্যক্রম। নীতিনির্ধারকগণ না জানলেও কৃষক এবং কৃষিবিদরা জানেন শস্যক্রম চাইলেই সৃষ্টি করা যায় না। শস্যক্রম নষ্ট হওয়ায় এতোদিন পাট চাষের আওতায় থাকা জমিগুলোর ঊর্বরা শক্তি কমে যাবে। এর প্রভাব পড়বে অন্য ফসল উৎপাদনের উপর। ক্ষেত্র বিশেষে বেড়ে যাবে ফসল উৎপাদন খরচ। কমে যেতে পারে পাট চাষের আওতাভুক্ত ৮ লক্ষ হেক্টর জমির মোট ফসল উৎপাদন। নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশে বলছি শস্য আবর্তন হলো (ঈৎড়ঢ় জড়ঃধঃরড়হ ) একটি জমিতে রবি, খরিপ-১, খরিপ-২ মৌসুমে একই ফসল বা একই গোত্রের ফসল চাষাবাদ না করে ভিন্ন ভিন্ন মৌসুমে ভিন্ন ভিন্ন গোত্রের ফসল চাষ করা। এর ফলে মাটিতে বিদ্যমান এবং প্রয়োগকৃত সকল স্তরের পুষ্টি উপাদানের সঠিক ব্যবহার যেমন নিশ্চিত হয়, তেমনি ফসলের মাটি বাহিত রোগ, বীজ বাহিত রোগ, পোকা মাকড়ের আক্রমণ কম হয়; মাটির গঠন ও গ্রথন উন্নত হয় সর্বোপরি কৃষকের উৎপাদন খরচ কম হয়। এমনিতেই আমাদের মাটিতে জৈব উপাদানের পরিমাণ কাক্সিক্ষত মাত্রার চেয়ে বহুগুণে কম। যে কোনো ফসলের চেয়ে পাট গাছ থেকে অনেক বেশি পরিমাণ পাতা তৈরি হয় যা মাটিতে পুষ্টি উপাদান যুক্ত করে। অন্যদিকে এখনও প্রতি বছর লাখ লাখ টন পাটকাঠি জ¦ালানী হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে; ঘরের বেড়া তৈরীতে ব্যবহৃত হচ্ছে, চারকোল তৈরীতে ব্যবহৃত হচ্ছে। একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, বছরে যে পরিমাণ পাটকাঠি কম উৎপাদন হবে সেই পরিমাণ বন ধ্বংস হবে জ¦ালানী সরবরাহ করতে গিয়ে। পাট শিল্পে কেন এতো লোকসান তার কারণ আমাদের সকলের জানা। এটাও আমরা জানি ব্যক্তিমালিকানাধীন ২ শতাধিক পাটকল নিয়মিত লাভ করছে। তাই বলা যায় সদিচ্ছা থাকলে সরকারি পাটকলগুলো লাভজনক করা কোনো কঠিন কাজ নয়। আমার খুব দুঃখ হয়, যখন দেখি স্বাধীনতার ৫০ বছর পর শুধু পাটকল কেন সরকারের বহু প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য সত্যিকারের দায়িত্বশীল লোক খুঁজে পাওয়া যায় না। সরকারি হাসপাতাল, বিমান, রেল সব ক্ষেত্রেই একই কথা প্রযোজ্য। অলিতে গলিতে ক্লিনিক, উপজেলা, জেলা, বিভাগে সরকারি হাসপাতাল অথচ প্রতিবছর লাখ লাখ লোক হাজার হাজার কোটি টাকা চিকিৎসার জন্য ব্যয় করছে পাশ^বর্তী দেশে। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত রেল লোকসান করেছে ১৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। স্বাধীনতার পর ৪৮ বছরের মধ্যে ২৮ বছর লোকসান দিয়েছে বাংলাদেশ বিমান। আমরা রেল বন্ধ করছি না, বিমান বন্ধ করছি না তবে পাটকল কেন বন্ধ করলাম?  ২০১০ সালে দেশে প্রথম তোষা পাটের জীবনরহস্য উন্মোচন হলো। এরপর বিগত একটি দশক ধরে পাটের জাত উন্নয়ন, জীবনরহস্য উন্মোচন, পাট চাষ, পাট পণ্যের প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও উন্নয়ন নিয়ে অঢেল গবেষণা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম  দেখলাম। জানতে পারলাম পাট ও ছত্রাকের সাতটি জিনের পেটেন্ট পেয়েছে বাংলাদেশ। শুনে খুব আনন্দিত হলাম, বিশ^ বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নিয়ম অনুযায়ী এই উদ্ভাবন থেকে কোনো আয় হলে তার একটি অংশ বা রয়্যালটি বাংলাদেশ পাবে। যুক্তরাষ্ট্্র, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, হংকং এবং ইউরোপের ২৮টি দেশ এই পেটেন্টকে স্বীকৃতি দিলো। বাংলাদেশ পাট গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ওয়েব সাইটে প্রবেশ করে দেখতে পেলাম প্রতিষ্ঠান কর্তৃক উদ্ভাবিত ৩৭টি প্রযুক্তির নাম, গুণাগুণ বৈশিষ্ট্য, শিল্প পর্যায়ে এসবের প্রতিফলনের তালিকা। পত্রপত্রিকা থেকে জানতে পারলাম বাংলাদেশ থেকে কাঁচা পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি হয় যুক্তরাজ্য, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, তুরস্ক, ইরাক, সিরিয়া, মিশর, সৌদি আরব, জাপান, সুদান, ঘানা, রাশিয়া, চীন, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ভারত, ব্রাজিল, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়াসহ পৃথিবীর প্রায় ১১৮টি দেশে। তাই ভাবছিলাম তৈরী পোশাক শিল্পকে পেছনে ফেলে আবারও দেশের প্রধান এবং বৃহত্তম খাত হিসেবে ঘুরে দাঁড়াবে পাটশিল্প। আফসোস! পাট শিল্প টিকিয়ে রাখার কোনো রহস্য উদঘাটন হলো না। ১ জুলাই ২০২০ সাল থেকে বন্ধ হয়ে গেল সরকার পরিচালিত সর্বশেষ পাটকলগুলো। এমন একটি সময়ে পাটকলগুলো বন্ধ করা হলো যখন পৃথিবীব্যাপী পরিবেশবাদীরা পরিবেশ রক্ষার তাগিদে পলিথিন এবং সিনথেটিকের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করছে; ইউরোপের ২৮টি দেশে একযোগে পলিথিন ব্যবহার নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নিচ্ছে; পৃথিবীর অনেক দেশ ইতোমধ্যে পলিথিনের ব্যবহার সীমিত করে এনেছে সর্বোপরি পাট পণ্যের বিশাল বাজার তৈরীর সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। এখন আমাদের প্রয়োজন ছিল আমদানিকারকদের পছন্দ অনুযায়ী পাটপণ্য উৎপাদনের জন্য সমস্ত আয়োজন করা; আন্তর্জাতিক ও জাতীয় চাহিদা মোতাবেক পণ্য উৎপাদনে সক্ষমতা ও বৈচিত্র আনা। তা না করে কতিপয় কর্তাব্যক্তির সীমাহীন অসততা, দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনার কাছে নতি স্বীকার করে আমরা পাটকলগুলো বন্ধ করে দিলাম! আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আস্থাশীল যে, তিনি বন্ধ পাটকল, পাটচাষি আর আমাদের কৃষির ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত করতে যা যা করা প্রয়োজন তাই করবেন। সর্বশেষ আবেগের কথা বলি, আমরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়েছি, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়েছি, পরীক্ষার খাতায় লিখেছি ‘পাট কে কেন সোনালী আঁশ বলা হয়’? আমার বাড়ি শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ি। বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়, ময়মনসিংহে ভর্তি হয়ে কৃষিতত্ত্ব বিভাগের স্যারের কাছে প্রথম জানতে পারলাম নালিতাবাড়ি শব্দের জন্ম ‘নালিতা’ হতে। প্রাচীনকালে পাটকে ‘নালিতা’ বলা হতো। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ আপনি এমন উদ্যোগ গ্রহণ করুন, যাতে পাট শিল্পের মাধ্যমে আমরা গার্মেন্টস্ বা রেমিট্যান্সের মতো বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারি; আমাদের নতুন প্রজন্ম বিশ^াস করে পাট সত্যিকার অর্থেই সোনালী আঁশ।

লেখক: কৃষিবিদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here