বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা: নৈতিক চেতনা ও সভ্যতার ভবিষ্যৎ

0
19

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজুলল হক

পূর্ব প্রকাশিতের পর
ফ্যাসিবাদের গ্রাস থেকে মানবজাতিকে রক্ষা করার জন্য রোঁমা রোঁলা, ম্যাক্সিম গোর্কি ও অঁরি বারবুসের আহ্বানে ১৯৩৫ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত প্রগতিবাদী লেখকদের এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গড়ে তোলা হয়েছিল International Association of Writers for the Defence of Culture Against Facism. ওই সংগঠনের ধারাবাহিকতায় সেদিন কলকাতায় গড়ে উঠেছিল প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘ – যার শাখা ঢাকা শহরেও অত্যন্ত সক্রিয় ও কার্যকর ছিল। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও তার সহযোগীরা সভ্যতার বিরুদ্ধে- সংস্কৃতির বিরুদ্ধে- যে দুষ্কর্ম চালিয়ে যাচ্ছে, তার প্রতিকার ও জনগণের প্রগতির পথকে উন্মুক্ত করার জন্য পৃথিবীর সব রাষ্ট্রের বিবেকবান চিন্তাশীল ব্যক্তিদের আজ গড়ে তোলা দরকার তেমনি একটি সংগঠন। দরকার ওই মনীষীদের চরিত্রবলের মতো চরিত্রবল। মনুষ্যত্বকে বাঁচিয়ে রাখা ও শক্তিশালী করার জন্য এবং নৈতিক শক্তিকে পুনর্গঠিত করার জন্য এই ধরনের সংগঠনের প্রয়োজন আজ অতীতের যে-কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। পৃথিবীর সব রাষ্ট্রে উচ্চশ্রেণির লোকেরা মন-মানসিকতার দিক দিয়ে পাশবিক হয়ে উঠছে আর অবশিষ্ট শতকরা নব্বইভাগ মানুষ বহুমুখী চাপে নিস্পিষ্ট হতে হতে প্রাণহীন যন্ত্রের মতো হয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ও তার সহযোগীদের পশুশক্তির বিরুদ্ধে সারা দুনিয়ার মানবশক্তির সার্বিক জাগরণ আজ একান্ত দরকার। বিশ্বব্যাপী মানুষের চেতনার অন্তর্গত ঘুমন্ত নৈতিক শক্তিকে জাগিয়ে তুলতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের ও আগ্রাসী পশ্চিমা রাষ্ট্রসমূহের জনসাধারণের নৈতিক চেতনাকেও জাগাতে হবে। বুশ, ব্লেয়ার ও তাদের অনুসারীদের নেতৃত্বে যে মানবতাবিরোধী, সভ্যতাবিরোধী, সংস্কৃতিবিরোধী এটা তাদের দেশের জনগণকেও বুঝিয়ে দিতে হবে। মানবজাতির জন্য সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার এই যে, গোটা পৃথিবীতেই বুদ্ধিজীবী বলে অভিহিত ব্যক্তিদের আজ নৈতিক দিক দিয়ে দুর্বল দেখা যাচ্ছে। ব্যতিক্রম সব জায়গাতেই থাকে, আমি ব্যতিক্রমের কথা বলছি না, বলছি সাধারণ অবস্থার কথা।


নৈতিকতা সমস্যা বিবেচনার সময়ে মানুষের মনের বস্তুগত ভিত্তির দিকেও অবশ্যই দৃষ্টি দিতে হবে। সর্বজনীন কল্যাণের ধারায় নৈতিক পরিবর্তনের স্থায়িত্বের জন্য মনের বস্তুগত ভিত্তিরও পরিবর্তন ঘটাতে হবে। নিছক মানসিক পরিবর্তন স্থায়ী হয় না। মনের অপরিহার্য দুই ভিত্তি:
এক. ইন্দ্রিয়, স্নায়ুতন্ত্র ও মস্তিষ্ক – এক কথায় অন্তর্জগত:
দুই. সামাজিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশ – এক কথায় বহির্জগত।


দুটোই বস্তু দিয়ে গড়া। এক সঙ্গে এই দুই বস্তুভিত্তি ছাড়া কোনো রকম মনেরই অস্তিত্ব নেই। বাইরের কোনো কিছু কর্মেন্দ্রিয়, জ্ঞানেন্দ্রিয় ও স্নায়ুতন্ত্রীর মধ্য দিয়ে মস্তিষ্কে সাড়া না জাগালে কোনো প্রকার মনের, কিংবা কোনো প্রকার চেতনার, অথবা কোনো প্রকার বোধ-বুদ্ধির অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। অন্তরিন্দ্রিয় মস্তিষ্ক ছাড়া আর কিছু নয়। যা-কিছু মানুষের অস্তিত্বকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করে, সেই সব-কিছু নিয়েই মানুষের পরিবেশ এ অবস্থায়, নৈতিক উন্নতির জন্য মন-মানসিকতার পরিবর্তনের সঙ্গে অবশ্যই পরিবেশেরও অনুকূল পরিবর্তন ঘটাতে হবে – আইন-কানুন, প্রথা-পদ্ধতি ও আর্থ-সামাজিক-রাষ্ট্রিক ব্যবস্থা পরিবর্তন করতে হবে। কেবল মনের পরিবর্তন নিয়ে চলতে চাইলে পারা যায় না – তাতে উন্নতির বা প্রগতির প্রয়াস ব্যর্থ হয়। সামাজিক পরিবেশের সঙ্গে প্রাকৃতিক পরিবেশকেও ধরতে হবে। কার্যকর নৈতিক উন্নতির জন্য কাজের সীমা ঠিক মতো নির্ধারণ করতে হবে।


প্রচলিত বিশ্বায়নের পরিবর্তে বিশ্বপরিসরে মানবজাতিকে জাতীয়তাবাদ ও তার সম্পূরক আন্তর্জাতিকবাদের ভিত্তিতে পুনর্গঠিত করতে হবে। জাতিরাষ্ট্রকে উন্নত নৈতিক চেতনা দিয়ে প্রগতির পরিকল্পনা ও কর্মসূচি নিয়ে পুনর্গঠিত করতে হবে। এক রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে অন্য রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। সামরিক আয়োজন ও অস্ত্রের উৎপাদন কমাতে হবে। সভ্যতার ধারায় জনগণের গণতান্ত্রিক বিশ্বসরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বিশ্বসরকারের পরিচালনা এটিমাত্র সেনাবাহিনী রেখে বাকি সকল বাহিনী বিলুপ্ত করতে হবে। সকল কর্মকান্ডের মধ্যে নৈতিক বিবেচনাকে কেন্দ্রীয় গুরুত্ব দিতে হবে। কর্তব্য নির্ধারণের সময়ে বিবেচনা করতে হবে যে, কায়েমি স্বার্থবাদীদের নৈতিক বিবেচনা আর জনগণের নৈতিক বিবেচনা ভিন্ন প্রকৃতির। নৈতিক ব্যাপারে অনেক জটিলতা আছে যেগুলো নিয়ে পৃথিবীর কোথাও কোনো আলোচনাই নেই। অর্থনীতিবিদেরা নৈতিক বিষয়কে বিবেচনা ধরেন না। কেবল ডলার কিংবা টাকার হিসেব দিয়ে তাঁরা উন্নয়ন পরিমাপ করেন। সামাজিক ন্যায়-অন্যায়কে তারা বিবেচনাযোগ্য বিষয় মনে করেন না। জাতিসংঘ বিশ্বসরকারে রূপান্তরিত হতে পারত। কিন্তু জাতিসংঘ হয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছাধীন সংঘ।


নৈতিকতা সম্পর্কে সচরাচর যেসব গঁৎবাঁধা কথা বলা হয় সেগুলোর কোনো কার্যকারিতা নেই। ধর্ম সম্পর্কে দুই হাজার বছর আগের রোমান দার্শনিক সেনেকার উক্তি স্মরণযোগ্য: Religion is regarded by the common people as true, by the wise as false and by the rulers as useful. নৈতিক বিবেচনা সম্পর্কেও এই উক্তি সম্পূর্ণ প্রযোজ্য। নৈতিক বিষয়ে ভালো ভালো কথা বলাকে শাসকেরা খুব useful মনে করেন।

নীতিবিদ্যা মূলত মনোবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের তথ্যাদির উপর প্রতিষ্ঠিত। তা-ছাড়া ইতিহাসের দিক থেকেও নৈতিক বিষয়গুলোকে দেখা হয়। বিষয়টিকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক করে রাখা হয়েছে। নীতিবিদ্যাকে প্রসারিত করা দরকার মানবজাতির আর্থ-সামাজিক-রাষ্ট্রিক সবরকম কর্মকান্ডের ভেতরে। নীতিবিদ্যাকে value-free academic study-তে সীমাবদ্ধ রেখে সুফুল কী? নৈতিক সমস্যার বিচারে অবশ্যই গ্রহণ করা দরকার শাসক শ্রেণি অতিক্রম করে সর্বজনীন কল্যাণের বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি। শতকরা দশভাগ লোকের জীবনে সীমাহীন প্রাচুর্য আর শতকরা নব্বইভাগ লোকের জীবনে সীমাহীন বঞ্চনা ও দারিদ্র্য – এর পেছনে যে নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তার প্রকৃতি কী? এই প্রাচুর্য ও বঞ্চনার মর্মে নিহিত অপরাধের ফলেই আত্মপ্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র কথিত fundamentalist ও terrorist-রা। অন্যায় করা এবং অন্যায় সহ্য করা দুটোই অপরাধ। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা ও রাষ্ট্রব্যবস্থা বহাল রেখে কথিত fundamentalist-দের আর কথিত terrorist-দের হাত থেকে রেহাই পাওয়া কি সম্ভব? বাংলাদেশে প্রচলিত ব্যবস্থা বহাল রেখে justice ইনসাফ ন্যায় না বাড়িয়ে র‌্যাব, ক্লিন হার্ট অপারেশন, এনকাউন্টার, ক্রসফায়ার ও বন্দুকযুদ্ধ দিয়ে কি সমস্যার সমাধান হচ্ছে? বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় এক দিকে দেখা যাচ্ছে কথিত সন্ত্রাস দমনের জন্য বিচার বহির্ভূত হত্যাযজ্ঞ ও যুদ্ধ, আর অপর দিকে দেখা যাচ্ছে কথিত human rights-এর জন্য মায়াকান্না ও কথিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ।


৮। মানুষের মধ্যে দুঃখ, বঞ্চনা, ভয়, ঘৃণা ও অশান্তি সৃষ্টির শক্তি যেমন আছে, তেমনি আছে সম্প্রীতিময়, সুখকর, আশাপ্রদ, সমৃদ্ধ, সুন্দর অবস্থা সৃষ্টির শক্তিও। মানুষ প্রেমময় এবং প্রেমের ভিখারি। মানুষের অন্তর্গত শুভকর শক্তিটিকে আজো ভালো করে কাজে লাগানো যায়নি। তবু যেটুকু গেছে তা থেকেই বোঝা যায়, এক উন্নত পৃথিবীতে মানুষের জীবন ও পরিবেশ কত সুন্দর হতে পারে। মানুষ যদি সম্মিলিতভাবে সামাজিক গুণাবলিকে পূর্ণমাত্রায় বিকশিত করতে, সেই সঙ্গে পরিবেশকে উন্নত করতে সচেষ্ট হয়, তাহলে মানুষ এমন এক উচ্চতায় পৌঁছবে যা আজ আমরা কল্পনাও করতে পারি না। দারিদ্র্য, ভয়, রোগ-শোক, অন্যায়, অপ্রেম ও নিষ্ঠুরতা লোপ পাবে এবং আশা, সাহস, সম্প্রীতি, সৃষ্টিশীলতা ও প্রগতিশীলতা অবসান ঘটাবে অন্ধকার রাত্রির। মানুষের জীবন হয়ে উঠবে প্রেমময়। সম্প্রীতির কিছু মূল নীতি, সকলেরই জানা, তবু স্মরণ করিয়ে দিতে চাই;

১। সবকিছু জানতে গেলে সকলকেই ক্ষমা করতে হয়। To know all is to pardon all.
২। নিজে বাঁচুন এবং অন্যদের বাঁচতে দিন। Live and let others live.
৩। ভালোবাসুন এবং ভালবাসা লাভ করুন। Love and be loved.
৪। নিজের জন্য যা পছন্দ করেন, অন্যের জন্যও তাই পছন্দ করবেন। নিজের জন্য যা পছন্দ করেন না, অন্যের জন্যও তা পছন্দ করবেন না।

বিশ্বব্যবস্থা, রাষ্ট্রব্যবস্থা ও জীবপ্রণালিতে মৌলিক পরিবর্তন সাধন করতে হবে। তার জন্য কাজ করতে হবে। চিন্তা ও কাজ দুইই লাগবে। যে ব্যবস্থা বিরাজ করছে তাতে উন্নত পরিবেশ সৃষ্টির কোনো সংক্ষিপ্ত কিংবা সহজ উপায় নেই। বাংলাদেশের জনগণের জন্য একটি কর্মসূচি ও কর্মনীতি প্রণয়নের সামান্য চেষ্টা আমার আটাশ দফা: আমাদের মুক্তি ও উন্নতির কর্মসূচিতে আছে। আমার ধারণা, সেই ধারায় মুক্তি ও উন্নতির উপায় খুঁজতে হবে পৃথিবীর প্রতিটি রাষ্ট্রের জনসাধারণকে। যে সভ্যতার সংকটে মানবজাতি এখন আছে, তা থেকে মুক্তির উপায় সেটাই। এর জন্য প্রত্যেক রাষ্ট্রেই বিবেকবান চিন্তাশীল কিছু ব্যক্তিকে অগ্রযাত্রীর দুঃসাহসী ভূমিকা পালন করতে হবে। কেবল ছোটো-কিছুতে মনোযোগী হলে সুফল বিশেষ হবে না, বৃহত্তর ও বৃহত্তম পরিমন্ডলের দিকেও দৃষ্টিকে প্রসারিত করতে হবে। নতুনভাবে চিন্তা ও কাজ আরম্ভ করতে হবে। আরম্ভটা আমরা আমাদের এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও করতে পারি। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী সবার জীবন অনেক সুন্দর হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্র ও সমাজকে উন্নত করার জন্য অনেক কিছু করতে পারে, বিশ্বব্যবস্থাকে উন্নত করার কাজেও পালন করতে পারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।


হীনমন্যতাবোধ সজ্ঞানে ত্যাগ করতে হবে। অভ্যস্ত আচরণের বাইরে যেতে হবে। কন্টকাকীর্ণ পথ অতিক্রম করতে হবে। সাহস চাই। একা একলা নিঃসঙ্গ মানুষ দুর্বল, অসহায়, অপূর্ণ। নিঃসঙ্গ দুর্বল অসহায় ও অপূর্ণ থাকা অন্যায়। সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া আর দায়িত্ব পালনের জন্য সংগঠিত হওয়া প্রত্যেকের এবং সকলের কর্তব্য। সাফল্যের মর্মে থাকে সঙ্কল্প ও সঙ্ঘশক্তি, সাধনা ও সংগ্রাম। সাধনা ও সংগ্রাম চালিয়ে গেলে পরাজয় নেই। কাল নিরবধি, পৃথিবী বিপুলা। এক প্রজন্মে না হলে প্রজন্মের পর প্রজন্মের চেষ্টায় হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here