বর্তমান লকডাউন পরিস্থিতিতে ও রমজান মাসে কোষ্ঠকাঠিন্য এবং এর প্রতিকার

0
340

ডা. মো. মাহমুদুল হাসান পান্নু
ইতিমধ্যে আমরা রমজানের ছয়টি রোজা অতিবাহিত করেছি। এই পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহ্ তায়ালার ইবাদত বন্দেগি করার জন্য সুস্থ থাকাটা একান্ত জরুরি। সুতরাং এই সময়ে স্বাস্থ্য সচেতন থাকলে এই পবিত্র মাসে সুন্দরভাবে ইবাদত বন্দেগি করা সম্ভব।

এই পবিত্র রমজানে আমাদের খাদ্যাভ্যাসে কিছুটা পরিবর্তন আসার কারণে অনেকেই কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগেন। সারাদিন রোজা রাখার জন্য পানি পান করা হয় না। তাছাড়া, ইফতারির সময় আমরা বিভিন্ন ভাজাপোড়া জাতীয় খাবার বেশি খাই এবং সেহেরিতেও আমরা আঁশযুক্ত খাবার কম খাই, উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবার বেশি খাই। ফলে প্রায় সব রোজাদারেরই রমজানে কিছুটা কোষ্ঠকাঠিন্য হয়ে থাকে। তাছাড়া, বর্তমানে এই লকডাউন পরিস্থিতির কারণে এই রমজানে আমরা সারাদিন একরকম কাজ ছাড়াই ঘরে বসে আছি। ফলে, খাবার-দাবার পরিপাকেও বিঘ্ন ঘটছে। এর ফলে রমজানে পায়ুপথের বিভিন্ন রোগের প্রকোপ কিছুটা বেড়ে যায়। বিশেষ করে পাইলস ও এনালফিসার নামক এই দু’টি রোগ এই সময় বেশি হয়ে থাকে।

কোষ্ঠকাঠিন্যের জন্য মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দিয়ে মলত্যাগ করতে হয়, যার ফলে মলদ্বারের রক্তনালীসমূহ ফুলে যায় এবং কোনো কোনো সময় রক্তনালী ছিড়ে যায়, ফলে রক্তপাত হয়। একেই পাইল্স (Piles বা Haemorrhoids) বলে। এছাড়া মল যখন খুব কঠিন হয়, তখন অতিরিক্ত চাপ দিয়ে মলত্যাগের কারণে মলদ্বার ছিড়েও যেতে পারে এবং এতে অনেক সময় তীব্র ব্যাথাসহ কিছুটা রক্তপাত হয়। ব্যাথার জন্য রোগীর দৈনন্দিন কাজের ব্যাঘাতও ঘটতে পারে। একে এনাল ফিসার (Anal fissure) বলে। সমীক্ষায় দেখা গেছে রমজান মাসে অনেক রোগী নতুন করে পায়ুপথের এই পাইল্স ও এনাল ফিসার এর মতো রোগগুলোতে আক্রান্ত হয়। অপরদিকে পুরাতন রোগী যারা ইতিমধ্যে পাইলস ও এনাল ফিসার রোগে ভুগছেন রমজানে তাদের রোগের প্রকোপ আরও বেড়ে যায়। মলত্যাগের সময় রক্তপাত ও তীব্র ব্যাথার কারণে রোগীকে অনেক সময় রোজা ভেঙ্গে ফেলতে হয় বা রোগী রোজা রাখতে পারেন না। ফলে অনেকেই রমজানের নেয়ামত থেকে বঞ্চিত হন।

তাহলে এ থেকে বাচার উপায় কী? এ থেকে পরিত্রাণের উপায় হলো:

  • রমজানে যথাসম্ভব ভাজাপোড়া কম খাবেন। ইফতারির পর থেকে সেহেরি পর্যন্ত সময়ে প্রচুর পানি পান করবেন। বেশি করে ফলমূল খাবেন। রাতের খাবারে শাকসবজি ও আঁশযুক্ত খাবার বেশি খাবেন।
  • নিয়মিত মলত্যাগের অভ্যাস গড়ে তুলুন। “DON’T MAKE A DEDICATORY CALL AS A MISS CALL” অর্থাৎ, মলত্যাগের বেগ আসলে ধরে না রেখে যত দ্রুত সম্ভব মলত্যাগ করুন।
  • যাদের পূর্বে থেকেই কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা আছে তারা প্রথম থেকেই সতর্ক হোন। মল নরম করার জন্য রমজান মাস জুড়ে ইসবগুলের ভূষি খেতে পারেন। এটা বাজারে খোলা অবস্থায় পাওয়া যায় আবার ওষুধের দোকানে প্যাকেট আকারেও পাওয়া যায়। ইফতাররের সময় ও সেহেরি খাবার পর এক চামচ ইসবগুলের ভূষি এক গ্লাস পানিতে গুলিয়ে সাথে সাথে পান করুন।
  • যাদের পূর্ব থেকেই পায়ুপথের বিভিন্ন রোগ আছে তারা রমজানের শুরুতেই একজন কলোরেক্টাল সার্জন এর কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে রাখুন।

রমজানে যদি কারো নতুন করে পায়ুপথের কোনো সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে অবশ্যই একজন কলোরেক্টাল সার্জনের পরামর্শ নিন। রোগের বিষয়ে লজ্জার কিছু নেই। অনেকে মহিলা রোগী পায়ুপথের এসব রোগের চিকিৎসার জন্য লজ্জার কারণে গাইনী চিকিৎসকের কাছে যান। কিন্তু মনে রাখবেন, পায়ুপথের কোনো রোগের চিকিৎসা একজন কলোরেক্টাল সার্জনই (পায়ুপথের রোগ বিশেষজ্ঞ) সবচেয়ে ভালো করতে পারবেন। প্রাথমিক পর্যায়ে পাইলস বা এনাল ফিসার রোগের চিকিৎসা করালে শতকরা ৮০ ভাগ ক্ষেত্রে অপারেশন ছাড়াই তা ভালো হয়ে যায়।

পরিশেষে, প্রত্যেকে সুস্থ থেকে ভালোভাবে পবিত্র রমজানের ইবাদত বন্দেগি করুন, এই প্রত্যাশা রইল।

লেখক: কলোরেক্টাল ও জেনারেল সার্জন; এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য); এফসিপিএস (সার্জারী); এমএস (কলোরেক্টাল সার্জারী)-ফেইজবি।
চেম্বার: কিংস মেডিকেল সার্ভিসেস এন্ড হাসপাতাল, নওয়াপাড়া রোড, ঘোপ, যশোর।
ফোন: ০১৩০৪-৩৬০৭৮৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here