বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু প্রণব মুখার্জির প্রয়াণ

0
160

আবুল কালাম আজাদ খান

প্রণবকুমার মুখোপাধ্যায় (১১ ডিসেম্বর ১৯৩৫ ও ৩১ আগস্ট ২০২০) হলেন ভারতের ত্রয়োদশ রাষ্ট্রপতি (জুলাই, ২০১২-এ কার্যভার গ্রহণকারী)। তাঁর রাজনৈতিক কর্মজীবন ছয় দশক ব্যাপী। তিনি ছিলেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা। বিভিন্ন সময়ে ভারত সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছিলেন। ২০১২ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে প্রণব মুখার্জি ছিলেন ভারতের অর্থমন্ত্রী ও কংগ্রেসের শীর্ষস্থানীয় সমস্যা-সমাধানকারী নেতা।

প্রণব মুখার্জির জন্ম অধুনা পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার কীর্ণাহার শহরের নিকটস্থ মিরাটি গ্রামে। তাঁর পিতার নাম কামদাকিঙ্কর মুখার্জি ও মাতার নাম রাজলক্ষ্মী দেবী। বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী কামদাকিঙ্কর ১৯২০ সাল থেকে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। ব্রিটিশ শাসনকালে তিনি দশ বছর কারারুদ্ধ ছিলেন। পরে কামদাকিঙ্কর অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটি এবং পশ্চিমবঙ্গ বিধান পরিষদের সদস্য (১৯৫২-৬৪) হন; তিনি বীরভূম জেলা কংগ্রেস কমিটির সভাপতির পদও অলংকৃত করেন। প্রণব মুখার্জি সিউড়ির বিদ্যাসাগর কলেজের ছাত্র ছিলেন; এই কলেজটি সেই সময়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ছিল।

প্রণব মুখোপাধ্যায় একজন কলেজ শিক্ষকরূপে তার কর্মজীবন শুরু করেন। পরে তিনি সাংবাদিকতাও করেন কিছুকাল। এই সময় তিনি ‘দেশের ডাক’ নামে একটি পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এছাড়াও তিনি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের ট্রাস্টি ও পরে নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনের সভাপতিও হন। মাননীয় প্রণব মুখার্জির কর্মজীবনে প্রথম দিকে হাওড়া জেলার বাঁকড়ায় অবস্থিত বাঁকড়া ইসলামিয়া হাইস্কুলে ২ বছর শিক্ষকতা করেছেন। ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দ হতে ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তিনি দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার আমতলার নিকটস্থ বিদ্যানগর কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ছিলেন।

১৯৫৭ সালের ১৩ জুলাই প্রণব মুখার্জি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন শুভ্রা মুখার্জির সঙ্গে। শুভ্রা মুখার্জি বাংলাদেশের নড়াইল জেলার সদর উপজেলার ভদ্রবিলা গ্রামের মেয়ে। তাদের দুই পুত্র ও এক কন্যা হলেন, শর্মিষ্ঠা মুখার্জি, অভিজিত মুখার্জি, ইন্দ্রজিৎ মুখার্জি । শুভ্রা মুখার্জি ২০১৫ সালের ১৮ আগস্ট ৭৪ বছর বয়সে নয়াদিল্লির এক হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি শ্বাসযন্ত্রের সমস্যায় ভুগছিলেন এবং হৃদযন্ত্রের সমস্যায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।

প্রণব মুখোপাধ্যায় প্রায় পাঁচ দশক ধরে ভারতীয় সংসদের সদস্য ছিলেন। ১৯৬৯ সালে তিনি প্রথমবার কংগ্রেস দলের প্রতিনিধিস্বরূপ রাজ্যসভায় নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৭৫, ১৯৮১, ১৯৯৩ ও ১৯৯৯ সালেও তিনি রাজ্যসভায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৭৩ সালে কেন্দ্রীয় শিল্পোন্নয়ন উপমন্ত্রী হিসেবে তিনি প্রথম ক্যাবিনেটে যোগদান করেন।

ক্যাবিনেটে ক্রমান্বয়ে পদোন্নতির পর ১৯৮২ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত তিনি ভারতের অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৪ সালে ইউরোমানি পত্রিকার একটি সমীক্ষায় তাঁকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ পাঁচ অর্থমন্ত্রীর মধ্যে অন্যতমের শিরোপা দেওয়া হয়। ১৯৯৫ সালের মে থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত তিনি সার্ক মন্ত্রিপরিষদ সম্মেলনেও সভাপতিত্ব করেছিলেন। ১৯৯৫-৯৬ সালে তিনি রাওয়ের মন্ত্রিসভায় বিদেশমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৭ সালে তিনি শ্রেষ্ঠ সাংসদ পুরস্কারে ভূষিত হন। ২০০৬ সালের ২৪ অক্টোবর প্রণব মুখার্জিকে ভারতের বিদেশমন্ত্রীর দায়িত্বে নিযুক্ত করা হয়। ২০০৭ সালে তাঁকে ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান পদ্মবিভূষণ দ্বারা সম্মানিত করা হয়। ২০০৮ সালের ১০ অক্টোবর প্রণব মুখার্জি ইউএস সেক্রেটারি অফ স্টেট কন্ডোলিজা রাইস সেকশন ১২৩ চুক্তি সই করেন। তিনি আন্তর্জাতিক অর্থভণ্ডার, বিশ্ব ব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও আফ্রিকান উন্নয়ন ব্যাংকের বোর্ড অফ গভর্নরসের সদস্য। ২০০৮ সালে তাঁকে ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান পদ্মবিভূষণ প্রদান করেছিল।

২০১০ সালে বিশ্ব ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের দৈনিক সংবাদপত্র এমার্জিং মার্কেটস তাঁকে ‘ফাইনান্স মিনিস্টার অফ দ্য ইয়ার ফর এশিয়া’ পুরস্কার দিয়েছিল। ২০১০ সালের ডিসেম্বর মাসে, দ্য ব্যাঙ্কার পত্রিকা তাকে ‘ফাইনান্স মিনিস্টার অফ দ্য ইয়ার্স’ সম্মান দিয়েছিল ভারত সরকার।

২০১১ সালে উলভারহ্যাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সাম্মানিক ডক্টর অফ লেটারস ডিগ্রি দেয়। ২০১২ সালের মার্চ মাসে আসাম বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশ্বেশ্বরায়া প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সাম্মানিক ডি. লিট ডিগ্রি দেয়। ২০১৩ সালের ৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সাম্মানিক ডক্টরেট অফ ‘ল’ ডিগ্রি দেয়। ২০১৩ সালের ৫ মার্চ তিনি বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অসামরিক পুরস্কার বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা পান। ২০১৩ সালের ১৩ মার্চ মরিশাস বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডক্টর অফ ‘ল’ সম্মান দেয়। তিনি ২৫ জানুয়ারি ২০১৯ সর্বোচ্চ অসামরিক পুরস্কার ভারতরত্ন সম্মানে সম্মানিত হন।

গত ৯ আগস্ট বাড়ির শৌচাগারে পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পেয়েছিলেন ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি। তারপর থেকেই দিল্লির সেনা হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন তিনি। স্নায়ুঘটিত সমস্যা দেখা দেওয়ায় গত ১০ অগস্ট তাঁর মাথায় অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল। ১৩ অগস্ট থেকে কোমায় ছিলেন তিনি। অস্ত্রোপচারের আগে তাঁর শরীরে কোভিড-১৯  সংক্রমণও ধরা পড়েছিল। ২২ দিন অসুস্থ থেকে ৩১ আগষ্ট না ফেরার দেশে চলে যান ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি।  মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। আমি তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করছি।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ প্রণব মুখার্জির মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করে বলেছেন, “প্রণব মুখার্জি ছিলেন বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে তাঁর ভূমিকা আমাদের বিজয়কে ত্বরান্বিত করেছিল।” তাঁর মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শোক বার্তায় বলেছেন, ‘বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে একজন রাজনীতিবিদ ও আমাদের পরম সুহৃদ হিসেবে প্রণব মুখার্জির অনন্য অবদান কখনো বিস্মৃত হওয়ার নয়।’  মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদানের কথাও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন তিনি।

প্রণব মুখার্জির মৃত্যুতে একদিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করে বাংলাদেশ তাঁর প্রতি যথাযোগ্য সম্মানই প্রদর্শন করেছে।

[লেখক: শিশু সংগঠক চাঁদের হাট]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here