বাংলাদেশে রবীন্দ্রচর্চা

0
179

অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান

বাংলাদেশে রবীন্দ্রচর্চার বিষয়ে কিছু বলতে গেলে তার ভূমিকাস্বরূপ রবীন্দ্রনাথের প্রতি বাঙালি মুসলমান সমাজের মনোভাব সম্পর্কে দু-একটি কথা বলে নেওয়া দরকার। ১৯০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে বাঙালি মুসলমানদের নানাধরনের প্রতিক্রিয়ার পরিচয় পাই। এর এক ভাগে দেখা যায় তার সৃষ্টিশীলতার স্বপ্রসংস আস্বাদ গ্রহণের প্রয়াস। আবদুল হামিদ খান ইউসফজয়ী, একরামউদ্দীন, কাজী আবদুল ওদুদের লেখায় তা ফুটে উঠেছে। আবদুল ওদুদের রবীন্দ্র-সমালোচনা সম্পর্কে ১৯২৭ সালে রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলেছিলেন, আমার রচনা এমন সরস বিচারপূর্ণ সমাদর আর কারো হাতে লাভ করেছে বলে মনে পড়ে না।’ অপরপক্ষে ১৯২৮ সালে মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার লাভের প্রসঙ্গে লেখা হয় যে, “পার্সী ও উর্দ্দুর দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের অনেক কবি গীতাঞ্জলীর সাধ্য-সন্দর্ভে ইহা অপেক্ষা অনেক উচ্চ স্তরের জ্ঞান ভাব ও কল্পনার সমাবেশ সাধনে এবং মধুরতর রস সৃষ্টি করিতে সমর্থ হইয়াছেন’। তবে আলোচনা সবটা সাহিত্য বিচারে সীমাবদ্ধ থাকেনি। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে সাম্প্রদায়িকতা ও পৌত্তলিকতার অভিযোগ কেউ কেউ এনেছিলেন। মোহাম্মদ হেদায়েতউল্লাহ সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ খন্ডন করেছিলেন, আর গোলাম মোস্তফা লিখেছিলেন যে, ‘কবিসম্রাট রবীন্দ্রনাথ তাহার গীতি কবিতায় যে ভাব ও আদর্শ ব্যক্ত করিয়াছেন, তাহার সহিত ইসলামের চমৎকার সৌসাদৃশ্য আছে। … গীতাঞ্জলির প্রথম কবিতার …. ভিতরে ইসলামের প্রায় সব সত্যেরই সমাবেশ হইয়াছে’। বিদ্যাসাগর-বঙ্কিমচন্দ্র থেকে রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্র যুগের সাহিত্যকে উন্নত সাহিত্য বলে স্বীকার করেও ১৯৪৪ সালে, পাকিস্তান আন্দোলনকালে, আবুল মনসুর আহমদ বলেন যে, ‘এ-সাহিত্যে মুসলমানদের উল্লেখযোগ্য কোনো দান নেই, শুধু তা নয়, মুসলমানদের প্রতিও এ সাহিত্যের কোনো দান নেই’। কারণ, ‘এ-সাহিত্যের স্রষ্টাও মুসলমান নয়; এর বিষয়বস্তুও মুসলমান নয়। এর স্পিরিটও মুসলমানী নয়; এর ভাষাও মুসলমানের নয়’। রবীন্দ্রনাথ মুসলমান সমাজের জন্যে কী করছেন, সাধারণভাবে উত্থাপিত এমন প্রশ্নের উত্তরে কাজী আনোয়ারুল কাদীর পাল্টা প্রশ্ন করেছিলেন, ‘সূর্য মুসলমান সমাজের জন্য বিশেষ কী করেছে?” তবে পাকিস্তান সৃষ্টির পরে রবীন্দ্রনাথ প্রথম আক্রান্ত হন বামপন্থীদের দ্বারা। ১৯৪৮ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি যে-অতিবাম রাজনৈতিক আদর্শ ও কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল, তার ঢেউ এসে লেগেছিল ঢাকার প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘে। এই আদর্শের অনুসরণে যাঁরা রবীন্দ্রনাথকে বুর্জোয়া ও প্রতিক্রিয়াশীল বলে গণ্য করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন মুনীর চৌধুরী, আখলাকুর রহমান ও আবদুল্লাহ আল-মুতী। সংঘের সভাপতি অজিতকুমার গুহ এ বিষয়ে দ্বিমত প্রকাশ করেছিলেন, কারান্তরালবাসী রণেশ দাসগুপ্ত ও সন্তোষ গুপ্তও।

বামপন্থী ভাবধারার তেমন প্রভাব তখন পূর্ব বাংলায় ছিল না, বরঞ্চ প্রভাব ছিল পাকিস্তানী ভাবধারার। তাতেই উদ্দীপ্ত হয়ে ১৯৫০ সালে সৈয়দ আলী আহসান লিখেছিলেন:
নতুন রাষ্ট্রের স্থিতির প্রয়োজনে আমরা আমাদের সাহিত্য নতুন জীবন ও ভাবধারার প্রকাশ খুঁজবো। সে-সঙ্গে একথাও সত্য যে, আমাদের সাংস্কৃতিক স্বতন্ত্র বজায় রাখবার এবং হয়তো বা জাতীয় সংহতির জন্য যদি প্রয়োজন হয়, আমরা রবীন্দ্রনাথকেও অস্বীকার করতে প্রস্তুত রয়েছি। সাহিত্যের চাইতে রাষ্ট্রীয় সংহতির প্রয়োজন আমাদের বেশি।

এই আদর্শিক ঘোষণা কিন্তু রাষ্ট্রীয় বেতারে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গান বা নাটকের প্রচারে বাধা হয়ে দেখা দেয়নি, পাঠ্যপুস্তকে তিনি যথেষ্ট স্থান লাভ করেছিলেন এবং বেসরকারি পর্যায়ে তার জয়ন্তী উদ্যাপনের কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়নি।

সরকারি প্রতিকূলতা দেখা দেয় ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকী পালনের সময়ে। সময়টা পাকিস্তান সামরিক শাসনের। রবীন্দ্রনাথের প্রতি সরকারি পোষকতায় দৈনিক আজাদ পত্রিকা সম্পাদকীয় স্তম্ভে, সম্পাদকীয় পাতায় ও অন্যত্র প্রকাশিত প্রবন্ধে ও চিঠিপত্রে দিনের পর দিন রবীন্দ্রনাথকে আক্রমণ করতে থাকেন। তিনি হিন্দু ভারতের স্বপ্নদ্রষ্টা, সাম্প্রদায়িক চেতনাসম্পন্ন, সাম্রাজ্যবাদের বন্ধু-যুবরাজের সম্মানে গান লিখেছিলেন; ইতিহাসাশ্রিত কবিতায় তিনি মুসলমান শাসকদের অবমাননাকারী, তাঁর রচনায় মুসলমান জীবন উপেক্ষিত, বাংলাভাষায় আরবি-ফারসি শব্দপ্রয়োগে তিনি আপত্তিকারী; তাঁর লেখায় পৌত্তলিকতার ছড়াছড়ি, পাকিস্তানের মৌলিক ভাবধারার সঙ্গে তাঁর রচনা সাংঘর্ষিক। তাঁর জন্মশতবর্ষ-উদ্যাপনের প্রয়াস দুই বাংলাকে যুক্ত করার ষড়যন্ত্রবিশেষ, পাকিস্তানের আদর্শের মূলে কুঠারাঘাতপ্রয়াসী এবং দেশের জনগণের সাংস্কৃতিক জীবনের প্রতি হুমকিস্বরূপ। আজাদের এসব বক্তব্যের জবাব প্রকাশ পায় দৈনিক ইত্তেফাক ও সংবাদে। তাতে বলা হয়, রবীন্দ্রনাথ মুসলিমবিরোধী নন, সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী; তিনি হিন্দু ছিলেন না, ছিলেন একেশ্বরবাদী ব্রাহ্ম; সুফি মরমিবাদের প্রভাব ছিল তাঁর ওপরে, সর্বোপরি তিনি ছিলেন মানবতাবাদী; তাঁর পূর্বপুরুষের ভিটেবাড়ী ছিল পূর্ব বাংলায়, তিনি নিজে এখানে দীর্ঘকাল বাস করেছেন এবং তাঁর রচনায় এই অঞ্চলের জীবন ও প্রকৃতি রূপলাভ করেছে; বস্তুত তাঁর সাহিত্যে মুসলমানেরা হীনভাবে চিত্রিত হয়নি; আমাদের প্রাত্যহিক জীবেন তিনি গভীরভাবে সম্পৃক্ত, আমাদের অনুভূতি ও চেতনায় তিনি সর্বদা বিরাজমান।

এইসব তর্কবিতর্কের পটভূমিকায় রবীন্দ্রজন্মশতবার্ষিকী বেশ বড়ো করেই উদ্যাপিত হয়- ঢাকায়, চট্টগ্রামে এবং প্রদেশের অন্যত্র। রবীন্দ্রনাথের প্রতি শ্রদ্ধানিবেদনের সঙ্গে তাতে যুক্ত হয় বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির আবহমান ধারাকে নিজের বলে ধরে রাখার চেষ্টা, বাঙালির আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান ও স্বায়ত্তশাসনের স্পৃহা এবং তখনকার সামরিক শাসনের বিরুদ্ধাচরণ। রবীন্দ্রনাথ শুধু রবীন্দ্রনাথ থাকেন না, হয়ে ওঠেন যেমন প্রেরণার উৎস, তেমনি সংগ্রামের বিষয়। ১৯৬১ তে যদি রবীন্দ্রপ্রেমিদের জন্ম হয়ে থাকে, তাহলে ১৯৬৫ তে জন্ম হয় শাসককুলের। পাক-ভারত যুদ্ধের পটভূমিকায় ভারতীয় উৎসের সবকিছুর আমদানি নিষিদ্ধ হয়ে যায়- তার মধ্যে রবীন্দ্রনাথের বইপত্র ও গানের রেকর্ডও পড়ে। পাঠ্যবই থেকে তিনি নির্বাসিত হন না, কিন্তু বেতার-টেলিভিশনে জায়গা হারান- ততদিনে দেশে টেলিভিশন চালু হয়ে গেছে। যুদ্ধশেষে প্রচার-মাধ্যমে যখন তিনি ধীরে ধীরে পুনর্বাসিত হন, তখনই ১৯৬৭ সালের জুন মাসে, কেন্দ্রীয় তথ্যমন্ত্রী পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে ঘোষণা করেন যে, পাকিস্তানের ভাবাদর্শের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ না হওয়ায় বেতার টেলিভিশন থেকে রবীন্দ্র-সংগীতের প্রচার ক্রমে হ্রাস করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গেই তার প্রতিবাদ করে বিবৃতি দেন উনিশজন শিল্পী-সাহিত্যিক-শিক্ষক-বিজ্ঞানী। তাতে রবীন্দ্রনাথকে অভিহিত করা হয় ‘বাংলাভাষী পাকিস্তানীদের সাংস্কৃতিক সত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ’ বলে। এই বক্ত্যবের বিরুদ্ধে এবং সরকারি নীতির সমর্থনেও অনেকের বিবৃতি প্রকাশিত হয়, তেমনি তার পলটা মতও প্রচারিত হয়। বিতর্ক এত প্রবল হয় যে, এক পর্যায়ে এ-নিয়ে বাদ-প্রতিবাদ ও প্রকাশে সরকার নিষেধাজ্ঞা জারি করে, তবে তাতে সভা বা অনুষ্ঠান করায় বাধা হয়নি। তাই দেখা গেল, সরকার -প্রতিষ্ঠিত ইসলামিক একাডেমীর পরিচালক প্রকাশ্যে সরকারি নীতির বিরোধিতা করছেন এবং সরকার-পৃষ্ঠপোষিত পাকিস্তান লেখক সংঘের পূর্বাঞ্চল শাখা মহাকবি স্মরণোৎসব করে মধুসূদন, গালিব, ইকবাল ও নজরুল ইসলামকে শ্রদ্ধানিবেদন করছেন, কিন্তু উৎসব শুরু হচ্ছে রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে। ফলে, রবীন্দ্র-সম্পর্কিত এই অনুষ্ঠানের খবর বা এই অনুষ্ঠানমালা নিয়ে আলোচনা সম্প্রচার করা যায়নি ঢাকা টেলিভিশনে। অন্যদিকে, ভারত থেকে বইপত্র আমদানি নিষিদ্ধ থাকায় গ্রন্থস্বত্ব আইন লঙ্ঘন করে ঢাকায় রবীন্দ্রনাথের অনেক রচনা পুনর্মুদ্রিত হতে থাকে। এই আবহাওয়ায় আবুল মনসুর আহমদও তাঁর পূর্বমত সংশোধন করে বঙ্কিমচন্দ্র-রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্র-সত্যেন দত্তকে আমাদের সাহিত্যিক ঐতিহ্যের অংশ বলে স্বীকার করে নেন। অল্পকাল পরে, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময়ে, ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি ব্যপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে, মুুক্তিযুদ্ধের কালে তা মুখে মুখে গীত হয় এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার অব্যবহিত পরে গানটির প্রথম দশ চরণ জাতীয় সংগীতরূপে গৃহীত হয়।
(চলবে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here