বাংলাদেশে রবীন্দ্রচর্চা

0
459

অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান
তবে রবীন্দ্রনাথের ভাগ্য এত সুপ্রসন্ন নয় যে, বিষয়টার পরিসমাপ্তি এখানেই ঘটবে। কয়েক বছর আগে একজন রাজনীতিবিদ বলেন যে, যে-দেশে তিরিশ লাখ লোক স্বাধীনতার জন্যে প্রাণ দেয়, সে-দেশে জাতীয় সংগীত রচনা করার মতো কি এমন একজনও নেই যে, কোথাকার কোন রবীন্দ্রনাথের গানকে আমাদের জাতীয় সংগীত করতে হয়! একজন সার্বক্ষণিক অধ্যাপক ও খন্ডকালীন রাজনীতিবিদ দাবি করেন যে, ব্রিটিশ ভারতে বঙ্গভঙ্গ- আন্দোলনের সময়ে রচিত গান বাংলাদেশের জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে পারে না, সুতরাং আমদের জাতীয় সংগীত পরিবর্তন করা হোক। এসব কথায় যে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে, তাতে কিন্তু বোঝা যায়, সাধারণ মানুষের কাছে রবীন্দ্রনাথের আসনটি কেমন ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা দিয়ে গড়া।

তবে বাংলাদেশ-আমলে রবীন্দ্রনাথের প্রতি কঠিনতম আঘাত আসে তাঁর ১২৫তম জন্মবার্ষিকীতে আহমদ শরীফের কাছ থেকে। পাকিস্তান-পর্বে তিনি রবীন্দ্রনাথের বিষয়ে সরকারী নীতির বিরুদ্ধাচরণ করেছিলেন, লিখেছিলেন কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ। বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথের প্রতি সরকার অনুকূল হওয়ায় তিনি নিলেন রবীন্দ্র-বিরোধিতার দায়িত্ব। প্রথমে ১৯৭৩ সালে, তিনি ঘোষণা করেন যে, রবীন্দ্রনাথ আর আমাদের অনুপ্রেরণার উৎসব হতে পারেন না। ১৯৮৬ সালে বাংলা একাডেমীর উত্তরাধিকার পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের সম্পর্কে তিনি বহু অভিযোগ উত্থাপন করেন : রবীন্দ্রনাথ উনিশ শতকী কবি ও বিশ শতকী ভাবুক, তবে তাঁর রচনায় এমন কিছু নেই যা পাশ্চাত্য চিন্তা ও সংস্কৃতিতে ছিল না; নোবেল পুরস্কার প্রাপকরূপে নিজের সুনাম অক্ষুণ্ন রাখতেই তিনি বিশ্বজনীন মানবিক চিন্তার কথা বলেছেন; তিনি উপনিষদের ভুল ব্যাখ্যাতা, পৌরণিকতার মোহে আচ্ছন্ন, ব্রাহ্মমতের যথাযথ অনুধাবনে অপারগ- তিনি ব্রাহ্মদের হিন্দু আখ্যা দিয়েছেন এবং আস্থা স্থাপন করেছেন প্ল্যানচেটে; প্রাচীন পৌরণিক ঘটনা নিয়ে এবং বৌদ্ধ, রাজপুত ও শিখ আখ্যান নিয়ে তিনি কবিতা লিখেছেন, কিন্তু মুসলিম শাসক ও দরবেশ নিয়ে তিনি কিছু লেখেননি- তাতে মনে হয়, মুসলমানদের প্রতি তিনি বিদ্বিষ্ট ছিলেন; অথচ ইংরেজ শাসকদের প্রতি তার অপরিমেয় অনুরাগ, গভীর আস্থা ও নিবিড় শ্রদ্ধা দেখা যায়; তার গল্পে-উপন্যাসে গণমানবের স্থান হয়নি, তিনি তাদের কল্যাণকামী ছিলেন না; তার মনের গভীরে ছিল সামন্তবাদের প্রতি মোহ অথচ উপনিবেশে তার ঘৃণা ছিল না; তিনি জমিদারি উচ্ছেদের বিরোধী ছিলেন, নিজেও ছিলেন নিপীড়ক জমিদার।

আহমদ শরীফের প্রবন্ধের ক্ষুব্ধ প্রতিবাদ করেছেন হায়াৎ মামুদ- উত্তরাধিকার পত্রিকার পরের সংখ্যায়। তার পরের সংখায় সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম লেখেন যে, আহমদ শরীফ ও হায়াৎ মামুদ দুই চরম অবস্থান গ্রহণ করেছেন। তবে আহমদ শরীফ যে যাচাই-না-করা তথ্যের ওপর এতখানি নির্ভর করেছেন, তাতে তিনি বিস্মিত। সমাজতন্ত্রী বা সমাজসংস্কারক না হওয়ায় কিংবা ভারতে মুসলিম-শাসনের প্রসঙ্গ না-আনায় অথবা বিশ শতকী মনোভাব আয়ত্ত না করায় রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্মের কী ক্ষতি হয়েছে, আহমদ শরীফ তা দেখেননি।

রবীন্দ্রনাথের আবেদন পাঠকের নান্দনিক বোধের কাছে, আর শিল্পীর সামাজিক দায়িত্বের প্রশ্ন তো চূড়ান্তভাবে এখনো মীমাংসিত হয়নি। তবে রবীন্দ্রনাথ গণমানবের কল্যাণকামী ছিলেন না, একথা বললে সত্যের অপলাপ হয়।

এই পর্যায়ে সম্পাদক এ-বিষয়ে আলোচনা বন্ধ করে দেন, কিন্তু আরো দীর্ঘকাল ধরে এ নিয়ে অন্যত্র লেখালেখি চলে। তাতে অংশ নেন শওকত ওসমান, খান সারওয়ার মুরশিদ, শামসুর রাহমান ও হুমায়ুন আজাদ। আহমদ শরীফের রচনাটিকে সৈয়দ শামসুল হক চিহ্নিত করেন ‘রবীন্দ্রনাথের জন্মের একশ পঁচিশতম বার্ষিকীতে বাংলাদেশ আমাদের সবচেয়ে কলঙ্কিত কাজ’ বলে। রবীন্দ্রনাথের সার্ধশতজন্মবর্ষে তাকে নিয়ে বাংলাদেশে যে আলোড়ন হয়েছে, তাতে হয়তো সৈয়দ হকের ক্ষোভ প্রশমিত হয়ে থাকবে।

রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বাংলাদেশে আমরা কেবল তর্কে মেতেছি, তাকে বোঝার বা ব্যাখ্যার চেষ্টা করিনি, এতক্ষণের আলোচনা থেকে এমন ভুল ধারণা যেন না হয়। পাকিস্তান-পর্বে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে বইপত্র বেরিয়েছিল অল্প। তার মধ্যে আ ন ম বজলুর রশীদের রবীন্দ্রনাথ (১৯৬১), মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর রবি-পরিক্রমা (১৯৬৩), যোগেশচন্দ্র সিংহের ধ্যানী রবীন্দ্রনাথ (১৯৬৪), আনোয়ার পাশার রবীন্দ্র-ছোটগল্প-সমীক্ষা (১৯৬৯) এবং সৈয়দ আকরাম হোসেনের রবীন্দ্রনাথের উপন্যান: দেশ কাল ও শিল্পরূপ (১৯৬৯)-এসব বইয়ের কথা বিশেষভাবে মনে পড়ে। আরেকটি উল্লেখযোগ্য বই ছিল হায়াৎ মামুদের রবীন্দ্রনাথ: কিশোর জীবনী (১৯৬৭)। এ সময়ে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে বিস্তর প্রবন্ধ লেখা হয়েছে এবং অন্যান্য রচনার সঙ্গে সেসব প্রবন্ধ অনেক লেখক নিজের গ্রন্থে স্থান দিয়েছেন। রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষ সংখ্যা সমকাল অনেক গুরুত্বপূর্ণ রচনায় সমৃদ্ধ ছিল। আমার সম্পাদনায় রবীন্দ্রনাথ (১৯৬৮) নামে যে সংকলনটি প্রকাশিত হয়, তাতে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও মুহম্মদ কুদরত-ই-খুদা থেকে শুরু করে আবদুল মান্নান সৈয়দ ও আহমদ ছফা পর্যন্ত পূর্ব বাংলার তিরিশজন প্রবীণ ও নবীন লেখকের প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত হয়। তাতে দেখা যায় যে, প্রজন্মের ব্যবধানে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টি আধ্যাত্মিকতা থেকে ইহজাগতিকায় কেন্দ্রীভূত হয়েছে; আমরা যেমন তার সৌন্দর্যচেতনা ও শিল্পকৌশলের দিকে আকৃষ্ট হয়েছি, তেমনি কৌতুহলী হয়েছি তার শিক্ষা ভাবনা ও পল্লি-পুনর্গঠন প্রয়াসের বিষয়ে। বস্তুত শ্রদ্ধার আসনে বসিয়ে দূর থেকে নৈবেদ্য না দিয়ে প্রাত্যহিক জীবনে সংগ্রামের সাথী হিসেবে রবীন্দ্রনাথকে পেতেই যে তরুণেরা বেশি উৎসাহী, তা তাদের নানাধরনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ থেকেও বোঝা গেছে।

বাংলাদেশ-পর্বে রবীন্দ্রনাথের পক্ষসমর্থনের প্রয়োজনীয়তা আর দেখা দেয়নি। তিনি যে কখনো সংকীর্ণতার বাঁধনে ধরা পড়েছেন, যা প্রচার করেছেন তা যে কখনো কখনো নিজে পালন করতে ব্যর্থ হয়েছেন, এসব বিষয়ে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, আহমেদ হুমায়ুন, সফিউদ্দীন আহমদ ও আবদুশ শাকুর লিখেছেন। বামপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী দেখিয়েছেন, কোথায় রবীন্দ্রনাথের শক্তি, কোথায় তার দুর্বলতা। মার্কসবাদী রবীন্দ্রদীক্ষায় অবশ্য তার পূর্বগামী রণেশ দাসগুপ্ত ও সন্তোষ গুপ্ত। আবদুল মান্নান সৈয়দ মনোনিবেশ করেছেন রবীন্দ্রনাথের পাঠঘনিষ্ঠ আলোচনায়- সেখানে কবিতার আলোচনা উল্লেখযোগ্য। রবীন্দ্রকাব্যবিচারে সৈয়দ আলী আহসানের ভূমিকা বিশিষ্ট, সেইসঙ্গে নাম করতে হয় মনজুরে মাওলার। অ্যাকাডেমিক আলোচনায়ও নতুন মাত্রা এনেছেন অনেকে; যেমন, উপন্যাসের আলোচনায় সৈয়দ আকরম হোসেন, রাষ্ট্র ও সমাজবিষয়ক প্রবন্ধের আলোচনায় হুমায়ুন আজাদ, নাটকের আলোচনায় মঞ্জুশ্রী চৌধুরী, গদ্যকবিতার প্রসঙ্গে সিদ্দিকা মাহমুদা, ছন্দের বিষয়ে মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান ও আবদুল মান্নান সৈয়দ, অলংকার সম্পর্কে আহমদ কবির, শিশুতোষ রচনা সম্পর্কে সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ। রবীন্দ্রসংগীতের আলোচনায় সন্জীদা খাতুন, ওয়াহিদুল হক, আনিসুর রহমান ও করুণাময় গোস্বামীর কাছে আমরা ঋণী। রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞানচেতনাবিষয়ে আবদুল্লাহ আল-মুতী, এ এম হারুন অর রশীদ, ভ্রমণসাহিত্য সম্পর্কে হাসনাত আবদুল হাই, পল্লি-পুনর্গঠন ও গ্রামীণ উন্নয়ন সম্পর্কে মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, আতিউর রহমান, সনৎকুমার সাহা ও গোলাম মুরশিদ, স্বদেশ রাষ্ট্র ও জাতীয়তা বিষয়ে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, আবদুশ শাকুর ও গোলাম মুস্তফা উল্লেখযোগ্য আলোচনা করেছেন। রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা সম্পর্কে সন্তোষ গুপ্ত, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ও আবুল মনসুরের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। রবীন্দ্রনাথের ভাষাচিন্তা সম্পর্কে মুহম্মদ আবদুল হাইয়ের মৌলিক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে অনুসারী হয়েছেন কাজী দীন মুহম্মদ ও মনিরুজ্জামান। রবীন্দ্রনাথের নিজের রচনার অনুবাদ সম্পর্কে আবু রুশ্দ ও কবীর চৌধুরী অন্তর্দৃষ্টিমূলক সমালোচনা করেছেন। লোকসংস্কৃতি ও রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে শামসুজ্জামান খান, আলমগীর জলীল, আনোয়ারুল করীম ও সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ উল্লেখযোগ্য আলোচনা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ও মুসলমান সমাজ সম্পর্কে লিখেছেন আহমেদুর রহমান, তবে এ বিষয়ে ভূঁইয়া ইকবালের বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ। রবীন্দ্রনাথের পূর্ববঙ্গবাস এবং সেই সময়কার সৃষ্টি নিয়ে লিখেছেন আহমদ রফিক, গোলাম মুরশিদ, আনোয়ারুল করিম ও মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান। মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন, তার মধ্যে মাতৃভাষা, আর্ট ও সংগীত-বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের উক্তির সুনির্বাচিত সংকলন যেমন উল্লেখযোগ্য, তেমনি পাঠযোগ্য রবীন্দ্রনাথের বিবিধ চিন্তা ও সৃষ্টি সম্পর্কে তাঁর সমালোচনা।
রবীন্দ্রনাথের সার্ধশতবর্ষ উপলক্ষে অনেক গ্রন্থ ও সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। তার মধ্যে সন্জিদা খাতুন সম্পাদিত সার্ধশতবর্ষে রবীন্দ্রনাথ, আবুল হাসনাত সম্পাদিত রবীন্দ্রনাথ : কালি ও কলমে, ভীস্মদেব চৌধুরী-সম্পাদিত প্রভাতসূর্য, বিশ্বজিৎ ঘোষ-সম্পাদিত তোমার সৃষ্টির পথ উল্লেখযোগ্য। আমার সম্পাদনায় রবীন্দ্রনাথ, এই সময়ে বেরিয়েছে ঢাকা থেকে আর সার্ধশতবর্ষে রবীন্দ্রনাথ : বাংলাদেশের শ্রদ্ধাঞ্জলি বেরিয়েছে বিশ্বভারতী থেকে। মনজুরে মওলার সম্পাদনায় রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে বিভিন্ন লেখকের ১৫১টি গ্রন্থের প্রকাশ ঘটনা হিসেবে চমকপ্রদ।
এই আলোচনায় অনেক লেখক ও গ্রন্থের আলোচনা বাদ পড়ল, তা তাদের গুণের অভাবে নয়, আমার অজ্ঞতা ও অসাবধানতার জন্যে। সেজন্যে আমি ক্ষমাপ্রার্থী।

বাংলাদেশে রবীন্দ্রচর্চা বলতে রবীন্দ্রনাথের কবিতা-আবৃত্তি, গান গাওয়া ও নাটকের অভিনয়ও অন্তর্ভূক্ত হবে। স্বাধীনতা লাভের পরে এসবের অনুশীলনে নানা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, পুরোনো প্রতিষ্ঠানও নতুন গতি লাভ করেছে। শান্তি নিকেতনে শিক্ষা লাভের সুযোগ পেয়ে অনেক শিল্পী প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন। প্রযুক্তির বিকাশও রবীন্দ্রনাথকে নিত্যসঙ্গী করতে আমাদের সাহায্য করেছে। তবু মনে হয়, রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গান আমরা যত শুনি, সে তুলনায় তাঁর রচনা পাঠ করি কম। আমার এই মনে-হওয়াটা ভুল হলে আমি সবচেয়ে বেশি খুশি হবো।

[প্রবন্ধটি ১৩ মে ২০১৩ তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত রবীন্দ্রজয়ন্তীতে পঠিত।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here