বাংলা ক্যালেন্ডারের বিবর্তন

0
298

আব্দুল্যাহ আদিল মাহমুদ
বাংলা ভাষাভাষী মানুষের প্রাণের পঞ্জিকা বাংলা সন। ভাষার জন্য বাঙালির আত্মত্যাগের স্বীকৃতি স্বরূপ ২১ ফেব্রুয়ারি বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করা হয়। এ বছর গ্রেগরীয় পঞ্জিকার সঙ্গে বাংলা তারিখের সমন্বয় করার জন্য বাংলা পঞ্জিকায় পরিবর্তন এনেছে বাংলা একাডেমি।

ক্যালেন্ডারের ইতিহাস বহু পুরোনো। আরও সঠিক করে বললে সে ইতিহাস প্রাগৈতিহাসিক। প্রত্নতত্ত্ববিদেরা নব্য প্রস্তর যুগেও প্রাথমিক ক্যালেন্ডারের নিদর্শন পেয়েছেন। সেটা অবশ্য এধরনের সময় গুনার ধারণা ছিল। তবু সেটিকে ক্যালেন্ডারেরই সূচনা বলা চলে। নব্য প্রস্তর যুগ হলো প্রস্তর যুগের একেবারে শেষের অংশ। এর সূচনা হয়েছিল প্রায় ১২ হাজার বছর আগে।

ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত প্রথম ক্যালেন্ডারের দেখা মেলে ব্রোঞ্জ যুগে। বানিয়েছিল সুমেরীয়রা। সুমের জায়গাটির অবস্থান ছিল বর্তমান দক্ষিণ ইরাক। তাদের ক্যালেন্ডার একই সঙ্গে ছিল সূর্য ও চন্দ্রভিত্তিক। ক্রমে ক্রমে মিসরীয়, আসিরীয় ও প্রাক্-ইরানীয়দের হাতে ক্যালেন্ডার প্রস্তুত হয়। আসিরীয় ও ব্যাবিলনীয়দের হাতে লৌহ যুগে বহুসংখ্যক ক্যালেন্ডারের প্রচলন হতে দেখা যায়।

বাংলা ক্যালেন্ডারের ইতিহাস সে তুলনায় নতুন। বঙ্গাব্দের সূচনা সম্পর্কে দুটি মত প্রচলিত আছে। একটি মত অনুসারে এর সূচনা করেন গৌড় রাজা শশাঙ্ক। প্রায় সপ্তম শতকের দিকে। আরেকটি মত অনুসারে বাংলা সনের সূচনা হয় মোগল সম্রাট আকবরের উদ্যোগের মাধ্যমে। সে সময় হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে সব কাজকর্ম পরিচালিত হতো। সেটা বিভিন্ন দিক থেকে সুবিধাজনক হলেও কিছু কিছু কাজের জন্য আবার অসুবিধাও ছিল। এর প্রধান কারণ হলো, হিজরি পঞ্জিকা চন্দ্রনির্ভর। তাই চান্দ্র বছর সৌর বছরের চেয়ে প্রায় ১১ দিন কম হয়। মোটামুটি ৩৫৪ দিনে একটি চান্দ্র বছর শেষ হয়।

কিন্তু পৃথিবীর জলবায়ু নির্ভর করে সূর্যের ওপর। সূর্যের আলো ও তাপ পেয়েই পৃথিবীর বুকে ফসল ফলে। সূর্যের অবস্থানের কারণেই ঋতুর পরিবর্তন ঘটে। বিভিন্ন ঋতুতে বিভিন্ন ফসল পাওয়া যায়। তাই পঞ্জিকা সূর্যনির্ভর হলে বাস্তব কাজকর্মে, বিশেষ করে কৃষিকাজে অনেক সুবিধা হয়। এই বিষয়টিই সম্রাট আকবরের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কিন্তু তিনি নিজে তো আর পঞ্জিকা প্রস্তুত করার জন্য উপযুক্ত মানুষ নন। ফলে দায়িত্বটা দেওয়া হয় পারস্য থেকে আসা জ্যোতির্বিজ্ঞানী আমির ফতুল্লাহ্ শিরাজিকে।

সে সময় পারস্যে ফারসি বর্ষপঞ্জি প্রচলিত ছিল। প্রচলিত আছে অবশ্য আজও। ততটা জনপ্রিয় নয় আর কি। ফারসি পঞ্জিকার অনুসারেই তৎকালীন হিজরি পঞ্জিকা থেকে সূচনা করা হয় বাংলা সনের। তখন হিজরি ৯৯২ সাল ও ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দ। সম্রাট আকবর সিংহাসনে বসেন ৯৬৩ হিজরি সালে। তাই তিনি নির্দেশ দেন যাতে সেই সময় থেকেই বাংলা সন গণনা শুরু হয়। হিজরি সনের প্রথম মাস মহররম। আর বাংলা প্রথম মাস হয় বৈশাখ।
অন্য অনেক পঞ্জিকার মাসের মতোই বাংলা মাসগুলোর প্রতিটি মাসের বিপরীতে একটি করে রাশির নাম প্রচলিত আছে। সাধারণত রাশি বললে জ্যোতিষবিজ্ঞানের কথা মাথায় আসে। তবে জ্যোর্তিবিজ্ঞানে রাশির ভিন্ন অর্থ। পৃথিবী মোটামুটি ৩৬৫ দিনে একবার সূর্যকে পুরোটা ঘুরে আসে। পৃথিবীর এই বার্ষিক গতির কারণে প্রতিদিনই রাতের আকাশে দৃশ্যমান নক্ষত্রদের অবস্থান একটু একটু করে বদলে যায়। আর সূর্যের তুলনায় আকাশের দুরবর্তী নক্ষত্রদের চলাচল পৃথিবীর সাপেক্ষে খুব ধীর। ফলে পৃথিবীর বার্ষিক গতির কারণে সূর্যের বিপরীতে একেক সময় একেক নক্ষত্র থাকে। পুরো আকাশের নক্ষত্র জ্যোর্তিবিজ্ঞানীরা ৮৮টি অঞ্চলে ভাগ করেছেন। এ অঞ্চলগুলোর মধ্যে পুরো এক বছরে সূর্য মোট ১৩টি অঞ্চল অতিক্রম করে। অর্থাৎ পৃথিবী থেকে দেখলে সূর্য সারা বছরের সব সময় এই ১৩টি অঞ্চলের কোনো না কোনো একটিতে অবস্থান করে বলে মনে হয়।
আর এই ১৩টি অঞ্চলকেই বলা হয় রাশিচক্র। অবশ্য প্রাচীনকালে সূর্য ১৩টির বদলে ১২টি অঞ্চল অতিক্রম করত। কালের বিবর্তনে সেই ১২টি অঞ্চলের সঙ্গে আরেকটি অঞ্চল যুক্ত হয়েছে। কিন্তু অপবিজ্ঞান জ্যোতিষবিদ্যা বিজ্ঞানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পারায় এখনো পত্রিকার রাশিচক্রে ১২টি রাশিই পাওয়া যায়। একইভাবে বাংলা সনের প্রতিটি মাসের সঙ্গেও একটি করে রাশি যুক্ত আছে। যেমন বৈশাখ মাসে সূর্য অবস্থান করে মেষ রাশিতে। পরের মাসে অবস্থান করে বৃষ রাশিতে। আষাঢ় মাসে চলে আসে মিথুন রাশিতে। অবশ্যই এখানে রাশি মানে একেকটি আলাদা তারামন্ডল।

আমরা এখন যাকে খ্রিষ্টীয় সাল বলে জানি, সেটি আসলে জুলীয় পঞ্জিকার পরিবর্তিত সংস্করণ গ্রেগরীয় সাল। জুলীয় বর্ষপঞ্জির সূচনা হয়েছিল খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬ সালে। সূচনা করেন রোম সাম্রাজ্যের জুলিয়াস সিজার। ১৫৮২ সালে পোপ গ্রেগরি এর উন্নতি সাধন করে গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি প্রর্বতন করেন। জুলীয় থেকে গ্রেগরীয় পঞ্জিকায় যাওয়ার মূল কারণ ছিল অতিমাত্রায় অধিবর্ষের উপস্থিতি। পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরে আসতে ৩৬৫ দিনের চেয়ে একটু বেশি সময় লাগে বলে কিছু বছর পরপর ৩৬৫ দিনে বছর ধরে বানানো পঞ্জিকায় একটি নতুন দিন যোগ করতে হয়। জুলীয় পঞ্জিকার সেই যোগের নিয়ম ভালোভাবে কাজ করত না। ফলে নতুন করে অধিবর্ষের নিয়ম বানিয়ে গ্রেগরীয় পঞ্জিকা বানানো হয়। আর সৌরভিত্তিক পঞ্জিকা হওয়ায় বাংলা সনেও একই পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। গ্রেগরীয় পঞ্জিকায় বাড়তি একটি দিন যুক্ত হয় ফেব্রুয়ারি মাসে। অধিবর্ষের বছর একটি দিন বেড়ে মাসটি হয় ২৯ দিনের।

অন্যদিকে বাংলা সনের প্রথম সংস্করণ অনুসারে প্রথম পাঁচ মাস ছিল ৩১ দিনের ও পরের ছয় মাস ৩০ দিনের। সর্বমোট ১৫৫+ ২১০=৩৬৫ দিন। আর গ্রেগরীয় অধিবর্ষের সালে বাংলা সনেও যুক্ত হতো বাড়তি একটি দিন। সে বছর ফাল্গুন মাস ৩০ দিনের বদলে হতো ৩১ দিন।

তবে এ বছর থেকে পাল্টে গেছে বাংলা সনের নিয়ম। স্বাভাবিক নিয়মে এমনিতে প্রতিটি বছর ৩৬৫ দিনেরই থাকছে। আগের নিয়মে প্রথম পাঁচ মাস বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ ও ভাদ্র ছিল ৩১ দিনের। নতুন নিয়মে আশ্বিন মাসসহ প্রথম ৬টি মাস হবে ৩১ দিনের। আর ফাল্গুন ছাড়া বাকি ৫টি মাস হবে ৩০ দিনের। শুধু ফাল্গুন মাস হবে ২৯ দিনের। তবে অধিবর্ষের সময় ১ দিন বেড়ে গিয়ে এই মাসটি হবে ৩০ দিনের। তাহলে মোট ১৮৬+১৫০+২৯=৩৬৫।

এই নিয়মের ফলে এ বছর বসন্ত বরণ হয়েছে ১৩ ফেব্রুয়ারির বদলে ১৪ ফেব্রুয়ারিতে। তবে এটি উদ্দেশ্য ছিল না। উদ্দেশ্য ছিল ২১ ফেব্রুয়ারি, ১৬ ডিসেম্বর, ২৬ মার্চের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবসগুলো বাংলা যে তারিখে অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সব সময় সে দিবসইে অনুষ্ঠিত হতে থাকবে। ফলে আন্তর্জাতিক দিবসগুলোর সঙ্গে বাংলা তারিখ সব সময় সমন্বিত থাকবে ভবিষ্যতে।

বাংলা বর্ষপঞ্জি এর আগেও দুই দফা সংস্কার হয়েছে। বাংলা বর্ষপঞ্জি সংস্কারের কাজ প্রথম শুরু হয়েছিল ভারতে ১৯৫২ সালে। বাংলাদেশের সন্তান বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহাকে প্রধান করে ভারতের সরকার একটি পঞ্জিকা সংস্কার কমিটি করেছিল। এরপর ১৯৬৩ সালে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র নেতৃত্বে এই সংস্কার হয়। মেঘনাদ সাহার সুপারিশে বৈশাখ থেকে ভাদ্র ৩১ দিন, আশ্বিন থেকে চৈত্র ৩০ দিন ছিল, অধিবর্ষে ১ দিন যুক্ত হতো চৈত্র মাসে। তার আগে কেবল চান্দ্র হিসাব ধরে বাংলা বর্ষপঞ্জি করা হতো, যার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ছিল না। নতুন বর্ষপঞ্জি তারই আলোকে করা হয়েছে।
লেখক: প্রভাষক, পরিসংখ্যান বিভাগ, পাবনা ক্যাডেট কলেজ।
সূত্র: বিবিসি, কোরা, বাংলাপিডিয়া

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here