বাংলা সাহিত্যের মুসলিম বিখ্যাত কবি

0
20

আবদুল কাদের

দৌলত উজির বাহরাম খান
মধ্যযুগের কাব্যগ্রন্থ লাইলি-মজনু সাহিত্য-সম্পদে অতুলনীয়। সে যুগে রোমান্সের প্রয়োজনে অলৌকিক ও অস্বাভাবিক ঘটনার সমাবেশ যেখানে অপরিহার্য ছিল। এ কাব্যের মধ্যে, সে রকম ঘটনা দেখা যায় না।


১৬ শতকের রোমান্টিক প্রণয়োপখ্যান রচয়িতাদের মধ্যে অন্যতম প্রভাবশালী কবি হলেন- দৌলত উজির বাহরাম খান। মধ্যযুগীয় বাংলা ভাষার বিখ্যাত কবি। তার প্রকৃত নাম ছিল আসাউদ্দীন। তিনি পারস্যে লোককাহিনি ‘লাইলি মজনু’ শীর্ষক বেদনাবিধুর প্রেম-কাহিনিমূলক কাব্য রচনা করে মুসলিম সমাজে অত্যন্ত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। কবি চট্টগ্রামের অধিপতি নেজাম শাহ শুরের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতায় কাব্যটি রচনা করেছিলেন। এ কাব্য শিল্প-মহিমা বা সাহিত্য-সম্পদে অতুলনীয় এবং কবিত্বে পরিপক্ব। সেই যুগে রোমান্স সৃষ্টির প্রয়োজনে অলৌকিক ও অস্বাভাবিক ঘটনার সমাবেশ যেখানে অপরিহার্য ছিল, এ কাব্যের মধ্যে সে রকম অতিপ্রাকৃত ঘটনার চিহ্নমাত্র দেখা যায় না। ড. মুহম্মদ এনামুল হকের মতে, ১৫৬০ থেকে ১৫৭৫ সালের মধ্যে কবি লাইলি-মজনু কাব্য রচনা করেছিলেন। কবি দৌলত উজির বাহরাম খান রচিত লাইলি-মজনু কাব্য ফারসি কবি জামিরের লাইলি-মজনু নামক কাব্যের ভাবানুবাদ। লাইলি-মজনু প্রেমকাহিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এই কাহিনির মূল উৎস আরবি লোকগাথা। গুণী এই কবি বাহরাম খান চট্টগ্রাম জেলার ফতেয়াবাদ অথবা জাফরাবাদে জন্ম। বাবা মোবারক খান ছিলেন চট্টলাধিপতির উজির (মন্ত্রী)। অল্প বয়সে বাবাকে হারালে চট্টগ্রামের অধিপতি নেজাম শুর বাবার উজির পদে তাকে অভিষিক্ত করেন। রাজকাজের পাশাপাশি তিনি সাহিত্যাঙ্গনে রেখেছেন দৃপ্ত পদচারণা। কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে তিনি শিক্ষা গ্রহণ করেননি, তবে তিনি স্বশিক্ষিত ছিলেন। কবি আরবি, ফারসি ও সংস্কৃত ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। আর তারই প্রমাণ মিলেছে দৌলত উজির বাহরাম খান রচিত কাব্যগ্রন্থগুলো থেকে। বাহরাম খানের অপর আখ্যানকাব্য ইমাম-বিজয়। ইমাম-বিজয়ের বিষয়বস্তু কারবালার বিষাদময় যুদ্ধকাহিনি। সাহিত্যে দৌলত উজির বাহরাম খান রচিত প্রথম কাব্যের নাম জঙ্গনামা বা মক্তুল হোসেনও সমান জনপ্রিয়। লাইলি-মজনু তার দ্বিতীয় কাব্য।


সৈয়দ সুলতান
সৈয়দ সুলতান বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগীয় কবি। তিনি হবিগঞ্জ জেলার হবিগঞ্জ সদর উপজেলার (প্রাচীন তরফ রাজ্যের রাজধানী) লস্করপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। আনুমানিক ১৫৫০-১৬৪৮ সালের বাংলা সাহিত্যের কবি ছিলেন তিনি। মহাকবি সৈয়দ সুলতান কাহিনিকাব্য ও শাস্ত্রকাব্য রচয়িতা হিসেবে পরিচিত। তার বাংলা ভাষার ওপর বিশেষ দখল ছিল। তিনি একাধারে ফারসি ও উর্দু ভাষায় কাব্য রচনা করেন। তার রচিত জ্ঞান প্রদীপ গ্রন্থে গভীর সাধনতত্ত্ব আলোচিত হয়েছে। তার অন্যান্য গ্রন্থ হচ্ছে নবিবংশ, শব-ই-মিরাজ, রসুল বিজয়, ওফাৎ-ই-রসুল, জয়কুম রাজার লড়াই, ইবলিস নামা, জ্ঞান চৌতিশা, মারফতী গান, পদাবলী। তার শব-ই মিরাজ গ্রন্থটির আনুমানিক রচনাকাল ১৫০০ সালের শেষভাগ। প্রায় ২৫ হাজার পঙ্ক্তিতে তিনি নবিবংশ কাব্যটি রচনা করেন। নবিবংশ কাব্যে আল্লাহর গুণকীর্তন করে কবি, হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মবৃত্তান্ত শুরু করার আগে ১৮ জন নবির কাহিনি বর্ণনা করেছেন। হযরত আদম (আ.)-এর কাহিনি প্রথম এবং ঈসা (আ.)-এর কাহিনি দিয়ে নবিবংশ প্রথম পর্বের সমাপ্তি ঘটান। এভাবে কবি এ মহাকাব্যের প্রথম খন্ডের সমাপ্তি টানেন। সৈয়দ সুলতান স্বতন্ত্র ও ব্যাপকভাবে বাংলা ভাষার মাধ্যমে মুসলমানদের ধর্ম ও সংস্কৃতি চর্চার প্রয়োজনীয়তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন।


হেয়াত মাহমুদ
মুঘল আমলের সর্বশেষ কবি হেয়াত মাহমুদ। অনুমান করা হয় ১৬৮০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৬৮৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ের মধ্যে জন্মগ্রহণ করেন। আর ১৭৬৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে কোনো এক সময়ের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর পিতার নাম ছিল শাহ মুহম্মদ কবির এবং তাঁর পিতা সে সময়ে ঘোড়াঘাট সরকারের দেওয়ান ছিলেন। হেয়াত মামুদের পিতাও ছিলেন একজন কবি। কবির পূর্বপুরুষরা মুঘল ও নবাবি আমল থেকে বংশ পরম্পরায় সরকারি কর্মকর্তা বা কাজী ছিলেন। হেয়াত মাহমুদ নিজেও একজন কাজী বা বিচারক ছিলেন। এখন পর্যন্ত কবি হেয়াত মাহমুদের চারখানা গ্রন্থের সন্ধান পাওয়া গেছে। সেসব কাব্যগ্রন্থের মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য জঙ্গনামা বা মহররম পর্ব, চিত্ত উত্থান বা সর্বভেদ, হিতজ্ঞান বাণী, আম্বিয়া বাণী। কবির জঙ্গনামা বা মহররম পর্ব কারবালার হাসান হোসেনের বিষাদময় কাহিনি নিয়ে রচিত কাব্য। গ্রন্থে রসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রিয় নাতি হাসান হোসেনের মৃত্যুর করুণ পরিণতি, বিষের পেয়ালা পানে হাসানের মৃত্যু। নববধূ সখিনার অকাল বৈধব্য, বিলাপ, কাফেরের তরবারি তলে (সিমারের) ইমাম হোসেনের নির্মম শিরোচ্ছেদ প্রভৃতি হৃদয়গ্রাহী করুণ বর্ণনা কাব্যে স্থান পেয়েছে। জঙ্গনামা কাব্যগ্রন্থের একস্থানে কবি হেয়াত মাহমুদ নিজের আত্মপরিচয় দিয়েছেন। যার মধ্য দিয়ে পীরগঞ্জ এলাকার ঝাড় বিশিলা গ্রামের ইতিহাস-ঐতিহ্য প্রতিফলিত হয়েছে।


জৈনুদ্দিন
‘রসুল বিজয়’ কাব্য কোনো মৌলিক কাহিনি নয়, ফারসি এক পুস্তক থেকে গৃহীত কাহিনিকে কবি নবরূপ দিয়েছেন। কাব্যে যুদ্ধে ইসলামের বিজয় দেখানো হয়েছে।
মধ্যযুগীয় বিখ্যাত কবি জৈনুদ্দিন। ১৫ শতকে রস প্রধান সাহিত্য সৃষ্টির প্রেরণা নিয়ে যে কজন শরিক ছিলেন, তাদের মধ্যে যুগের উন্মোচন করলেন পরবর্তীতে তাতে অনেকেই শরিক হলেন। কবি জৈনুদ্দিন অন্যতম। তিনি গৌড়ের সুলতান ইউসুফ শাহের (১৪৭৪-১৪৮১খ্রি) সভাকবি ছিলেন। কবি তার কাব্য ভণিতায় বারবার সুলতানের নাম উল্লেখ করেছেন। জৈনুদ্দিনের কাব্যের নাম ‘রসুল বিজয়’। কাব্যটি হযরত মুহাম্মদ (সা.) কর্তৃক ইসলাম ধর্ম প্রচারের বিজয়াত্মক কাহিনি। কাব্যে হযরত মুহাম্মদ (সা.) ও ইরাকের এক অধিপতি জয়কুমের মধ্যকার দীর্ঘ যুদ্ধের বর্ণনা করে। ‘রসুল বিজয়’ মৌলিক কাহিনি নয়, কোনো ফারসি পুস্তক থেকে গৃহীত কাহিনিকে কবি নবরূপ দিয়েছেন। কবির বাবার নাম ছিল মৈনুদ্দিন। তারা নিজেদের খলিফা আবুবকর সিদ্দিকীর বংশধর বলে দাবি করেন। জৈনুদ্দিন ছিলেন সুফি ধারার অনুসারী। শাহ মোহাম্মদ খান ছিলেন তার পির। কবির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন গৌড়ের যুবরাজ ইছপ খান (ইউসুফ খান), যিনি পরে শামসুদ্দীন ইউসুফ শাহ (১৪৭৪-৮২) নামে গৌড়ের সুলতান হন।


সৈয়দ আলাওল
সৈয়দ আলাওল ছিলেন সপ্তদশ শতকের কবি। কারও মতে, তিনি ফরিদপুরের বাসিন্দা আবার কারও মতে চট্টগ্রামের। কবি আলাওল আরাকান রাজসভার অন্যতম কবি হিসাবে আবির্ভূত হলেও মধ্যযুগের সমগ্র বাঙালি কবির মধ্যে ‘শিরোমণি ছিলেন তিনি। আরবি ফারসি হিন্দি ও সংস্কৃত ভাষায় তিনি সুপন্ডিত ছিলেন। ব্রজবুলি ও মঘী ভাষাও তার আয়ত্তে ছিল। পাশাপাশি যোগশাস্ত্র, কামশাস্ত্র, অধ্যাত্মবিদ্যা, ইসলাম ও হিন্দু ধর্মশাস্ত্র-ক্রিয়াপদ্ধতি, যুদ্ধবিদ্যা প্রভৃতিতে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। তবে কবির জীবনে ছিল সুখ-দুঃখের টানাপোড়নে। কবি আলাওলের বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ পদ্মাবতী। রোসাঙ্গ রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী মাগন ঠাকুরের আশ্রয়ে ও অনুপ্রেরণায় আলাওল পদ্মাবতী রচনা করেন। যা ছিল কবি মালিক মুহম্মদ জায়সীর হিন্দি কাব্য পদুমাবৎ-এর অনুবাদ। সৈয়দ মুসার উৎসাহে সয়ফল মুলুক ও বদিউজ্জামাল নামক পারস্য গ্রন্থ অনুবাদ করেন। মধ্যযুগের আরেক কবি দৌলত কাজীর অসমাপ্ত কাব্য শেষ করেন আলাওল, এর নাম সতীময়না। তার উল্লেখযোগ্য কাব্যের মধ্যে রয়েছে তোহ্ফা, দারাসেকেন্দারনামা প্রভৃতি।


নসরুল্লাহ খাঁ
মধ্যযুগের মুসলিম সাহিত্যে অবদানের জন্য সেরা হয়ে আছেন কবি নসরুল্লাহ খাঁ। মুসলিম ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে তার কাব্যগ্রন্থ রচিত করে মুসলিম সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেন।


মধ্যযুগে বাংলার মুসলিম সাহিত্যে একটি স্বর্ণ যুগ দেখা যায়। সেই যুগের বাংলা সাহিত্যে মুসলমানদের দান খুব গুরুত্বপূর্ণ। সেই স্বর্ণযুগে আরেক বিখ্যাত বাঙালি কবি হলেন- নসরুল্লাহ খাঁ। আনুমানিক ১৫৬০-১৬২৫ সালে তিনি অসামান্য কিছু কাব্য রচনা করেন। এ পর্যন্ত তার রচিত চারটি কাব্যগ্রন্থের সন্ধান পাওয়া গেছে। সেগুলো হলো- জঙ্গনামা, মুসার সাওয়াল, শরিয়তনামা ও হিদায়িতুল ইসলাম। তার রচিত জঙ্গনামা ও শরিয়ত নামা গ্রন্থে তার সুদীর্ঘ আত্মবিবরণী দেখা যায়। শরিয়ত নামায় লিখিত আত্মবিবরণী থেকে জানা যাচ্ছে যে, কবির পূর্ব পুরুষ হামিদুদ্দীন খান গৌড় দরবারের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন। আধুনিক দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাহার ছড়াহ নামক স্থানে তিনি বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন। কবি নসরুল্লাহর কোনো সন্তান ছিল না। কিন্তু তার ভাইসহ বংশের অন্যরা এখনো বাঁশখালী থানার জলদি গ্রামে বসতি স্থাপন করে আছেন। কবির কাব্যে সন্দ্বীপ বিজয়ী ফতেহ খানের উল্লেখ আছে। কবির বংশপরিক্রমায় জানা যায়, কবি ষোড়শ শতকের শেষ ও সপ্তদশ শতকের প্রথমদিকে জীবিত ছিলেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here