বাংলা সাহিত্যের মুসলিম বিখ্যাত কবি

0
46

আবদুল কাদের
ইসলামি সমাজে সাহিত্য সমাদৃত। পবিত্র কুরআন আরবি সাহিত্যের উৎকৃষ্ট নিদর্শন। তাই যুগে যুগে মুসলিম সমাজেও সাহিত্যচর্চার শুরু হয় ইসলামের সূচনাকালেই। তবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চায় মুসলিম কবিদের পথ চলা শুরু হয় সুলতানি আমলে। যাঁদের লেখনীতে প্রকৃতি, সৃষ্টি আর সৃষ্টিকর্তার গুণগান ছিল দারুণ শ্রুতিমধুর। কাব্যচেতনার মাধ্যমে তারা সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি অনুসন্ধান এবং তাঁর সন্তুষ্টি লাভের পথ খুঁজেছেন। কবি-সাহিত্যিকরা কলমের আঁচড়ে পুষ্টি জুগিয়েছেন পাঠকের মনে। হৃদয় করেছেন পরিতৃপ্ত। যা পরবর্তীকালে বাংলা ভাষাভাষীর মনে আনে মানবপ্রেম, ন্যায়নীতি, উত্তম আদর্শ ও শিষ্টাচার। সে সময়কার মুসলিম সাহিত্যের বিখ্যাত কয়েকজন কবি-সাহিত্যিকদের নিয়ে আলোচনা করা হলো:


শাহ মোহাম্মদ সগীর
কাব্যগাঁথা ইউসুফ-জোলেখা গ্রন্থের নাম শোনেননি, এমন সাহিত্যপ্রেমী বোধ হয় কমই আছে। কিন্তু অনেকেই হয়তো জানেন না, এর রচয়িতা কে? তিনি প্রাচীনতম মুসলিম কবি শাহ মোহাম্মদ সগীর। আনুমানিক ১৩-১৪ শতকের সময় বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত কবি ছিলেন তিনি। ধারণা করা হয়, গৌড়ের সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহর রাজত্বকালে (১৩৮৯-১৪১১ খ্রিস্টাব্দ) তিনি কাব্যগাঁথা ‘ইউসুফ-জুলেখা’ রচনা করেন। কবি ছিলেন সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের রাজকর্মচারী। এই সময় তিনি বন্দনা গীতি কবিতাও রচনা করেন। যেখানে বাবা-মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ফুটে ওঠে। তুলে ধরেন শাসকের স্তুতিও। কাব্যরস পরিবেশন অপেক্ষা ধর্মীয় প্রেরণা সৃষ্টির প্রতিই শাহ মোহাম্মদ সগীরের অধিক আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়। সে যুগে বাংলা ভাষাভাষীদের রম্যরসে ভরা ধর্মকাহিনি রচনা করার মধ্যে কবির সৎসাহসের পরিচয় মেলে। বাইবেল-কোরআন কিংবা ফেরদৌসী-জামির অনুসরণে কাহিনি-কাব্যটি কল্পিত হলেও, বাংলাদেশ ও বাঙালি-জীবনের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পেয়েছে। ধারণা করা হয়, কাব্যটি আনুমানিক পঞ্চম শতাব্দীর প্রথম দশকে রচনা করা হয়। ড. এনামুল হকের মতে, কবি শাহ মোহাম্মদ সগীর ইউসুফ-জুলেখার মূল কাহিনি সংগ্রহ করেন ‘কিতাবুল কোরআন’ থেকে। কিন্তু কাব্যটি ধর্মীয় উপাখ্যান নয়, রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান যা মানবজীবন রসে সিক্ত। শাহ মোহাম্মদ সগীর মূলত কোরআনে বর্ণিত ইউসুফ-জুলেখাকে নতুন আকৃতিতে মোহনীয় মূর্তি গড়ে তুলেছিলেন।

শেখ ফয়জুল্লাহ
মধ্যযুগের মুসলিম কবি শেখ ফয়জুল্লাহ। বাংলার বুকে অসাম্প্রদায়িক কবি হিসেবে তিনি পরিচিত। তার জন্মস্থান নিয়ে মতভেদ আছে। নানা তথ্যমতে, কবি শেখ ফয়জুল্লাহর জন্মস্থান (আনুমানিক ১৫৭৫-৭৬ সালে) হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের বারাসাত, দক্ষিণ রাঢ় এবং কুমিল্লার নাম উল্লেখ আছে। তবে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এবং ডক্টর আহমদ শরীফ তার জীবনকাল ১৫৭৫-৭৬ খ্রিস্টাব্দ বলে নির্ধারণ করেছেন। অর্থাৎ যে সময়টায় বাংলায় কররানি বংশের (১৫৫৯ থেকে ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দ) শাসনের অবসান ঘটেছে। কররানি বংশের শাসক ছিলেন সোলায়মান এবং দাউদ কররানি। ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় আরম্ভ হয় মুঘল আমল। এমন সময়েও তিনি বেঁচে ছিলেন। শেখ ফয়জুল্লাহর জন্ম পশ্চিমবঙ্গের পাচনা গ্রামে। এই মতটি ডক্টর সুকুমার সেনের। শেখ ফয়জুল্লাহর মোট পাঁচটি কাব্যের সন্ধান মেলে। সেগুলো হলো- ‘গোরক্ষবিজয়’, ‘গাজীবিজয়’, ‘সত্যপীর (১৫৭৫)’, ‘জয়নবের চৌতিশা’ এবং ‘রাগনামা’। রংপুরের খোঁট দুয়ায়ের পির ইসমাইল গাজীর জীবন নিয়ে রচিত গাজীবিজয়। কবি আধ্যাত্মিক সাধনা অবলম্বনে গড়ে উঠেছে সত্যপীর কাব্যটি। জয়নবের চৌতিশার বিষয়বস্তু মহররমের মর্মান্তিক ঘটনা। রাগনামাকে বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম সংগীতবিষয়ক কাব্য মনে করা হয়। দেখা যায় শেখ ফয়জুল্লাহর অধিকাংশ কাব্যের বিষয়ই পির-দরবেশ এবং কারবালার মতো মুসলিম ঐতিহ্য। শেখ ফয়জুল্লাহ বাংলা সমাজের চিরায়ত দ্ধন্ধকে অতিক্রম করতে পেরেছিলেন।


দোনাগাজী চৌধুরী
মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যকে যে কয়েকজন সাহিত্যিক সমৃদ্ধ ও গৌরবোজ্জ্বল করেছেন তাদের মধ্যে কবি দোনাগাজী চৌধুরী অন্যতম। তিনি বাংলায় ‘আলিফ লায়লা’ অবলম্বনে প্রথম রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান ‘সয়ফুল মুলুক-বদিউজ্জামাল’ রচনা করেন। তাঁর পরে মহাকবি আলাওল (১৫৯৭-১৯৭৩) ও মালে মুহম্মদ (ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভ) একই কাহিনি অবলম্বনে কাব্য রচনা করেন। গবেষকরা মনে করেন, দোনাগাজী আনুমানিক ১৬ শতকের মধ্যভাগ থেকে ১৭ শতকের প্রথমভাগের কবি। নিজের লেখা কাব্যে, পুথিতে বা অন্য কেউ তার জন্মসাল উল্লেখ করেননি। ড. এনামুল হক মনে করেন, ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যভাগে দোনাগাজীর আবির্ভাব। দোনাগাজীর জন্মস্থান নিয়েও কয়েকটি তথ্য প্রচলিত রয়েছে। কাব্যে তিনি জানিয়েছেন, ‘দোল্লাই’ দেশে তার নিবাস। দোল্লাই পরগনা বর্তমান কুমিল্লা জেলায় অবস্থিত। দোনাগাজীর ‘চৌধুরী’ উপাধি এবং কাব্যে ক্ষুরধার প্রতিভা দেখে আহমদ শরীফ অনুমান করেছেন, ‘তিনি ধনী-মানি বংশের সন্তান। দেশ প্রচলিত বিদ্যা ও সংস্কৃতিতে তিনি অভিজ্ঞ ছিলেন।’ দোনাগাজী রচিত ‘সয়ফুল মুলুক-বদিউজ্জামাল’ কাব্যের শুরুতে কেবল স্তুতিপর্বে আল্লাহ-রসুল-পিরের বন্দনা রয়েছে। কোনো রাজা, আমলা বা অন্য কারও প্রশংসা করা হয়নি। অর্থাৎ কোনো পৃষ্ঠপোষকতা কবি নেননি। হয়তো নিজে বিত্তবান হওয়ায় পৃষ্ঠপোষকতা গ্রহণের প্রয়োজন পড়েনি। এ থেকে অনুমান করা যায়, তার কাব্য রচনার পেছনে আত্মোৎসাহ কাজ করেছে।
চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here