বাংলা সাহিত্য ফারসি রসে ঋদ্ধকরণে কাজী নজরুল ইসলামের অবদান

0
19

মেহেদী হাসান
কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬ খ্রি.) বাংলা সাহিত্যের অভূতপূর্ব প্রতিভা এবং চিরন্তন বাঙালি জাতিসত্তার প্রতিভূ এক স্বভাব-কবি। আজীবন দারিদ্র্যের সাথে মিতালিতে অভ্যস্ত মহান নজরুল সৈনিক হিসেবে বিশ্বযুদ্ধের রণাঙ্গনে, নির্ভীক সাংবাদিক হিসেবে ধূমকেতুর মতো প্রকাশনার জগতে এবং সাধারণ বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে রাজনীতির আঙ্গিনায় অবাধ বিচরণের পাশাপাশি কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস ও নাটকসহ সাহিত্যের সকল শাখায় নিজের যে অসামান্য সৃষ্টিশীলতার পরিচয় দিয়েছেন, বিশ্বসাহিত্যে তার দৃষ্টান্ত বিরল। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১ খি.) যুগে জন্মগ্রহণ করেও তিনি কেবল তাঁর প্রভাবমুক্ত হতেই সক্ষম হননি, আধুনিক বাংলা সাহিত্যে সূচনা করতে পেরেছিলেন এক অনন্য ধারার, যে ধারাটি মধ্যযুগে বাঙালি মুসলিম কবিদের প্রচেষ্টায় ‘মুসলমানি রীতি’ বলে স্বীকৃতি লাভ করেছিল।

মূলত ‘আধুনিক বাংলা সাহিত্য কেবল হিন্দুদের সাহিত্য নয়, মুসলমানদের সাহিত্যও বটে’ এ বিষয়টিকে যে কেবল প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন, তা-ই নয়, বাংলা সাহিত্য-জগতে রবীন্দ্রনাথ পরবর্তী শ্রেষ্ঠত্বের স্থানটিকেও তিনি নিজের করে নিতে পেরেছেন। তিনি এ দুরূহ কাজটি করতে সক্ষম হয়েছিলেন কুলীন আধুনিক বাংলা সাহিত্যে অবহেলিত, কিন্তু বাংলার আপামর গণমানুষের মুখে মুখে সাধারণভাবে প্রচলিত ফারসি, আরবি ও উর্দু শব্দরাজিসমৃদ্ধ ‘মুসলমানি ভাষা’ অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সাহিত্যকর্মে ব্যবহারের মাধ্যমে। তিনি এতে এতটাই সফল হয়েছিলেন যে, তাঁর জীবদ্দশাতেই এ সাহিত্য-রীতিকে কেন্দ্র করে বাংলা সাহিত্যে এক ব্যতিক্রমী ধারার উদ্ভব ঘটে। তাঁর সম ও উত্তরকালে হিন্দু মুসলমান বহু কবি-সাহিত্যিকই এ ধারায় প্রভাবিত হন। আধুনিক বাংলা সাহিত্যে নজরুল যে ভাষার শব্দ সবচেয়ে বেশি ঋণ করেছেন, সেটি হচ্ছে ফারসি। শুধু ফারসি শব্দই নয়, বিশ্বখ্যাত ফারসি সাহিত্যের বিভিন্ন সাহিত্য-উপাদানও বাংলা সাহিত্যে প্রয়োগ করে এ সাহিত্যকে তিনি নিয়ে যান এক অনন্য উচ্চতায়। ফারসি সাহিত্যের বিশ্ববিশ্রুত কবিদের বিভিন্ন সাহিত্যকর্মের অনুবাদ ও তাঁদের দর্শন ও ভাবধারাকে বাংলা সাহিত্যে প্রবিষ্ট করে তিনি এ সাহিত্যে একটি ভিন্নমাত্রা সংযোজন করেন। তাঁর এ বিস্ময়কর প্রতিভাই বাংলা সাহিত্যে তাঁকে দান করেছে শ্রেষ্ঠত্ব ও চিরন্তনতা; আসীন করেছে বাংলাদেশের ‘জাতীয় কবি’র আসনে।


ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই, আর্য ও অনার্যদের সংমিশ্রণের ফসল হচ্ছে বাঙালি জাতি। এর পরবর্তী পর্যায়ে আরব-ইরান তথা মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম ব্যবসায়ী, ধর্মপ্রচারক ও বিজয়ী শাসকগোষ্ঠী বঙ্গীয় জনপদে ইসলাম প্রচারের ফলে বাঙালি জাতির মধ্যে হিন্দু ও মুসলমান এ দুটি বৃহত্তর স্বতন্ত্র সম্প্রদায় অস্তিত্ব লাভ করে। ফলে অবধারিতভাবে ধর্মকে কেন্দ্র করে একই ভাষার দুটি ধারা সূচিত হয়।

সনাতনী বাংলা এবং মুসলমানি বাংলা। বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ থেকে এ দুটি ধারায়ই যথাক্রমে হিন্দু লেখকগণ মঙ্গলকাব্য এবং মুসলমান কবি-সাহিত্যিকগণ ফারসি সাহিত্যের অনুবাদ-নির্ভর বাংলা পুঁথিকাব্য, যেমন : ইউসুফ-জুলেখা, লাইলী-মজনু, জঙ্গনামা, নূরনামা প্রভৃতি কাব্য রচনা করতে থাকেন। মুসলমানি বাংলা বলতে আমরা ওই বাংলাকে বুঝি, যে বাংলা সমৃদ্ধ হয়েছিল ফারসি এবং ফারসিভাষী শাসকগোষ্ঠীর ভাষায় ব্যাপকহারে ব্যবহৃত আরবি শব্দাবলির দ্বারা, যেগুলোকে তারা ফারসি ভাষার আবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে করত। বলা হয়ে থাকে, ফারসি-আরবি শব্দভান্ডারসমৃদ্ধ এ মুসলমানি বাংলা-ই বাংলা ভাষাকে মাতৃভাষায় পরিণত হবার হাত থেকে রক্ষা করে। এ ভাষাটি সৃষ্টির পটভূমি হচ্ছে : ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে ইখতিয়ারুদ্দিন মুহাম্মাদ বিন বখতিয়ার খিলজি কর্তৃক বঙ্গদেশ মুসলিম শাসনের আওতায় আসার পর থেকে ১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় ৬৩৪ বছর বাংলার সরকারি তথা রাজভাষা ছিল ফারসি। চাকুরি পাবার ক্ষেত্রে এখন যেমন প্রতেকের ইংরেজি জ্ঞান থাকা আবশ্যক, ওই সময়কালে তেমনি হিন্দু, মুসলমান কিংবা অন্য যেকোনো ধর্মের অনুসারীকেই সরকারি চাকুরি পেতে হলে ফারসি ভাষা জানতেই হতো। শাসকদের ভাষা হিসেবে এটি ছিল সকল সম্প্রদায়ের অভিজাত শ্রেণির ভাব বিনিময়ের মাধ্যম। ফলে এ ছয় শতাধিক বছরে হাজার হাজার ফারসি এবং ফারসিতে ব্যবহৃত আরবি শব্দ ব্যাপকহারে বাংলা ভাষায় অনুপ্রবেশ করে। উল্লেখ্য, ফারসি ভাষা বাঙালি জাতির উপর এতটাই প্রভাব বিস্তার করেছিল যে, ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ কর্তৃক এ দেশ বিজিত হলেও ১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় ৮১ বছর তারা তাদের ভাষা ইংরেজি দ্বারা ভারতবর্ষে শাসনকার্য পরিচালনা করতে সক্ষম হয়নি। এ সময়ে তাদেরকেও ফারসি ভাষা শিখেই এদেশ শাসন করতে হয়েছে। এমনকি ১৮৩৮ সালে এক রাজকীয় ফরমানের মাধ্যমে ইংরেজিকে সরকারি ভাষায় রূপান্তরিত করা হলেও বিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগ পর্যন্ত ফারসি ভাষার ব্যবহার ও চর্চা এদেশের হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায়েরই শিক্ষিত শ্রেণির মধ্যে স্ব-মহিমায় বিদ্যমান ছিল।


এ কথা সর্বজনস্বীকৃত যে, ফারসির ভাষাশৈলী সাহিত্যচর্চা বিশেষত কাব্যচর্চার জন্য বিশ্বের যে কোনো ভাষার চেয়ে অনুকূলতর। তবে কেবল ভাষাশৈলীই নয়, এ ভাষায় বিদ্যমান প্রেম, মানবতা ও নৈতিকতার বাণী ও শিক্ষা বাঙালি কবি-সাহিত্যিকদের ভীষণভাবে আকৃষ্ট করত। আর এ কারণেই তাঁরা বাধ্য হয়ে নয়, বরং মনের টানেই এ ভাষায় সাহিত্যচর্চা করতে আগ্রহী হয়েছিলেন। আর সে কারণেই ১৮৩৮ সালে সরকারিভাবে এ ভাষার পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ হয়ে গেলেও এর চর্চা সাধারণের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই তখনও বিদ্যমান ছিল। তবে এটা ঠিক যে, চর্চাটি তখন ক্রমক্ষয়িষ্ণু ছিল।

বাঙালি মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে, বিশেষ করে ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে ইসলাম ধর্মের দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে তখনও ফারসি ভাষার চর্চা সমাজে বিদ্যমান ছিল; এমনকি মধ্যযুগে যে বাঙালি হিন্দু কবি-সাহিত্যিকগণ বিদ্বেষপ্রসূতভাবে এ ভাষার শব্দরাজি ব্যবহার থেকে নিজেদের বিরত রেখেছিলেন, তাঁরাও এ যুগে তাঁদের গল্প-কবিতায় ফারসি-আরবি শব্দের ব্যবহার শুরু করেন, এদের মধ্যে রাজা রামমোহন রায়, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ও মোহিতলাল মজুমদারের নাম প্রণিধানযোগ্য। অত্র প্রেক্ষাপটটির এ কারণে অবতারণা করা হলো, যাতে আগ্রহী পাঠকগণ অনুধাবন করতে পারেন যে, ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে জন্ম নেওয়া কাজী নজরুল ইসলাম এমন একটা সময়, পরিবেশ ও পরিবারে বেড়ে উঠেছিলেন, যেখানে ফারসি কোনো অপরিচিত ভাষা ছিল না এবং এর চর্চা ক্ষীণভাবে হলেও সেখানে তখনও বিদ্যমান ছিল। তাই এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি গভীর আকর্ষণ জিনগতভাবেই নজরুলের মধ্যে বিরাজমান ছিল। এটা ছিল শত শত বছরের প্রাচীন এমন এক উত্তরাধিকার, যা দ্বারা তিনি বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

ফারসি ভাষাজ্ঞানের সাথে নজরুলের পরিচয়, যখন তিনি চুরুলিয়া গ্রামের মক্তবে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করতে যান। এ কথা স্বতঃসিদ্ধ যে, তৎকালীন মক্তবসমূহে বাংলা, উর্দু ও আরবি শেখানোর পাশাপাশি কবি শেখ সাদির গুলিস্তান ও বুস্তান, ফরিদুদ্দিন আত্তারের পান্দনামা ও মানতেকুত্তাইর এবং মৌলানা রুমির মসনভি শরিফের পাঠও দেওয়া হতো। তাই মক্তবে পাঠগ্রহণকালীন তিনি ফারসির উপর প্রাথমিক জ্ঞান লাভ তো করেনই, উপরন্তু শিক্ষালাভ শেষে তিনি যখন একই মক্তবে শিক্ষকতা শুরু করেন, তখন হয়ত ওই ফারসি কিতাবাদি তাঁকে পড়াতেও হতো। এছাড়া তাঁর জীবনীগ্রন্থসমূহে দেখা যায়, শৈশবকালে তিনি তাঁর চাচা বজলে করিমের কাছে ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের উপর তালিম নেন। এভাবে তাঁর ফারসি ভাষাজ্ঞান ধীরে ধীরে আরো শাণিত হয়ে ওঠে।


ভৌগোলিক দিক বিবেচনা করলে দেখা যায়, পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্গত বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামের কিছুটা উত্তর থেকেই শুরু হয়েছে উর্দুভাষী বিহারী অধ্যুষিত ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্য। সে কারণে চুরুলিয়া এলাকার মানুষের মাতৃভাষা বাংলা হলেও তা ছিল ব্যাপক মাত্রায় উর্দু প্রভাবিত। আর যেহেতু ফারসি শব্দভান্ডারকে আশ্রয় করে হিন্দি ভাষা থেকে উর্দু ভাষার জন্ম, তাই ভৌগোলিক কারণেও নজরুল উর্দু ও উর্দুর হাত ধরে ফারসি শব্দরাজির সাথে পরিচিতি লাভ করেন সেই ছোটবেলাতেই।
নজরুলের এ ফারসি জ্ঞান পরিপক্বতা লাভ করে যখন তিনি ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here