বাগদাদ যখন মুসলিম বিশ্ব শাসন করত

0
62


বিপ্লব

এই বৈপ্লবিক আন্দোলন সমাজের বিভিন্ন অংশের সমর্থন লাভ করে। আরব-অনারব সবাই নবি পরিবারের ভালোবাসায় আকৃষ্ট হয়। আব্বাসিয় পরিবারের বিস্তারিত ইচ্ছাকৃতভাবেই অস্পষ্ট রাখা হয়, কিন্তু শুধুমাত্র ইসলামি পুনর্জাগরণের গুরুত্ত্বপূর্ণ হওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। নতুন আন্দোলনের সামরিক নেতা ছিলেন এক রহস্যময় চরিত্র আবু মুসলিম যে আব্বাসিয় পরিবার বাকুফার প্রধান ষড়যন্ত্রকারীদের কেউ ছিলেন না। আব্বাসিয়দের সময়ে তার পরিচয় নিয়ে বিস্তর জল্পনা-কল্পনা ছিল। তার নাম আবু মুসলিম। মুসলিমের পিতার ছিল একটা ছদ্ম নাম, যেখান থেকে তার বংশ পরিচয়ের কোনো হদিস পাওয়া যায় না। তিনি সম্ভবত ছিলেন নিচু বংশের, হয়ত একজন আজাদকৃত কৃতদাস, যিনি কুফার প্রধান যড়যন্ত্রকারী আর তাদের খোরাসানি সমর্থকদের মধ্যে গোপন যোগাযোগে নিজেকে অপরিহার্য হিসেবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।


আবু মুসলিম দ্রুতই আন্দোলনের নেতৃত্ব নিয়ে নেন, সমর্থকদের মধ্যে আবেগকে কাজে লাগিয়ে আন্দোলনকে এগিয়ে নেন, কিন্তু একই সাথে বিরোধীদের নিষ্ঠুরভাবে দমন কল্পে, এমনকি তার হাত থেকে আন্দোলনের শুরুর দিকের সমর্থকরাও রক্ষা পায়নি। সম্ভবত কোনো বিপ্লবী আন্দোলন ক্ষমতা দখলের পর প্রারম্ভিক উচ্ছ্বাস শেষে এটির টিকে থাকার জন্য একজন নিষ্ঠুর ব্যক্তির প্রয়োজন হয়। আবু মুসলিম নিশ্চিতভাবেই আব্বাসিয়দের জন্য সেই ভূমিকা পালন করেছিলেন। বলা হয় তার ক্ষমতাকালীন চার বছরে আবু মুসলিম ষাট হাজার মানুষকে ঠান্ডা মাথায় হত্যা করেছিলেন। এই সংখ্যা হয়ত অতিরঞ্জিত, কিন্তু মোদ্দাকথা পরিষ্কার, আবু মুসলিম খুবই নিষ্ঠুর ছিলেন আর উদ্দেশ্য সাধনে প্রচুর মানুষকে হত্যা করেছিলো।


মার্ভে যখন বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠেছে, আব্বাসিয় পরিবার তখনো অনেক দূরে হুমায়মায়ই অবস্থান করছিল। এর কারণ হতে পারে, হয়ত কুফা গ্রুপ, বুখায়েরের মৃত্যুর পর আবু সালামা যার নতুন নেতা, তাদের তখনো সবকিছুর কেন্দ্রে আনতে চায়নি অথবা তারা আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছে রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু এখানেও উমাইয়া শাষকরা তাদের তাদের হদিস পেয়ে গিয়েছিল। একদিন একজন উমাইয়া প্রতিনিধি হুমায়মায় হাজির হয়, আর ইব্রাহিমের খোঁজ করে, যে ছিল মোহাম্মদ ইবনে আলীর বংশধর। ইব্রাহিমকে গ্রেফতার করা হয় উমাইয়া খলিফা মারওয়ানের কাছে হেরান শহরে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে শেষ উমাইয়া খলিফা তার ঘাটি স্থাপন করেছিলেন। সেখানে তাকে কারাদন্ডে দন্ডিত করা হয়। বেঁচে যাওয়া আব্বাসিয়রা বুঝতে পারে, তাদের দ্রুতই পালাতে হবে। চৌদ্দজন পুরুষ ও তাদের সমর্থকরা হুমায়মা ত্যাগ করে। তারা শাসক গোষ্ঠীর দৃষ্টি এড়াতে দূর্গম দক্ষিণের পথে দামাত আলজান্দাল হয়ে ইরাক পাড়ি দেয়, ক্লান্ত আর কপর্দক শূন্য হয়ে কুফায় পৌছায়, তাদের ভাড়া করে আনা উটের চালকদের পারিশ্রামিক দেওয়ার জন্য ১০০ দিনার পর্যন্ত তাদের কাছে ছিল না। তাদের সমর্থকরা তাদের একটা গোপন আস্তানায় লুকিয়ে রাখে, তাদেরকে কোনো ক্রমেই বাড়ির বাইরে না আসার নির্দেশ দেওয়া হয়। উমাইয়ারা রক্ষণাত্মক অবস্থায় থাকলেও তখনো ছিল অনেক বিপদজনক।


ইতোমধ্যে আবু মুসলিম মার্ভে তার অবস্থান সুরক্ষিত করেছে আর পশ্চিমে তার সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেছে। একের পর এক বুদ্ধিদীপ্ত জয়ে তারা উমাইয়া বাহিনীকে ইরান থেকে বিতাড়িত করে আর শীঘ্রই তারা ইরাকের সমতলভূমিতে গিয়ে হাজির হয় আর কুফার দিকে ধাবিত হয়। কুফায় আব্বাসিয়দের সমর্থকরা এক অভ্যুত্থান ঘটায় আর শীগ্রই বিপ্লবী বাহিনী শহরের নিয়ন্ত্রণ নেয়। যাদের জন্য তারা লড়াই করছে, তখনও সেই আব্বাসিয়দের কোনো হদিস তারা পাচ্ছিল না। স্থানীয়দের মাঝে জিজ্ঞাসাবাদ করে সেই গোপন আস্তানার হদিস পাওয়া যায় আর একদল খোরাসানি তাদের নতুন নেতা আবুল আব্বাসের কাছে আনুগত্যের শপথ নেয়, যে পরবর্তীতে সাফাহ উপাধি ধারণ করে। এটা মোটেই আবু সালামা বা কুফা গ্রুপের জন্য সুখকর ছিল না, কারণ তারা আন্দোলনের সুফল নিজেরা ভোগ করতে চেয়েছিল, অথবা তাদের শত্রুরা যেমন অভিযোগ করে, তারা আলী পরিবারের একজনকে খলিফা হিসেবে বসাতে চেয়েছিল। আবু সালামা দ্রুতই ক্ষমা প্রার্থনা করেন। আর এতে আব্বাসিয় পরিবার আর তাদের সমর্থকরা উভয়েই বিজয়ীর ভুমিকায় অবতীর্ণ হলো।

জ্বরে ভুগে অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও নতুন খলিফা মসজিদে জনগণের সামনে হাজির হলেন। তিনি বিপ্লবের কারণ ব্যখ্যা করে বক্তৃতা দিলেন, আর স্থান ত্যাগ করার পূর্বে তার বাগ্মী চাচা দাউদকে বক্তৃতা করার জন্য দিয়ে গেলেন। তখন কুফার জনগণ, স্থানীয় লোকেরা ও খোরাসানী সৈন্যরা, নতুন খলিফা ও রাজ পরিবারের নিকট আনুগত্যের শপথ নিতে প্রস্তুত হয়। ইসলামে তখনো রাজ-অভিষেকের মতো কোনো অনুষ্ঠান হতো না, বরং লোকজন নতুন খলিফার হাত ধরে শপথ নিয়ে নিজেদের আনুগত্য প্রকাশ করত। আব্বাসিয়দের প্রাথমিক যুগে রাজধানীর প্রধান মসজিদে জনগণের অংশগ্রহণে প্রকাশ্য অনুষ্ঠান হতো, যেটা কয়েকদিন পর্যন্ত স্থায়ী হতো। পরেরদিকে এই শপথ গ্রহণ বা বায়েত অনুষ্ঠান প্রাসাদে গোপনীয়ভাবে কিছু সৈন্য ও সরকারী কর্মচারীদের দ্বারা পালিত হতো আর বৃহত্তর মুসলিম সমাজকে শুধু জানিয়ে দেওয়া হতো, নতুন খলিফা কে হলেন।


কুফা বিজয়ের পর আরো নতুন নতুন বিজয়ের খবর আসতে থাকে। উমাইয়া খলিফা নিজে আব্বাসিয় পরিবারের সাফাহর চাচা আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে তার সৈন্য বাহিনী চালনা করেন। ৭৫০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে উত্তর ইরাকে দক্ষিণ মসুল এলাকায় জেব নদীর ধারে দুই বাহিনী পরস্পরের মুখোমুখি হয়। মারওয়ান নিজে ছিলেন একজন অভিজ্ঞ সেনাপতি, আর তার বাহিনীর অনেক সিরীয় সৈন্যরাও আনাতোলিয়ার উষর পাহাড়ী অঞ্চলে বাইজেন্টাইনদের সাথে বহু বর্ষের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ছিল। কিন্তু খোরাসানিরাও মুসলিম বিশ্বের উত্তর পূর্ব সীমান্তে দীর্ঘ যুদ্ধে অভিজ্ঞ ছিল আর তারা কুফার পতন ও ইরাকের মধ্য দিয়ে যাত্রায় অন্যান্য উমাইয়া বাহিনীর সাথে বিজয়ের অভিজ্ঞতার কারণে উজ্জীবিত ছিল। তাদের সিরীয় প্রতিপক্ষের উদ্ভাবিত একটা যুদ্ধ কৌশল তারা কাজে লাগাল। তারা যুদ্ধ ক্ষেত্রে হাটুগেড়ে বসে শত্রুর দিকে বর্শা তাক করে একটা বর্শার দেওয়াল খাড়া করল। উমাইয়া অশ্বারোহী বাহিনী আক্রমণ করল কিন্তু বর্শার দেওয়াল টিকে গেল। মারওয়ান আর তার সৈন্যদল পালিয়ে গেল, পালাতে গিয়ে অনেকে নদীতে ডুবে গেল, কেউবা শীতের বৃষ্টিতে মরল। শেষ উমাইয়া খলিফা প্রথমে উত্তর ইরাক থেকে বিতাড়িত হলেন, তারপর সিরিয়া হয়ে তার ঘাটি হেরান, যেখান থেকে উমাইয়াদের রাজধানী দামেস্ক, কোথাও মারওয়ান টিকতে পারলেন না।

সিরীয় বাহিনী ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে গেল, মহামারি আর ভুমিকম্পে তাদের ফসল ধ্বংস হয়ে গেল আর কোথাও লোকজন শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারল না। মারওয়ান পালাতে লাগলেন আর পিছনে পিছনে খোরাসানী বাহিনী ধাওয়া করে আসতে লাগল। অবশেষে আগস্ট মাসে মিশরীয় বদ্বীপ এলাকার ছোট্ট শহর বুসিরে তারা তার নাগাল পেল। এক সংক্ষিপ্ত যুদ্ধের পর শেষ উমাইয়া খলিফা মারওয়ানকে হত্যা করা হলো। শুরু হল আব্বাসিয়দের যুগ।


[Hugh Kennedy-Gi ÔWhen Baghdad Ruled the Muslim World’ থেকে অনূদিত। অনুবাদ- সালাহ উদ্দিন]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here