বাগদাদ যখন মুসলিম বিশ্ব শাসন করত

0
40

বিপ্লব

আব্বাসীয়রা যখন মুসলিম খেলাফতের শাসকরূপে আবির্ভুত হলো, তার পরবর্তীকালে এক অজানা লেখকের লেখা আব্বাসীয় আন্দোলনের ইতিহাস বিষয়ক এক বইয়ে এই ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যায়। অন্যসব বড়ো রাজনৈতিক আন্দোলনের শুরুর দিকের গল্পের মতই, আব্বাসীয়দের ইতিহাস ও নানান কিংবদন্তী আর গল্প গাঁথায় মোড়ানো। হুমায়মায় বসে যে গোপন পরিকল্পনা মুহাম্মদ আর বুখায়ের করেছিলেন, সেটার চূড়ান্ত পরিণতি তারা দুজনের কেউই দেখে যেতে পারেননি। যাই হোক, এই গল্পের সার কথাটি অনেকাংশে সত্য- কুফার একটা ছোটো রাজনৈতিক কর্মীদল হুমায়মায় বসবাসকারী আব্বাসীয়দের সাথে যোগাযোগ করেছিল এবং খোরাসান এলাকার লোকেদের মধ্যে নবি পরিবারের প্রতি যে আবেগ ছিল সেটাকে কাজে লাগানোর জন্য তাদের আহবান করেছিল।


মধ্য পারস্যের বিশাল মরুভূমি থেকে শুরু করে আধুনিক ইরানের সীমানারও অনেক অনেক দূরে প্রায় চিনের সীমানা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল খোরাসান এলাকা। ভৌগোলিকভাবে এলাকাটি ছিল বৈচিত্রে ভরপুর। একদিকে যেমন ছিল বুখারা, সমরখন্দ বা নিশাপুরের মতো সম্পদশালী মরুদ্যান শহর, একই সাথে ছিল বিশাল বিশাল বালুকাময় প্রান্তর, যেগুলো শহরগুলোকে আলাদা করে রেখেছিল। খরস্রোতা অক্সাস নদী পামির পর্বতমালা থেকে উৎপন্ন হয়ে পর্বতমালার উত্তর সীমান্তের ধার ঘেষে প্রবাহিত হচ্ছে, যেটা বর্তমানে আফগানিস্তান। সেখান থেকে নদীটি কারাকুম (কালো বালি) ও কিজিলকুম (লাল বালি) মরুভুমির উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে খোরেজমের মরুদ্যান বদ্বীপ হয়ে আরাল সাগরে গিয়ে পড়েছে। মরুভূমি আর মরুদ্যান শহরগুলোর পরেই ছিল পামির আর হিন্দুকুশ পর্বতমালার বিস্তৃত এলাকা। এই দুই পর্বতমালার পাদদেশের গ্রাম আর দুর্গের লোকেরা তখনো কিছু প্রাচীন বিশ্বাস আর প্রথা পালন করত, যেগুলো সমতল এলাকা থেকে অনেক আগেই উঠে গিয়েছিল। এলাকাগুলো তখনো প্রাচীন রাজবংশের রাজারা শাসন করত।


এই বৈচিত্র্যময় ভুখন্ডে নানা জাতিগোষ্ঠির বসতি ছিল। শহর ও গ্রামগুলোতে ইরানিদের বসতি ছিল, বিশেষ করে পশ্চিমে। সগদীয় বণিকেরা ছিল, যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বুখারা ও সমরখন্দের ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করে আসছিল এবং যারা মধ্যএশিয়া থেকে অনেক দূরে প্রাচীন সিল্ক রোড ধরে সুদূর চিন পর্যন্ত বাণিজ্যিক কাফেলা পাঠাত। ছিল কিরগিজিস্তানের পাহাড়ী ও কাজাকাস্তানের সমতল প্রান্তরে বসবাস করা যাযাবর তুর্কিরা, যারা তাদের ঘোড়ায় চড়ে সফরের উপরই থাকত আর তারা ছিল সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধ বিদ্যা অশ্বারোহী তিরন্দাজিতে পারদর্শী। এলাকাটিতেই রানী বা তুর্কি জাতিসত্তার একটি স্থানীয় অভিজাত বংশেরও বসবাস ছিল। কখনো কখনো তারা মরুদ্যান বসতী বুখারা শাসন করত, কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই পাহাড়ী দুর্গ বা গ্রামগুলোই ছিল তাদের মূল শক্তি কেন্দ্র। সমরখন্দের দক্ষিণ পূর্বে ছিল ফেন পর্বতমালা যেটি উশরু সানার রাজ্যকে আশ্রয় দিয়ে রেখেছিল। এই রাজ্যের বংশপরম্পরায় শাসন করে আসা আফসিন রাজারা মুসলিমদের দ্বারা তাদের প্রাচীন ঐতিহ্য ও প্রথাগুলো পরিবর্তনকে প্রতিহত করার চেষ্টা করেন।
এই ক্ষুদ্র রাজ্যসভাগুলো অভিজাত সংস্কৃতি লালন করত। বাউল কবিরা প্রাচীন ইরানি গল্পগাঁথা নিয়ে গান আর কবিতা পাঠ করতেন, এটা ছিল একটা সাহিত্যিক ঐতিহ্য, যার উপরে ভিত্তি করেই ১০০০ সালের দিকে পারসি জাতীয় মহাকাব্য শাহনামা রচিত হয়। এই কাব্যগ্রন্থে বিধৃত হয়েছে প্রাচীনকালের রাজা জামশেদ আর খসরুর কাহিনী, আছে শক্তিমান বীর রুস্তমের বর্ণনা, যে অক্সাস নদীর তীরে নিজ পুত্র রুস্তমকে হত্যা করেছিল। সোহরাব-রুস্তমের গল্প ইতিহাসের অন্যতম বেদনাবিধুর কাহিনী হিসেবে বিবেচিত হয়, ভিক্টোরিয়াল যুগের লেখক ম্যাথু আর্নল্ড ইংরেজি সাহিত্যে এই গল্পটি জনপ্রিয় করেছিলেন। এই সব সামন্ত প্রভুদের জীবনযাত্রার নিদর্শন পাওয়া যায় দেয়ালচিত্র আর রূপার পাত্রের চিত্রকর্মে। এসব চিত্রে আমরা তাদের উৎসব করে খাওয়া আর পান করতে দেখি, ঘোড়ায় চড়ে শিকার করতে দেখি, হাতির পিঠে চড়ে যুদ্ধযাত্রায় যেতে দেখি। তাদের লম্বা আলখেল্লার মতো পোশাক আর পূর্বদেশীয় শারীরিক বৈশিষ্টের কারণে তারা আরবিয় মসলমানদের চেয়ে দেখতে অনেকটাই ভিন্ন ছিল। তাদের জাঁকজমকপূর্ণ অভিজাত সংস্কৃতি আব্বাসীয় রাজসভায় একটা দৃশ্যমান প্রভাব বিস্তার করবে সামনের দিনগুলোতে।


৬৬০ সালের পর থেকেই এই নানান ভাষা আর জাতিগোষ্ঠীর আবাসস্থলে মুসলিমদের আগমন শুরু হয়। আরব গোত্রগুলো নিম্নভূমি দিয়ে ব্যপক সংখ্যায় আসতে শুরু করে আর গ্রাম ও তৃনভূমির স্তেপ এলাকাগুলোতে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে শুরু করে। তারা একইসাথে তুর্কি আর ইরানি, দুই গোষ্ঠির কাছ থেকেই প্রতিরোধের মুখে পড়ে। ইরাক থেকে আরো আরব লোকজনকে নিয়ে আসা হয়, আর খেলাফতের দক্ষিণ পূর্বের এই দুরবর্তী এলাকা শীগ্রই আরব বদ্বীপ আর উর্বর ইরাকি এলাকার বাইরে সবচেয়ে বেশি মুসলিমসমৃদ্ধ এলাকায় পরিণত হয়। আরবরা যদিও নিম্নভূমির শহরগুলোকে শাসন করত, তুর্কি যাবাবর আর ইরানি রাজাদের সাথে চলতে গিয়ে তাদের অনেক বিষয়েই আপষ করতে হয়েছিল। যা সাধারণত হয়, বিজয়ী লোকজন বিজিত লোকদের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয় আর তাদের ভাষা আর রীতিনীতি দ্বারা প্রবলভাবে প্রভাবিত হয়। খোরাসানে এক আরব-ইরানি অভিজাত শ্রেণির উদ্ভব হয়, যারা ধর্মীয় পরিচয়ে ছিল মুসলিম কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই ভাষা আর জীবনযাত্রায় ছিল পারসি।


প্রাচীন শহর মার্ভ ছিল এই প্রদেশের রাজধানী। বিশাল জনশুন্য ঊষর প্রান্তরের মাঝখানে এই শহরটি অবস্থিত, যেখানে গ্রীষ্মে প্রচুর গরম পড়ে আর শীতে ঠান্ডাও পড়ে অনেক। এখানে প্রায় কোনো বৃষ্টিপাতই হয় না। বর্তমানের মতো অতীতেও শহরটি একমাত্র মুরগাব নদীর জন্যই টিকে ছিল, সেটি উত্তরে আফগান পর্বতমালা থেকে সৃষ্টি হয়ে এই এলাকায় একটা বদ্বীপ অঞ্চল তৈরী করেছিল। এখানে সকল ফসলই ভাল জন্মাত। এটা ছিল সুতি ও লিনেন কাপড় উৎপাদনের আদি কেন্দ্র। তাছাড়া এই এলাকা সবচেয়ে বিখ্যাত ছিল চমৎকার তরমুজ জাতীয় ফলের জন্য, যেগুলো কেটে টুকরো টুকরো করে শুকিয়ে সুদূর ইরাক পর্যন্ত রপ্তানি করা হতো। ৩২০ খৃষ্টপূর্বাব্দে মহাবীর আলেকজেন্ডার যখন শহরটি জয় করেন, এটা তখন একটি প্রতিষ্ঠিত এলাকা ছিল, আলেকজেন্ডার এর নাম দিয়েছিলেন মার্জিয়ানা। ৬৫০ সালের দিকে যখন আরবরা এলো, তারা সেখানে একটা বিশাল আয়তকার শহর দেখতে পেল, পোড়ামাটির ইটের উঁচু দেওয়াল দিয়ে ঘেরা, এখানকার দেয়াল রোমান আর গ্রিকদের মতো খাড়াদুর্গ প্রাকারের মতো ছিল না, বরং ছিল মধ্য এশিয়ার বৈশিষ্টপূর্ণ ঢালু দুর্গ প্রাকার। এই দুর্গ প্রাকারের বৈশিষ্ট ছিল এতে পোড়ামাটির ইটে তৈরী দেয়াল ছিল, কিছদূর পরপর নজর রাখার জন্য ফোকড় আর উঁচু টাওয়ার ছিল। শহরটির একপাশে একটা বিশাল ডিম্বাকৃতি দুর্গ ছিল, যেটি পোড়ামাটির ইটে তৈরী ছিল, মুসলিমদের শহরটি বিজয়ের সময়ে সেই দুর্গের বয়স হয়ে গিয়েছিল ১০০০ বছরেরও বেশি।


মার্ভ ছিল ঐ এলাকায় সে সানীয় পার্সিরা জাদের সীমান্ত ঘাঁটি, আর আরবরা এটিকে নিজেদের ঘাঁটি বানিয়ে নেয়। এখান থেকেই প্রতি বছর টান্সসক্সানিয়া (অক্সাস নদীর অন্যপাশের ভূমি) এর সমৃদ্ধ মরুদ্যান এলাকা জয় করার জন্য অভিযান পরিচালিত হতো। এখানেই যুদ্ধের মালামাল নিয়ে আসতো আর বিক্রি করা হতো। এখান থেকেই আরব সৈন্যদের পারিশ্রামিক দেওয়া হতো আর এখানে তারা সেটা খরচও করত।


খোরাসানের অন্যান্য এলাকা থেকে বণিকেরা ও কাজের সন্ধানে লোকেরা এখানে দলে দলে আসতে শুরু করে। অল্প দিনের মধ্যেই এখানে বুখারীয়, সঘদীয় আর অক্সাসের উজানের দুর্গম তুখারিস্তানের লোকেদের বসতি গড়ে উঠে। বুখারার শাসক মুসলমানদের সাথে যোগাযোগ রাখার জন্য এখানে একটি অফিস স্থাপন করেছিলেন। সামরিক উপকরণের চাহিদা মেটাতে এখানে ইস্পাত শিল্প গড়ে উঠে। দ্রুতই শহরের প্রাচীন দেয়ালের বাইরেও শহর সম্প্রসারিত হয়। পশ্চিমে মাজান খালের তীর ধরে নতুন ডিজাইনের ঘরবাড়ি গড়ে উঠতে থাকে। নতুন সরকারি ভবন এখানেই স্থাপিত হয়। এই স্থানের একটি বাড়িতেই আব্বাসিীয়দের কিছু সমর্থক জড়ো হয়েছিল আর সর্বপ্রথম আব্বাসীয়সের সমর্থনে নিজেদের পোশাককে কালো রঙ্গে রঞ্জিত করেছিল।


এই উন্নয়নশীল শহরেই ইরাক থেকে পাঠানো প্রথম আব্বাসীয় প্রতিনিধিরা তাদের প্রথম সমর্থকদের খুঁজে পেয়েছিল। বর্তমান সময়ের তৃতীয় বিশ্বের শহরগুলোর মতই, দ্রুত বর্ধনশীল মার্ভ শহরেও ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য ছিল ব্যাপক। আরব ও স্থানীয় নও মুসলিমের অনেকের কাছেই বিশ দিনের দূরত্বে অবস্থিত দামেস্কের খলিফাদের অনেক দূরের লোক মনে হতো। স্থানীয় ধার্মিক ও সাধারণ মুসলিমদের সুযোগ সুবিধার দিকে এই অঙ্গরাজ্যের স্থানীয় গভর্নররাও ততটা নজর দিত না বলেই মনে হতো স্থানীয়দের কাছে। বুখায়েরের হুমায়মা সফরের পরবর্তী সময়গুলোতে যেসব আব্বাসীয় প্রতিনিধি এই এলাকায় এসেছিল, তাদের একটা সরল যুক্তি ছিল- সব মুসলিম যদি একসাথে নবিপরিবারের একজন ব্যক্তিকে সমর্থন করে, তাহলে উমাইয়া শাসকদের উৎখাত করা যাবে, একটা সত্যিকারের মুসলিম রাষ্ট্র কায়েম করা যাবে এবং সকল মুসলিমের স্বার্থ রক্ষা করা যাবে। (তারা সকলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য আব্বাসীয়দের বিষয়টি নির্দিষ্ট করে বলত না)।

আব্বাসীয় প্রতিনিধিরা সমর্থকদের একটা গুপ্ত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। ইরাকে অবস্থিত আব্বাসীয় আন্দোলনের কেন্দ্রীয় দল, আব্বাসীয় পরিবার ও বুখারায় তাদের ক্রমবর্ধমান সমর্থকগোষ্ঠির মধ্যে নানারকম মতবিরোধ ও সমস্যার উদ্ভব হয়েছিল, কিন্তু আন্দোলনটি টিকে যায় এবং ক্রমে শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকে। বিভিন্ন শ্রেণি ও বিভিন্ন এলাকার সমর্থকদের আন্দোলনে শামিল করা হয়। তাদের দমন করতে উমাইয়া গভর্নররা কঠোর ব্যবস্থা নেন, কিন্তু এই আন্দোলন দমাতে ব্যর্থ হন। অবশেষে ৭৪৭ সালের গ্রীস্মের শুরুতে মার্ভ মরুদ্যান এলাকার এক গ্রামে আব্বাসীয়দের কালো পতাকা প্রথম বারের মতো জনসম্মুখে উত্তোলিত হয় আর সূচনা হয় বিপ্লবের।


[হিউ কেনেডির ‘When Bagdad Ruled the Muslim World‘ থেকে অনূদিত। অনুবাদ-সালাহউদ্দিন]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here