বার্ধক্যের ইতিবাচক দিক এবং সম্ভাবনাময় বার্তা

0
20

অধ্যাপক মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান
পূর্ব প্রকাশিতের পর
সম্ভাবনাময় বার্তা

আগামীতে প্রবীণদের জন্য কোনো সম্ভাবনাময় বার্তা আছে কি? জরাবিজ্ঞানীরা বার্ধক্যের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করেছেন, করেছেন গবেষণা, দিয়েছেন কতিপয় সামাজিক পূর্বাভাস । আজ যারা নবীন বা মধ্যবয়সী তাদের জন্য এসব বার্তা হতে পারে কৌতুহল-উদ্দীপক এবং তৃপ্তিদায়ক। তৈরি হতে পারে বার্ধক্য নিয়ে কাজ করার মনোভাব যা হয়ত প্রবীণ জীবনকে করবে আরও খানিকটা অর্থবহ, উপভোগ্য ও প্রাণবন্ত। চলমান অবস্থা দৃষ্টিতে বিজ্ঞানীরা বলছেন যে আগামীতে অধিকাংশ সমাজই হতে যাবয়োবৃদ্ধের সমাজ। কেননা, জন্ম ও মৃত্যুহার ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। এর অনিবার্য ফলশ্রুতিতে জনসংখ্যায় প্রবীণ অংশের পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে যাচ্ছে।


জনসংখ্যার প্রবীণ অংশের পরিমাণ বৃদ্ধি ছাড়াও সারা বিশ্বের বিভিন্ন সমাজে মানুষের প্রত্যাশিত গড় আয়ু বৃদ্ধি পাচ্ছে। রোগ প্রতিরোধ ও রোগ নিরাময় ব্যবস্থার ক্রম উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে যার ফলে বিজ্ঞানীরা আশা করছেন আগামীতে প্রত্যাশিত গড় আয়ু আরও যাবে বেড়ে এবং শতায়ু লোকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। আগের তুলনায় ক্রমেই স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, ব্যায়াম ও পরিমিত খাদ্য গ্রহণে অনেকেই দিচ্ছেন দৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচনে পরিলক্ষিত হচ্ছে উল্লেখযোগ্য সাফল্য। গৃহের মান ও পয়:প্রণালী ব্যবস্থায় উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে করে আগামীতে অধিক শিক্ষিত এবং অধিক স্বাস্থ্য সচেতন প্রবীণ আরও অধিক বয়স পর্যন্ত সুব্যবস্থায় জীবন কাটাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।


মহিলা সমাজের জন্য রয়েছে একটি বাড়তি সুবার্তা। অধিকাংশ সমাজেই দেখা যাচ্ছে যে পুরুষের তুলনায় মহিলারা দীর্ঘদিন বাঁচেন এবং তা গড়ে ৭ বছরের বেশি। আর তাই পুরুষের চেয়ে মহিলাদের প্রত্যাশিত গড় আয়ু দেখা যাচ্ছে বেশি। এর পেছনে শক্তিশালী জৈবিক কারণ ছাড়াও সামাজিক সাংস্কৃতিক কারণ রয়েছে। কেবল মানুষের ক্ষেত্রেই নয় প্রাণী জগতের কিছু কিছু প্রজাতি যেমন মাকড়সা, মাছ, ইঁদুর এবং এক ধরনের বিশেষ মাছি র ক্ষেত্রে এটা লক্ষও করা গিয়েছে। যেহেতু মহিলাদের প্রত্যাশিত গড় আয়ু বেশি সেহেতু আগামীতে পুরুষ-প্রবীণের চেয়ে মহিলা প্রবীণের সংখ্যাই বেশি হবে বলে মনে করা হচ্ছে ।
আমেরিকান সমাজে জনসংখ্যা গবেষণায় পপুলেশন পিরামিডের যে প্রাক্কলিত চিত্র দেখান হয়েছে তাতে স্পষ্টতই লক্ষণীয় যে পুরুষ-প্রবীণের চেয়ে মহিলা-প্রবীণের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং আগামী ২০৩০ সালের জন্য প্রাক্কলিত জনসংখ্যা পিরামিডটি কেবল T-shape-ই নেয়নি পিরামিডের দক্ষিণপার্শ্বের অংশে অর্থাৎ মহিলা-প্রবীণের অংশ যে উল্লেখযোগ্যভাবে দীর্ঘ তা দেখান হয়েছে। অর্থাৎ পুরুষ-প্রবীণের চেয়ে মহিলা-প্রবীণের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

কেবল তাই নয়, সমাজে বিপত্নীক এর চেয়ে বিধবা প্রবীণের সংখ্যাও বেশি। এই ধরাটি অব্যাহত রয়েছে এবং সেটাই থাকবে বলে মনে হচ্ছে। গবেষকরা মনে করছেন যে আগামীতে পরিবারের ওপর দীর্ঘায়ুর একটি তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব পড়তে যাচ্ছে। এতে পরিবারের গড়ন-কাঠামোতে পরিবর্তন আসবে। পরিবারে শিশু-কিশোর বয়সী সদস্যদের তুলনায় প্রবীণ বয়সী সদস্য সংখ্যা যাবে বেড়ে। গ্রান্ড প্যারেন্ট, এমনকি গ্রেট-গ্র্যান্ড প্যারেন্টসদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে যাচ্ছে। এর ফলে বিপরীতমুখী ফ্যামিলি পিরামিড হচ্ছে তৈরি যেখানে শিশুদের সংখ্যা হবে কম, প্রবীণের সংখ্যা হবে বেশি। অবশ্য এতে চাকরিজীবী পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হবে। যেমন, একটি পরিবারে একাধিক প্রবীণ-সদস্য হয় চাকরি করবেন, নতুবা পেনশন পেতে থাকবেন। দীর্ঘায়ুলাভ করার আরেকটি অর্থ আগামী দিনে দাম্পত্যজীবনও হবে দীর্ঘদিনের। অবসর জীবনও হবে দীর্ঘ। তাই, প্রবীণ স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে আরও বেশি সময় দিতে পারবেন।


বিজ্ঞানীরা আশাবাদী যে আগামীদিনের প্রবীণরা কেবল যে দীর্ঘায়ু লাভ করবেন তাই নয় বার্ধক্যে তারা আরও অধিক সুস্থজীবন কাটাবেন। তারা আরও বলছেন যে, আগামীতে চিকিৎসা প্রযুক্তির উন্নতির ফলে ধমনি, স্নায়ুকোষ, এমনকি মস্তিষ্ককোষ প্রতিস্থাপন করা যাবে। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা দেহের বিভিন অঙ্গ যেমন ত্বক, হাড় এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ উৎপাদনে সক্ষম হবেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানী বাটলার আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন যে, আগামীতে ধমনীর রাস্তায় জমা হয়েছে এমন যেকোনো অনাকাঙ্খিত দ্রব্য পরিষ্কার করার যন্ত্রপাতি আবিষ্কৃত হবে। এমন এন্টিবডি আবিষ্কৃত হবে যা কৃতকার্যভার সাথে ক্যান্সার নিরাময়ে সহায়ক হবে, কৃত্রিম উপায়ে শ্রবণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা যাবে, আলঝেইমার রোগ চিকিৎসায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হবে এবং দক্ষতার সাথে চটপট কাজ করতে সক্ষম এমন হাত, বাহু এবং দেহের জন্য বাইওনিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তৈরি করা হবে সম্ভব।


এ প্রসঙ্গে একজন বিজ্ঞানী বলেছেন যে আগামী কয়েক দশকের মধ্যে অতি দ্রুতগতিতে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ উৎপাদন, বিক্রি, সংযোজন ও মেরামত শিল্প গড়ে উঠবে আমাদের এই পৃথিবীতে (“……..in the decades ahead, the production, sale, installation and servicing of human spare parts is likely to become the fastest growing industry in the modern world”)।
এমন আশাও ব্যক্ত হয়েছে যে মানুষ সচেতন প্রয়াস ও ধ্যানের মাধ্যমে তার দেহের আভ্যন্তরীণ রসায়নকে নিয়ন্ত্রন করতে পারবে যাকে বলা হচ্ছে biofeed back. এভাবে মানুষ তার প্রয়াস ও ধ্যান দ্বারা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে উচ্চরক্তচাপ হ্রাস পাবে যা বার্ধক্যে স্বাস্থ্যরক্ষায় হবে একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক পদক্ষেপ।
চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here