বার্ধক্যের ইতিবাচক দিক এবং সম্ভাবনাময় বার্তা

0
24


অধ্যাপক মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান
পূর্ব প্রকাশিতের পর
আগেই বলা হয়েছে যে যদিও বার্ধক্য অনিবার্য তথাপি বৃদ্ধায়ন প্রক্রিয়াকে মন্থর করা যেতে পারে। ফলে বার্ধক্য দেখা দেবে আরও অনেক পরে ৮০/৯০ বছরে পৌঁছার পরে। তবে কেউ কেউ বলছেন যে, বৃদ্ধায়ন প্রক্রিয়াকে মন্থর করতে তথা বার্ধক্যকে বিলম্বিত করার কাজটি যদি হয় অতিশয় ব্যয়বহুল ও দীর্ঘ প্রয়াসের ব্যাপার এবং তা যদি হয় অ-ঐতিহ্যবাহী ও অস্বস্তিদায়ক অভিজ্ঞতা (ঁহপড়হাবহঃরড়হধষ ধহফ ফরংপড়সভড়ৎঃরহম বীঢ়বৎরবহপব) তাহলে একাজে সীমিত সংখ্যক লোকই হয়ত আগ্রহ দেখাবে। আমেরিকান সমাজের প্রেক্ষাপটে বলা হয়েছে যে আয়ুবর্ধনের জন্য যদি কেবলমাত্র আলফালফা স্প্রাউটস (ধষভধষভধ ংঢ়ৎড়ঁঃং) নামক এক জাতীয় ঘাস-এর উপর কাউকে নির্ভর করতে হয় তবে এটা মনে হয় না যে অধিকাংশ লোক তাদের বর্তমান খাদ্যাভ্যাস পরিহার করে আয়ুবর্ধনে আগ্রহী হবে। জরাবিজ্ঞানীরা বলছেন যে, আয়ুবর্ধনের কাজটি যদি হয় অত্যন্ত ব্যয়বহুল তবে তা সবার পক্ষে সম্ভবও হবে না। আর এ কাজের ব্যয়ভার যদি সমাজ গ্রহণ করে তবে দরিদ্র সমাজের চেয়ে ধনী দেশ ও সমাজের পক্ষেই তা সম্ভব হবে।


যা হোক আগামীতে খাদ্যের পুষ্টিমান আরও বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে বলে বিজ্ঞানীরা আশাবাদী এবং তার ফলে প্রত্যাশিত গড় আয়ু বেড়ে যেতে পারে এবং এতে করে আগামীতে সুস্থসবল দেহের অধিকারী শতায়ু (ঈবহঃবহধৎরধহ) লোকের সাক্ষাৎ পাওয়া খুব একটা অসাধারণ ব্যাপার হবে বলে মনে হয় না বলেছেন জরাবিজ্ঞানী ডেকার (উবপশবৎ)। ইতোমধ্যে বিজ্ঞানীরা মবহবঃরপ ঃযবৎধঢ়ু-র মাধ্যমে মানুষ অধিক সুস্থ জীবনযাপন করতে পারবে যা হয়ত আয়ুবর্ধনে বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখতে হবে সহায়ক।


জরাবিজ্ঞানীরা আশা করছেন যে, আজকের তুলনায় আগামীতে প্রবীণদের আয় (রহপড়সব) বৃদ্ধি পাবে। জন্মহার হ্রাস পেতে থাকলে এমন একটা সময় আসতে পারে যখন শ্রমবাজারে নবীন কর্মীর যোগান হ্রাস পেতে পারে। তখন নিয়োগকর্তা প্রবীণকর্মীদের উৎসাহভাতা (রহপবহঃরাব) প্রদান করে তাদেরকে কর্মস্থলে আরও কিছুকাল ধরে রাখতে চাইবে। এতে বার্ধক্যে প্রবীণদের আয় ও আর্থিক মর্যাদা কিছুটা হলেও বৃদ্ধি পাবে। এটা ঠিক যে বার্ধক্যে শারীরিক শক্তি হ্রাস পায় আর তাই প্রবীণদের উৎপাদনক্ষমতা হ্রাস পেতেই পারে। তবে এটাও ঠিক যে শিল্পোন্নত অনেক সমাজেই কাজের জন্য বেশি শারীরিক শক্তি আগের মতো লাগবে না, লাগছেও না কোনো কোনো সমাজে। মেশিনে কল টিপেই প্রবীণরা অনেক কাজ করতে পারবেন। গবেষণায় দেখা গেছে যে বর্তমান আমেরিকান সমাজে মাত্র ১৪% কাজে শারীরিক শক্তির প্রয়োজন হয়। এর অর্থ বাকি ৮৬% কাজই মেশিনে সম্পন্ন হচ্ছে। মেশিনের ব্যবহার যতই বৃদ্ধি পাবে ততই শারীরিক শক্তির ব্যবহার যাবে কমে। ফলে, আগামীদিনের প্রবীণরা কল টিপেই অনেক কাজ করতে পারবেন, আর তাই আজকের তুলনায় তাঁরা অধিক স্বচ্ছল থাকবেন বলে আশা করা হচ্ছে।


বিজ্ঞানীরা এটাও ভাবছেন যে আগামীতে শিল্প-উত্তর সমাজে কর্ম ও কর্ম-পরিবেশ ভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করবে। এখন যেমন কর্মে নিয়োগ লাভে কাজের প্রকৃতি ও প্রয়োজন অনুযায়ী কাউকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হয়, তৈরি হতে হয়, আগামীতে ব্যক্তির প্রকৃতি ও সামর্থ্য অনুযায়ী কর্মব্যবস্থা গড়ে উঠবে। যদি তাই হয় তাহলে আগামীতে প্রবীণদের উপযোগী কর্মব্যবস্থা তথা কর্ম পরিবেশ গড়ে উঠবে। ফলে, বার্ধক্যে অনেকেই খন্ডকালীন সময়ের জন্য হলেও কাজ পাবেন এবং কাজ প্রবীণদের অসচ্ছলতা দূর করবে, আর্থিক মর্যাদা বৃদ্ধি করবে। বলার অপেক্ষা রাখে সারাবিশ্বেই বিভিন্ন সমাজে দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি কম-বেশি সাফল্য আনছে এবং আগামীদিনের সমাজগুলো আর্থিক দিক থেকে উন্নতি লাভ করতে পারে তাহলে সেটার সুফল লাভে প্রবীণরা বঞ্চিত হবে না। আগামীতে অবকাশ (খবরংঁৎব) এবং অবকাশ কাটানোর ধারণায়ও পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। বার্ধক্যে মানুষ কেবল শুয়ে-বসে, ঘুরে-ফিরে, বই পড়ে, টিভি দেখে আর গল্প গুজব করেই অবকাশ কাটাবেন না-তারা এমন সব শখের কাজে বেশি করে সময় কাটাবেন যা হবে উৎপাদনমুখী। এ সব কাজের মাঝে থাকলে শরীর ও মন থাকবে ভালো আর আসবে কিছু বাড়তি আয়ও।


আগামীদিনে প্রবীণদের যে কেবল আর্থিক মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে তাই নয় আগামীতে প্রবীণদের ক্ষমতাও (ঢ়ড়বিৎ) বৃদ্ধি পাবার সম্ভাবনা রয়েছে, এবং তা সঙ্গত কারণেই। আগামীদিনের প্রবীণরা বর্তমানের প্রবীণদের চেয়ে হবেন আরও অধিক শিক্ষিত, প্রশিক্ষিত এবং আরও অধিক সমাজ সচেতন। সংখ্যাও তাঁদের যাবে বেড়ে। তাই একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোটার হবেন এই প্রবীণ সমাজ। ভোটার হিসেবে তাঁদের গুরুত্ব যাবে বেড়ে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রবীণরা একটা চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী হিসেবে সমাজে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে, যার ফলে যেকোনো দেশের শাসক ও অশাসক রাজনৈতিক এলিট শ্রেণি সমাজে প্রবীণদের অবদান এবং ভোটার হিসেবে তাঁদের গুরুত্বের কথা বিবেচনায় নেবেন, নিচ্ছেনও বটে। তাই প্রবীণদের অধিকারের প্রতি তারা আরও অধিক যত্নবান হবেন, পদক্ষেপ নেবেন যা হবে প্রবীণের জন্য ইতিবাচক ও কল্যাণমুখী।


জরাবিজ্ঞানী রাসেল ওয়ার্ড (ডধৎফ) আমেরিকান সমাজে প্রবীণদের ক্ষমতা সম্পর্কে আলোচনার জের টেনে বলেন, “ঞযব ধমবফ ৎবঢ়ৎবংবহঃ ধ ঢ়ড়ঃবহঃরধষষু রসঢ়ড়ৎঃধহঃ ঢ়ড়ষরঃরপধষ ভড়ৎপব.” অর্থাৎ, প্রবীণরা হচ্ছেন একটি সম্ভাবনাময় গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি। আগেই বলা হয়েছে আগামী দিনের প্রবীণ হবেন আরও অধিক শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত। তারপরও প্রবীণ-জীবনে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে না, বরং নতুন নতুন অনেক বিষয়ে ভিন্ন আঙ্গিকে প্রবীণের জন্য বিশেষ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন দেখা দেবে। অর্থাৎ, তারা থাকবেন আজীবন শিক্ষার্থী বা প্রশিক্ষণার্থী। জরাবিজ্ঞানীরা মনে করছেন যে, কাজ থেকে অবসর গ্রহণ, পেনশন নীতিমালা, প্রবীণভাতা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ, স্বাস্থ্যবীমা, রোগের প্রতিরোধ ও প্রতিকার ইত্যাদি বিষয়ে প্রবীণদের জন্য বিশেষ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। অবসর গ্রহণের পর অনেকেই ১৫/২০ বছর বা তার বেশি বেঁচে থাকেন। কীভাবে এই সুদীর্ঘ অবকাশকালীন সময়টা সুস্থ শরীরে অর্থপূর্ণভাবে কাটানো যায়, পরিবার ও সমাজের সঙ্গে অবসরকালীন সময়টা কীভাবে খাপ-খাইয়ে চলা যায় ইত্যাদি বিষয়ে নতুন নতুন ধ্যান-ধারণা ও শিক্ষণ-প্রশিক্ষণ প্রয়োজন হবে, গড়ে উঠবে সেবামূলক পরামর্শ কেন্দ্র। জরাবিজ্ঞানীরা আশা করছেন যে, আগামী দিনের প্রবীণরা হবেন আরও বেশি মানসিক যোগ্যতাসম্পন্ন। কেননা, তাঁরা হবেন আরও বেশি শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত। বার্ধক্যে মানসিক দক্ষতা দীর্ঘদিন বজায় থাকলে তাঁরা হয়ত আজকের ন্যায় বয়স-বৈষম্যবাদের (অমবরংস) শিকার হবেন না। এতে করে হ্রাস পাবে প্রবীণের প্রতি যত সব নেতিবাচক মনোভাব।


উপসংহার
এই প্রবন্ধে বার্ধক্যের যেসব ইতিবাচক দিক তুলে ধরা হলো তা হয়ত প্রবীণ জীবনে বয়ে আনতে পারে অন্তত কিছুটা তৃপ্তি ও আনন্দ। এতে প্রবীণ জীবনে নানাবিধ সমস্যার আবর্তে থেকেও কিছুটা সুখানুভূতি জাগতে পারে। অন্যদিকে আগামী দিনের প্রবীণ জীবন সম্পর্কে গবেষকরা যেসব আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তাতে মনে হয় আগামী দিনের প্রবীণ জীবন হবে আরও অধিক উৎপাদনমুখী, অর্থবহ ও উপভোগ্য।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here