বিজিএমইএ’র ভূমিকায় ব্যাংক খাতের নীতিনির্ধারকরা

1
299

তাকী মোহাম্মদ জোবায়ের
করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে তৈরি পোশাক খাতের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ কর্মকাণ্ডের সাক্ষী হয়েছে বাংলাদেশ। দৃশ্যত লকডাউনের মধ্যে গার্মেন্ট কারখানা খোলার কথা বলে শ্রমিকদের ডেকে এনে আবার বন্ধের মেয়াদ বাড়িয়েছে। এক-দেড়শ কিলোমিটার পথ হেটে আর রিকশায় চড়ে তারা ঢাকায় এসেছিল বানের জলের মতো। এ কারণে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয় গার্মেন্ট মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। এদিকে করোনা পরিস্থিতির শুরু থেকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশে শাখা খোলা রেখেছে ব্যাংকগুলো। ব্যাংকের শাখাগুলোতে উপচে পড়া ভিড় থাকলেও ব্যাংকারদের জন্য নেই সুরক্ষা সরঞ্জাম। নেই বীমা সুরক্ষার ব্যবস্থা বা প্রণোদনা। তবুও সারাদেশের অঘোষিত লকডাউনের মধ্যে নানা ঝক্কি-ঝামেলা পোহায়ে কর্মক্ষেত্রে যোগ দিতে হচ্ছে ব্যাংকারদের।

এদিকে সুরক্ষা ছাড়াই ব্যাংক খোলা রাখার খেসারত ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। করোনায় আক্রান্ত হতে শুরু করেছেন ব্যাংকাররা। অগ্রণী ব্যাংকের এক কর্মকর্তা করোনা আক্রান্ত হওয়ায় ব্যাংকটির প্রিন্সিপাল শাখা লকডাউন করা হয়েছে। অন্যদিকে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের একজন কর্মকর্তাও করোনায় আক্রান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকটির কর্মকর্তা ইসহাক মোহাম্মদ চৌধুরী। অগ্রণী ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ ওই কর্মকর্তা গত রোববার পর্যন্ত অফিস করেছেন। বুধবার করোনা পরীক্ষায় তাঁর আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়।

কর্মক্ষেত্রে পরিপূর্ণ সুরক্ষা ও আসা-যাওয়ার পথে যাতে হয়রানির শিকার হতে না হয় তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন ব্যাংকাররা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া পোস্টে অনেক ব্যাংকার নিজেদের ও পরিবারের সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সরকারি ছুটির সময় পুরোপুরি ব্যাংক বন্ধ রাখার কথা বলছেন; কেউ বলছেন সপ্তাহে এক বা দুইদিন ব্যাংক খোলা রাখতে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, দেশের প্রায় ১১ হাজার ব্যাংক শাখার মধ্যে প্রায় ৪ হাজার শাখা খোলা আছে। বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে সাধারণ ছুটির মধ্যে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত চলছে ব্যাংকিং কার্যক্রম। সরকারি ছুটির মধ্যে ব্যাংকারদের এক রকম বাধ্য হয়ে অফিস করতে হচ্ছে। এ জন্য কয়েকটি ব্যাংক কর্মীদের ঝুঁকি ভাতা দিলেও বেশির ভাগ ব্যাংকই তা করছে না। বৃহস্পতিবার আবার ব্যাংক সময় সকাল ১০টা থেকে ১২ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।

জরুরি সেবাপ্রতিষ্ঠান বাদে সব প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখলেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখার জন্য ব্যাংক খোলা রাখা হয়েছে। যদিও বলা হচ্ছে সামাজিক দুরত্ব রক্ষা করে সেবা দিতে। ব্যাংকাররা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে যেমন ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, নিরাপত্তা নিয়েও অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, করোনা মোকাবিলায় যেখানে সামাজিক দূরত্বই প্রধান উপায়, সেখানে আমরা ব্যাংক সেবা দিচ্ছি খুব কাছাকাছি অবস্থান থেকে।

একদিকে জন চলাচল নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও সেনাবাহিনী নিয়োগ করা হয়েছে। এদের কাছে অফিসগামী ব্যাংক কর্মকর্তা আইডি কার্ড, অফিস আদেশ দেখিয়েও নিস্তার পাচ্ছেনা। হেনস্থার স্বীকার হচ্ছে। বলা হচ্ছে হেঁটে যেতে। অথচ মানুষ ব্যাংকে চলে যেতে পারছে বাধাহীনভাবে। উপচে পড়া ভিড় হচ্ছে ব্যাংকগুলোর কাউন্টারে। জরুরি প্রয়োজনে লেনদেন চালুর কথা বলা হলেও জরুরি নয় এমন কাজেও ব্যাংকে এসে ভিড় করতে দেখা যাচ্ছে হিসাবধারীদের। দেখা যাচ্ছে, ব্যাংক খোলা থাকাটা মানুষের চলাচলের অসিলা হয়ে উঠেছে। চেকবই দেখিয়ে সেনাবাহিনী বা পুলিশের চেকপোস্ট পার হতে পারছেন তারা যা সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখার সরকারি উদ্দেশ্য ব্যাহত করছে।

বুধবার সরেজমিনে দেখা গেছে, শাখাগুলোতে ভিড় করছেন গ্রাহকরা। এতে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে সবার। ব্যাংকার কিংবা গ্রাহকÑ সবাই স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়েই শাখাগুলোতে লেনদেন করছেন। গ্রাহকরা টাকা জমা, উত্তোলনই বেশি করছেন। কাউন্টারে থাকা ব্যাংক কর্মকর্তাদের বেশিরভাগেরই কোনো নিরাপত্তা সরঞ্জাম নেই। এমনকি ব্যাংক শাখার বাইরে প্রতিরোধমূলক কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সাবান, স্যানিটাইজার বা এ জাতীয় কোনো কিছুই নেই। গ্রাহকদের অনেকে মাস্ক ব্যবহার করলেও মাস্ক ছাড়াও অনেককে দেখা গেছে।

বুধবার দুপুরে রূপালী ব্যাংকের ধানমণ্ডি শাখার এক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শাখা খোলা থাকায় সবাইকে অফিসে আসতে হচ্ছে। কিন্তু ব্যাংকের পক্ষ থেকে কোনো পরিবহন সুবিধা দেওয়া হয়নি। ফলে নিজেদের মতো করে আসছেন তারা। এতে আরও বেশি স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া ব্যাংক কর্মকর্তারা নিরাপত্তা বাহিনীর হয়রানিরও শিকার হচ্ছেন।

ডাচ বাংলা ব্যাংকের ধানমণ্ডি শাখার কর্মকর্তা সালাহউদ্দিন বলেন, যেভাবে ব্যাংকে প্রতিদিন ভিড় হচ্ছে কোনো ধরনের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়া এতে সবাই শঙ্কিত। ব্যাংকাররা নয় শুধু, গ্রাহকরাও ঝুঁকিতে রয়েছেন। এখন লেনদেনের পরিমাণ প্রতিদিনই বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে গ্রাহকদের ভিড়।

রাষ্ট্রমালিকানাধীন সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে মাসের প্রথম দিকে সব পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন হয়েছে। এখন চলছে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন ও সামাজিক ভাতাভোগীদের ৩৭ ধরনের ভাতা প্রদান। দ্বিতীয় সপ্তাহে শুরু হবে এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষকদের বেতন প্রদান। ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত এভাবেই চলবে বেতন ভাতা প্রদান কার্যক্রম। ফলে সারা দেশের ১ হাজার ২২৪ শাখায় লেগে থাকা জটলা কোনোভাবেই কমাতে পারছে না ব্যাংকটি।

করোনাভাইরাস থেকে রক্ষা পেতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, সেটির কোনো বালাই নেই রাষ্ট্র মালিকানাধীন এ ব্যাংকটির বেশির ভাগ শাখায়। ঠাসাঠাসি করে লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে বয়স্ক ভাতা গ্রহীতাদের। ফলে একদিকে ঝুঁকিতে পড়ছে ব্যাংকটির কর্মকর্তারা, আবার গ্রাহকেরা যে নিরাপদ থাকছে তাও বলা যাচ্ছে না। এ নিয়ে ব্যাংক কর্মকর্তারা ক্ষুব্ধ, সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে ছবি দিয়ে প্রতিকার চাইছেন। তবে এর কোনো সুরাহা হচ্ছে না, শাখায় ভিড় দিনে দিনে বাড়ছেই।

শুধু সোনালী ব্যাংকের অবস্থা এমন তা বলা যাবে না। সরকারি বেসরকারি খাতের আরও অনেক ব্যাংকের পরিস্থিতি একই ধরনের। বিশেষ করে বেসরকারি খাতের ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় ভিড়ও চোখে পড়ার মতো।

রূপালী ব্যাংক লিমিটেডের সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার মো. রেজ্জাকুল হায়দায় ৭ এপ্রিল ব্যাংকারদের জন্য প্রণোদনার আবেদন জানিয়ে তার ফেসবুক ওয়ালে একটি পোস্ট দিয়েছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, বাংলাদেশের অনেক গ্রাম বা ইউনিয়নে, সমস্ত উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় শহর এবং রাজধানীতে কর্মরত হাজার হাজার ব্যাংকার, যারা করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় দেশের এই দুঃসময়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে এবং সময়ে সময়ে আপনাদের জারিকৃত নির্দেশনা মোতাবেক নিজ পরিবারের সবাইকে উপেক্ষা করে নিজের জীবনের শতভাগ ঝুঁকি নিয়ে দিন ও রাত অনবরত বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের সবাইকে আর্থিক সেবা দিয়ে যাচ্ছেন, তাঁদের নিরলস পরিশ্রম ও অবদানের কথা কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে ঠিকভাবে তুলে ধরছে না। আমরা চাই না কোনো পুরস্কার, না পাইলাম কোনো বিশেষ প্রণোদনা, আর স্বাস্থ্য বীমা তাতো অনেক পরের কথা!”

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here