বিজ্ঞানমনস্ক মানুষই সম্পদ

0
14


ড. মো. আনিসুজ্জামান
প্রাণিজগতের অন্যতম সদস্য হোমো স্যাপিয়েন্স পৃথিবী শাসন করছে। জলে-স্থলে-আকাশে একচ্ছত্র আধিপত্য মানুষের। পৃথিবীতে মানুষের পথ কখনো মসৃণ ছিল না। কঠিন শীত-বর্ষা, বরফ-অগ্ন্যুৎপাত, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস মানুষকে সহ্য করতে হয়েছে। পৃথিবীর কোনো নির্দিষ্ট স্থান থেকে মানুষের বিকাশ শুরু হয়নি। খাদ্য ও নিরাপত্তার জন্য মানুষ পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। মাত্র ৪৫ হাজার বছর আগে সমুদ্র পার হয়ে অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছে মানুষ। জীবন-জীবিকার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১০ হাজার বছর আগে কৃষি বিপ্লব সম্পন্ন করে মানুষ।

মাত্র ৫০০ বছর আগে বৈজ্ঞানিক বিপ্লব সম্পন্ন হয়েছে। কৃষি বিপ্লবের পরও মানুষকে খাদ্যের জন্য সারা দিন পরিশ্রম করতে হয়েছে। পৃথিবীর অধিকসংখ্যক মানুষ একুশ শতকেও শুধু খাদ্যের জন্য সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পরিশ্রম করে। নিরাপদ খাদ্য, স্বাস্থ্যসম্মত বাসস্থান, সুশিক্ষা, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা এখনো নিশ্চিত হয়নি বহু দেশেই। শূদ্র, দাস, দলিত, অভিজাত, ব্রাহ্মণ, মালিক, শ্রমিক, পুঁজিপতি এবং নিরন্ন মানুষের শ্রেণিবিভক্ত সমাজে বহুমুখী বিভাজনে বিপন্ন মানবসমাজ।


পৃথিবীতে মানুষের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার অন্যতম কারণ হলো বংশবৃদ্ধি। সাধারণত যেসব প্রাণীর প্রজননক্ষমতা অধিক, সেসব প্রাণী টিকে আছে। বিশাল আকৃতির ডাইনোসর, অস্ট্রেলিয়ার দৈত্যাকৃতির ডাইপ্রোটোডন বিলুপ্ত। টিকে আছে মানুষ। মানুষের বংশবৃদ্ধি এবং জিনগত পরিবর্তনের ফলে বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ ঘটে। ভাষার উদ্ভবের পর যোগাযোগব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে অন্য প্রাণীর তুলনায়। ইতিহাসপর্বে দেখা যায়, সমাজ ও রাষ্ট্রে মানুষের অবস্থান নিয়ে মানুষ সৃষ্টি করেছে দর্শন, সাহিত্য এবং বিজ্ঞানের। গ্রিক দার্শনিক প্লেটো ইউটোপিয়ান আদর্শ রাষ্ট্রে নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। বুদ্ধিমান উন্নত নাগরিক ছাড়া উন্নত সমাজ-রাষ্ট্র কল্পনা করা যায় না।

রাষ্ট্র শুধু নদী, পাহাড়, বনভূমি আর সমতল ভূমির সমন্বয় নয়। মানুষের জন্যই রাষ্ট্র। ভারতবর্ষের বর্ণ ও কর্মভিত্তিক সমাজব্যবস্থায় সুশৃঙ্খল নাগরিক সৃষ্টির নিদর্শনই বহন করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিশুদ্ধ আর্য জাতি সৃষ্টির জন্য জার্মান চ্যান্সেলর এডলফ হিটলার পাঁচ লাখ মানুষ হত্যা করেছেন এবং আরো পাঁচ থেকে ছয় লাখ মানুষকে বাধ্যতামূলকভাবে স্টেরিলাইজ করেছিলেন। উদ্বাস্তু হয়ে জীবন রক্ষা করেছেন বহু আদমসন্তান।


আধুনিক রাষ্ট্রে তথ্য-প্রযুক্তির জ্ঞানসম্পন্ন বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সুশিক্ষিত জনসংখ্যা নির্ধারণ করে একটি রাষ্ট্রের ভালো-মন্দ। উৎপাদন উন্নয়নের মূলে থাকে জনগণ। রাষ্ট্রের আদর্শকে মূল অবলম্বন করে শিক্ষিত কোনো জাতির সার্বভৌমত্ব এবং উন্নয়ন ও উৎপাদন নিয়ে বাড়তি কোনো চিন্তা করতে হয় না। বর্তমানে উন্নত বিশ্ব এই তত্ত্বের প্রতিফলন দেখা যায়। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এর বিকল্প কিছু আছে বলে মনে হয় না। উন্নয়নশীল ও উন্নত রাষ্ট্রকাঠামোর মূলে রয়েছে জনগণ। কোনো রাষ্ট্রে জনসংখ্যা শুধু থাকলেই হবে না, সেই জনগণকে রাষ্ট্রের আদর্শিক কাঠামোতে নিয়ে আসতে হয়। প্রতিটি রাষ্ট্র পরিচালিত হয় কোনো না কোনো আদর্শকে কেন্দ্র করে। আদর্শ অর্থাৎ লক্ষ্যহীন কোনো রাষ্ট্র নেই। পুঁজিবাদী, উদারনীতিবাদী সমাজতান্ত্রিক এবং সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের আদর্শ বা মূল্যবোধ এক নয়। রাষ্ট্রে শুধু জনসংখ্যা বৃদ্ধি হলেই চলবে না। জনসংখ্যাই জনশক্তি-এই আপ্তবাক্যের কোনো অর্থ একুশ শতকে নেই। বিজ্ঞান ও তথ্য-প্রযুক্তির জ্ঞানহীন জনসংখ্যা মহাসমস্যায় পরিণত হতে পারে।


উন্নত বিশ্ব উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নানা প্রক্রিয়ায় জনসংখ্যা বৃদ্ধি ঘটিয়ে গরিব দেশগুলোকে বিপদে ফেলেছিল। অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশ ব্যর্থ রাষ্ট্রের দিকে চলে যায়। গ্যারেট হার্ডিন তাঁর ‘Living on a Lifeboat’ প্রবন্ধে রাষ্ট্রকে লাইফবোটের সঙ্গে তুলনা করেছেন। উন্নত রাষ্ট্র হলো এমন লাইফবোট, যেখানে মানুষ নিরাপদে স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করে। তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো এমন এক লাইফবোট, যেখানে জনসংখ্যা বেশি। ফলে অতিরিক্ত জনসংখ্যা পানিতে পড়ে যায় এবং সাঁতার কেটে আত্মরক্ষার চেষ্টা করে। ধনী রাষ্ট্রগুলো গরিব রাষ্ট্রের শিক্ষিত এবং মেধাবী জনগণকে তাদের লাইফবোটে তুলে নেয়। ফলে গরিব রাষ্ট্রগুলো আরো গরিব হয়। মেধাহীন মানুষ দিয়ে তৃতীয় বিশ্বের বহুমুখী সমস্যা সমাধান করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোতে ‘মুখ দিয়েছেন যিনি আহার দেবেন তিনি’-এই নীতির ফলে সম্পদের চেয়ে জনসংখ্যা অনেক বেশি। অতিরিক্ত জনসংখ্যার জন্য সাহায্য এবং ঋণের জালে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো উন্নত বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর নানা শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হয়। শুধু আর্থিকভাবে নয়, জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবেও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো উন্নত বিশ্বের ওপর নির্ভরশীল।


বৈশ্বিক করোনার মহামারিতে বিশ্বে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশের জনসংখ্যা বেড়েছে। অতিরিক্ত জনসংখ্যা নিয়ে আস্ফাালনের কোনো সুযোগ নেই। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের পর বিশ্বের জনসংখ্যার একটা বড়ো অংশ কর্মহীন হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উন্নত হচ্ছে। সাইবর্গ চলে আসতে পারে। মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে। যান্ত্রিক পদ্ধতিতে অনেক কাজ বর্তমানে দ্রুত সম্পন্ন হচ্ছে। ভবিষ্যতে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে আরো বহু কাজ সম্পন্ন হবে। ফলে মানুষের কর্মসংস্থান সংকোচিত হবে। পৃথিবীতে অফুরন্ত সম্পদ নেই। সীমিত সম্পদ দিয়ে অধিকসংখ্যক মানুষের সুন্দর ও নিরাপদ জীবনের জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অপরিহার্য। মানুষকে সম্পদে নয়, বিজ্ঞান ও তথ্য-প্রযুক্তির জ্ঞান দিয়ে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের উপযোগী করে গড়ে তোলার মধ্যে কোনো জনগোষ্ঠী কিংবা কোনো দেশের সফলা-ব্যর্থতা নির্ভর করবে ভবিষ্যতে।


চতুর্থ শিল্প বিপ্লব মানবজাতির জন্য একদিকে যেমন আশীর্বাদ, অন্যদিকে মানবিক মানসিক বিপর্যয় নিয়ে আসতে পারে। বিশেষ করে প্রযুক্তির আবর্জনা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বিরাট হুমকি। বাংলাদেশে ক্রমাগত আর্সেনিক দূষণ বাড়ছে। আমাদের খাদ্যবলয়ে আর্সেনিকের উপস্থিতি রয়েছে। অপরিশোষিত শিল্পবর্জ্যের ফলে সিসার পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সিসা ও আর্সেনিক খাদ্যবলয়ে প্রবেশ করায় প্রাণিজগতের শুধু শারীরিক-মানসিক ক্ষতি হয় না, চিন্তা করার ক্ষমতাও হ্রাস পায়। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য খাদ্যবলয় থেকে আর্সেনিকের পরিমাণ শূন্যের ঘরে নিয়ে আসার জন্য সামান্যতম অবহেলা করে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here