বিজ্ঞানে হেনরিয়েটা ল্যাকসের অনবদ্য দানের গল্প

0
168

নারী ডেস্ক: রেবেকা স্ক্লুট যখন সর্বপ্রথম ‘হেলা’ কোষের নাম শোনেন, তখন তিনি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। এই রেবেকা স্ক্লুটই পরবর্তীতে হেনরিয়েটা ল্যাকসের উপর একটি জীবনীগ্রন্থ রচনা করে ভূয়সী প্রশংসিত হয়েছেন। মাধ্যমিক প্রথম বর্ষের সিলেবাসের কারণে রেবেকার পাঠ্যবিষয়ে কোষ বিভাজন অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেখান থেকে তিনি তার শিক্ষকের কাছ থেকে হেলা কোষ সম্পর্কে জানতে পারেন। কৌতূহলবশত কিশোরী রেবেকা জিজ্ঞাসা করেন, “ঐবখধ মানে কী?” জবাবে শিক্ষক বোর্ডে চক দিয়ে দুটো শব্দের একটি নাম লিখেন- ‘ঐবহৎরবঃঃধ খধপশং’। এই নামের সংক্ষিপ্ত রূপ দিয়ে নামকরণ করা হয়েছে এই কোষকে।

হেনরিয়েটা ল্যাকস নামক এক কৃষ্ণাঙ্গ তরুণী জরায়ুর ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তার মৃত্যুর পূর্বে জন হপকিন্স হাসপাতালের চিকিৎসক ক্যান্সার কোষের কিছু নমুনা সংগ্রহ করে গবেষণাগারে প্রেরণ করেন। সাধারণ মানব কোষ গবেষণাগারের সুনিয়ন্ত্রিত পরিবেশে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। এরপর সেগুলো নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু হেনরিয়েটার কোষগুলো এদিক থেকে ব্যতিক্রম। মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে সেই কোষগুলো এক প্রজন্ম কোষে বিভাজিত হয়ে গেলো এবং এর বিভাজন এখনও থামেনি। এরা অন্যান্য কোষের ন্যায় নষ্টও হয়ে যায়নি। সোজা বাংলায় বলতে গেলে, হেলা কোষ অমর।

১৯২০ সালের ১লা আগস্ট ভার্জিনিয়ায় জন্ম নেন লরেটা প্লিজান্ট নামক এক শিশু। জন্মের সময় মায়ের দেওয়া এই নাম অবশ্য তার জীবনের একপর্যায়ে পরিবর্তিত হয়ে যায় হেনরিয়েটা ল্যাকস-এ। মাত্র চার বছর বয়সে শিশু হেনরিয়েটাকে ছেড়ে চলে যান মমতাময়ী মা। তার মৃত্যুতে বাবা জন প্লিজান্ট কিছুটা অগোছালো হয়ে পড়েন। তার পক্ষে শিশুর দেখাশোনা করা সম্ভব ছিল না। তাই হেনরিয়েটাকে ক্লোভার শহরে দাদা টমি ল্যাকসের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে দাদা পরিবারের অন্য সদস্যদের সাহায্যে তামাক চাষ করতেন। শিশু হেনরিয়েটা দাদাবাড়ির একান্নবর্তী পরিবারে অন্যান্য চাচাতো ভাই-বোনের সাথে এক নতুন জীবন শুরু করে।

এখানে তার পরিচয় হয় চাচাতো ভাই ডেভিড ল্যাকসের সাথে। এই পরিচয় গিয়ে প্রেমে পরিণত হয়। মাত্র ১৪ বছর বয়সে হেনরিয়েটা এবং ডেভিডের ঘর আলো করে জন্ম নেয় পুত্র সন্তান লরেন্স। এর চার বছর পর আরেকটি কন্যাসন্তান জন্ম নেয়। এবার ডেভিড ল্যাকস আর অপেক্ষা করতে রাজি হলেন না। ১৯৪১ সালে পারিবারিক সম্মতিতে প্রেমিকা হেনরিয়েটাকে বিয়ে করেন তিনি। নতুন সংসার গড়ার লক্ষ্যে দুজন ক্লোভার ছেড়ে পাড়ি জমান ম্যারিল্যাণ্ডে। সেখানে তাদের ঘরে আরো তিনটি সন্তান জন্ম নেয়। কিন্তু তাদের সেই সংসার সুখের ছিল না। কয়েক বছর পরে দেখা গেলো তাদের আদরের কন্যা সন্তান এলসি ল্যাকস শারীরিক প্রতিবন্ধী। আর কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য তখনও সব হাসপাতাল উন্মুক্ত ছিল না। তাই মেয়েকে বাল্টিমোরের জন হপকিন্স হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আশপাশের কয়েক মাইল এলাকায় এই জন হপকিন্সই ছিল কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য একমাত্র চিকিৎসালয়।

মেয়েকে ভর্তি করানোর কয়েক বছরের মাথায় হেনরিয়েটা নিজেও অসুস্থ হয়ে পড়েন। তলপেটে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভূত হওয়ায় হেনরিয়েটা ল্যাকস ১৯৫১ সালের ২৯ জানুয়ারি সর্বপ্রথম জন হপকিন্সে চিকিৎসা নিতে যান। ডাক্তারদের জানান, “তার তলপেটে কোথায় যেন প্যাঁচ লেগে আছে বলে অনুভূত হচ্ছে।” হেনরিয়েটার দায়িত্বরত চিকিৎসক হাওয়ার্ড জোন্স পরীক্ষার পর জানালেন, তিনি জরায়ুর ক্যান্সারে আক্রান্ত। ‘ক্যান্সার’-এর মতো ভয়াবহ শব্দ যেন হেনরিয়েটার ভেতরটাকে নাড়িয়ে দিলো। কিন্তু এই সংবাদ কাউকে দেওয়া যাবে না। তার উপর পুরো সংসার নির্ভর করে আছে। তিনি চুপচাপ বাড়ি ফিরে স্বাভাবিকভাবে কাজ করা শুরু করেন। যেন তার কিছুই হয়নি। কেউ টেরও পেলো না এই হাসিখুশি মানুষটির ভেতরে জন্ম নিচ্ছে এক প্রাণনাশী ক্যান্সার।

ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী হেনরিয়েটা নিয়মিত হাসপাতালে যাওয়া শুরু করেন। তখনকার হাসপাতালে ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য রেডিয়াম থেরাপি প্রয়োগ করা হতো। রেডিয়াম দেহে জন্ম নেওয়া ক্যান্সার কোষ ক্ষয় করতে পারতো। এই তেজস্ক্রিয় এবং ক্ষতিকর রেডিয়াম মানবদেহের জন্য কতটা বিপদজনক হতে পারে, তা তখনও মানুষের জানা ছিল না। তাই যা হবার তা-ই হলো। রেডিয়াম হেনরিয়েটার ক্যান্সার কোষের পাশাপাশি নিজের বিষ তার দেহে ছড়িয়ে দিলো। আর সেই বিষক্রিয়ায় ধীরে ধীরে হেনরিয়েটার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটতে থাকে।

জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষ বিজ্ঞানী জর্জ গে তখন কোষ বিভাজন নিয়ে গবেষণা করছিলেন। গবেষণার জন্য তিনি দীর্ঘস্থায়ী টিস্যু তৈরির চেষ্টা করছিলেন। তিনি হেনরিয়েটার ক্যান্সারের খবর পেয়ে আগ্রহ নিয়ে তাকে দেখতে আসেন। হেনরিয়েটা তখনও জানতেন না জর্জ গে ঠিক কী কারণে তাকে দেখতে এসেছেন। যখন জর্জ গে হেনরিয়েটার ক্যান্সার কোষের দুটো নমুনা কেটে নিজের গবেষণাগারে প্রেরণ করেন, তখন হেনরিয়েটা ধরে নিয়েছিলেন হয়তো ক্যান্সার পরীক্ষা করার জন্য কোষগুলো নেওয়া হচ্ছে।

জর্জ গে’র গবেষণাগারে যখন হেনরিয়েটার কোষগুলো বিভাজিত হতে থাকে, তখন ড. গে কিছু অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করলেন। অন্যান্য ক্যান্সার কোষ গবেষণাগারে বড়জোর কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারতো। কিন্তু হেনরিয়েটার নমুনা কোষগুলো বেশ কয়েক সপ্তাহ পরেও দিব্যি বিভাজিত হতে থাকে সমান তালে। জর্জ গে হেনরিয়েটার কোষগুলো আলাদা করে আলাদা আলাদা পাত্রে কোষ উৎপাদন করতে থাকেন। এই উচ্চ বৃদ্ধিহার সম্পন্ন টিস্যুগুলোর নাম দেওয়া হয় ঐবখধ কোষ। এভাবে হেনরিয়েটার সম্মতি না নিয়েই তার অগোচরে জন্ম নেয় বিংশ শতাব্দীর বিস্ময় ঐবখধ কোষ।

জর্জ গে তার এই কোষের নমুনা দেশের বিভিন্ন বড়ো বড়ো গবেষণাগারে ছড়িয়ে দেন। অতি দ্রুত বিজ্ঞান মহলে এই কোষ নিয়ে সাড়া পড়ে যায়। কোষ নষ্ট হয়ে যাওয়ার প্রতিবন্ধকতায় এতদিন যেসব গবেষণা বন্ধ ছিল, সেগুলো নতুন করে শুরু করা হয়। বিজ্ঞানভিত্তিক বাণিজ্যিক শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো মাত্র একটি নমুনা থেকে মিলিয়ন মিলিয়ন কোষ উৎপাদন করতে থাকে। আর এই কোষ যার দেহের অংশ, সেই হেনরিয়েটা ল্যাকস তখন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন জন হপকিন্স হাসপাতালের শয্যায়। তার কোষ অমর হলেও, আর দশজনের মতো হেনরিয়েটা ছিলেন মরণশীল মানুষ। হেনরিয়েটার মেডিকেল রিপোর্ট থেকে জানা যায়, রেডিয়াম থেরাপি প্রাথমিকভাবে ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করে ফেললেও কয়েকদিন পর তা পুনরায় জন্ম নিতে থাকে। এ কারণে ডাক্তাররা পুনরায় রেডিয়াম থেরাপি প্রয়োগ করলে হেনরিয়েটার জরায়ুসহ অন্যান্য অঙ্গে মারাত্মক ক্ষতিসাধন হয়। চিকিৎসা গ্রহণের ৮ মাসের মাথায় ১৯৫১ সালের ৪ অক্টোবর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন মহীয়সী হেনরিয়েটা। তার হৃদস্পন্দন চিরতরে বন্ধ হয়ে গেলেও তখন তার কোষগুলো অবিরাম প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জন্ম নিচ্ছিলো।

লেখিকা রেবেকা স্ক্লুটের অনুসন্ধান থেকে জানা যায়, এখন পর্যন্ত হেলা কোষ নিয়ে প্রায় দশ হাজারেরও বেশি প্যাটেন্ট রেজিস্ট্রি করা হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, হেনরিয়েটা চিকিৎসাক্ষেত্রের জন্য কী অমূল্য উপহার দিয়ে গেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের গণ্ডি পেরিয়ে তখন এই কোষ অন্যান্য দেশেও রপ্তানি করা হচ্ছিলো। হেনরিয়েটার মৃত্যুর মাত্র এক বছরের মাথায় বিজ্ঞানী জোনাস সাল্ক মহামারি পোলিও টিকা আবিষ্কার করেন। এই টিকার বদৌলতে হাজার হাজার শিশু বিকলাঙ্গতা থেকে রক্ষা পায়। এমনকি মহাকাশ বিজ্ঞানীদের আগ্রহে মানব কোষের উপর মহাকাশের তাৎক্ষণিক প্রভাব পর্যবেক্ষণের উদ্দেশ্যে এই কোষকে মহাকাশেও প্রেরণ করা হয়েছে।

হেলা কোষ গবেষণার মাধ্যমে মানব কোষের ক্রোমোজোমের বিভিন্ন অস্বাভাবিকতা ও ব্যাধি নির্ধারণ করা সম্ভব হয়। জীববিজ্ঞানের জগতে অন্যতম সেরা গবেষণাগুলোর মধ্যে মানুষের জিনোম ম্যাপিংকে উল্লেখ করা হয়। এই অসাধারণ সাফল্যের পেছনেও হেনরিয়েটার কোষগুলোর অবদান রয়েছে। হেনরিয়েটার মৃত্যুর কারণ জরায়ুর ক্যান্সার গবেষণায়ও এই কোষগুলোর অসামান্য অবদান রয়েছে। ২০১৪ সালে পেন স্ট্যাট বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকগণ হেলা কোষ ব্যবহারের মাধ্যমে ক্যান্সারের নিরাময় তৈরির কাজ শুরু করেন। শীঘ্রই ক্যান্সার চিকিৎসায় বেশ বড়ো কিছু আবিষ্কার হতে পারে এই কোষের মাধ্যমে। তবে এই কোষের সবচেয়ে অসাধারণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর অমরত্ব। পৃথিবীর অনেক বিজ্ঞানী এই অমরত্বের পেছনেই ছুটছেন। হয়তো অমরত্ব অর্জন করা যাবে না, কিন্তু এই গবেষণার মাধ্যমে এমন কিছু আবিষ্কার হতে পারে, যা মানুষের কোষ এবং প্রাণের রহস্যজটের সমাধান দিতে পারবে।

হেলা কোষের রহস্য কী?

হেলা কোষের এই অত্যাশ্চর্য বৈশিষ্ট্যের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীদের ভিন্ন মতামত রয়েছে। তবে হাজার মতামতের ভিড়ে যদি বিজ্ঞানসম্মত কয়েকটি কারণ আলাদা করা যায়, তাহলে সবার প্রথমে উঠে আসবে হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস দ্বারা মিউটেশন ঘটা। এই ভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তির ডিএনএ-তে নিজের ডিএনএ যুক্ত করে হাইব্রিড ডিএনএ’র উদ্ভব ঘটায়। তবে সবধরনের মিউটেশন ক্যান্সার ঘটায় না। আবার সব ক্যান্সার কোষ হেনরিয়েটার কোষের ন্যায় অমর হয় না।

হেনরিয়েটার ক্ষেত্রে এমন মিউটেশন ঘটেছিলো যা তা কোষে দুধরনের পরিবর্তন ঘটিয়ে দেয়। প্রথমত, ক্যান্সার কোষগুলোর বিভাজন ক্ষমতা কয়েক শত গুণ বৃদ্ধি পায়। দ্বিতীয়ত, ক্যান্সার কোষগুলোর মাঝে অতি সক্রিয় টেলোমারেজ এনজাইমের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। সাধারণ মানব কোষে বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে টেলোমারেজ এনজাইমের কর্মক্ষমতা কমে যায়। তার মানে টেলোমারেজের সক্রিয়তার সাথে কোষের সক্রিয়তা নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। হেলা কোষের টেলোমারেজ এতটাই সক্রিয় যে তা কোষের বয়স বাড়তে দেয় না। আর এর ফলে সৃষ্টি হয় চিরঞ্জীব হেলা কোষ, যা অনবরত বিভাজিত হতে থাকে। বিজ্ঞানীরা গবেষণাগারে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং রাসায়নিক পদ্ধতিতে ক্ষণস্থায়ীভাবে এই কোষের বিভাজন হ্রাস করে সংরক্ষণ করে থাকেন।

হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসের মিউটেশনের ফলে হেলা কোষের ক্রোমোজোমের সংখ্যাও সাধারণ কোষ থেকে বেশি। সাধারণ কোষে ৪৬ ক্রোমোজোমের বিপরীতে হেলা’র ক্রোমোজোম মোট ৭৬-৮০টি। এই বৈশিষ্ট্যের কারণে অনেক বিজ্ঞানী হেলা কোষকে আলাদা প্রজাতিতে নামকরণের প্রস্তাবও করেছিলেন।

তৎকালীন রাষ্ট্রপতি নিক্সন তখন সোভিয়েন ইউনিয়নের সাথে ক্যান্সার নিরাময় আবিষ্কারের এক স্নায়ুযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানীরা এই যুদ্ধ জয়ের লক্ষ্যে হেলা কোষের সাহায্যে সম্পূর্ণ মানব টিস্যুর একটি ডেটাবেজ তৈরির প্রকল্প হাতে নেয়। সাথে সাথে চলতে থাকে হেলা কোষের মাধ্যমে ক্যান্সার নিরাময়ের উপায় বের করা। তাদের কাজও অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়ে গিয়েছিলো, কিন্তু মাঝখানে খলনায়ক হিসেবে দাঁড়িয়ে গেলো স্বয়ং হেলা।

এই ঘটনা সর্বপ্রথম আঁচ করতে পারেন বিজ্ঞানী স্ট্যানলি গার্টলার। তিনি তখন কোষের নতুন জেনেটিক মার্কার খোঁজার গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন। তখন তিনি লক্ষ্য করলেন যে, তার সংগ্রহের প্রায় ১৮টি নমুনার কোষের মাঝে একটি মার্কার সবসময় উপস্থিত ছিল।  এই মার্কারটি আমেরিকা অঞ্চলের কৃষ্ণাঙ্গদের নিকট পাওয়া যেত, যা অন্যান্যদের মাঝে সচরাচর দেখা যায় না। তাই ১৮টি ভিন্ন নমুনায় এই মার্কার একদম শুরু থেকে উপস্থিত থাকার কোনো সম্ভাবনাই নেই। তাই এই মার্কার অন্য কোষ থেকে এসেছে।

এখান থেকে তিনি সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, কালজয়ী হেলা কোষের আগ্রাসনে অন্যান্য সবধরনের কোষের নমুনা এই মার্কার দ্বারা আক্রান্ত হয়ে গিয়েছে। সোজা কথায়, হেলা কোষ যে গবেষণাগারে সংরক্ষণ করা হয়, সে কক্ষের বাকি কোষের নমুনাকে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়ার মতো কলুষিত করতে পারে। এই আবিষ্কারে বিজ্ঞানীদের মাথায় হাত পড়লো। বাতাসে ভেসে কিংবা অন্য মাধ্যমে হেলা কোষগুলো তখন হাজার হাজার নমুনাকে দূষিত করে ফেলেছে। এর অতিমানবীয় বিভাজন ক্ষমতা দ্বারা দ্রুত পুরো নমুনার সব শূন্যস্থান পূরণ করার মতো ক্ষমতা রাখে। এই ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানীদের ক্যান্সার প্রকল্পের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অপচয় হয়।

জাতীয় টিকা দিবসে হাজার হাজার শিশু তার মা-বাবার কোলে চড়ে টিকাদান কেন্দ্রে যায়। সেখানে শিশুকে পোলিও নিরোধক টিকা প্রদান করা হয়। টিকার প্রতিটি ফোঁটায় নিশ্চিত হয় শিশুর পোলিও মুক্তির সম্ভাবনা। বিজ্ঞানীদের অবদান এবং জনগণের সচেতনতায় পোলিও আজ পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্নপ্রায়। তবে এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, এই পোলিও টিকার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান যার, তিনি হেনরিয়েটা ল্যাকস নামক এক অবহেলিত নারী। ইতিহাস তাকে একদম ভুলে বসেছিলো। কিন্তু রেবেকা স্ক্লুটের মতো এক অধ্যবসায়ীর কারণে পুরো পৃথিবী তার গল্প জানতে পেরেছে। ক্লোভারে পারিবারিক সমাধিক্ষেত্রে কোনো এক অজানা স্থানে শায়িত আছেন এই মহীয়সী। তার দেহ নিথর হয়ে গেলেও তার কোষগুলো বেঁচে আছে। যতদিন চিকিৎসাক্ষেত্রে হেলা কোষ নিয়ে গবেষণা হবে, ততদিন হেনরিয়েটার নামও বেঁচে থাকবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here