বিশ্বদারিদ্র্য প্রসঙ্গ: মানবাধিকার, ন্যায় এবং মানবতা

0
94

অধ্যাপক ড. নাইমা হক
 
পূর্ব প্রকাশিতের পর

দারিদ্র্য দূরীকরণে বণ্টনের ভূমিকা
বিশ্ব দারিদ্র্যের মূলে ক্ষুধা এবং অপুষ্টি দূরীকরণে দারিদ্র জনগোষ্ঠিকে তাদের প্রয়োজনীয় ক্রয়ক্ষমতার ব্যর্থতা একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে কাজ করে। একটি রাষ্ট্রে বা দেশে দারিদ্র্য তখনই দেখা দেয় যখন রাষ্ট্রের সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থা তাঁর নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়। এটি একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রে এর উৎপাদন এবং বণ্টনের মধ্যে অসমতার কারণে ঘটতে পারে। কিন্তু বিশ্ব দারিদ্র্যের বিষয়টি এক্ষেত্রে ভিন্ন, কেননা এখানে দারিদ্র্যের উৎসে উৎপাদন নয় বরং খাদ্য ও সম্পদের অসম বিতরণকে দায়ী করা হয়। খাদ্যের সুষম বণ্টনের অভাবই দরিদ্র লোকের নিকট এগুলো পৌঁছাতে ব্যর্থ হয় এবং এ কারণে তারা ক্ষুধা দূরীকরণে এখানে ঢুকতে ব্যর্থ হয়। দারিদ্র্য এবং ক্ষুধার মূলে অবস্থান করে একটি বৈশ্বিক ভিত্তি। অর্থাৎ দারিদ্র্য কেবল কোনো নির্দিষ্ট দেশের সমস্যা নয় বরং এটির মূলে রয়েছে বিভিন্ন দেশের মধ্যে অসম সম্পর্কের ভিত্তি। দক্ষিণের তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো এবং উত্তরের পুঁজিবাদী দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক অসম সম্পর্ক মূলত এরূপ চিত্রের জন্য দায়ী। বিশ্ব দারিদ্র্যের একটি বিশ্লেষণে দাবী করা হয় যে দারিদ্র্য হচ্ছে পদ্ধতিগত, বিভিন্ন দেশের মধ্যে শোষণ ক্ষমতার সম্পর্ক এবং ঠিক এ কারণেই বৈশ্বিক ব্যবস্থাকে সহজাতভাবে শোষণমূলক বলে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। তবে এই শোষণকারী বৈশ্বিক ব্যবস্থা প্রকৃতির সৃষ্টি নয় যা কিনা অপরিবর্তনীয়। এটি বরং ব্যক্তির কার্যাবলি এবং ব্যক্তির সিদ্ধান্ত দ্বারা সৃষ্ট যা অবশ্যই পরিবর্তন করা যায় নৈতিক এবং প্রায়োগিক প্রেক্ষিত থেকে।


বৈশ্বিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নীতি এবং আদর্শসমূহ প্রকৃতপক্ষে ধনী এবং দরিদ্রের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করে যে কারণে দরিদ্র রাষ্ট্র এবং এর নাগরিকদের ক্ষমতাহীন করে দেয় একটি অন্যায় পদ্ধতির মাধ্যমে। সুজান জর্জ মনে করেন যে, ক্ষুধা দূরীকরণে একটি পদ্ধতিকে বেছে নেওয়া যায় এবং সেটি হচ্ছে ন্যায় (ঔঁংঃরপব) কেননা অনুদান এবং অন্যান্য সাহায্য একটি শূন্যস্থান (ংঃড়ঢ় মধঢ়) পূরণ করে মাত্র। কিন্তু অনুদান কোনো অন্যায় প্রাতিষ্ঠানিকতাকে বা অক্ষমতাকে দূর করতে সক্ষম নয় (অহফৎবি ইবষংব: ২০০৪)। অন্যায় ও অসমতা সংঘবদ্ধভাবে কাজ করে এবং তাদের ভিত্তি অনেক গভীর দৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। ক্ষুধা এবং দারিদ্র্য দূরীকরণে সাময়িকভাবে সাহায্য প্রদান করলে এরূপ অবস্থা থেকে উত্তরণ পাওয়া যায় বলেই ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে হলে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর প্রয়োজন। এটি বিশেষত প্রয়োজন কারণ শোষণের ওপর প্রতিষ্ঠিত বৈশ্বিক সম্পর্কে দারিদ্র্য থেকে সাময়িক মুক্তি দিবে। কিন্তু সাধারণের চাহিদার উপর ভিত্তি করে সমতার স্বীকৃতিই কেবল দারিদ্র্য দূরীকরণের ভিত্তি হতে পারে। দারিদ্র্য মানব উন্নয়নের পথে বাধাস্বরূপ এবং এর মূলে রয়েছে যে বিষয়টি সেটি হচ্ছে মানব উন্নয়ন এবং মানবাধিকার যা ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। এরকম সম্পর্ক বিশেষভাবে নির্ভর করে একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে যেটি হলো মানব স্বাধীনতা। মানবাধিকার এবং এর উন্নয়নের পথে তিনটি বিষয় প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে যা হলো: দারিদ্র্য, শ্রেণি-বৈষম্য এবং শিক্ষার অভাব। ব্যক্তির অস্তিত্ব রক্ষার্থে অর্থনৈতিক চাহিদার মূলে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় দারিদ্র্য। মানবাধিকার চর্চা এবং এর প্রয়োগের ক্ষেত্রে দারিদ্র্য বড় প্রতিকূলতা সৃষ্টি করে। কারণ খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান এবং অন্যান্য মৌল চাহিদাগুলো যখন অর্থনৈতিক কারণে অপূর্ণতা সৃষ্টি করে তখনই মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয় এবং দারিদ্র্যের তীব্রতা তখন বৈষম্য সৃষ্টি করে যা কিনা আবারও মানবাধিকার লঙ্ঘন করে। মানবাধিকার যখন বাধাপ্রাপ্ত হয় তখন অন্যান্য অধিকার বিশেষত শ্ক্ষিার অধিকার বাধাপ্রাপ্ত হয়। শিক্ষার অভাব ফলশ্রুতিতে চাকুরি প্রাপ্ত এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে বাধাস্বরূপ হয়ে পড়ে এবং দারিদ্র্য দূরীকরণের পরিবর্তে বরং দারিদ্র্যের কষাঘাতে জড়িয়ে পড়ে। দারিদ্র্য এবং শিক্ষা গভীরভাবে সম্পর্কিত কেননা মানবসত্তা শিক্ষার অভাবে দারিদ্র্যের সীমারেখায় অবস্থান করে এবং অন্যদিকে আবার আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রবেশে বাধাপ্রাপ্ত হয়।


দারিদ্র্য এবং মানবতা
দারিদ্র্যের ব্যাখ্যায় দেখা যায় যে, এটি দুটি বিষয়কে উপস্থাপন করে। টম ক্যামবেল (চড়মমব:২০০৭) মনে করেন যে, দারিদ্র্য একদিকে একটি অত্যন্ত অশুভ বা মন্দ বিষয় যার মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠি প্রতিটি মুহূর্তে অভিজ্ঞতা লব্ধ হয় অর্থাৎ তারাই কেবল তীব্র কষ্টের শিকার হয়। অন্যদিকে দারিদ্র্যকে কেউ অত্যন্ত অন্যায় (মৎধাব রহলঁংঃরপব) বলে মনে করেন কেননা এখানে দুটি পক্ষের মধ্যে একটি ধনী জনগোষ্ঠি এবং অন্যপক্ষ দরিদ্র হয়। এখানে বিষয়টি দারিদ্র্যের নয় বরং যারা দারিদ্র্য ঘটানোর জন্য দায়ী তাদের সম্পর্কে বলা হয়। অর্থাৎ অতি দারিদ্র্যের কারণে যে কষ্টের অভিজ্ঞতা সেটির থেকেও বড় বিষয় হচ্ছে এরূপ কষ্ট ঘটানোর পেছনে যাদের আচরণ দায়ী তাদেরকে চিহ্নিত করা হয়। ক্যামবেল মনে করেন যে, অতি দারিদ্র্য অবশ্যই মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং এটি দূরীকরণের দায়িত্ব যাদের তারা এ বিষয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হলে সেখানে নৈতিকতার ব্যত্যয় ঘটে। দারিদ্র্যের ক্ষেত্রে মানবাধিকারের বাধ্যবাধকতা মূলত মানবতার দায়িত্ব থেকেই উৎসারিত হয়। এটি ন্যায়-এর দায়িত্ব থেকে মানবতার দায়িত্বকে বরং গুরুত্ব দেওয়া উচিত এবং মানবতার উপরে ন্যায়কে অগ্রাধিকার দেওয়া যাবে না বলে ক্যামবেল মনে করেন।
মানবাধিকারকে আইনগত অধিকার (ষবমধষ ৎরমযঃং) বলেও দাবী করা হয় যেখানে কর্তব্য পালনকারী সত্তা অর্থাৎ রাষ্ট্র ভূমিকা পালন করে। মানবাধিকারের দাবীর ক্ষেত্রে অধিকারের আইনগত ভিত্তি এবং এটি পালনের বাধ্যতাই কিন্তু মানবাধিকার দাবীর বিষয়টিকে তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। দারিদ্র্য দূরীকরণের বিষয়টি তখনই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে যখন দারিদ্র্যকে একটি সুনির্দিষ্ট নৈতিক অধিকারে লঙ্ঘন হয়েছে বলে দাবী করা যাবে। মানবাধিকারকে, অর্জুন সেনগুপ্ত মনে করেন, আইনগত অধিকারের পাশাপাশি নৈতিক অধিকার বলেও দাবী করা যাবে যখন সর্বজনীন নৈতিক আদেশ (ঁহরাবৎংধষ সড়ৎধষ ড়ৎফবৎ) বলে এর যথার্থতা নির্ধারণ করা যাবে।


শেষ কথা
দারিদ্র্য দূরীকরণের সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে বিশ্ব রাজনীতি কেননা বিশ্বের কর্তৃত্ববাদী দেশ এবং শাসকগণের একটি বিষয়ে মিল দেখা যায় যে, উন্নয়নশীল দেশের গণতান্ত্রিক পদক্ষেপসমূহের পথে তারা বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এটি তারা করে উন্নয়নশীল দেশের গণতন্ত্রের সংস্কারসমূহ যেন সফল না হয়। উন্নত বিশ্বের স্বার্থসমূহ প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তারা উন্নয়নশীল দেশের দারিদ্র্যের সত্যিকার সমাধানের ব্যাপারে নিরুৎসাহ বোধ করে তাদের বাহ্যিক সাহায্যের নাম করে। এখানে উল্লেখ্য যে, দারিদ্র্য দূরীকরণে আমাদের প্রচেষ্টা শুধু দরিদ্রদের সাহায্যে কর্তব্য পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি মূলত অন্যায়ের শিকার দরিদ্র ব্যক্তিদের রক্ষা করাটাও আমাদের একটি কর্তব্য যা কিনা প্রথম কর্তব্য থেকে আরও বেশি কঠোর। কেননা এটি অন্যায়ের বিপক্ষে ন্যায়করণের সুবিধার জন্য আমাদের বিশেষ প্রচেষ্টা। এভাবে দারিদ্র্যের মূলে অবস্থিত যে অন্যায় সেটিকে দূরীকরণের জন্য আমাদের প্রচেষ্টার সঠিক ফলাফল প্রদান করতে সহায়ক হবে।


কোভিড-১৯ প্রেক্ষিতে দারিদ্র্যের বিষয়টি আবার নতুনভাবে চিন্তার ক্ষেত্র প্রসারিত করেছে। এরকম সংক্রামক রোগের মোকাবিলা করার জন্য বিশ্বের প্রায় সকল দেশেই টীকা উদ্ভাবন, সকল দেশের মধ্যে টীকার সঠিক বণ্টন, আর্থিক দুরবস্থা, চাকুরি হ্রাস, চাকুরি হারানো, চাকুরির স্বল্পতা ইত্যাদি বিষয়গুলো প্রকট সমস্যার সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশে এ বিরূপ প্রতিক্রিয়া অনেক বেশি ঘটেছে এবং দেশের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের সম্মুখীন হয়েছে। এতে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে এবং রাষ্ট্র তাদের দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। উন্নত বিশ্ব এবং উন্নয়নশীল দেশের রাজনীতি মেরুকরণের প্রভাবে দারিদ্র্য নতুন করে পরিলক্ষিত হয়। এর সমাধানে শুধু রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের পাশাপাশি মানবতাবোধ থেকে রাষ্ট্রের নাগরিকগণও দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হলে দারিদ্র্য দূরীকরণ সম্ভব বলে আমরা মনে করতে পারি।  

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here