বিশ্বসেরা মুসলিম পর্যটক ইবনে বতুতা

0
18

সাইফ ইমন


মুসলিম সাম্রাজ্য ভ্রমণ
প্রায় সব মুসলিম সাম্রাজ্য ভ্রমণ করেছিলেন ইবনে বতুতা। হজ পালনের পরই তিনি পৃথিবীর মুসলিম সাম্রাজ্য ভ্রমণ শুরু করেছিলেন। মক্কা থেকে তিনি ১৩২৬ সালের ১৭ নভেম্বর আরব সাগর হয়ে ইরাকের উদ্দেশে এক কাফেলার সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন। এই কাফেলা তাকে নাজাফ শহরে নিয়ে যায়। নাজাফ শহরে হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর জামাতা এবং ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রা.)-এর রওজা জিয়ারত শেষে বতুতার কাফেলা ইরাকের উদ্দেশে রওনা দিলেও তিনি কাফেলার সঙ্গে না গিয়ে আরও দক্ষিণে টাইগ্রিস নদী পার হয়ে বসরা নগরীর দিকে রওনা করেন। ইবনে বতুতা মক্কায় ৩ বছর অবস্থান করে ১৩৩০ সালে হজ পালন করেন। অবশ্য কেউ কেউ এ সময় নিয়ে দ্বিমত পোষণ করেন।


অনেকের মতে, তিনি ১৩২৮ সালে হজ পালন করেন। ইবনে বতুতার সব মুসলিম সাম্রাজ্য ভ্রমণ শেষে একটি দেশই বাকি ছিল। তা হলো নিগ্রোল্যান্ড। ১৩৫১ সালের এমনি এক বসন্তে ইবনে বতুতা সাহারা মরুভূমির উত্তরে সিজিলমাসার উদ্দেশে ফেজ নগরী ত্যাগ করেন। সিজিলমাসা থেকে ১৩৫২ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি লবণের খনির শহর তাঘাজার উদ্দেশে রওনা দেন। তাঘাজা থেকে বিশাল সাহারা মরুভূমি পার হওয়ার পর নিগ্রোল্যান্ড থেকে ১৩৫৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি মরক্কোর উদ্দেশে যাত্রা করেন এবং ১৩৫৪ সালের শুরুর দিকে তার জন্মভূমিতে শেষবারের মতো পদার্পণ করেন। তার দীর্ঘ সফরে মরুভূমির তপ্ত বালিতে উটের পিঠে চড়া, সমুদ্রে জাহাজডুবি থেকে ভিনদেশের সৈন্যদলের আক্রমণ সবই ছিল।


জীবন্ত ইতিহাস যেন রেহলা
ইবনে বতুতার লিখিত ‘রেহলা’ গ্রন্থ হলো ইতিহাসকে জানার অন্যতম প্রধান উৎস। ৩০ বছরে ৪০টিরও বেশি দেশ ভ্রমণ করা পর্যটক তার অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করেন এ বইয়ে। আফ্রিকা থেকে শুরু করে মিসর, সৌদি আরব, সিরিয়া, ইরান, ইরাক, কাজাকিস্তান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, মালদ্বীপ, ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং চীন ভ্রমণ করেছিলেন। এ গ্রন্থটি ভারতীয় উপমহাদেশের এবং বাংলার ইতিহাসের অন্যতম প্রধান উৎস। ইবনে বতুতা তার ৩০ বছরের বিশ্ব ভ্রমণের অভিজ্ঞতা এ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেন। তবে ইবনে বতুতা তার অভিজ্ঞতার বিবরণ নিজে লিপিবদ্ধ করেননি বলে জানা যায়। যতদূর সম্ভব ইবনে জুজাই নামক এক পন্ডিত, যিনি মরক্কো সুলতানের ব্যক্তিগত সচিব ছিলেন। তিনিই সুলতানের নির্দেশে শ্রুতি লিখন পদ্ধতিতে ইবনে বতুতার ভ্রমণ কাহিনি লিপিবদ্ধ করেন। ১৩৫৫ সালের ৯ ডিসেম্বর মৌখিক বর্ণনা শেষ হলে ‘রেহলা’ নামক বইটি লিপিবদ্ধ করার কাজ শেষ হয়। রেহলা কথাটির সারমর্ম হলো ‘মুসলিম সাম্রাজ্য, সৌর্য, শহর এবং এর গৌরবান্বিত পথের প্রতি উৎসাহীদের জন্য একটি দান।’ এ রেহলা গ্রন্থে আফ্রিকা, মিসর, চীনসহ ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিবরণ অত্যন্ত সুন্দরভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। বিশেষ করে বাংলার ইতিহাসে ‘রেহলা’ গ্রন্থের ভূমিকা অনবদ্য। সফর শেষে মরক্কোর ফেজ নগরীতে গিয়ে ইবনে বতুতা সুলতান আবু ইনান ফারিজ এবং তার সভাসদদের কাছে সব ভ্রমণ কাহিনি খুলে বলেন। তখনই সুলতান নিজের একান্ত সচিবদের একজন ইবনে জুজাইকে তার ভ্রমণের বিস্তারিত লিখে রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

বাংলাদেশে কী দেখলেন ইবনে বতুতা
ইবনে বতুতা ১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলা সফর করেন। এখানে ইবনে বতুতা প্রথম পৌঁছেন ১৩৪৬ সালের ৯ জুলাই। সাদকাঁও (চাটগাঁ) প্রথম আসেন তিনি। সেখান থেকে সরাসরি তিনি কামাররু (কামরূপ) পার্বত্য অঞ্চল অভিমুখে রওনা হন। সাদকাঁও থেকে কামাররু বর্ণনায় এক মাসের পথ। হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশেই তিনি বাংলা সফরে এসেছিলেন বলে ইতিহাসে আছে। হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ফেরার পথে ইবনে বতুতা একটি ছাগলের পশমের কোট উপহার পান। তিনি আন-নহর উল-আয্রক (নীল নদ অর্থে) নদীর তীরবর্তী শহর অভিমুখে রওনা হন। এই নদীপথে ১৫ দিন নৌকায় ভ্রমণের পর তিনি সুনুরকাঁও (সোনারগাঁ) শহরে পৌঁছেন ১৩৪৬ সালের ১৪ আগস্ট।


সোনারগাঁ থেকে একটি চীনা জাহাজে করে তিনি জাভার উদ্দেশে রওনা হন। যখন ইবনে বতুতা বর্তমান বাংলাদেশে এসে পৌঁছেন তখন এখানকার সুলতান ছিলেন ফখর-উদ্দিন। তৎকালীন মুসলিম শাসনামলে মানুষের আর্থিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত সচ্ছল। দেশে খাদ্যশস্যের প্রাচুর্য এবং দৈনন্দিন ব্যবহার্য পণ্যের সস্তা দর উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, পণ্যের এমন প্রাচুর্য ও সস্তা দর তিনি পৃথিবীর আর কোথাও দেখেননি। তার বর্ণনায় পাওয়া যায়, মাত্র এক দিরহাম দিয়ে তখন বাংলাদেশে আটটি স্বাস্থ্যবান মুরগি পাওয়া যেত। এ ছাড়াও এক দিরহামে পনেরোটা কবুতর, ২ দিরহামে একটি ভেড়া এবং এক স্বর্ণমুদ্রারও কম মূল্যে দাস-দাসী কিনতে পাওয়া যেত। ইবনে বতুতা তার ভ্রমণ কাহিনিতে বাংলার জলবায়ু ও প্রাকৃতিক দৃশ্যের বর্ণনা দিয়েছেন। বাংলার সুদৃশ্য শ্যামল-সবুজ প্রান্তর, পল্লীর ছায়া-সুনিবিড় সবুজের সমারোহ তাকে এতটাই মুগ্ধ করে যে, তিনি উচ্ছ্বসিত হয়ে মন্তব্য করেন, ‘আমরা পনেরো দিন নদীর দুই পাশে সবুজ গ্রাম ও ফলফলারির বাগানের মধ্য দিয়ে নৌকায় পাল তুলে চলেছি, মনে হয়েছে যেন আমরা কোনো পণ্যসমৃদ্ধ বাজারের মধ্য দিয়ে চলছি।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here