বিস্ময়কর প্রতিভা নিকোলা তেসলা (শেষ পর্ব)

0
184
নিকোলা তেসলা

হারিয়ে যাওয়া এক প্রতিভা

পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান ব্যক্তি হতে কেমন লাগে? এই প্রশ্নের জবাবে আইনস্টাইন বলেছিলেন, “এর উত্তর আমার জানা নেই। আপনি নিকোলা তেসলাকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন।”

তেসলা বিজ্ঞানী হিসেবে সময়ের চেয়ে এগিয়ে হলেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত মানবিক। তাঁর কিছু মানবিক দিক তুলে না ধরলেই নয়:

পরিবেশের প্রতি ছিলেন সজাগ:
তেসলা লক্ষ্য করেন প্রাকৃতিক সম্পদ দ্রুতই ফুরিয়ে যাচ্ছে। তাই তিনি ভীষণভাবে পুনরায় ব্যবহার যোগ্য জ্বালানীর সমর্থক ছিলেন। জীবাস্ম জ্বালানীর উপর চাপ কমাতেও তিনি বহু গবেষণা করেছেন। কৃত্তিম বীজ তৈরী করার মতো সফল গবেষণাও রয়েছে তাঁর।

মানবতাবাদী তেসলা:
তেসলা চেয়েছিলেন কিভাবে স্বল্প খরচে ও সহজে মানুষের জীবন মানের উন্নতি করা যায়। তিনি তাঁর আবিষ্কার নিয়ে কখনোই আর্থিক ও ব্যবসায়িক লাভ নিয়ে ভাবেননি। তাঁর অনেক আবিষ্কার মানুষের জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে ভেবে, সেসকল আবিষ্কার নিজেই ধ্বংস করে দেন কিংবা সেই প্রজেক্ট বন্ধ করে দেন।
তার মৃত্যুর অনেক বছর পর তেসলার গবেষণার উপর ভিত্তি করে ওয়াইফাই তৈরি করা হয়। নিকোলা তেসলার এই অবদানের জন্য সিলিকন ভ্যালিতে তার একটি মূর্তি তৈরি করা রয়েছে যেখান থেকে ফ্রি ওয়াইফাই সুবিধা দেওয়া হয়। তিনি সারা বিশ্বে বিনামূল্যে বিদ্যুৎ দিতে চেয়েছিলেন এবং তা ওয়্যারলেস!

নায়াগ্রা জলপ্রপাতের কানাডা অংশে নিকোলা তেসলার স্ট্যাচ্যু ।

কেমন ব্যাক্তিত্ব ছিলেন তিনি?
তেসলা ৬ ফুট ২ ইঞ্চির দীর্ঘকায় মানুষ ছিলেন। প্রচন্ড গর্বিত, চটপটে ও বুদ্ধিমান। তাঁর সবকিছু তাঁকে একজন বিজ্ঞানীই নয় সেলিব্রিটির মর্যাদায়ও নিয়ে গিয়েছিল। অত্যন্ত সুবক্তা ছিলেন তিনি। ব্যস্ত ছিলেন গবেষণায় তাই বিয়ে করেননি। তিনি অত্যন্ত গুছানো মানুষ ছিলেন কারণ তিনি ছিলেন অত্যধিক শুচিবাই সম্পন্ন। তিনি টানা ৪৮ ঘন্টা না ঘুমিয়ে কাজ করতে পারতেন। স্বাভাবিকভাবে তিনি দিনে ৩ ঘন্টা ঘুমোতেন। তিনি ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন লোক ছিলেন। টমাস আলভা এডিশন তাঁর সাথে কথার বরখেলাপ করলে তিনি তাঁর কোম্পানি ছেড়ে দেন।
যেভাবে তাঁর মৃত্যু: ১৯৪৩ সালের ৬ জানুয়ারিতে তেসলা বৃদ্ধ বয়সে, সম্পূর্ণ নিঃস্ব অবস্থায় নিউইয়র্কের এক হোটেল রুমে মারা যান। কেউ কেউ বলেন, জার্মান নাজি গুপ্তচরেরা তাকে খুন করেছিল। অনেকে দাবি করেন যে তারা গুপ্তচরদের নামও নাকি জানেন অটো স্করজেনি (হিটলারের সরাসরি বডিগার্ড) এবং রাইনহার্ড। মৃত্যু যেভাবেই হোক না কেন, তেসলার যাবতীয় কাজকর্মের নকশা সব চলে যায় এফবিআইয়ের কাছে।

আসলে শুধু মৃত্যুর পরে নয়, মৃত্যুর আগেও এই সমস্যাটায় তাকে পড়তে হয়েছিল। তিনি যেটাই আবিষ্কার করেন সেটাই পরে চুরি হয়ে যায়। ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও তার এমন অনেক আবিষ্কার বিভিন্ন দেশে পাচার হয়ে গিয়েছিল। তার প্রযুক্তি দিয়ে অনেক দেশ সুপার পাওয়ার হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তেসলা যেই নিঃস্ব-ভবঘুরে-হতচ্ছাড়া ছিলেন, তাই রয়ে গেলেন। মাঝে অনেক টাকা কামালেও সেগুলোকে নতুন গবেষণায় উড়িয়ে দিয়েছিলেন তেসলা।

আমরা তেসলা সম্বন্ধে জানিনা কেন?
তেসলা এত জিনিয়াস হলেও বিশ্ববাসী তার সম্পর্কে এত কম জানে কেন? কেন স্কুলে এডিসন, মার্কনি, কিংবা আইনস্টাইনের নামের সাথে সাথে তার নাম জানলাম না আমরা? এমন প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক।

সিলিকন ভ্যালীতে, ওয়াইফাই ওয়ারলেস কানেক্টিভিটির আবিষ্কারক নিকোলা তেসলার স্টাচ্যু ।

এর কারণ তেসলা সম্পর্কে আমাদের কখনো জানতে দেওয়া হয়নি। তার আবিষ্কারগুলো ছিল বিভিন্ন দেশের সরকারের বেশ আগ্রহের বিষয়। তার সমসাময়িক সকল বিজ্ঞানীরা তার অনন্য মেধাকে হিংসা ও ঘৃণা করতেন। কিন্তু তার কাছ থেকে আইডিয়া চুরি করতে কারো তেমন খারাপ বোধ হতো না। কিন্তু তেসলা প্রশংসা দূরে থাক, বেঁচে থাকার জন্য ভালোমতো খাবারের পয়সাই জোটাতে পারেননি। তিনি এমনকি আক্ষেপ করে বলেছিলেন- কিছু টাকা পয়সার মালিক হলে তিনি আরও নতুন নতুন কিছু আইডিয়া নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারতেন।

কোথায় আছে তেসলার হারিয়ে যাওয়া ডকুমেন্ট?
অনেকেই ধারণা করেন তেসলার গবেষণাগারের নথি এখনো মার্কিনীদের হাতেই আছে। আর তা থেকে নিত্য নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কারে ব্যস্ত তারা। ধারণা করা হয় এরিয়া ৫১ এ তেসলার রেখে যাওয়া ডকুমেন্ট ব্যবহার করে এখনো গবেষণা চলছে।

মিডিয়া যে সকল বিজ্ঞানীদের তাদের দু’একটি ধ্বংসাত্মক আবিষ্কারের জন্য বা নোবেল প্রাইজের জন্য সারা বিশ্বের কাছে সেরা বিজ্ঞানী হিসেবে তুলে ধরেছে একসময় তারাও অনেকে নিকোলা তেসলাকে গুরু হিসেবে সম্মান করতো।

অন্যান্য বিজ্ঞানীদের সাথে তেসলার পার্থক্য হলো, অন্যেরা তাদের আবিষ্কারের ধারণাগুলোকে থিওরী আকারে প্রকাশ করতেন আর তেসলা তাঁর ধারণাগুলো বাস্তবে তৈরী করে দেখাতেন। যার প্রতিটাই ছিল বিস্ময়কর।

আসুন তেসলাকে অনুভব করি
হ্যা তাঁকে অনুভব করা যাবে, আপনার ঘরের বাতি নিভিয়ে দিন, সকল ডিজিটাল ডিভাইসের ওয়্যারলেস কানেক্টিভিটি বন্ধ করে দিন। ওয়াইফাই রাউটার অফ করুন। এবার রেডিও-টেলিভিশনও বন্ধ করুন। সকল হাসপাতালের এক্সরে মেশিনগুলোও বন্ধ করুন। সকল রাডার ব্যবস্থা শাটডাউন করে দিন। এবার চোখ বন্ধ করে তেসলার অভাবটা অনুভব করুন। ভাবুন কেমন আধুনিক পৃথিবী তিনি আমাদের দিয়ে গেছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here