বিস্ময়কর প্রতিভা, নিকোলা তেসলা (দুই)

0
298
নিকোলা তেসলা

বিজ্ঞান ডেস্ক : নিকোলা তেসলা ছিলেন বিজ্ঞানের একনিষ্ঠ সাধক । যারা বিজ্ঞানকে ভালোবাসে বা বিজ্ঞান সাধনায় নিয়োজিত তাদের আছে তেসলা একজন সুপার হিরো। আধুনিক যুগের প্রায় প্রতিটি প্রয়োজনীয় আবিষ্কারের পেছনেই রয়েছে তেসলার অবদান। আজ তেসলার বিস্ময়কর আবিষ্কারগুলো নিয়ে কথা বলবো। নিকোলা তেসলার নামে ২৬টি দেশে ৩০০টি আবিষ্কারের পেটেন্ট আছে। তাঁর আবিষ্কারগুলো ছিলো সময়কে ছাপিয়ে যাওয়ার, সময়ের চেয়েও অনেক বেশী আধুনিক। যা আজকের যুগেও আধুনিক হিসেবে বিবেচিত!

মূল গল্পে যাবার আগে একনজরে তেসলার কিছু আবিষ্কারের কথা শুনে নিন
ওয়্যারলেস ইলেক্ট্রিসিটি
চল বিদ্যুৎ (এসি কারেন্ট)
বাসাবাড়িতে বহুল ব্যবহৃত ফ্লুরোসেন্ট বাতির আবিষ্কারক তিনি
তিনি আধুনিক জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের আবিষ্কারক
এক্স-রে ফটো প্রযুক্তির আবিষ্কারক
রেডিওর আবিষ্কারকও তেসলা
রিমোট কন্ট্রোল এর আবিষ্কারক তিনি
আধুনিক রোবটিক্স এর প্রথম ধারণা তিনিই প্রদান করেন
ওয়্যারলেস যোগাযোগ প্রযুক্তির উদ্ভাবক তিনি
রাডার প্রযুক্তি
ভেক্যুয়াম টিউব
রোটারি ইঞ্জিন
লাউড স্পিকার
টেলিভিশনের কয়েল যা দ্বারা আমাদের জীবন হয়েছে বৈচিত্র্যময়
ব্লেডবিহীন টারবাইন
ভায়োলেট রে
নিয়ন বাতি

নিকোলা তেসলা আসলে ১৫০ বছর আগের মানুষ হলেও, আমাদের এই বর্তমান যুগের মানুষ তাকে আজকের মানুষই ভাবতে পারে। অন্তত তাঁর আবিষ্কারের কারণে। সেটার প্রমাণ হলো, তিনি একবার বলেছিলেন, “এমন এক সময় আসবে যখন সংবাদ, প্রেসিডেন্টের ভাষণ, কিংবা মাঠের খেলাগুলো তারবিহীন পদ্ধতিতে ঘরে বসেই দেখা যাবে।” হ্যাঁ, তেসলার স্বপ্ন সত্যি হয়েছে। টিভি এবং ইন্টারনেটের ভুবনে আজ সবারই বিচরণ।

তেসলার আবিষ্কৃত বিশ্বের সর্ব প্রথম ড্রোন বোট ।
তেসলা কর্তৃক আবিষ্কৃত রাডার সিস্টেম ।

বৈদ্যুতিক যুদ্ধ
টমাস আলভা এডিসন তেসলার প্রতি অন্যায় আচরণ করলে তেসলা তাঁর কোম্পানি ছেড়ে দেন। এ সুযোগে এডিসনের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টিং হাউস ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি তেসলাকে নিজেদের করে নেয়। এই কোম্পানিতে যোগ দিয়েই তেসলা শুরু করেন তাঁর বৈদ্যুতিক যুদ্ধ। যুদ্ধটা ছিলো এডিসনের স্থির বিদ্যুৎ (ডিসি কারেন্ট) বনাম ওয়েস্টিনের চল বিদ্যুৎ (এসি কারেন্ট)। এই যুদ্ধ বিজ্ঞানের ইতিহাসে বৈদ্যুতিক যুদ্ধ নামে পরিচিত। এই যুদ্ধে প্রাথমিক বিজয়ী হলেন তেসলাই, কারন তাঁর তত্ত্ব প্রমাণিত হলো যে স্থির বিদ্যুতের চেয়ে চল বিদ্যুৎ বেশী কার্যকর। এসি বিদ্যুৎ দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠে, কারণ এটি ছিলো উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন। এমনকি শিল্প কল-কারখানার জন্যও ব্যবহার উপযোগী ।

তেসলা ও এডিসনের বিদ্যুৎ যুদ্ধের সংক্ষিপ্ত ধারনা ।

তেসলার চলবিদ্যুৎ আবিষ্কার না হলে আমাদের হয়তো আজকে এডিসনের প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হতো যেখানে প্রত্যেক ঘরে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হলে আলাদা আলাদা জেনারেটর বসানো লাগতো। কিন্তু তেসলার প্রযুক্তি অনুযায়ী এখন বহু মাইল দূরে একটা পাওয়ার স্টেশনে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় এবং সেখান থেকে তার দিয়ে টেনে বাসা-বাড়িতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়।

কিন্তু তেসলা বিজ্ঞানের সুদ্ধ সাধক হলেও ধুরন্ধর ব্যবসায়ী ছিলেন না, তাই শেষ পর্যন্ত পরাজিতদের খাতায় নাম লেখালেন তেসলা-ই। তার সমস্ত গবেষণার ফসলই এখন ব্যবহৃত হচ্ছে আমার আপনার পকেটের টাকা দিয়ে এডিসনের উত্তরসূরীদের পকেট বোঝাই করতে।

তেসলা চেয়েছিলেন মানবসভ্যতার উন্নয়নের জন্যে বিদ্যুৎশক্তিকে বিনামূল্যে ছেড়ে দেওয়া হোক। তিনি অনেক প্রভাবশালীদের নিয়ে এ ব্যাপারে আলোচনাও করেছিলেন। কিন্তু কেউই তাঁর এই মতামত গ্রহণ করেননি। সবাই চেয়েছিলেন মানুষ বিদ্যুৎ তাদের থেকে কিনে নিয়ে ব্যবহার করুক। পরে তেসলা একা একাই গবেষণার মাধ্যমে এই লড়াই চালিয়ে যান। এতে কিছু সফলতাও লাভ করেন।

ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ
তিনি ওয়েস্টিংহাউজ কোম্পানির সাথে মিলে চল বিদ্যুতের সাশ্রয়ী উৎপাদন কিভাবে সম্ভব সেটা আবিষ্কার করেন। তেসলাই সর্বপ্রথম নায়াগ্রা জলপ্রপাতের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বাসা-বাড়িতে ব্যবহারযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম হন। তার হাত ধরেই বিশ্ব পরিচিত হয় ‘আধুনিক জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র’ এর ধারণার সাথে। কিন্তু সবাই জানে ‘জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র’ এর আবিষ্কারক জর্জ ওয়েস্টিং হাউজ। আগেই বলেছিলাম, তেসলা এডিসনের কোম্পানি ছেড়ে ওয়েস্টিং হাউজ কোম্পানিতে চলবিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়ে গবেষণার কাজ নিয়েছিলেন। এখন নিশ্চয়ই এটা বোঝার বাকি নেই যে কার মেধা বিক্রি করে ওয়েস্টিং হাউজ এই নাম কামিয়েছেন।

ওয়্যারলেস ইলেক্ট্রিসিটি
নিকোলা তেসলা এমন একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, কোনো তাঁর ছাড়াই বিদ্যুৎ এক স্থান থেকে আরেক স্থানে পাঠানো যেত। তিনি তৎকালীন ব্যবসায়ীদের থেকে ফাণ্ড কালেক্ট করে ১৮৭ ফুট একটি টাওয়ার নির্মাণ করেছিলেন। এই তেসলা টাওয়ার দিয়ে তিনি তাঁর বিহীন বিদ্যুৎ পাঠানোর ব্যবস্থা করে ছিলেন। তিনি বিনামূল্যে সারাবিশ্বে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন।

তারহীন বিদ্যুৎ সেবা দিতে তেসলার নির্মিত ১৮৭ ফুট উঁচু তেসলা টাওয়ার ।

তিনি সারা পৃথিবীকে একটা কন্ডাক্টর হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন এবং সার্থকও হয়েছিলেন। আশ্চর্যজনকভাবেই এই প্রজেক্টটি শেষ হবার আগেই বিনিয়োগকারীরা তাদের অর্থ যোগান দেওয়া বন্ধ করে দেন। কারণ এর মূল বাধা ছিলো বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো। বিনামূল্যে তারবিহীন বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া গেলে অনেক কোম্পানিই দেউলিয়া হয়ে যেত। এভাবেই এই যুগান্তকারী আবিষ্কারটি হারিয়ে গেলো। তা না হলে আজ আমরা ফ্রিতেই বিদ্যুৎ পেতাম।

রেডিও
মার্কনি প্রথম যে রেডিও সিগন্যাল আবিষ্কার করেছিলেন সেটা তার বাড়ির চিলেকোঠা পর্যন্ত পৌঁছেছিল। পক্ষান্তরে ১৮৯১ সালেই তেসলার আবিষ্কৃত রেডিও সিগন্যাল সেকেন্ডে ১৫,০০০ সাইকেল বা চক্র সম্পন্ন করতে পারতো। কারণ এই কাজে তিনি ব্যবহার করেছিলেন তাঁর নিজেরই আবিষ্কৃত তেসলা কয়েল।

তেসলার বানানো রেডিও ।

এক্স-রে ইমেজিং
উইলহেলম রন্টজেন প্রথম এক্স-রে রশ্মি আবিষ্কার করলেও সেটা দিয়ে যে ফটো তোলা সম্ভব সেটা দেখিয়েছেন নিকোলা তেসলা। ১৮৯৪ সালের দিকে তাঁর ল্যাবরেটরিতে বেড়াতে আসেন লেখক ‘মার্ক টোয়েন’। তেসলা তাঁর এই ঘনিষ্ঠ বন্ধুর আগমন উপলক্ষ্যে ভ্যাকুয়াম টিউবে কিছু ফটো তোলেন। কিন্তু পরে দেখা যায় ছবিতে মার্ক টোয়েনের চেহারার বদলে ভ্যাকুয়াম টিউবের লেন্স অ্যাডজাস্ট করার স্ক্রুগুলো দেখা যাচ্ছে। সেখান হতেই তাঁর এক্স-রে ইমেজ নিয়ে গবেষণার শুরু। অন্যান্য সব ক্ষেত্রের বিপরীতে এই ক্ষেত্রে অবশ্য রন্টজেন তেসলাকে কৃতিত্ব দিয়েছিলেন তাঁর আবিষ্কৃত এক্স-রে রশ্মির এমন একটা ভালো উপযোগিতা খুঁজে বের করার জন্যে।

তেসলার আবিষ্কৃত প্রথম এক্স-রে ইমেজিং সিস্টেম থেকে প্রাপ্ত ছবি ।

যার নামে ৩০০ আবিষ্কারের পেটেন্ট আছে তাকে নিয়ে আলোচনা করে শেষ করা অসম্ভব। নিকোলা তেসলা মূলত একাই বিংশ শতাব্দীর পরিচিত সব প্রযুক্তি আবিষ্কার করে গেছেন। পরবর্তীতে ইতিহাসের পরিচিত বিজ্ঞানীরা এগুলো নিয়ে গবেষণা করে আরেকটু উন্নত করেন। কিন্তু নিকোলা তেসলার মত সম্পূর্ণ মৌলিক চিন্তাধারা এবং প্রায় শূন্য হতে ম্যাজিকের মত কোন আইডিয়া নিয়ে আসা কারো পক্ষেই সম্ভব হয়নি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here