বুদ্ধ দর্শনে নারী

0
956

মিলটন কুমার দেব

কালের চাহিদায় ও পরিস্থিতির প্রয়োজনে মহামনীষীগণ পৃথিবীতে আবির্ভূত হন। ঠিক এমনি এক যুগের পরিস্থিতি ও প্রয়োজনে খৃষ্ট পূর্ব ৬ষ্ঠ অব্দে মহামানব গৌতম বুদ্ধ জন্মগ্রহণ করেছিলেন অবিভক্ত বাংলার বুকে। পালি সাহিত্য  সুত্তনিপাত গ্রন্থে আছে, ‘‘শ্রেষ্ঠত্বের মতো অতুলনীয় যে বোধসত্ত্ব, তিনি লুম্বিনী জনপদে শাক্যদের  গ্রামে, মানবের মঙ্গল ও সুখের জন্য জন্মগ্রহণ করেন।’’ এই তথ্য অশোকের শিলালিপি (২৫০ খৃ.পূ.) কর্তৃক সমর্থিত হয়েছে। শিলালিপিতে উল্লেখ আছে যে, ‘‘এই স্থানে বুদ্ধ শাক্যমুনি ভূমিষ্ঠ হইয়াছিলেন।’’ গৌতম বুদ্ধের আবির্ভাবের সময়ে সমগ্র বাংলা ষোলটি রাজ্যে বা মহাজনপদে বিভক্ত ছিল বলে জানা যায়। অঙ্গুতর নিকায় গ্রন্থে এই ষোড়শ জনপদের উল্লেখ আছে। বুদ্ধত্বলাভের পর গৌতম বুদ্ধ সর্বপ্রথম তার ধর্মপ্রচার করেন এই ষোড়শ মহাজনপদের অন্যতম মহাজনপদ মগধে। সে সময় মগধের শাসক ছিলেন বিম্বিসার। এরপর বৌদ্ধধর্ম ভারতের বিভিন্ন স্থানে বিস্তার লাভ করে। সে ভূখণ্ডটি বর্তমানে বাংলাদেশ নামে পরিচিত এখানে ঠিক কোন সময়ে বৌদ্ধধর্মের প্রথম প্রসার ও বিকাশ ঘটেছিল তা নির্দিষ্টভাবে বলা সহজ নয়। তবে অশোকের রাজত্বের পূর্বেই সম্ভবত উত্তরবঙ্গে বৌদ্ধধর্মের প্রভাব ছিল বলে বিনয় পিটকে ইঙ্গিত আছে। ঐতিহাসিক নিদর্শন এবং চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ-এর বিবরণ হতে পণ্ডিতরা মনে করেন যে, সম্রাট অশোকের রাজত্বকালে তাঁর সাম্রাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বাংলাদেশে (উত্তরবঙ্গ) বৌদ্ধধর্মের প্রভাব ছিল।

পালি সাহিত্যের ইতিহাস পর্যালোচনায় লক্ষ্যণীয় যে, সমসাময়িক বাংলা অঞ্চলে রক্ষণশীলতার আবহের মাঝেও বৌদ্ধ যুগে নারীদের সামাজিক মর্যাদা অনেক বেশি বৃদ্ধি পেয়েছিল। আর এ জন্য  বৌদ্ধধর্মের আদর্শ ও গৌতম বুদ্ধের উদার মনোভাবই মূলত চালিকাশক্তি। বৌদ্ধধর্মের প্রচারের পূর্বে শাস্ত্রীয় আচার-অনুষ্ঠান তথা মাঙ্গলিক কর্মকাণ্ডে নারীদের স্থান ছিল গৌণ এবং নিঃসন্তান ও বিধবা নারীদের এসব অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কোনো ধরনের অধিকারও ছিল না। বুদ্ধ জাতিভেদ, বর্ণপ্রথা এবং বৈষম্যব্যবস্থার ঘোর বিরোধী ছিলেন। দীর্ঘনিকায় এর সুত্ত মণ্ডলে বুদ্ধ বলেছেন, ‘‘সব মানুষ সমান, সে নারী বা পুরুষ, ব্রাহ্মণ অথবা শুদ্র যেই হোক না কেন।’’ গৌতম বুদ্ধ নারী পুরুষ উভয়কেই তাঁর সদ্ধর্ম প্রচারের তুল্য অধিকার প্রদান করেন এবং বৌদ্ধসংঘে পুরুষের পাশাপাশি নারীর যোগদান নিশ্চিত করে মানবতার মহিমাকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। উল্লেখ্য, বৌদ্ধসংঘে নারীর প্রবেশাধিকার প্রথম দিকে ছিল না। এমনকি বুদ্ধদেব স্বয়ং প্রথমদিকে নারীদের সংঘে প্রবেশের অনুমতি দানে আগ্রহী ছিলেন না। তাঁর আশংকা ছিল নারীদের সংঘে প্রবেশের ফলে পবিত্রতা, ব্রহ্মচর্য, একাগ্রতা ইত্যাদি বৌদ্ধধর্মের প্রধান সোপানগুলো ক্ষতিগ্রস্থ হবে। কিন্তু তাঁর প্রধান শিষ্য স্থবির আনন্দের অনুরোধ এবং বিমাতা মহাপ্রজাবতী গৌতমী পাঁচশত শাক্যনারী নিয়ে তাঁর সম্মুখে উপস্থিত হয়ে ভিক্ষুনীসংঘ স্থাপনের প্রস্তাব করলে গৌতম বুদ্ধ তা মেনে নেন। বুদ্ধদেব ভিক্ষুনীদের জন্য কতগুলো অনুশাসন (অট্ঠগরুধম্ম) নির্ধারণ করে দিলেন। মনুর যে বিধান Ñ‘‘শৈশবে পিতার অধীন, স্ত্রীলোক কোনো কালেই স্বাতস্ত্র্য অবলম্বন করিবেন না।’’ ভিক্ষুনীদের প্রতি বুদ্ধের অষ্ঠানুশাসন এরই অনুযায়ী। যেমন-

১. কোনো ভিক্ষুনীর যদি একশত বছর বয়স হয় তাহলেও তাকে একজন তরুণ ভিক্ষুর আরাধনা করতে হবে।

২. কোনো ভিক্ষুর বাসস্থানের সামনে ভিক্ষুনী তাঁর বর্ষাবাসের কাল যাপন করবে না।

৩. উপসৎ এর দিন নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাদের প্রয়োজনীয় সকল উপদেশ ভিক্ষুর নিকট হতে নিতে হবে।

৪. উপবাসের অবসানে কোনো ভিক্ষুনীর যে অপরাধ দৃষ্ট, শ্রুত বা কল্পিত হয়েছে তার জন্য তাঁকে ভিক্ষুসংঘ ও ভিক্ষুনীসংঘ উভয় সংঘের নিকট ক্ষমা ভিক্ষা করতে হবে।

৫. যদি কোনো ভিক্ষুনীর গুরুতর অপরাধ হয় তবে উভয়সংঘের নিকট ক্ষমা ভিক্ষা করতে হবে।

৬. দু বছর যাবৎ ছটি উপদেশ সম্বন্ধে জ্ঞান অর্জন করে ভিক্ষুনী উভয় সংঘের কাছেই উপসম্পদা যাচ্ঞা করবে।

৭. ভিক্ষুনী কোনো ভিক্ষুকে অপমান বা নিন্দা করবে না।

৮. কোনো ভিক্ষুনী কোনো ভিক্ষুর সাথে বাক্যালাপ করবে না। কিন্তু ভিক্ষু ভিক্ষুনীকে উপদেশ দিতে পারবে।

যাহোক, বুদ্ধদেব প্রথমে নিজ বিমাতা মহাপ্রজাবতীকে তাঁর প্রথম নারী শিষ্যারূপে গ্রহণ করেন। রাজপরিবারে জন্ম নিয়েও তিনি প্রথম পার্থিব সুখ বিসর্জন দিয়ে সন্ন্যাস জীবন গ্রহণ করেছিলেন। সর্বপ্রথম তিনিই মস্তকমুণ্ডণ করে পীত বসন পরিধান করেন। বুদ্ধদেব জননী গৌতমীকে ভিক্ষুনী সংঘের প্রধান ও পরিচালিকা নিযুক্ত করেন। যে পাচঁশত ভিক্ষুনারী তাঁর সঙ্গ গ্রহণ করেছিলেন তাঁরাও যথা সময়ে সহত্ত্ব লাভে সমর্থ হন। এখানে গৌতমবুদ্ধ নির্বাণ লাভের জন্য নারী ও পুরুষের মাঝে কোনরূপ পার্থক্য করেননি। তাঁর প্রচারিত বাণী এবং নৈতিক শিক্ষানীতি নারী ও পুরুষ উভয়ের কল্যাণের জন্যই প্রযোজ্য ছিল। বৌদ্ধসংঘে প্রবেশের দ্বার বিবাহিত, অবিবাহিত, নি:সন্তান. বিধবা সকল শ্রেণির এবং জাতি, ধর্ম ও গোত্র নির্বিশেষে সকল নারীর জন্যই উম্মুক্ত ছিল। এমনকি বারবনিতা এবং চণ্ডাল কন্যাও সংঘে যোগদানপূর্বক প্রব্রজ্যা গ্রহণ করলে তাদের প্রতি সমান সমীহ প্রদর্শন করা হতো। তার উজ্জ্বল প্রমাণ পাওয়া যায় বুদ্ধের অন্যতম শিষ্য আম্রপালী নামে গণিকার জীবন পর্যালোচনায়। বুদ্ধ স্বয়ং লিচ্ছবীগণের নিমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যাান করে সমসাময়িক যুগের বৈশালীর অন্যতম পরিচিত গণিকা আম্রপালীর নিমস্ত্রণ গ্রহণ করেছিলেন। পদুম্বতী, সামা. সুলসা সহ অনেক খ্যাতনামা নর্তকী ও গণিকার জীবনী হতে জানা যায় যে, বৌদ্ধধর্মের প্রভাবে তারা পাপপ্রধান মানসিকতা হতে মুক্তিলাভ করে আদর্শজীবন অতিবাহিত করতে সমর্থ হয়েছেন এবং পরবর্তীতে জনগণের অতল শ্রদ্ধাও লাভ করেছে। পালি সাহিত্যসমূহে বিভিন্ন শ্রেণির নারীর যেসব জীবনচিত্র অংকিত রয়েছে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন সম্পর্কে আলোচনা করা হলো :

চণ্ডালকন্যা প্রকৃতি

বুদ্ধের প্রধান আনন্দ একদিন আহার সংগ্রহের জন্য গ্রামে প্রবেশ করেন। এমন সময় তিনি দেখতে পান এক কুমারী কূপ থেকে জল তুলে নিয়ে আসছেন। তৃষ্ণার্ত আনন্দ সেই কুমারীর কাছে জল খেতে চাইলে উত্তরে কুমারী বললেন যে, তিনি একজন চণ্ডাল কন্যা। অতএব তিনি তাকে জল প্রদান করার যোগ্য নন। স্থবির আনন্দ তাঁর এ কথায় বিমর্ষ হয়ে বললেন, তিনি তার নিকট তৃষ্ণা নিবারণের জন্য কেবল জল চেয়েছেন, তিনি কোন জাতের, তা জিজ্ঞাসা করেননি। তিনি আরো বললেন, বুদ্ধ ও তাঁর শিষ্যরা জাতিভেদ বিশ্বাস করেন না। একথা শ্রবণ করে কুমারী অত্যন্ত প্রীতা হলেন এবং আনন্দকে পান করার জন্য জল প্রদান করলেন। পরবর্তী সময়ে এ কুমারী প্রব্যজ্যা গ্রহণ করে বৌদ্ধ ভিক্ষুনী সংঘে যোগ দেন এবং বৌদ্ধ ইতিহাসে ভিক্ষুনী প্রকৃতি নামে পরিচিতা হন।

গৃহী নারী ভদ্দা

শ্রাবন্তীর কিম্বিল শহরের জনৈক গৃহস্থের কন্যা ভদ্দা। অন্য এক গৃহস্থপুত্র রোহকের সাথে তাঁর বিয়ে হয়। এই নারী তাঁর সদগুণের জন্য ‘ভদ্দিস্থি’ বা ভদ্র মহিলা নামে পরিচিতা ছিলেন। একদিন বুদ্ধদেবের দুইজন প্রধান শিষ্য কিম্বিল নগরে আগমন করেন এবং ভদ্দাপতি রোহক এবং ভদ্দার অতিথ্য গ্রহণ করেন। ভদ্দা তাদের ধর্মালোচনা শ্রবণ করে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ এবং পঞ্চশীল লাভ করেন। ভদ্দা বৌদ্ধ ধর্মের নিয়ম অনুযায়ী প্রতি অর্ধ মাসের অষ্টমী, চতুর্দশী ও পঞ্চাদশীতে ‘উপসথ’ পালন করতেন।

(চলবে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here