বেগম রোকেয়া: নারী আন্দোলনের অগ্রদূত

0
218

মালেকা বেগম

বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন ছিলেন প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী, সাহসী, প্রতিবাদী ও মানবতাবাদী। তাঁর অভীষ্ট লক্ষ্য ছিল সমাজ থেকে গোঁড়ামি, ধর্মান্ধতা, অসাম্য, বৈষম্য দূর করা। সেই লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য নারী-পুরুষের বৈষম্য, অক্ষমতা, অযোগ্যতা, অসম্পূর্ণতাকে চিহ্নিত করে উভয়ের মিলিত শক্তিতে সম মানবাধিকারের ভিত্তিতে একটি সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করেছেন তিনি। আজীবন চালিত তাঁর এই সংগ্রামের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ধর্মান্ধতা, নারীর প্রচলিত কুসংস্কার ও পশ্চাৎপদতা। গার্হস্থ্য জীবনের প্রচলিত ধ্যান-ধারণা, নারীর শিক্ষাগত, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার-বঞ্চনার বিষয়গুলো নারী প্রগতির জন্য রোকেয়ার সংগ্রামকে বাধাগ্রস্ত করেছে। পশ্চাৎপদ রক্ষণশীল সমাজের প্রতিভূ পুরুষ রোকেয়ার প্রগতিশীল চিন্তাধারার ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে পথ রুদ্ধ করে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু ক্রমাগত অব্যাহত সাধনায় তিনি কর্মযজ্ঞ চালিয়েছেন সেসব বাধা ভেঙে নতুন সমাজ গড়ার অভিযানে।

জমিদার বাবা জহীর মোহাম্মদ আবু আলী সাবের ও মা মোসাম্মৎ রাহাতন্নেসা সাবেরা চৌধুরানীর অনুশাসনে অবরোধবাসিনীর জীবনযাপনের মধ্যে মুক্তির পথ তৈরি করে দিয়েছিলেন বড় ভাই ইব্রাহিম সাবের ও বড় বোন করিমুন্নেসা খানম। বিয়ের আগপর্যন্ত মা-বাবার অগোচরে তাঁর লেখাপড়ার চর্চা চলেছিল। বিয়ের পর তাঁকে বিহারের ভাগলপুরে চলে যেতে হয়েছিল স্বামী সাখাওয়াত হোসেনের কর্মস্থলে। মূলত সেই সময় থেকে তিনি অবরোধমুক্ত হলেন এবং মুক্ত স্বাধীনভাবে পড়া ও লেখার চর্চা করতে থাকলেন।

দাম্পত্যজীবনে রোকেয়ার অতৃপ্ত বেদনা নিয়েও লেখালেখি হয়েছে। সেসব যাঁরা লিখেছেন, তাঁরা বলেছেন, বিপত্নীক বয়স্ক পাত্রের সঙ্গে বিয়ে হওয়া, অসুস্থ স্বামীর সেবা করা, স্বল্পায়ু, দুই মেয়ের জন্য শোকাতুর মা হিসেবে তাঁর কষ্টের জীবনযাপন ইত্যাদি প্রসঙ্গে। পারিবারিক এসব অবশ্যম্ভাবী বাস্তবতার দুঃখের উত্তরণ ঘটিয়ে রোকেয়া-সাখাওয়াত হোসেন যুগলে অন্তরঙ্গ জীবনচর্চা, সাহিত্যচর্চা, সমাজ পরিবর্তনের চিন্তাচর্চা করেছিলেন স্বল্পকালীন দাম্পত্যজীবনে (১৮৯৬ বা ১৮৯৮-১৯০৯)। বিয়ের ১১, মতান্তরে ১৩ বছর পর স্বামীর মৃত্যু হওয়ায় তিনি একা হয়ে পড়লেন তাঁর চিন্তাচর্চা, সাহিত্য সাধনা ও সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে। সাখাওয়াত হোসেন রোকেয়ার লেখাপড়া, সাহিত্যচর্চার জন্য আটচালা একটি ঘর বানিয়ে দিয়েছিলেন। সেই ঘরে তিনি ১৯০১-০৭ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে প্রচুর সাহিত্যচর্চা করেছেন।

স্বামীর অসুস্থতা ও মৃত্যুশোক, মেয়েদের মৃত্যুশোক, ভাগলপুরের বাড়ি থেকে বাধ্য হয়ে চলে যাওয়া, মা-বাবার মৃত্যুশোক ইত্যাদি তাঁর লেখা, সাহিত্যসাধনা ও চর্চা স্তব্ধ করে দিয়েছিল। ১৯০৭ সালে ভারত মহিলা পত্রিকায় ‘প্রেম রহস্য’ লেখাটি প্রকাশের পর আট বছর বিরতি দিয়ে তাঁর লেখা আবার প্রকাশিত হতে থাকে ১৯১৫ থেকে।

তাঁর সাহিত্যচর্চার এই দীর্ঘ বিরতির সময়ে তিনি পারিবারিক-সামাজিক-ব্যক্তিগত জীবনে লড়াই-সংগ্রাম করেছেন, ভাগলপুরে নারীশিক্ষার স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন, পরবর্তী সময়ে সেই স্কুল কলকাতায় স্থানান্তর করেছে-স্বপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেছেন। নারীসমাজের সামাজিক-পারিবারিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অধিকার আদায়ের সংগ্রাম করার লক্ষ্যে সে সময় তিনি নারী সংগঠন গড়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। জীবনের সব অভিজ্ঞতা থেকে উৎসারিত রোকেয়ার কর্মসাধনার মূল ব্রত হিসেবে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো দেদীপ্যমান তাঁর নারীশিক্ষা আন্দোলন।

একটি থেকে জ্বলছে কোটি মোমবাতি’, প্রথম আলো, ১৪ এপ্রিল ২০১৬ থেকে সংকলিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here