বৈদিক যুগ থেকে উনিশ শতকে ভারতবর্ষে নারী

0
601

তাকী মোহাম্মদ জোবায়ের

বৈদিক যুগের আদি পর্বে নারীরা জীবনের সকল ক্ষেত্রেই পুরুষের সঙ্গে সমানাধিকার ভোগ করেছে। পতঞ্জলি বা কাত্যায়ণের মতো প্রাচীন ভারতীয় বৈয়াকরণের লেখা থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, আদি বৈদিক যুগে নারীরা শিক্ষিত ছিলেন। ঋক বেদের শ্লোক থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে নারীরা পরিণত বয়সে বিবাহ করতেন এবং সম্ভবত স্বয়ম্বরা নামক প্রথায় নিজের স্বামী নির্বাচনের বা গান্ধর্ব বিবাহ নামক প্রথায় সঙ্গী খুঁজে নেওয়ার স্বাধীনতা তাদের ছিল। ঋক বেদ, উপনিষদের মতো আদি গ্রন্থে বহু প্রাজ্ঞ ও আধ্যাত্মিক ক্ষমতাসম্পন্ন নারীর উল্লেখ আছে, গার্গী ও মৈত্রেয়ী যাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

নারীর বেদপাঠের অধিকার ছিল। আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০ শতকে নারীর অবস্থার অবনতি শুরু হয়। যদিও জৈনধর্মের ন্যায় সংস্কার আন্দোলনগুলি নারীদেরকে ধর্মীয় অনুশাসন পালনের অনুমতি দেয়, তবুও ভারতে অধিকাংশ নারী বিধিনিষেধের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। বাল্যবিবাহের প্রথা খুব সম্ভবত ছয় শতকের কাছাকাছি সময় থেকে প্রচলন লাভ করে।

মধ্যযুগীয় ভারতীয় সমাজে নারীদের অবস্থার আরও অবনতি ঘটে এবং বাল্যবিবাহের প্রচলন এবং বিধবাদের পুনর্বিবাহের নিষেধাজ্ঞা ভারতে কিছু সম্প্রদায়ের সামাজিক জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক কারণে হিন্দু ক্ষত্রিয় শাসকদের মধ্যে বহুবিবাহ প্রথা প্রচলিত ছিল। অনেক মুসলিম পরিবারে, নারীর গতিবিধি বাড়ির অন্দরমহলেই সীমাবদ্ধ ছিল।

খুব অল্প সংখ্যক গ্রন্থেই স্ত্রীর আচার ও মহিলাদের ক্রিয়াকলাপ মূল উপজীব্য বিষয়, তবে, ১৭৩০ সালে তাঞ্জৌরের জনৈক রাজকর্মচারী ত্রম্বকোয়জ্যন রচিত স্ত্রী ধর্ম পদ্ধতি একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম।

এই পরিস্থিতিতেও, রাজনীতি, সাহিত্য, শিক্ষা ও ধর্ম-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বহু বিশিষ্ট নারীর সন্ধান পাওয়া যায়। সুলতানা রাজিয়া (১২০৫-১২২০) একমাত্র মহিলা সুলতান যিনি দিল্লি শাসন করেছেন। ১৫৬৪ খ্রিষ্টাব্দে মুগল সম্রাট আকবরের সেনাপতি আসাফ খানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রাণ হারানোর আগে গোন্দ রানী দুর্গাবতী ১৫ বছর রাজ্যশাসন করেছিলেন। চাঁদ বিবি ১৫৯০ খ্রিষ্টাব্দে আকবরের শক্তিশালী মুগল বাহিনীর বিরুদ্ধে আহমদনগরকে রক্ষা করেছিলেন। জাহাঙ্গীরের স্ত্রী নূরজাহানের রাজ্যশাসনে কার্যকরী ভূমিকা ছিল এবং তিনি মুগল সিংহাসনের পিছনে প্রকৃত ক্ষমতা হিসেবে পরিগণিত হতেন। মুগল রাজকুমারী জাহানারা ও জেবুন্নেসা ছিলেন বিখ্যাত কবি এবং তারা ক্ষমতাসীন শাসকদেরও প্রভাবিত করেছিলেন। যোদ্ধা এবং প্রশাসক হিসেবে তার দক্ষতার শিবাজীর মা জিজাবাইকে শাসক বা রাজপ্রতিনিধির মর্যাদা দিয়েছিল। তারাবাই ছিলেন আরেকজন মহিলা মারাঠা শাসক। দক্ষিণ ভারতে অনেক নারী গ্রাম, শহর ও বিভাগ পরিচালনা করেন এবং নতুন সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন।
ভক্তি আন্দোলন নারীর অবস্থা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করে এবং তাদের উপর হওয়া বিভিন্ন নিপীড়নের বিষয়ে প্রশ্ন তোলে।

কর্ণাটকের স্থানীয় রাজশাসিত রাজ্য কিত্তুরের রানী, কিত্তুর চেন্নাম্মা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সশস্ত্র বিপ্লবীদের নেতৃত্ব দেন। উপকূলবর্তী কর্ণাটকের রানী আব্বাক্কা, ইউরোপীয় সৈন্যদের, বিশেষত ১৬ শতকের পর্তুগিজ সৈন্যদের আক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেন। ঝাঁসির রানী লক্ষ্মী বাই ১৮৫৭ সালের ব্রিটিশ বিরোধী সিপাহী বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন। তিনি বর্তমানে জাতীয় নায়কের মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিতা। অযোধ্যার যুগ্ম শাসক বেগম হযরত মহল ছিলেন আর এক জন শাসক যিনি ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন। তিনি ব্রিটিশদের সঙ্গে সন্ধিস্থাপনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এবং পরে নেপালে আত্মগোপন করেন। ভোপালের বেগমরাও এই সময়ের উল্লেখযোগ্য মহিলা শাসক হিসেবে বিবেচিত হন। তারা মার্শাল আর্টেও প্রশিক্ষিত ছিলেন।

চন্দ্রমুখী বসু, কদম্বিনী গাঙ্গুলী এবং আনন্দীগোপাল জোশি সফল প্রশংসাপত্র অর্জনকারী ভারতীয় মহিলাদের মধ্যে অগ্রগণ্য।
উনিশ শতকে নতুন আলোর বার্তা নিয়ে আবির্ভূত হলেন প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর, রাজা রামমোহন এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। সঙ্গত কারণেই ইউরোপীয় সংস্কৃতি অবাধ বিস্তারের সঙ্গে জড়িত ছিল ঠাকুর বাড়ির পর্বত প্রমাণ ঐশ্বর্য এবং সমৃদ্ধ ঐতিহ্য। ফলে দ্বারকানাথ ঠাকুরই বিশেষভাবে দিন নির্দেশকরূপে চিহ্নিত হন নতুন কলকাতা শহর বিনির্মাণের সক্রিয় ভূমিকায়। পাশাপাশি বন্ধু, সহযোগী রাজা রামমোহন রায়ও নিয়োজিত হলেন বহু দেববাদ এবং কট্টর ব্রাহ্মণ্যধর্মের বিপরীতে নতুন এক ধর্মসংস্কার আন্দোলনে। ধর্মকে মুক্ত করতে সচেষ্ট হলেন যুগ যুগ ধরে চলে আসা সমস্ত প্রাচীন অপসংস্কার থেকে। আর বিদ্যাসাগর এসে হাল ধরলেন অপ্রয়োজনীয় সামাজিক আবর্জনা থেকে অন্ধকারে নিমজ্জিত নারী তথা গোটা সমাজকে নতুন সূর্যের আলো দেখাতে।


দ্বারকানাথ আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় উঠতি শিল্পোদ্যোক্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেও সমাজ সংস্কারের প্রতিও তাঁর দৃষ্টি ছিল উল্লেখ করার মতো। আধুনিক সৃষ্টিশীলতা, উদার মানবিকতাবাদ, প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের মেল বন্ধনসহ বিভিন্ন সামাজিক কার্যকলাপে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে তৎপর হলেন। নতুন আলোর দিশারী, কর্মবীর এই দ্বারকানাথ স্ত্রী স্বাধীনতায় ও বিশ্বাসী ছিলেন।

উপনিষদের প্রথম বাংলা অনুবাদক রাজা রাম মোহন রায় ধর্মগ্রন্থ থেকেই বের করে আনেন ব্রহ্মের সমস্ত দিক-নিশানা। শুধু তাই নয় নারী-শিক্ষার প্রতিও তাঁর জোরালো সমর্থন ছিল। আধুনিক শিক্ষা গ্রহণে ব্রাহ্ম ধর্মে দীক্ষিত নারীরাই প্রথম এগিয়ে আসে।

আর নিপীড়িত নারীদের সত্যিকারের ত্রাণকর্তা হিসেবে আজো যাঁর নাম উজ্জল নক্ষত্রের মতো দীপ্তিমান তিনি নারীজাতির সত্যিকারের পথ দ্রষ্টা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। চারিত্র পূজা প্রবন্ধে বিদ্যাসাগর সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন যে, কোনদিন তাকে মন্দিরে প্রবেশ করতে হয়নি, কারণ তাঁর মাই ছিলেন সাক্ষাত দেবী-প্রতিমা। তারপরেও ঈশ্বরে অবিশ্বাসী একজন নিষ্ঠাবান, মানবিক মানুষ ধর্মশাস্ত্র ঘেঁটেই বের করে আনেন অনাদৃত, অবহেলিত বঞ্চিত নারীদের মুক্তির সমস্ত উপায়। দুঃসাহসিক এই বিপ্লবী একাই এগিয়ে যান নারী জাতিকে তাঁর সমস্ত মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে দেবার দৃঢ় প্রত্যায়। নিজের ছেলের সঙ্গে বিধবার বিয়ে দিয়ে সমাজে দৃষ্টান্ত রাখেন।

উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে নারী শিক্ষার দ্বার উন্মোচিত হলেও এ শিক্ষা সবার জন্য অবারিত হয়নি এবং অবরুদ্ধ নারীরা সেভাবে ঘর থেকেও বের হতে পারেনি। নারীর এই বিপর্যস্ত সামাজিক অবস্থা মূর্ত হয়ে আছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্পে, উপন্যাসে, প্রবন্ধে, নাটকে এবং কবিতায়। বিংশ শতাব্দীতে নজরুলের লেখার মধ্যেও আমরা পাই নারী জাতির অসহায়ত্বের সামাজিক দলিল।

সাথে সাথে আরো কয়েকজনের নাম এসে যায়, যার দীপ্ত আভায় ঠাকুর বাড়ি তথা কলকাতা শহর নতুন কিরণে অভিষিক্ত হয়। তিনি ঠাকুর বাড়ির মেজ বৌ জ্ঞানদানন্দিনী দেবী। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী। স্বামী প্রথম ভারতীয় আইসিএস অফিসার। শুধু তাই নয়, তিনি ছিলেন বাংলার নারী স্বাধীনতারও একজন জাগ্রত সৈনিক। বিলেতে গিয়ে নতুন সভ্যতার নারীর ঘরে বাইরে কর্মদ্যোতনায় তিনি মুগ্ধ, বিস্মিত। শুধু তাই নয়, সেই বিস্ময় আর আনন্দের স্রোতে নিমন্ত্রিত করে তাঁর স্ত্রীটিকেও। প্রথা অনুযায়ী ঠাকুর বাড়ির কড়া শাসন, দুর্ভেদ্য বিধি নিষেধ, কঠোর শৃঙ্খল সব কিছু ভেঙে দেন স্বামীর অনুপ্রেরণায় বাড়ির মেজ বৌ। এ নতুন আলোয় পা রাখাটা অত সহজ ছিল না। দেবেন্দ্রনাথের অভেদ্য নিয়মকে উপেক্ষা করে প্রথমেই তিনি স্ত্রীকে ঘরের বাইরে বের করতে পারেননি।

কিন্তু এক সময় সে স্বপ্ন যখন সফল হল জ্ঞানদ নন্দিনী দেবী ঠাকুরবাড়ির সীমাবদ্ধ অন্দরমহল থেকে বৃহত্তর বহিরাঙ্গণে পা দিলেন। তারপর আর পেছনে ফিরে তাকাননি ঠাকুর বাড়ির এই মেজো বৌটি। শুধু বোম্বে যাওয়া নয়, গভর্নমেন্ট হাউসে যাওয়া প্রথম বাঙালি রমণীও তিনি।

১৮৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত বেথুন স্কুল নারী শিক্ষাকে অবারিত করলেও সবার জন্য সেইপথ সহজ সরল হয়নি। শুধু শিক্ষা নয়, সমাজের সব ধরনের অব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে নারীকে আরো অনেক কালক্ষেপণ করতে হয়। নব উদ্ভাবনকে স্বাগত জানাতে মানব সভ্যতাকেও দীর্ঘকাল অপেক্ষা করতে হয়েছে। দুর্বল অংশ হিসাবে নারীর ক্ষেত্রে এ সময় হয়েছে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর। বিদ্যাসাগর ও নিউ উদ্যোগে ভদ্রঘরের মেয়েদের জন্য বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করে নারী শিক্ষাকে সর্বজনীন করার প্রয়াসে লিপ্ত হন। এর পরেও স্কুলে যাওয়া মেয়েদের সংখ্যা ছিল হাতে গোনার মতো। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরই স্ত্রী শিক্ষার আন্দোলন জোরদার হয়। ১৯৭৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্ব প্রথম মেয়েদের পরীক্ষা দেবার অধিকার স্বীকৃত হয়। ১৮৮৩ সালের শুরুতে চন্দ্রমুখী এবং কাদম্বিনী উভয়েই বিএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এভাবে উনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে এবং বিংশশতকের প্রথমার্ধে প্রায়ই অর্ধশত মহিলা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক-স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন।

মুসলিম নারীদের মধ্যে সর্ব প্রথম নবাব ফয়জুন্নেসা ও বেগম রোকেয়া মুসলিম নারী শিক্ষা ত্বরান্বিত করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত হলেন।

বেগম রোকেয়া শুধু নারী শিক্ষা নয় নারীকে তার যাবতীয় অধিকার অর্জন করার ব্যাপারে বাস্তব কর্মসূচি এবং তাদের সচেতন ও ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে নারী জাগরণের ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here