বোরো মৌসুমে রেকর্ড পরিমান চালের উৎপাদন

0
35

কৃষি ডেস্ক: বর্তমান বোরো মৌসুমে ২ কোটি ৭ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন চাল উৎপাদন হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে একক মৌসুমে এই পরিমাণ চাল আগে কখনো উৎপাদিত হয়নি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সুত্রে জানা যায়, এবছর বোরো মৌসুমে গত বোরো মৌসুমের চেয়ে ১১ লাখ টন চাল বেশি উৎপাদন হয়েছে। গত বছর দেশে বোরো মৌসুমে চাল উৎপাদন হয়েছিল ১ কোটি ৯৬ লাখ টন। এ বছর দেশে বোরোতে চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ কোটি ৫ লাখ মেট্রিক টন। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে দুই লাখ টনের বেশি উৎপাদন হয়েছে। এবছর জাতীয় গড় ফলন হয়েছে হেক্টর প্রতি ৪.২৯ মেট্রিক টন যা গত বছরের গড় ফলন ৩.৯৭ মেট্রিক টন/হেক্টরের চেয়ে প্রায় ৮ শতাংশ বেশি। এই গড় ফলন বৃদ্ধির হার বিগত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।


বাংলাদেশে বছরে মোট উৎপাদিত চালের ৫৫ ভাগের বেশি আসে বোরো মৌসুম থেকে। কিন্তু সফলভাবে এই ধান ঘরে ওঠানো খুবই চ্যালেঞ্জিং। বিশেষ করে, আকস্মিক বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে হাওড়ের ধান ঠিকমতো ঘরে তোলা নিয়ে প্রতিবছরই আতঙ্কে থাকতে হয়। এর সাথে করোনা পরিস্থিতির জন্য ধান কাটার সময়ে যুক্ত হয়েছে চলাচলে বিধিনিষেধ বা লকডাউন। এ অবস্থায়, বোরো ধান কর্তনের জন্য যন্ত্র বিতরণ ও আন্তঃজেলা ধান কাটা শ্রমিক পরিবহনে ত্বরিতগতিতে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। স্বাস্থ্যবিধি মেনে সারাদেশে শ্রমিকদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন রাখা হয়। একই সাথে কম্বাইন হারভেস্টার, রিপারসহ ধান কাটার যন্ত্র জরুরি ভিত্তিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়।

ফলে অত্যন্ত সফলভাবে এ বছর হাওড়ের বোরো ধান ও সারাদেশের বোরো ধান ঘরে তোলা সম্ভব হয়েছে। শুধু তাই নয়, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবছর অনেক আগেই বোরো ধান কৃষকের ঘরে উঠেছে। করোনার সময়ে কৃষকেরা যে সফলভাবে বোরো ধান ঘরে তুলতে সক্ষম হয়েছেন, এটি অত্যন্ত আনন্দের ও স্বস্তির বিষয় মনে করছেন কৃষি বিশেষজ্ঞরা।


এবছরের ধান কাটা কার্যক্রম পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ধানকাটা মেশিন দ্রুত মাঠে দেওয়া এবং সরকারি তত্ত্বাবধানে শ্রমিকের সময়মতো যাতায়াত সুগম করার ফলেই এ বছর দ্রুততার সঙ্গে ধান কাটা সম্ভব হয়েছে। এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় শ্রমিকদের চলাচল নির্বিঘ্নকরা এবং কৃষি যন্ত্রপাতি সময়মতো সরবরাহ করা। এবছর শুধু হাওড়ভুক্ত ৭ জেলাতেই বহিরাগত শ্রমিক আনা হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার (৪৯১০৮ জন)। এছাড়া, তিন হাজার ২০ কোটি টাকার ‘কৃষি যান্ত্রিকীকরণ’ প্রকল্পের আওতায় অঞ্চলভেদে ৫০-৭০ শতাংশ ভর্তুকি দিয়ে ধান কাটাসহ অন্যান্য কৃষি যন্ত্রপাতি কৃষকদেরকে দেওয়া হয়েছিল। গতবছর ধান কাটতে কম্বাইন হারভেস্টার মাঠে নামানো হয়েছিল ১ হাজার ২৪০টি। এবছর আরও ১ হাজার ৬৬৬টি মাঠে নেমেছে। অর্থাৎ মোট ২ হাজার ৯০৬টি হার্ভেস্টার মাঠে দেওয়া হয়েছে। রিপারও চলেছে মোট ৮৩৯টি। ধান কাটা মৌসুমে কৃষকদের দুঃখ-কষ্ট লাঘবের এসব কৃষিযন্ত্র নতুন মাত্রাযোগ করেছে। এতে একদিকে শ্রমিক সঙ্কট থাকলেও দ্রুত ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে, অন্যদিকে উৎপাদন খরচ কমার ফলে কৃষক লাভবান হচ্ছে।


এবছর হাওড়ভুক্ত ৭টি জেলায় বোরো আবাদ হয়েছে ৯ লাখ ৪৬ হাজার ৫৩৪ হেক্টর জমিতে; যা দেশের মোট আবাদের প্রায় ২০ শতাংশ। আর শুধু হাওড়ে বোরো আবাদ হয়েছে ৪ লাখ ৫১ হাজার ৭৭০ হেক্টর জমিতে, যা মোট আবাদের প্রায় ৯.২৫ শতাংশ। আর সারাদেশে এবছর ৪৮ লাখ ৮৩ হাজার ৭৬০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে।


গত বছর বোরো ধান আবাদ করা হয়েছিল ৪৭ লাখ ৫৪ হাজার ৪৪৭ হেক্টর জমিতে। আর এ বছর আবাদ হয়েছে ৪৮ লাখ ৮৩ হাজার ৭৬০ হেক্টর জমিতে। এবছর ১ লাখ ২৯ হাজার ৩১৩ হেক্টর বেশি জমিতে বোরো আবাদ বেড়েছে। শতকরা হিসাবে এই বৃদ্ধির হার ২.৭২ শতাংশ।


এ বছর (২০২০-২১) বোরো ধান চাষের লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৪৮ লাখ ৫ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে। যা ছিল গত বছরের আবাদের চেয়ে ৫০ হাজার ৭৫৩ হেক্টর বেশি। কিন্তু সরকারের দেয়া প্রণোদনা ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরসহ কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সকল কর্মকর্তার অনুপ্রেরণামূলক কর্মকান্ডের কারণে লক্ষমাত্রার বিপরীতে অর্জন দাঁড়ায় ৪৮ লাখ ৮৩ হাজার ৭৬০ হেক্টর। যা লক্ষমাত্রার চেয়ে ৭৮ হাজার ৫৬০ হেক্টর বা ১.৬৩ শতাংশ বেশি।


এছাড়া, এবছর হাইব্রিড ধানের আবাদ বৃদ্ধির জন্য কৃষকদের সরকারি প্রণোদনা দেয়া হয়। প্রতিবিঘা জমিতে চাষের জন্য ৬৪ জেলার ১৪ লাখ ৯৬ হাজার ৯৭০ কৃষককে বিনামূল্যে ৭৬ কোটি টাকার হাইব্রিড ধানের বীজ সহায়তা দেয়া হয় ২ লাখ হেক্টর জমি আবাদের জন্য।


আবার প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ নানা কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কিছু প্রান্তিক কৃষক বোরো ধানের আবাদ করতে সামর্থ্য নাও হতে পারেন- এমন বিবেচনায় নির্দিষ্ট কৃষকগণকে চিহ্নিত করে ১ লাখ ৬০ হাজার চাষীকে ২১ হাজার ৩৭৬ হেক্টর জমিতে আবাদের জন্য বিনামূল্যে বীজ ও সার সহায়তা দেওয়া হয়।


এবার বোরো মৌসুম চলাকালে ৪-১১ এপ্রিল পর্যন্ত মূলত ৬টি জেলায় ধানগাছ ‘হিট শক’ ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন ঝড়ো হাওয়া বা শিলাবৃষ্টিতে আক্রান্ত হয়। আক্রান্ত জমির পরিমান ছিল প্রায় ২১ হাজার ২৯২ হেক্টর। প্রাকৃতিক কিছু বৈরিতা থাকলেও কৃষকগণ সময়মতো সম্প্রসারণ কর্মীদের পরামর্শমতো ব্যবস্থা নিয়েছেন, জমিতে দ্রুত সেচের ব্যবস্থা করেছেন এবং বালাইনাশক ব্যবহার করেছেন বিধায় হিট শক ও অন্যান্য ক্ষতি কমিয়ে ফলন উঠিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। তবে চাষাবাদকালীন পোকামাকড়-রোগবালাইয়ের কারণেও প্রতিবছর ধানগাছের এমন কিছু ক্ষতি অনেকসময় হয়ে থাকে। এবছর অবশ্য রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়া থাকার কারণে এ ধরনের ক্ষতি কম হয়েছে।


কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. আসাদুল্লাহ বলেন, এবার বোরো ধানের ফলন বেশি হয়েছে। কারণ হাইব্রিডের আবাদ এবার বেড়েছে। নতুন নতুন জাতেরও সম্প্রসারণ ঘটেছে। হাইব্রিড ধানের আবাদ এবার বেড়েছে তিন লাখ হেক্টর। প্রতি হেক্টরে হাইব্রিডের উৎপাদন প্রায় ৫ টন করে হয়। ফলে তিন লাখ হেক্টরে প্রায় ১৫ লাখ টন ধান বেশি উৎপাদন হয়েছে।


তিনি বলেন, এবার আবহাওয়া ভালো ছিল। উৎপাদনে তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি। করোনার মধ্যেও আমরা কৃষককে নানাভাবে সহায়তা করেছি। দেশের ইতিহাসে বোরো ধান বা চালের উৎপাদন এবারই এত বেশি হয়েছে। যা দেশে সর্বোচ্চ বোরো ধান উৎপাদনে রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। করোনার মধ্যে এটি একটি বড়ো সুখবর।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here