ভোজ্য তেলের চাহিদা পূরণে বাড়ছে বীজ আমদানি

0
23

বাণিজ্য ডেস্ক: দেশে অপরিশোধিত ভোজ্য তেল আমদানির চেয়ে বীজ আমদানির দিকেই বেশি ঝুঁকছেন মিল মালিকরা। এতে সব ধরনের অপরিশোধিত তেলের আমদানি কমে তেলবীজ আমদানি বাড়ছে। এতে এক দিকে মিলগুলোতে যোগ হচ্ছে নতুন বিনিয়োগ। বীজ থেকে তেল উৎপাদনের যন্ত্রপাতি (সিড ক্রাশিং মেশিন) সংযোজন হচ্ছে। অন্যদিকে তেলবীজ উৎপাদনে আশা দেখছেন কৃষকরা। তুলনামূলক খরচ কম, শুল্ক সুবিধা ও দেশে সয়ামিলের চাহিদা বাড়তে থাকায় তেলের বাজারে এই পরিবর্তন আসছে। তবে উৎপাদকরা বলছেন, দেশের বীজ থেকে তেল উৎপাদন করতে হলে বীজের মান ভালো করতে হবে।


কাস্টমস ও আমদানি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্যে দেখা যায়, দেশে বছর পাঁচেক আগে সয়াবিন, পাম ও ক্যানুলা (সরিষা দানার মতো) থেকে উৎপাদিত অপরিশোধিত ভোজ্য তেল আমদানি হতো কমবেশি সাড়ে ২৬ লাখ মেট্রিক টন। বর্তমানে তা কমে ২৩ লাখের ঘরে নেমে এসেছে। মূলত গত তিন বছর ধরে এই চিত্র দেখা যাচ্ছে। বিপরীতে আগে যেখানে দুই থেকে আড়াই লাখ টন তেল উৎপাদনে বীজ দেশে আমদানি হতো, এখন তা বেড়ে সাড়ে তিন লাখ টনের ওপরে উঠেছে। আমদানি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, চলতি বছর বাড়তি মূল্যের পরও বীজের আমদানি ২০ লাখ টনের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে। গড়ে ২০ শতাংশ হারে এই বীজ থেকে চার লাখ টনের বেশি তেল উৎপাদিত হবে।


মালয়েশিয়ান পাম ওয়েল কাউন্সিলের সাবেক আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক (বাংলাদেশ ও নেপাল) এ কে এম ফখরুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘দেশে এখন অনেক প্রতিষ্ঠানই বীজ থেকে তেল উৎপাদনে ঝুঁকছে। অনেক রিফাইনারি সিড ক্রাশিং মেশিন স্থাপন করা হচ্ছে। বছর চারেক আগেও দেশে এ জাতীয় কারখানা ছিল তিনটি। এখন চালু মিল রয়েছে পাঁচটি। আরো তিনটি চালুর পথে। বিনা শুল্কে বীজ আমদানির সুযোগ ও তেল তৈরির পর সয়াবিন মিল বা খইলের আলাদা বাজার তৈরি হওয়ায় এ চিত্র দেখা যাচ্ছে।’


বন্দর কাস্টমসের তথ্যে দেখা যায়, ২০১৭ সালে দেশে অপরিশোধিত ভোজ্য তেল আমদানি হয়েছিল ২৬ লাখ ৩৮ হাজার মেট্রিক টন। এ সময় দুই লাখ ৭০ হাজার টন তেলের জন্য সয়াবিন বীজ আমদানি হয়। পরের বছর অপরিশোধিত তেল আমদানি হয় ২৬ লাখ ৬২ হাজার টন ও বীজ আমদানি করে তেল উৎপাদন হয় দুই লাখ ছয় হাজার টন। তবে চিত্র বদলে যায় ২০১৯ সালে। এ সময় সয়াবিন, ক্যানুলা ও পাম তেল আমদানি হয় ২৪ লাখ ৩০ হাজার টন। বিপরীতে বীজ আমদানি হয় তিন লাখ ৪০ হাজার টন তেলের। পরের বছর করোনা পরিস্থিতিতে আমদানি-রপ্তানি কিছুটা ব্যাহত হয়। এর পরও তেল আমদানি হয় ২৩ লাখ পাঁচ হাজার টন। তবে তিন লাখ ৮৪ হাজার টনের সমপরিমাণ তেলের বীজ আমদানি করেন মিল মালিকরা। চলতি বছর নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে তেল আমদানি হয়েছে ২১ লাখ ১৬ হাজার টন, আর আমদানি বীজ থেকে তেল উৎপাদন হয়েছে তিন লাখ ২৬ হাজার টন।


দেশে বর্তমানে বেসরকারি সিটি গ্রুপের দুটি, মেঘনা গ্রুপের দুটি ও গ্লোবের একটি সিড ক্রাশিং মিল রয়েছে। এসব মিলে দৈনিক ১১ থেকে ১২ টন বীজ মাড়াই করা হয়। এ ছাড়া সিটি গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ ও টিকে গ্রুপ একটি করে আরো তিনটি মিল স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। এসব মিল চালু হলে আরো ১১ থেকে ১২ টন বীজ মাড়াই করা যাবে দৈনিক।


বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে দেখে যায়, ২০১৬-১৭ সালে দেশে তেলবীজ আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল ৪১ কোটি ৩০ লাখ ডলার। সর্বশেষ গত অর্থবছরে তেলবীজ আমদানিতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১২৮ কোটি ৭০ লাখ ডলার। অর্থাৎ এই পাঁচ বছরে তিনগুনেরও বেশি বেড়েছে। শুধু গত অর্থবছরেই তেলবীজ আমদানি বেড়েছে ৩৩ শতাংশ। ২০১৯-২০ সালে এ খাতে আমদানি ব্যয় ছিল ৯৬ কোটি ৮০ লাখ ডলার।


বীজ থেকে তেলের উৎপাদন বাড়তে থাকায় আশা দেখছেন দেশের কৃষকরা। অনেক অঞ্চলেই তেলবীজ উৎপাদনে ঝুঁকছেন তাঁরা। লাভজনক হওয়ায় এবং চাহিদা তৈরি হওয়ায় আবাদে আগ্রহী হয়ে উঠছেন কৃষকরা।


বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যে দেখা যায়, গত অর্থবছর দেশে মোট পাঁচ লাখ ৮৫ হাজার ৮৫৭ মেট্রিক টন তেলবীজ উৎপাদিত হয়েছিল। ২০১৯-২০ সালে উৎপাদন হয়েছে পাঁচ লাখ ৫৭ হাজার মেট্রিক টন। অর্থাৎ গত বছর উৎপাদন বেড়েছে সাড়ে ২৮ হাজার টন বা ৫ শতাংশ। আগের বছর উৎপাদন বেড়েছিল ৩৮ হাজার টন বা ৭.৩২ শতাংশ। ২০১৮-১৯ সালে তেলবীজ উৎপাদন হয়েছিল পাঁচ লাখ ১৮ হাজার টন।


গত অর্থবছর এক লাখ ৪২ হাজার হেক্টর জমিতে ৯১ হাজার ১৭৬ মেট্রিক টন সয়াবিন বীজ, আট লাখ ১৪ হাজার হেক্টর জমিতে প্রায় চার লাখ টন সরিষার উৎপাদন হয়েছিল। বাকিটা সূর্যমুখী, তিল ও চিনাবাদাম বীজ।


তবে মিল মালিক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশের বীজ থেকে তুলনামূক তেল কম আসে। তাই দেশের বীজে খুব একটা আগ্রহ নেই মিল মালিকদের। এ ক্ষেত্রে বীজ উন্নয়নের দিকে জোর দিতে পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা। সয়াবিন বীজ থেকে তেল উৎপাদনের পর সয়ামিলের চাহিদা বেশি। তবে তেল বেশি উৎপাদন হয় ক্যানুলা থেকে। তাই দুটির আমদানিই হয় দেশে।


টিকে গ্রুপের পরিচালক (ব্র্যান্ড অ্যান্ড ফাইনান্স) শফিউল আতহার বলেন, ‘বীজ আমদানির কারণে সরাসরি তেল আমদানি কমছে। শুল্ক সুবিধা, তুলনামূলক খরচ কম, ও বাইপ্রডাক্ট হিসেবে খইল বা মিলের বাজার তৈরি হওয়ায় ভোজ্য তেলের বাজারে পরিবর্তন হচ্ছে।’

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বাড়াতে সরকারের ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদের একটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। সরিষা, তিল, সূর্যমুখী, চিনাবাদাম, সয়াবিনসহ তেল ফসলের আবাদ এলাকা ২০ শতাংশ বাড়ানো ও তেলজাতীয় ফসলের হেক্টর প্রতি ফলন ১৫-২০ শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here