মনুষ্যত্ব বিকাশে সূফী সম্রাটের ভূমিকা

সূফী সম্রাট হযরত মাহবুব-এ-খোদা দেওয়ানবাগী (মাঃ আঃ) হুজুর কেবলাজান ।

এ আর ফজলে রাব্বী মো. ফরহাদ
মহান আল্লাহ্ মানুষ ব্যতীত সমগ্র সৃষ্টি সৃজন করতে একটি মাত্র নির্দেশনা ‘কুন’ বা ‘হও’ বলতেই তৈরী হয়ে গেছে। তাতে কোনো প্রকার প্রাক প্রস্তুতি, মালামাল, লোকবল, নকশা ও সময়ের প্রয়োজন হয়নি।

সূরা ইয়াসিনের শেষাংশে বলা হয়েছে- তিনি যখন কোনো কিছু করতে ইচ্ছা করেন, তিনি কেবল বলেন, ‘হও’ ফলে তাই হয়ে যায়। কিন্তু মানুষের সৃষ্টি প্রক্রিয়া ও পরিক্রমা সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। কেননা মানুষ তৈরীর প্রাক্কালে মহান আল্লাহ্ সমস্ত ফেরেশতাদের নিয়ে পরামর্শ করেন। এসবের কারণ হলো মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। এ শ্রেষ্ঠত্বের কারণ, মানুষের ভূষণ-বসন নয়, বরং এর মাঝে রক্ষিত মহাধন রূহ বা পরমাত্মা। এ মর্মে মহান সংস্কারক যুগের ইমাম সূফী সম্রাট হযরত সৈয়দ মাহ্বুব-এ-খোদা দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজান বলেন, পিতার শুক্রকীট হতে জন্মলাভকারী প্রতিটি নর-নারী জীব বা প্রাণী। তাই মানবিক শাস্ত্রে বলা হয়েছে- “আল ইনসানু হাইওয়ানুন নাতিকুন।” অর্থাৎ মানুষ বাকশক্তি সম্পন্ন প্রাণী।

মানুষ নামীয় জীবগুলো বাহ্যিক শিক্ষার মাধ্যমে পার্থিব জীবনকে ভোগ-বিলাসিতায় মগ্ন করতে পারে। ফলে এ মানুষগুলোর জৈবিক চহিদা আরও ব্যাপক আকার ধারণ করে। এরই ফলশ্রুতিতে একে অপরের ধন-সম্পদ ঐশ্বররয্য হাতিয়ে নিতে নানারকমের ছলচাতুরী, ঝগড়া বিবাদ, হামলা-মামলা এমনকি খুনখারাবী পর্যন্ত ঘটায়। তখন মানব বসতিতে নেমে আসে নারকীয় যন্ত্রণা। যার বাস্তবতা অনাদিকাল হতে চলে আসছে।

মহান সংস্কারক সূফী সম্রাট হযরত দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজান বলেন, মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে মহান আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করার জন্য। তাই মানুষকে প্রভুর গুণে গুণান্বিত হতে হবে। বলা হয়েছে তোমরা আল্লাহর চরিত্রে চরিত্রবান হও। হযরত রাসুল (সা.) আল্লাহর চরিত্রের ধারক ও বাহক হয়ে মানুষরূপী পশুদের মাঝে তাদেরকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে রূপান্তর করার জন্য আবির্ভূত হয়েছিলেন। পবিত্র কুরআনে তাইতো ঘোষণা হয়েছে- “অবশ্যই আল্লাহর রাসুলের মাঝে রয়েছে উত্তম আদর্শ।” আরও বলা হয়েছে- “নিশ্চয়ই আপনি সর্বোত্তম চরিত্রের উপর অধিষ্ঠিত।” নবুওয়তের পরিসমাপ্তি হলেও হেদায়েতের দ্বার অব্যাহত যা মহাপ্রলয় কাল পর্যন্ত চলবে।

হযরত রাসুল (সা.)-এর হেদায়েতের মহাশক্তি ধারণ করে যুগে যুগে নায়েবে রাসুল তথা অলী-আল্লাহ্গণের আগমন হয়েছে। সকল অলী-আল্লাহ্গণের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও শিক্ষাপদ্ধতি এক ও অভিন্ন। তাঁরাই হলেন, মানুষ গড়ার কারিগর ও মানবজতির জন্য আল্লাহ্ প্রদত্ত শিক্ষক।

অলী-আল্লাহ্গণের আগমনের ধারাবাহিকতায় সকল স্তরের মানুষের জন্য আদর্শ শিক্ষক হিসেবে সূফী সম্রাট হযরত দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজান নিরলসভাবে তাঁর সুমহান আদর্শ প্রচার করে চলেছেন। যার ফলশ্রুতিতে অগণিত মানুষ, পাপাচার হতে মুক্ত হয়ে হযরত রাসুল (সা.)-এর যুগের সাহাবীগণের ন্যায় পুতঃপবিত্র চরিত্রের অধিকারী হয়ে ইনসানে কামেলে পরিণত হচ্ছে।

প্রকৃত মানব হওয়ার পূর্বশর্ত আত্মশুদ্ধি লাভ করা। প্রকাশ্য উপাসনার মাধ্যমে বাহ্যিক কিছু রীতিনীতির প্রতিফলন হলেও প্রকৃত শুদ্ধতা তথা মনের কলুষতা দূর হয় না। তারজন্য প্রয়োজন ‘তাওয়াজ্জুহ’ (নেক নজর) বা সুদৃষ্টি। তাইতো বলা হয়েছে-
‘‘সান্নিধ্যের অগ্নিদাহে
হৃদয় তোমার নাও বানিয়ে
হয় না কিছু সোনাদানা
পরশমণির ছোয়া বিনা
নুরের প্রদীপ সদায় জ¦লে বুজর্গদের নেক নজরে।’’
সুফি দার্শনিক হযরত মাওলানা জালালুদ্দিন রূমী (রহ.) বলেন-
শত বৎসরের নির্জন ইবাদাতে যা লভ্য নয়
ক্ষণকাল আওলিয়ার সাহচর্যে তার চেয়েও অধিক হয়।

সূফী সম্রাট হযরত দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজান কাছে আসলে একজন সাধারণ মানুষ আশেকে রাসুলে পরিণত হয়। এটি হলো তাঁর অন্যতম শিক্ষা। মহান আল্লাহর নির্দেশে তিনি এ শিক্ষা এমন এক সময় হাতে নিয়েছেন যখন প্রচলিত ইবাদতগুলোর প্রভাব ও প্রতিফলনে রিপুর দংশন প্রশমিত হচ্ছে না। বরং তার ফল উল্টো দেখা যাচ্ছে। যেমন- আরব রাষ্ট্রগুলো যেখানে প্রকাশ্য ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন প্রচলিত রাষ্ট্রীয় আইনে বাধ্যতামুলক। সেসব দেশে শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ চরমভাবে উপেক্ষিত। আমাদের মাঝেও এর প্রভাব বিদ্যমান।

সূফী সম্রাটের শিক্ষার মাঝে আছে ইবাদতে আন্তরিক আগ্রহের আবহ। তাঁর প্রবর্তিত আশেকে রাসুল মিলাদ মাহফিল একটি অনন্য ইবাদত। যার হৃদয়গ্রাহী সুরের মরমি মূর্ছনা পাষাণ হৃদয়ের মানুষকেও শিহরণ জাগায়। তা যে কোনো মানুষকে আল্লাহ্ রাসুল, মৃত্যু, কবরসহ চিরন্তন সত্যের মুখোমুখী দাঁড় করায়। ফলে মানুষের মাঝে সেই বিষয়গুলো সচিত্রভাবে দোলা দেয়। আমি বিশ্বাস করি, সূফী সম্রাট হুজুর কেবলাজানের অন্তত এ আদর্শটি যদি আপামর মানুষের মাঝে প্রতিষ্ঠিত করা যায়, তাহলে মুসলিম জাতির হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার হবে। কবি বলেন, ‘‘প্রাণ থাকলে প্রাণী হয় কিন্তু মন না থাকলে মানুষ হয় না।’’

প্রাণের সঞ্চার হয় পিতার শুক্রাণু ও মায়ের ডিম্বাশয়ের সমন্বিতত মিলনে। যার ফলশ্রুতি মানুষ। আর অলী-আল্লাহ্গণের তাওয়াজ্জুহ্ হতে সঞ্চার হয় পরম সত্তা, যাকে বলা হয় ‘মন’। এ মনের জাগরণই মনুষ্যত্বের বিকাশ। এ মানুষের মাঝেই পাওয়া যাবে দয়া, মায়া, ক্ষমা, করুণা ও মানবতা। আজকের বিজ্ঞানের জয়যাত্রা মানুষকে জাগতিক প্রাচুর্যের চূড়ায় উঠিয়েছে বটে কিন্তু দারুণ অসহায় করে ফেলেছে। আজ বিজ্ঞানের অপব্যবহার পারিবারিক, সামাজিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দারুণ অনিশ্চয়তা দেখা যায়। এ হেন অবস্থায় মনুষ্যত্ব জাগ্রত না হলে কে কাকে রক্ষা করবে? আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা ও মানবিক মূল্যবোধে নিদারুণ অনুপস্থিতি বিদ্যমান। যা সচেতন মানুষ মাত্রই অনুধাবন করেন। নৈতিক অবক্ষয় ও শান্তিপ্রিয় মানুষকে আতংকে ফেলে দিয়েছে। কেননা ‘মরণ নেশা’ মাদকাসক্তির আধুনিক সংস্করণ ঠেকাতে সকল ব্যবস্থাই বরাবর অকার্যকর হচ্ছে। এক কথায়- সর্বত্রই এক অজানা হতাশা। হাদিস শরীফে আছে-এমন কোনো রোগ নেই; যার প্রতিষেধক দেওয়া হয়নি, এমন কোন সমস্যা নেই যার সমাধান দেওয়া হয়নি। ‘‘সকল সমস্যার সমাধান দিতে পারে- আল কুরআন।’’

সূফী সম্রাট হযরত দেওয়ানবাগী হুজুর কেবলাজান বলেন, নয় মাস স্বশস্ত্র যুদ্ধ করে হানাদার পাকিস্তানী হায়েনাদের বিতাড়িত করে ৫৪,১২৬ বর্গমাইল এলাকা স্বাধীন করতে আমরা সক্ষম হলেও মাত্র সাড়ে তিন হাত মানবজমিন (দেহ) হতে ছয়টি রিপু (কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য) পরিশুদ্ধ করতে পারছি না। ফলে প্রকৃত অর্থে আমরা মানবতার মুক্তি লাভ করিনি।

সূফী সম্রাট হযরত দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজান আপামর মানুষকে আহ্বান জানিয়ে বলেন, আসুন আমরা আরেক সংগ্রামে লিপ্ত হই আর সেটি হলো মানবতার মুক্তির সংগ্রম। সূফী সম্রাট হযরত দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজানের উক্ত আহ্বানটি মহানবি হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর আহ্বানেরই পুনঃউচ্চারণ। সেদিন যুদ্ধে বিজয় শেষে হযরত রাসুল (সা.) মদীনার উপকণ্ঠে এসে বলেছিলেন, আমরা ছোটো যুদ্ধ হতে প্রত্যাবর্তন করে বড়ো যুদ্ধের অভিমুখী হচ্ছি। সাহাবায়ে কেরাম বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ্! যে যুদ্ধে পিতা পুত্র হারাল, স্ত্রী স্বামী হারাল, এটা কী করে ছোটো যুদ্ধ হলো? হযরত রাসুল (সা.) বললেন, কু-প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধই হলো বড়ো যুদ্ধ। তাই মনুষ্যত্ব বিকাশের পূর্বশর্ত ষড়রিপুর বেড়াজাল হতে মুক্তি লাভ করা। আর সূফী সম্রাট হযরত দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজানের প্রধান শিক্ষাই হলো ষড়রিপুর তাড়না মুক্ত তথা মানবতা ও মানবাত্মার জাগরণ।

2 COMMENTS

  1. সূফী সম্রাট দেওয়ানবাগী হুজুর কেবলার সান্নিধ্যে গেলে মানুষের চরিত্রের পরিবর্তন হয়। ইহাতে বুঝতে পারা যায় উনি যুগশ্রেষ্ঠ অলি আল্লাহ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here