মনোরোগ নিরাময়ে হর্টিকালচার থেরাপি

0
36

মনোরোগ নিরাময়ে হর্টিকালচার থেরাপি
ঋতব্রত ব্যানার্জী

২০১১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ছিল ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে ঘটে যাওয়া মারণ জঙ্গি হানার দশম বার্ষিক স্মরণ দিবস। সেই দিন সকালে আমি আমার ছোটো ছেলেকে নিয়ে (শিকাগো বোটানিক্যাল গার্ডেনের) এক বৃহৎ জলাশয়ের পাশে হাঁটছিলাম। ঠিক তখনই আমাদের কানে ভেসে এলো চার্চের ঘণ্টা ধ্বনি- যা একনাগাড়ে বেজে ছিল ২৯৭৭ বার। (২০০১ সালে ঐ দিনেই ঘটে ছিল ‘ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে’ মারাত্মক জঙ্গি হানা এবং তাতে প্রাণ হারিয়ে ছিল ২৯৭৭ জন নিরীহ মানুষ)- ট্রেড সেন্টারের এই ভয়াবহ ঘটনা ও নিহত মানুষজনদের সমবেদনার স্মারক ঐ সংখ্যক ঘণ্টাধ্বনি। আমার পুত্র সে ঘটনা দেখেনি কিন্তু বারবার তা শুনেছে আমার কাছে। ফলে তার মনে জেগেছে সেই নিহত মানুষজনদের প্রতি সমচেবদনা ও মমত্ব। এই বাগানের প্রাকৃতিক সম্ভার কেবল আকর্ষণেরই বস্তু নয়- এ যেন মানুষের দুশ্চিন্তা ও ভয়াবহ ক্ষত নিরাময়ের আরোগ্য নিকেতন।’’

এই বক্তব্য শিকাগো বোটানিক্যাল গার্ডেনের প্রেসিডেন্ট ও মুখ্য কর্ণধার সোফিয়া শ-এর। তিনি আরো জানিয়েছেন যে, এই বাগানে কর্মরত আছে প্রায় দুই হাজার মানসিক অবসাদগ্রস্ত স্বেচ্ছাসেবী। তাঁদের এক সহকর্মীর ৪৭ বছর বয়সি বান্ধবী ম্যারিলি যকৃৎ-ক্যান্সার রোগে অকাল প্রয়াত হলে ম্যারিলির মা ও তিনি ম্যারিলির স্মৃতির উদ্দেশে এই বাগানে একটি ক্র্যাব আপেল গাছ রোপণ করেছিলেন। প্রতিবছর বসন্তকালে ঐ গাছটি লালফুলের বাহারে এতই সেজে ওঠে যে, বাগানে ভ্রমণকারী সকলেই সেই গাছের কাছে এসে কিছুক্ষণ দাঁড়ায়। ম্যারিলির মা ও তাঁর বন্ধু সে-দৃশ্য দেখে স্বজন হারানোর বেদনা অনেকটা ভুলতে পারেন।


অধুনা মনোবিদরা বলছেন, মানসিক রোগ নিরাময়ে হর্টিকালচার থেরাপি তথা বাগিচা বিদ্যার চর্চা বিশেষ ফলদায়ী। তাঁরা মনে করেন, বাগান পরিচর্যা হলো অন্যতম সাইকো- সোস্যাল থেরাপি। আমেরিকার বড়ো বড়ো উদ্যানের সঙ্গে যুক্ত থাকেন মনো চিকিৎসক ও হর্টিকালচার থেরাপিস্ট। মনোরোগীদের বাগান পরিচর্যার কৌশলকে ‘থেরাপিউটিক হর্টিকালচার’ বা ‘গ্রিন থেরাপি’ নামে অধুনা চিহ্নিত করা হয়। হর্টিকালচার থেরাপিস্ট নাতাসা এথরিংটন মনে করেন যে, মানসিক ভারসাম্যহীন শিশুদের নিয়ে বাগান পরিচর্যায় বীজ বপন, বৃক্ষরোপণ, গাছে জল দেওয়া, সার দেওয়া, মাটি খোঁড়া প্রভৃতি ক্রিয়ায় মনোনিবেশের মাধ্যমে তারা স্বাভাবিক জীবন ছন্দের আস্বাদ পায় এবং ধীরে ধীরে সুস্থতার দিকে আসে। বাগিচার সামগ্রিক স্নায়ুতন্ত্রজনিত শিশুরোগ, যথা- অটিজম, অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপার অ্যাক্টিভ ডিস-অর্ডার প্রভৃতির দ্রুত উপশম হয়।


উনিশ শতকের প্রথম দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মনোবিজ্ঞানের জনক ড. বেঞ্জামিন রাস মানসিক ব্যাধি উপশমে উদ্যান পরিচর্যার গুরুত্বের কথা বলেন। তারপর দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। ১৯৭২ সালে হর্টিকালচার থেরাপির প্রয়োগ শুরু হয় আমেরিকার ক্যান্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিভাগে। অধুনা এটি অন্যতম সাইকো-সোস্যাল থেরাপি হিসাবে জাপান, কোরিয়া, হংকং, ইংল্যান্ড, জার্মানি ও অন্যান্য দেশে প্রচলিত এবং এর মাধ্যমে স্কিজোফ্রেনিয়া, ডিমেনসিয়া, ম্যানিক ডিপ্রেশন ও অ্যালজাইমার ব্যাধির নিরাময় সম্ভব।


হর্টিকালচার থেরাপির মাধ্যমে প্যারানয়েড স্কিজোফ্রেনিয়া ব্যাধি থেকে মুক্ত ৬২ বছরের অবসরপ্রাপ্ত নৃত্যশিল্পী মিকলথ বন্ড লন্ডনের সিট্যালফিল্ড ফার্মে স্বেচ্ছাসেবকরূপে কর্মরত। তিনি মনে করেন, বাগান পরিচর্যায় তিনি প্রকৃতির সাথে আলিঙ্গনের সুযোগ পেয়েছেন। মৃত্তিকা খনন, বৃক্ষরোপণ, শিশু-উদ্ভিদ প্রতিপালন তাঁর প্রাথমিক কর্ম হলেও তার মাধ্যমেই তিনি ফিরে পেয়েছেন আত্মবিশ্বাস, স্বনির্ভরতা ও সমাজবোধের আস্বাদ।
ওরিগন স্টেট হর্টিকালচার থেরাপিতে নিযুক্ত এক কারাবন্দির ভাষায়-‘‘বৃক্ষরোপণ ব্যতীত উত্তম কর্ম আর কিছু হয় বলে আমি মনে করি না। আমার জীবনের লক্ষ্য প্রেইরি ঘাসভূমি সংরক্ষণ দ্বারা অবক্ষয়িত বাস্তুতন্ত্রের পুনরুদ্ধার।


মনোবিজ্ঞানিগণ মনে করেন, বাগান পরিচর্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উদ্ভিদের আকার, পাতার বাহার, ফুলের রং, ফুলের গন্ধ মনোরোগীর দর্শন, ঘ্রাণ ও স্পর্শ অনুভূতিকে উদ্দীপিত করে তার মধ্যে সংবেদনের সঞ্চার ঘটায়, যা তার স্নায়ুর স্বাভাবিক ক্রিয়া সংগঠনে সহায়তা করে। পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা অনুযায়ী নিয়মিত বাগান পরিচর্যাকারী ব্যক্তিরা সাত ঘণ্টাব্যাপী নিদ্রার অধিকারী হয়। কোরিয়ার কনকুক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা বলেন, প্রত্যহ কুড়ি মিনিট উদ্যান প্রযত্নে ডিমেনসিয়ায় আক্রান্ত রোগীরা সুন্থ থাকে। ২০১১ সালে ‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব মেন্টাল হেলথ নার্সিং’-এ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী বারো সপ্তাহ ধরে নিয়মিত উদ্যান পরিচর্যায় মানসিক অবসাদগ্রস্ত ব্যক্তিদের দেহে স্ট্রেস হরমোন তথা কর্টিসলের মাত্রা হ্রাস পায়। ভয়ানক নেশাগ্রস্ত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনেও সাইকো-সোস্যাল থেরাপি হিসাবে উদ্যান পরিচর্যাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।


ব্রিস্টল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সি. এ. লাউরির মতে, বাগিচার মৃত্তিকায় থাকা ব্যাকটেরিয়া মাইকোব্যাকটেরিয়াম ভ্যাকি মানবদেহের প্রান্তীয় সংবহনে প্রবেশ করে। মাটির সঙ্গে সরাসরি সংযোগযুক্ত বাগান পরিচর্যাকরীর দেহে এই ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করে দেহে অনাক্রম্যতা বৃদ্ধি করে এবং মস্তিষ্কস্থ কলারসে সেরাটোনিনের মাত্রা বাড়ায়। এর ফলে ব্যক্তির মানসিক অবসাদ দূরীভূত হয়ে মন প্রফুল্ল হয়। এই বাগান পরিচর্যার পরিশ্রমজাত উদ্ভিদের ক্রম বৃদ্ধি, তাদের পুষ্পোদ্গম এবং ফল ধারণের শোভা কর্মীদের মস্তিষ্কের মেসোলিম্বিক অঞ্চলের উদ্দীপনাকে বাড়িয়ে তোলে এবং ডোপামিনের ক্ষরণমাত্রা বাড়িয়ে ব্যক্তি দেহে স্বনির্ভরতা, আত্মবোধ ও আত্মবিকাশের সুযোগ এনে দেয়।


অনেক ক্ষেত্রে গমনাগমনে অক্ষম বয়স্ক ব্যক্তিগণ, যাঁরা একাকিত্বের শিকার, তাঁদের সেই মানসিক অবসাদ নিরসনে তাঁদের কাছে বনসাই করা ভ্রাম্যমাণ বাগিচা হাজির করা হয়। তখন বৃদ্ধ ও বৃদ্ধারা সেই বাগানের কাছে এসে বৃক্ষ পরিচর্যা করেন। একে বলা হয় ‘কমিউনিটি গার্ডেনিং’। এরূপ বাগিচা পরিচর্যায় বয়স্ক ব্যক্তিদের খুব আগ্রহ, এর ফলে তারা অনেকাংশে মানসিক স্ফূর্তি পায়।


মনোবিদ রিচার্ড থম্পসনের মতে, অধুনা ফ্ল্যাট বাড়িতে বাগান পরিচর্যার সুযোগ না থাকলেও ফ্ল্যাটের মধ্যেই স্বল্প সূর্যালোক ও কম জলের চাহিদাযুক্ত ইংলিশ আইভি, অ্যালোভেরা, লেডিস স্লিপার অর্কিড, ইন্ডিয়ান বেসিল, স্পাইডারপ্ল্যান্ট ও স্নেক প্ল্যান্টের মতো অবসাদ দূরে করা সম্ভব।
উটা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং বিজ্ঞান ও গণিত শিক্ষা বিভাগের কর্মাধ্যক্ষ ড. নালিনী নাডকার্নির মতে, উদ্যান পরিচর্যা ও প্রতিপালন পদ্ধতি সংশোধনাগারে থাকা বন্দিদের মধ্যে ক্ষমাশীলতা, নিজের প্রতি যত্নশীলতা ও শান্ত আচরণের প্রকাশ ঘটায় এবং সেইসঙ্গে অতিরিক্ত ক্রোধ ও উচ্চ রক্তচাপ প্রশমনেও সহায়তা করে।


বাগান পরিচর্যার অভ্যাস ব্যক্তির পেশি সঞ্চালন অব্যাহত রাখে, রক্তে পর্যাপ্ত অক্সিজেন জোগান বহাল রাখে, অনায়াস সূর্যালোক প্রাপ্তিকে সাহায্য করে; ফলে দেহে ভিটামিন ডি-র সংশ্লেষ-হার বাড়ে এবং নানা ধরনের ক্যান্সারের উপশম সহজতর হয়ে ওঠে। এ জাতীয় ক্রিয়া হৃৎস্পন্দনের হার স্বাভাবিক রাখে ও মাত্রাতিরিক্ত ওজনও নিয়ন্ত্রণ করে। মিসৌরি বোটানিক্যাল গার্ডেনের থেরাপিউটিক হর্টিকালচারের প্রধান ড. জেনি কার্বোন মনে করেন, হর্টি কালচার থেরাপির মুখ্য উদ্দেশ্য হলো প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগস্থাপনের মাধ্যমে মানুষের আবেগ প্রবণতা ও সংবেদনশীলতাকে জাগিয়ে তোলা, যাতে তারা সুস্থ এবং স্বাভাবিক জীবন ছন্দ ফিরে পায়।


পরিশেষে জানাই- আসুন! আমরা আমাদের সাধ্যমতো বাগান পরিচর্যায় নিজেদের নিয়োজিত রেখে আনন্দময় জীবন উপভোগ করি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here