মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ: কেন এবং কি করবেন?

0
56

মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ: কেন এবং কি করবেন?
ডা. স্নিগ্ধা সরকার

মস্তিষ্ক মানব দেহের খুবই সংবেদনশীল একটি অঙ্গ। শক্ত করোটির মধ্যে মস্তিষ্ক অত্যন্ত সুরক্ষিত অবস্থায় থাকে।
মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে ও এর বাহিরে অবস্থিত কোমল পর্দার (মেনিনজেস) মধ্যে অসংখ্য ছোটো-বড়ো রক্তনালী জালিকার মতো ছড়িয়ে থাকে। কোনো কারণে এসব রক্তনালী ছিড়ে গেলে মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণ ঘটে।
মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণ বিভিন্ন স্থানে ঘটতে পারে। যেমন- ঝিল্লি বা পর্দা (মেনিনজেস)-এর মধ্যে এবং মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে।

  • রক্তক্ষরণের কারণ:
    • মাথায় যেকোনো আঘাত জনিত কারণে রক্তক্ষরণ হতে পারে, বিশেষত রোড এক্সিডেন্টের পর। বয়স্কদের রক্তনালীর পেশিগুলো অনেকটা পাতলা হয়ে যায়। সেজন্য অল্প আঘাতেই (যেমন পা পিছলে শক্ত মেঝেতে পড়ে যাবার পর) মারাত্মক রক্তক্ষরণ (যেমন: সাব-ডুরাল হেমাটোমা) হতে পারে।
    • হেমোরেজিক স্ট্রোক: উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে মাত্রাতিরিক্ত কোলেস্টেরল, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস এসব কারণে মস্তিষ্কের ধমনী হঠাৎ করে ছিড়ে যাবার ফলে রক্তক্ষরণ ঘটলে একে হেমোরেজিক স্ট্রোক বলে। হঠাৎ করে উচ্চ রক্তচাপের ঔষধ সেবন করা বাদ দেওয়ার জন্যও হেমোরেজিক স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে।
    • মস্তিষ্কের রক্তনালীর নিজস্ব কিছু জন্মগত ত্রুটি থাকতে পারে। যেজন্য রক্তনালী জায়গায় জায়গায় বেলুনের মতো ফুলে যায়। এগুলোকে এনিউরিজম বলে৷ এই পাতলা বেলুনের মতো এনিউরিজম ফেটে গিয়েও ব্রেইন হেমোরেজ বা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ ঘটাতে পারে।
    • কিছু রোগের উপসর্গ হিসেবে রক্তক্ষরণ হতে পারে। যেমন: অ্যাপ্লাস্টিক এনিমিয়া, হিমোফিলিয়া, ডেংগু হেমোরেজিক ফিভার। এসব কারণে রক্তে অণুচক্রিকা কমে গিয়ে মস্তিষ্কেও রক্তক্ষরণ হয়।
    • এলকোহলসহ অনান্য নেশায় আসক্তি, ইয়াবা বা অন্যান্য উত্তেজনা বর্ধনকারী ঔষধ সেবনের জন্য ইদানিং অল্প বয়সীদের মধ্যেও মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণের ঘটনা দেখা যাচ্ছে।
    • ব্রেইন টিউমারের জন্য সেই টিউমারের মধ্যে রক্তক্ষরণ ঘটতে পারে।
    • তাছাড়া যারা রক্ত তরলীকরণের জন্য দীর্ঘদিন ইকোস্প্রিন জাতীয় ঔষধ খেয়ে থাকেন তাদের ক্ষেত্রেও ব্রেইন হেমোরেজের আশংকা থাকে।
    • এমাইলয়েড জাতীয় রোগের কারণে বয়স্কদের মস্তিষ্কে অনেক ছোটো ছোটো রক্তক্ষরণ হতে পারে। যেগুলো কিনা দীর্ঘদিন পর্যন্ত অলক্ষিত থাকে।
  • উপসর্গসমূহ:
  • উপসর্গ আসলে নির্ভর করে মস্তিষ্কের কোন জায়গায় রক্তক্ষরণ হয়েছে, কতটুকু হয়েছে এসবের উপর। তবুও কিছু সাধারণ উপসর্গ সবক্ষেত্রে পাওয়া যায়।
  • সাধারণত পুরুষ ও বয়স্কদের মধ্যে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের ঘটনা বেশি ঘটতে দেখা যায়। তবে সব বয়সীদের ক্ষেত্রেই এটা ঘটতে পারে।
    • তীব্র মাথাব্যথা হওয়া। সময়ের সাথে মাথা ব্যথা তীব্রতর হতে থাকে।
    • মাথাব্যথার সাথে ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া।
    • বমি করা বা বমিভাব হওয়া।
    • রোগীর চেতনার মাত্রা কমে যাওয়া, এমনকি অজ্ঞান হয়ে পরা।
    • শরীরের এক পাশ হঠাৎ করে দুর্বল/প্যারালাইজড হয়ে যাওয়া।
    • দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসা, খিচুনি হওয়া।
    • দীর্ঘদিন ধরে মস্তিষ্কে এক ধরনের রক্তক্ষরণে (ক্রনিক সাব-ডুরাল হেমাটোমা) রোগীর স্মৃতি শক্তি হ্রাস পাওয়া, হাঁটার সমস্যা, প্রস্রাব ধরে রাখতে না পারার মতো উপসর্গ পাওয়া যায়।
  • তবে আরেকটা বিষয় মনে রাখা জরুরি। প্রায় ৪৪% রোগীর ক্ষেত্রে একবার ব্রেইন হেমোরেজের পর একই ঘটনার আবার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।
  • মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে করণীয়:
  • এমনটা সন্দেহ করার সাথে সাথে দেরি না করে রোগীকে বিশেষায়িত হাসপাতালে নিতে হবে।
  • রক্তক্ষরণ নির্ণয়ের জন্য প্রথমেই মস্তিষ্কের সিটি স্ক্যান পরীক্ষা করা জরুরি।
  • পরবর্তীতে রক্তক্ষরণের কারণ, রক্তক্ষরণের জায়গা ও পরিমাণের উপর চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ভর করে।
  • অনেকক্ষেত্রেই সার্জিক্যাল ইন্ট্যারভেনশন দরকার হয়।
    • রক্তক্ষরণের পর জমাট বাঁধা রক্ত অপারেশনের মাধ্যমে অপসারণ করার প্রয়োজন হতে পারে।
    • মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ চাপ কমানোর জন্য ভেন্ট্রিকুলার ড্রেইনেজ টিউব ব্যবহার করা হয়।
    • রক্তনালীর ত্রুটি এনিউরিজমে বিশেষ ধরনের ক্লিপ লাগানোর কাজ বা কয়েলিং করা হয়।

তাই যেসব হাসপাতালে নিউরো সার্জারির সুবিধা আছে, সেখানে চিকিৎসা নেওয়াই উত্তম।

তাছাড়া খিচুনি ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য কিছু ঔষধ ব্যবহার করা হয়। রোগীকে সর্তকতার সাথে বারবার পর্যবেক্ষণ করতে হয়।

মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণের ঝুঁকি কমাতে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনোভাবে রক্তচাপের ঔষধ বাদ দেওয়া উচিত নয়।

রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা ও ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রণে রেখে, পরিমিত পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ ও নিয়ন্ত্রিত জীবন যাপনের মাধ্যমে অনেকাংশে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ প্রতিরোধ করা যায়।

সেইসাথে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের রোগীর জীবন বাঁচানো সম্ভব।
[লেখক: এম.ডি. রেসিডেন্ট (ফেইজ বি), নিউরোলজি বিভাগ, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here