মহান আল্লাহ তাঁর রূহ হতে রূহ মানুষের মাঝে ফুঁকে দিয়ে আত্মিক পঞ্চ ইন্দ্রিয় সৃষ্টি করেন

2
347

পবিত্র কুরআনে এরশাদ হচ্ছে- ‘‘আল্লাহ মানুষকে (মাতৃগর্ভে) মানবাকৃতি দান করেন এবং তাঁর রূহ হতে রূহ ফুঁকে দেন। অতঃপর তাদেরকে দান করেন কর্ণ, চক্ষু ও অন্তঃকরণ।’’ (সূরা আস সাজদাহ ৩২ : আয়াত ৯)
অত্র আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লাহর রাসুল (সা.) যে বাণী মোবারক প্রদান করেছেন, নিম্নে ইসলামের স্বর্ণযুগ হতে শুরু করে আধুনিক যুগের তাফসীর ও হাদিসের কিতাব যথা: তাফসীরে ইবনে আব্বাস তাফসীরে দুররে মানছুর, মুসনাদে আহমদ, বোখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ ও মিশকাত শরীফের হাদীস হতে উপস্থাপন করা হলো-
বর্ণিত হাদিসটি বিশিষ্ট সাহাবি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) কর্তৃক প্রণীত তাফসীরের কিতাব তাফসীরে ইবনে আব্বাস-এর ৩৪৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বলেন- ‘‘অতঃপর তিনি তাকে মানবাকৃতি দান করেন।’’ অর্থাৎ- মাতৃগর্ভে শিশুর সৃষ্টিকার্য পরিপূর্ণ করেন। এরপর তার মাঝে স্বীয় রূহ হতে রূহ ফুঁকে দেন। তিনি সৃষ্টি করেন তোমাদের জন্য আত্মিক কান যেন তোমরা সত্যবাণী এবং হিদায়েতের বাণী শুনতে পারো। আর তিনি সৃষ্টি করেন আত্মিক চোখ বা অন্তর দৃষ্টি যেন তোমরা পথ প্রদর্শনকারী সত্তাকে দেখতে ও চিনতে পারো। আর তিনি সৃষ্টি করেন অন্তঃকরণ বা ক্বালব যেন তোমরা ন্যায়, সত্য ও হিদায়েত হৃদয়ে ধারণ করতে পারো।’’
পর্যালোচনা
হাদিসের বর্ণনা হতে বিষয়টি পরিস্কার যে, আল্লাহ মাতৃগর্ভে শিশু সন্তানকে মানবাকৃতি দান করে রূহ ফুঁকে দেন, অতঃপর সৃষ্টি করেন, চক্ষু, কর্ণ ও অন্তর। অর্থাৎ- রূহ ফুঁকে দেওয়ার পরই আত্মিক পঞ্চইন্দ্রিয় জাগ্রত হয়। তখন মানব দেহের মাঝে যে কর্ণ সৃষ্টি হয় সে কর্ণ দিয়েই ওহি বা ইলহামের বাণী মানুষ শুনতে পায়, যে চক্ষুজাগ্রত হয় সে চক্ষু দিয়েই আল্লাহর রূপ দর্শন করে, তখন যে ত্বক জাগ্রত হয় সে ত্বকের সাহায্যেই সে রূহে আজম হতে উৎসারিত ফায়েজ উপলব্ধি করে এবং ঐ অন্তর দিয়েই আল্লাহর সত্তাকে সাধক নিজের মাঝে উপলদ্ধি করে।
বর্ণিত হাদিসটি হাদিসের কিতাব বোখারী শরীফ- এর ২য় খণ্ডের ৮৮১ পৃষ্ঠায় হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহর রাসুল (সা.) এরশাদ করেন- ‘‘দুনিয়াতে যে ব্যক্তি মূর্তি তৈরি করেছে, ক্বিয়ামত দিবসে তাকে নির্দেশ দেওয়া হবে এ মূর্তির মাঝে তুমি রূহ ফুঁকে দাও। সে কোনোভাবেই রূহ ফুঁকে দিতে পারবে না।’’
রূহ আল্লাহর সত্তা, যা মানব দেহে তাঁরই আমানত। মানুষের ইজ্জত-সম্মান, ভালো-মন্দ সবকিছু এ রূহের কারণেই।
বর্ণিত হাদিসটি হাদিসের কিতাব মুসলিম শরীফ-এর ২য় খণ্ডের ৩৩২ পৃষ্ঠায় হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) হতে বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহর রাসুল (সা.) এরশাদ করেন- ‘‘মায়ের পেটে সন্তানের প্রথম সৃষ্টি কার্য ৪০ দিনে সম্পন্ন হয়। অতঃপর তা রক্তপিণ্ডে পরিণত হয় ৪০ দিনে। অতঃপর এটা মাংস খণ্ডে পরিণত হয় ৪০ দিনে। অতঃপর আল্লাহ মানব শিশুর মাঝে স্বীয় রূহ হতে রূহ ফুঁকে দেন।’’
পবিত্র কুরআনের বর্ণনা মতে, আল্লাহ ৬টি স্তরে পর্যায়ক্রমে মানব শিশুকে সৃষ্টি করেন। সেগুলো হলো- ১. শুক্রকীট, ২. ডিম্বকোষের সাথে মিলিত অবস্থা, ৩. রক্তপিণ্ড, ৪. মাংস পিণ্ড, ৫. অস্থি সংযুক্ত অবস্থা এবং ৬. পূর্ণাঙ্গ মানবাকৃতি। অতঃপর আল্লাহ স্বীয় রূহ হতে রূহ ফুঁকে দিয়ে তাকে আপন প্রতিনিধিত্ব করার যোগ্যতা দান করেন।
বর্ণিত হাদিসটি মেশকাত শরীফ-এর ২০ পৃষ্ঠায় বোখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফ-এর সূত্রে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) হতে বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহর রাসুল (সা.) এরশাদ করেন- ‘‘মহান আল্লাহ ‘‘মাতৃগর্ভে সন্তানের আমল, বয়স, রিযিক এবং তার দুর্ভাগ্য ও সৌভাগ্য হওয়ার ব্যাপারটি লিখে দেন। অতঃপর তার মাঝে আল্লাহ স্বীয় রূহ হতে রূহ ফুঁকে দেন।’’
মহান আল্লাহ হযরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করে তাঁর পৃষ্ঠে হাত বুলিয়ে সকল রূহকে বের করে আনেন। অতঃপর তাদেরকে প্রশ্ন করেন- আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই? সকল রূহ একত্রে জবাব দিলেন- নিশ্চয়ই আপনি আমাদের প্রভু। অতঃপর আল্লাহ এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য সকল রূহকে আদমের পৃষ্ঠে পুনরায় প্রেরণ করেন। ফলে হযরত আদম (আ.) হতে শুরু করে কিয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ সৃষ্টি হবে রূহসমূহ বিভিন্ন নামে বিভিন্ন বাহনে সে সকল মানুষের মাঝে আগমন করতে থাকবে। সুতরাং রূহ যখন যে বাহনে যে নামে অবস্থান করে সে বাহনের কর্মের ছাপ তার স্মৃতি ফলকে সংরক্ষিত থাকে। বাহন পরিবর্তনের সময় রূহকে পূর্বের কর্মের ফল স্বরূপ যে ভাগ্যলিপি দেওয়া হয় উহাই তাক্বদির।
বর্ণিত হাদিসটি হাদিসের কিতাব মেশকাত শরীফ-এর ২০৪ পৃষ্ঠায় আহমাদের সূত্রে হযরত আবু সাঈদ আল খুদরী (রা.) হতে বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহর রাসুল (সা.) এরশাদ করেন- ‘‘শয়তান আল্লাহকে বলেছিল- হে আমার প্রতিপালক! তোমার ইজ্জতের শপথ। যতদিন তোমার বান্দার দেহে রূহ থাকেব ততদিন আমি তাদেরকে প্রতিনিয়ত ধোঁকা দিতে থাকব। মহান ও মহিমান্বিত আল্লাহ বললেন- আমার সম্মান, মর্যাদা, শ্রেষ্ঠত্ব এবং উচ্চ আসনের শপথ, আমিও তাদেরকে ক্ষমা করতে থাকব যখনি তারা আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে।’’
রূহ যতদিন মানবদেহে অবস্থান করে ততদিন নফস শয়তান মানুষকে ধোঁকা দিতে থাকে। নফস শয়তানের এ প্রবঞ্চনা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্যই মোর্শেদের নিকট যেতে হয়।
বর্ণিত হাদিসটি তাফসীরের কিতাব তাফসীরে দুররে মানছুর-এর ২১নং খণ্ডের ৫৩৯ পৃষ্ঠায় হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি বলেন- ‘‘আল্লাহ প্রত্যেককেই সুন্দরভাবে সৃষ্টি করেছেন।’ তিনি বলেন, এর অর্থ হচ্ছে- তাকে সুন্দর আকৃতি দান করেছেন।’’ (আল্লাহ তায়ালা মানব শিশুকে মাতৃগর্ভে উত্তম আকৃতি দান করে তার মাঝে স্বীয় রূহ হতে রূহ ফুঁকে দেন।)
বর্ণিত হাদিসটি তাফসীরের কিতাব তাফসীরে দুররে মানছুর-এর ২১নং খণ্ডের ৫৩৯ পৃষ্ঠায় হযরত মুজাহিদ (রা.) হতে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি বলেন- ‘‘আল্লাহ প্রত্যেক সৃষ্টিকেই সুন্দর করে সৃষ্টি করেছেন। পরিপূর্ণ আকৃতি দিয়েছেন।’’ কেননা আল্লাহ মানুষের মাঝে তাঁর রূহ হতে রূহ ফুঁকে দিয়ে তাকে স্বীয় প্রতিনিধি নির্বাচিত করেছেন।)
পরিশেষে পবিত্র কুরআন ও হাদিসের বর্ণনায় প্রমাণিত হয় যে, মহান আল্লাহ মাতৃগর্ভে পিতার শুক্রকীট হতে মানুষকে সৃষ্টি করেন। অর্থাৎ শুক্রকীট ডিম্ব কোষের সাথে মিলিত হয়ে পর্যায়ক্রমে রক্তপিণ্ড, মাংস পিণ্ড, অস্থি সংযুক্ত অবস্থা অতঃপর পূর্ণ মানবাকৃতি লাভ করে। এভাবে মাতৃগর্ভে ৪ মাসে শিশু সন্তানের গঠন সম্পন্ন হলে আল্লাহ তাঁর রূহ হতে রূহ ফুঁকে দেন। তখন ঐ শিশু সন্তানের মাঝে দেহের পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের পাশাপাশি আত্মিক পঞ্চ ইন্দ্রিয় সৃষ্টি হয়। ফলে তখন সে আপন ক্বালবে মহান আল্লাহর রূহময় সত্তার রূপ দর্শন করতে থাকে। এ সময় রাব্বুল আলামিনের রূপ দেখে সে এতোটই মোহিত হয়ে যায় যে, মাতৃগর্ভের বাকী সময় কিভাবে অতিবাহিত হয় সে টেরই পায় না। অতঃপর নির্দিষ্ট সময়ে যখন সে ভূমিষ্ঠ হয়, অন্য মানুষ তাকে স্পর্শ করে, তখনই আত্মিক চক্ষুর খেয়াল ছুটে যায়, আর সাথে সাথে ঐ রূপের দর্শন সে হারিয়ে ফেলে। মহান রাব্বুল আলামিনের রূহময় সত্তার রূপের দর্শন হতে বঞ্চিত হয়ে সে তখন চিৎকার করে উঁয়া উঁয়া শব্দ করে কাঁদতে থাকে। অর্থাৎ হায়! আমি কি হারালাম, কেন না সে মাতৃগর্ভে জাহেরি চক্ষু বন্ধ করে খেয়াল ক্বালবে ডুবিয়ে মোরাকাবারত অবস্থায় আত্মিক চক্ষু দ্বারা আল্লাহকে দেখে তাঁর প্রেমের সাগরে ডুবে থাকে।
আবার এই শিশুই যখন ঘুমিয়ে পড়ে তখন সে রূহের ঐ রূপ পুনরায় দেখে হেসে ওঠে, আর এ রূপ তার থেকে আড়াল হলে সে কেঁদে ওঠে। এভাবে আল্লাহর ফুঁকে দেওয়া রূহটি ঐ শিশুর নফসের সাথে খেলা করতে থাকে। অতঃপর ক্রমান্বয়ে এ শিশুটি যখন বড়ো হতে থাকে তখন তার পারিপাশির্^কতা, পরিবেশ ও নফসের প্ররোচনায় সে পাপ কাজে জড়িয়ে পড়ে। যখনই সে একটি পাপ কর্ম করে সাথে সাথে তার পরিশুদ্ধ ক্বালবের উপর একটি কালো দাগ পড়ে। এক পর্যায়ে দেখা যায় পাপ কর্ম করতে করতে রূহের সাথে তার যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এভাবেই মানুষ আল্লাহর প্রতিনিধির গুণ হারিয়ে ফেলে।
এই ব্যক্তিকে পুনরায রূহের মাধ্যমে আল্লাহর সাথে যোগাযোগ করতে হলে অলী-আল্লাহর সান্নিধ্যে গিয়ে এলমে তাসাউফের শিক্ষা গ্রহণ করতে হয়। হযরত রাসুল (সা.)-এর সিরাজাম মুনিরের ধারক ও বাহক ঐ মহামানব তাঁর এত্তেহাদি তাওয়াজ্জোহ শক্তির দ্বারা ঐ মানুষটির অন্তরে আল্লাহ নামের জি¦কির জারি করে দেন। এ পর্যায়ে তাকে আপন মোর্শেদের হৃদয় হতে ফায়েজ হাসিল করে ক্বালবের গুনাহর ময়লা পরিস্কার করে পুনরায় আল্লাহর সাথে যোগাযোগ করতে হয়।
তাফসীরে সূফী সম্রাট দেওয়ানবাগী ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৩৮৪ থেকে ১৩৮৮ সংকলিত

2 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here